
(নোটঃ
এম এ কায়সার টিপু নামে লেখালেখিতে সুপরিচিত তিনি। কুমিল্লায় কবি পরিচয়ের
বাইরেও সাংবাদিক পরিচয়েও সমধিক পরিচিত ছিলেন। এখন আর এম এ কায়সার টিপু নামে
লিখছেন না। মূলনাম মীর্জা আবু হেনা কায়সার টিপু। মীর্জা বানানটাও মির্জা
লিখতেন, বর্তমানে মীর্জা লিখছেন। বহুবছর ধরে কুমিল্লায় থাকছেন না, থাকছেন
ঢাকায়। তিনি আপাদমস্তক একজন কবি, লিখছেন মীর্জা আবু হেনা কায়সার নামে)
(এক)
আব্বা
আবদুল মজিদ ছিলেন রেলওয়ের টিটিই। ছাত্র জীবনে চারু কলায় বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে
পড়তে আগ্রহী থাকলেও রেলকর্মী আমার দাদা হাফেজ উদ্দিনের হাত ধরে, পিতার
একমাত্র পুত্র সন্তান রেলওয়ের জীবনেই আত্মসর্মপন করেছিলেন। তিনি তার চাকুরি
জীবন তিনটি আমলই পেয়েছিলেন। যেমন ৪৭ এর দেশ ভাগের আগে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া,
তারপর দেশ ভাগের পর পাকিস্তান এবং অবসরে গিয়েছিলেন ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ
রেলওয়ে থেকে। ৪৭ এ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন আম্মা জাহানারা বেগমের
সাথে। দীর্ঘ নিসন্তান জীবনে ১৯৭০ এর জুনে প্রথম সন্তান হিসেবে আমার জন্ম।
পরপর আমার দুই ভাই। আসলে আব্বার আবদুল মজিদ নামটি হারিয়েই গিয়েছিল, তিনি
ছিলেন টিটিই সাহেব নামে সুপরিচিত। একজন সাধারণ রেলওয়ের টিটিই হলেও তিনি
ছিলেন প্রসিদ্ধ মানুষ। অসাধারণ মানুষ। আমাদের কুমিল্লার উত্তরাঞ্চল তথা
বুড়িচং অঞ্চলের মানুষ তাকে এক নামে চিনতেন। আমাদের গ্রামটির নাম যদিও
শিবরামপুর, সিএস মানচিত্রে তার একটি উপনামও আছে, ধ্রুঘর। মানুষের মুখে
আঞ্চলিকতায় তিনি ছিলেন ধোরগরের টিটিসাব। আব্বাকে বেশিদিন আর পেলাম কই। ৭০ এ
জন্ম আব্বা চলে গেলেন ৮১ এর অক্টোবরের এক দুপুরে আমার ১১ বছর বয়সে। শৈশবে
আব্বাকে যতটুকু পেয়েছিলাম, তিনি তো থাকতেন চাকুরিতে ছুটিতে আসতেন। আমরা
থাকতাম গ্রামের বাড়িতে। এই অগোছালো সময়ে আব্বাকে যতটুকু চেনা। আব্বার ছিলো
চারু শিল্পের গুণ। তার গানের গলা ছিলো অসাধারণ। সবচেয়ে যে বড় গুণটা, তিনি
ছিলেন সেক্যুলার। ধর্ম কর্ম নিয়ে আগ্রহ যেমন ছিলো না মাতামাতিও ছিলো না।
রাজনৈতিক চিন্তা ছিলো বাম ঘরানার। দেশ বিদেশি (বিশেষ করে বিদেশি ইংরেজি) বই
পড়তে ভালোবাসতেন। পড়তেন ইংরেজি পত্রিকা, বাংলা পত্রিকাও। আব্বা যদিও
রেলওয়ের চাকুরিজীবী আমার তা কোনোদিনও মনে হতো না। তিনি যখন চাকুরি থেকে
বাড়ি আসতেন, কাধে বুদ্ধিজীবী ধরনের ব্যাগ মাথায় বামপন্থি টুপি। চলনে বলনে
একজন শিল্পিসুলভ বুদ্ধিজীবী মানুষই আমার মনে হতো। আমার মনে হতো তিনি বাচাঁর
জন্যই চাকুরিটা করতেন, ভিতরে যে তিনি অন্য মানুষ। তবে রেলওয়ের কাজটাকে
অবহেলা তিনি করতেন না। সততা ও নিষ্ঠার সাথে টিটিই পেশাটা ছিলো তার। আব্বার
যে গুণটা আমার আম্মা ও গ্রামবাসীর কাছে ধরা পরতো, সেটা হচ্ছে সব সংকটে তার
চিন্তা উদ্ভাবনী ও অসাধারণ কৌশল। যা সংকট মুক্তির জন্য সহায়ক। এমন সুক্ষ্ম
বুদ্ধি। আম্মার ভাষায় মুশকিল আসান। তিনি ছিলেন মানুষের মুশকিল আসানের
সহায়ক। গ্রামের মানুষ সংকটে তার সহায়তা চাইতেন। তাদের ভাষায় চিকন
বুদ্ধিদাতা। আব্বা ধর্মে কর্মে আগ্রহী না থাকলেও সৎ ছিলেন। মানুষকে কষ্ট
দিতেন না। মানুষের ক্ষতিতো চিন্তাও করতে পারতেন না। তবে মানুষ থেকে কষ্টও
পেয়েছেন ক্ষতির সম্মুখীনও হয়েছেন। যেখানে গ্রামের মানুষ আঞ্চলিক ভাষায় কথা
বলতো সেখানে আব্বা যখন প্রমিত বাংলায় কথা বলতেন। তা অনেকের কাছেই হাস্যরসের
কারণ হতো। আব্বাকে আমি আঞ্চলিক ভাষার ধারে কাছেও পাইনি কোনোদিন তিনি
চমৎকার শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতেন। আমার বারবার মনে হতো আব্বা একজন বড় মাপের
চারু শিল্পি হতে পারতেন চেষ্টা করলে। তার যে জীবন যাপন আমি দেখেছি, তিনি যে
শিল্পিসুলভ মানুষই ছিলেন। তার বচনে স্বভাবে চিন্তায় চেতনায় আচরণে বিজ্ঞ
জ্ঞানী পন্ডিত মানুষ ছিলেন। রেলের চাকুরি করলেও তিনি জ্ঞানার্জন করে গেছেন
নিষ্ঠার সাথে। আজ মনে হচ্ছে চারুশিল্প গুণ কন্ঠ যাদুর মানুষ আব্বার রক্ত
থেকেই আমার শব্দ খেলা (কবিতা চর্চা ) প্রতিভার বিকাশ।
(দুই)
আমার
জন্ম ১৯৭০ এর জুনে। আব্বা চলে গেলেন ১৯৮১ এর অক্টোবরের এক দুপুরে। পিতা
পুত্রের মাত্র ১১ বছরের সখ্যতা। ১১ বছরে আমার দুটি ঘটনাই অন্তর ছুঁয়ে আছে।
(ক)
আমার বয়স তখন ৬-৭ হবে, বাড়ির চাচাতো বড় বোন শানু বুবুর সাথে তার মামার
বাড়ি চলে গিয়েছিলাম একদিন সকালে। আমি আমাদের পাড়ার রাস্তায় দাড়িয়ে ছিলাম,
শানু বুবু বলাতে আমি তার সাথে চলে গেলাম। আমাদের শিবরামপুর থেকে মাইল
তিনেকের পথ পায়ে হেটে গোমতীর তীর ঘেষা বাজেউরা গ্রাম। বুবু অবশ্য আমাদের এক
ভাবির কাছে বলে গিয়েছিল যে আমারে নিয়ে যাচ্ছে আম্মার কাছে যেন বলে। ভাবি
সম্ভবত তা আর আম্মাকে বলেনি। আমি তো আনন্দেই ছিলাম। এদিকে আব্বা আমার
খোঁজে মাঠ ঘাট এ গ্রাম সে গ্রাম পথে প্রান্তরে বাড়ি ঘরে এমনকি খালের জলে
পুকুরের জলে পাগলের মতো খুঁজেছেন। আব্বা আম্মার কান্নাকাটিতে বাড়ির পরিবেশ
ভারি হয়ে গিয়েছিলো। পাড়া প্রতিবেশী এমনকি গ্রামবাসিও ছুটে এসেছিল সান্তনা
দিতে। সন্ধ্যায় যখন শানু বুবুর সাথে বাড়ি ফিরে এলাম আমাকে জড়িয়ে আব্বা
আম্মার সে কি কান্নাকাটি আমার চোখেও কান্না। কি এক দৃশ্যের জন্ম হয়েছিল।
সেদিন আব্বার যে অসহায় শুকনো মুখটা আমি দেখেছিলাম। সন্তান হারিয়ে যাওয়া
পিতা আমার আব্বার শুকনো মুখটা আমি আজও ভুলতে পারছিনা।
(খ) আব্বা ১৯৭৯
সালে অবসরে গিয়ে কয়েকটি স্মার্ট সুন্দর সুঠাম দেহের খাসি ছাগল কিনেছিলেন
শখে পোষার জন্য। একদিন সকালে তিনি ছাগলগুলো নিয়ে চড়াতে গেলেন আমাদের পূবের
জলায়, ফসলহীন খালি মাঠে ঘাস খাওয়াতে। আমাদেরও জমি আছে ও মাঠে আগানগর
দিঘিরচর মৌজায়। স্কুল ছুটির দিন ছিলো সেদিন। আব্বা আমাকে বলেছিলেন দুপুরে
যেন আমি একটু যাই ছাগলগুলোর কাছে। তিনি খাবার খেতে বাড়ি আসবেন। দূরন্ত বয়স
আমি আসলে আব্বার সেই আদেশ ভুলে যাই। ছাগলের ঘাস খাওয়ানোর নেশায় পেয়ে বসে
আব্বাকে। তিনি আর আসেননি বাড়ি। ছাতা মাথায় থাকলেও চৈত্রের রোদে পোড়া মুখটা
নিয়ে আব্বা যখন বিকেলে বাড়ি আসলেন ছাগলগুলো নিয়ে, আব্বার সেই শুকনো মখটাও
আমার মনে থাকে সবসময়। সাথে অপরাধবোধটাও আমাকে স্মৃতির ভাঁজে কাবু করে
ফেলে।
(তিন)
আমার জন্ম ১৯৭০ এর ১৯জুন। আমাকে যখন আমার আব্বা আব্দুল
মজিদ আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে নিয়ে গেলেন, সেখানে স্যারেরা
নিজের ইচ্ছেমতো আমার একটা জন্ম তারিখ আবিষ্কার করলেন। আমার সেই নতুন জন্ম
তারিখটি হল ১৫ মার্চ ১৯৭৩। আমার আব্বা একজন সচেতন শিক্ষিত মার্জিত ও
বুদ্ধিদিপ্ত মানুষ হয়েও আমার সেই দ্বিতীয় জন্ম তারিখটি সমর্থন করলেন।
আমাদের সময়কার আমরা সবাই ই এই একটি করে দ্বিতীয় জন্ম তারিখের বোঝা বহন করে
আছি। স্যারদের মনগড়া ১৫ মার্চ ১৯৭৩ জন্ম তারিখটি নাগরিক সব ক্ষেত্রে
ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছি।
(চার)
আমার আব্বা দাড়িয়ে থেকে দেখছিলেন,
আমার স্যারেরা আমার আসল জন্ম তারিখটা কি ভাবে হত্যা করলেন। ঠিক আমার দাদা
হাফেজ উদ্দিন ও নাকি আমার আব্বার স্বপ্নটাকে গলা টিপে হত্যা করেছিলেন। আমার
আব্বা ছিলেন রেলওয়ের সিনিয়র টিটিই। তবে তার টিটিই হওয়ার কথা কিন্তু ছিল
না। তিনি ইঞ্জিনিয়ার বা চারুকলায় পড়তে আগ্রহী ছিলেন। দাদার একমাত্র সন্তান
ছিলেন আব্বা। আমার দাদা ও রেলওয়েতে চাকুরী করতেন। তিনি আমার আব্বাকে
রেলওয়ের চাকুরী করতে বাধ্য করলেন। শিল্প রুচিবোধ সম্পন্ন আব্বা রেলওয়ের
জীবনেও সফল মানুষ-ই ছিলেন। রেলকেও ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তবে শিল্পবুদ্ধি,
যুক্তি কোনটা-ই হারিয়ে ফেলেননি। ছিলেন বিচক্ষণও। বামঘরানার চিন্তাযুক্ত
মানুষ ছিলেন, সোভিয়েত নেতা ভøাদিমির লেনিন কে পছন্দ করতেন, এমন কি কার্ল
মার্ক্স এ ও ঝোঁক ছিল। মোহ ছিল লেনিন বাদ ও মার্ক্স বাদে। সেজন্যই বুঝি
তৃতীয় পুত্রের নামেও লেনিনের স্বাদৃশ্য পাওয়া যায়। ইকবাল আলাতাস লেনিন।
(পাঁচ)
আম্মা
জাহানারা বেগম ছিলেন শিবরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালযের (বর্তমানে শিবরামপুর
স, প্রা, বিদ্যা) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাকালীন অবৈতনিক শিক্ষক। তা ছাড়াও
তিনি সম্ভবত দুই/তিন বার এই স্কুল কমিটির সভাপতি ও ছিলেন। একজন নারী হওয়ার
কারণে তার কর্মকাণ্ডের আলোচনা কমই এসেছে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। তার
জাহানারা বেগম নামটাও ভালোভাবে উপস্থাপনে অনিহা প্রকাশ পেয়েছে বিদ্যালয়ের
বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, ডাকনাম জাহেদা সম্বোধন করে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষের
ভালো কাজ কখনো হারিয়ে যায় না। ২০২৫ সালের শেষের দিকে গ্রামের বেশ কিছু
শুভাকাংখীদের সহযোগিতা নিয়ে। ইঞ্জিনিয়ার শাহীন রেজা আবু হেনা রায়হান
বিদ্যালয়ের একটি অনারম্ভর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে
গ্রামবাসীর পাশাপাশি আমন্ত্রিত উপস্থিতি ছিল বেশ কজন সম্মানিত সচিব,
সচিবদের মধ্যে একজন এই বিদ্যালয়ের ছাত্র ও এই গ্রামের সুযোগ্য সন্তান।
ছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের উর্দ্ধতন এক কর্মকর্তা। তিনি ও এই গ্রামেরই
সন্তান। ছিলেন জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা,
থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ, বেশ কিছু ইন্সপেক্টর পুলিশ সদস্য।
অনুষ্ঠানটি গ্রামবাসীর মন কেড়ে নেয়। অনুষ্ঠানে প্রয়াত ও বেঁচে আছেন, এই
স্কুলের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ও শিক্ষকতার সাথে যুক্ত ছিলেন, এমন সকলকে
সম্মানজনক ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। এমন এক আলোকিত ক্রেস্ট এর ডিজাইনার ও
আয়োজক ইঞ্জিনিয়ার শাহীন রেজা আবু হেনা রায়হান। আমার আম্মাও মরনোত্তর সে
ক্রেস্ট পেয়েছেন, পেয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও অবৈতনিক শিক্ষক হিসেবে।
আয়োজকদের অনিচ্ছাকৃত ভুলে সম্ভবত দুই/তিন বার স্কুল কমিটির সভাপতিও যে তিনি
ছিলেন তা এরিয়ে গেছে।
(ছয়)
আমার আম্মা জাহানারা বেগম উচ্চ
বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বয়সেই বেশ ক’বার ত্রিপুরা রাজ্য ভ্রমণের সুযোগ
পেয়েছিলেন। সেটা ১৯৪৭ এর দেশ ভাগের আগে। যদিও আমাদের কুমিল্লা অঞ্চলও
ত্রিপুরা রাজ্যেরই অংশ ছিল। দীর্ঘদিন তিনি আগরতলা শহরে কাটিয়েছেন আমার বড়
খালার বাসায়। খালু ছিলেন সরকারী সার্ভেয়ার। চালাক বাঙ্গালিদের দ্বারা সহজ
সরল আদিবাসি টিপরারা যে কতভাবে ঠকতো তার অনেক গল্প আম্মার মুখে শুনেছি।
ত্রিপুরা আদিবাসিদের পাহাড়ি জীবনযাপনের সাথে আম্মার পরিচয় ঘটেছে বহুবার।
আম্মার সেই টিপরা সম্প্রদায়ের গল্পগুলোর মধ্যে একটি অন্যরকম গল্পও ছিল যা
আজ আমার বড় মনে পড়ছে। আম্মার মুখে গল্পটি ছিল এমন, পাহাড়ি কঠিন জীবনে
বসবাসকারী একজন টিপরার রেডিও কেনার গল্প। তিনি আগরতলা শহর থেকে একটি রেডিও
কিনে এনেছিলেন। তার পাহাড়ে অনেক কষ্টও পরিশ্রমের আয় খরচ করে। দিনেরপর দিন
দীর্ঘপথ পারি দিয়ে সেই শহরে গিয়ে রেডিও কিনে এনে, যখন তিনি তা চালু করলেন।
তখন তিনি যারপরনাই হতাশ হলেন। সেই টিপরা ভদ্রলোকের আক্ষেপটা ছিল এই রকম,
কষ্ট করলো আমি-ধান বেচলো আমি- শহরত গেলো আমি, রেডিও কিনলো আমি, সেই রেডিও
খালি ছরকার ছরকার কয়, আমার কথা একবারও কইলোনা, এই বলে এক আছারে রেডিও
ভেঙ্গে চুরমার।
লেখক: কবি
