শনিবার ২০ জুন ২০২৬
৬ আষাঢ় ১৪৩৩
রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
আবু আহমেদ
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১:০১ এএম আপডেট: ২০.০৬.২০২৬ ১:২৭ এএম |

 রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনসাধারণের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে এ লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাতের লক্ষ্যমাত্রা ৯১ হাজার কোটি টাকা। এ বিশাল রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালঞ্জে। কারণ বর্তমানে দেশের সামস্টিক অর্থনীতির সূচকসহ রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাপী বিরাজমান কঠিন পরিস্থিতির কারণে ভীষণ চাপের মুখে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি-ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কার জরুরি।
প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বাজেট উপস্থাপনের পর প্রথম কার্যদিবসে মূল্যসূচকের উল্লেখযোগ্য উত্থান হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম। পাশাপাশি বেড়েছে লেনদেনের গতি। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে ১০০ পয়েন্টের ওপরে। লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি। অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) মূল্যসূচকের বড় উত্থান হয়েছে। সূচকের এই বড় উত্থানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানি।
এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারবান্ধব কিছু উদ্যোগের পাশাপাশি করকাঠামোয় আনা পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে বাজেট-পরবর্তী বাজারে ক্রয়চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে বাজেটের পর প্রথম কার্যদিবসেই হয়েছে বড় উত্থান। আর্থিক খাতের ১৬টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে কমেছে পাঁচটির এবং দুটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এ ছাড়া বিমা খাতের ৪৭টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে দাম কমেছে আটটির এবং তিনটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩৫৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। তার আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ১ হাজার ২৩৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। লেনদেন বেড়েছে ১১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। বাজেটের আকার বড় হলে রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালঞ্জে হবে। বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহার এবং সরকারের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার আলোকে বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসার পরিবেশ, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রভৃতি খাতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বাজেটঘাটতি মেটাতে স্থানীয় ব্যাংকব্যবস্থার পরিবর্তে যথাসম্ভব সুলভ সুদে ও সতর্কতার সঙ্গে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের জন্য নজর দেওয়া যেতে পারে।
বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং তদারকির মান ক্রমাগতভাবে উন্নয়নের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া বাজেট বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারত্ব আরও জোরদার করা দরকার। বাজেট বাস্তবায়নে উচ্চমূল্যস্ফীতি, কম কর-জিডিপি অনুপাত, খেলাপি ঋণের উচ্চহার, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
পুঁজিবাজারকে আরও স্বচ্ছ, বহুমাত্রিক ও আস্থাভিত্তিক করতে মূলধন সংগ্রহ সহজীকরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা যায়। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। শিল্প, অবকাঠামো, নগর উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ এবং সম্ভাবনাময় ব্যবসা শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করলে আর্থিক খাতের ওপর চাপ বাড়ে। তাই পুঁজিবাজারকে গভীর, বহুমাত্রিক, স্বচ্ছ ও আস্থাভিত্তিক করে উৎপাদনশীল খাত ও সম্ভাবনাময় কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা হবে। ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলো কেন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হয় না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত ব্যয়, একই ধরনের কাগজপত্র বারবার দাখিল এবং অনুমোদন ও পরিপালনসংক্রান্ত অস্পষ্টতা ধাপে ধাপে কমানো হবে বলে জানা যায়। বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা অক্ষুণ্ন রেখে তালিকাভুক্তির মানদণ্ড আরও স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত এবং প্রবৃদ্ধিশীল কোম্পানির জন্য সহায়ক হবে।
বাজেটে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল করতে পেনশন তহবিল, বিমাপ্রতিষ্ঠান, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি), মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে। নতুন এএমসি গড়ে তোলা, পেশাদার ফান্ড ম্যানেজমেন্ট জোরদার করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তরের সুযোগ বাড়িয়ে মিউচুয়াল ফান্ডের আকার ও সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে করপোরেট বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে মিউনিসিপ্যাল বন্ড ইস্যুর ব্যবস্থা করা হবে। সরকারি ও বেসরকারি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বন্ড, অবকাঠামো ফান্ডের ব্যবহার বাড়ানো হবে, যাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমে। বিনিয়োগের সুযোগ ও বাণিজ্যিক কাঁচামালের পরিসর বাড়াতে দেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ কার্যকরভাবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানা যায়। বিদ্যমান লাইসেন্স কার্যকর করা, প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।
দেশীয় কোম্পানির জন্য আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তের সুযোগ এবং বাছাইকৃত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। অনাবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ সহজ করতে এনআইটিএ হিসাব খোলা ও পরিচালনার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হবে। বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়াতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির তথ্য প্রকাশ, আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, শেয়ার মূল্যায়ন, ক্রেডিট রেটিং, আইপিও ব্যবস্থাপনা ও রিসার্চ রিপোর্টের মান উন্নত করা হবে। লেনদেনের পর শেয়ার ও অর্থ হস্তান্তর দ্রুত নিরাপদ করতে সেটেলমেন্টের সময় ধাপে ধাপে কমানো হবে। এ কথাও উল্লেখ আছে, পুঁজিবাজারসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত নিষ্পত্তি আদালত গঠনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে, যার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আইনি ক্ষমতা থাকবে। এতে বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়বে এবং বাজারে শৃঙ্খলা শক্তিশালী হবে। এসব উদ্যোগ পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্র নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ, অবকাঠামো অর্থায়ন, সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করবে, এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান, আইসিবি













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
৫-৬ টি ভালো দল না পেলে বিপিএল আয়োজন করবে না বিসিবি
কুমিল্লার উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে
৬ মাসের মধ্যে চালু হচ্ছে কুমিল্লার সেই বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালটি
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু, মোট মৃত্যু ৬৭০
অবশেষে পুলিশের পোশাক চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
তারেক রহমান যাকে প্রার্থী দিবে সে-ই আমাদের প্রার্থী
কুমিল্লার উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে
কুমিল্লায় গ্রেপ্তার শিবির নেতার পক্ষে দাঁড়ানোদুই এপিপির নিয়োগ বাতিল
কুমিল্লায় মাদক মামলায় কারাবন্দি যুবদলকর্মীর মৃত্যু
৬ মাসের মধ্যে চালু হচ্ছে কুমিল্লার সেই বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালটি
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২