
কুমিল্লায়
ঈদের ছুটিতে ৩২৫ একর পৃথক দু'টি বনভূমি থেকে শতশত গাছ কেটে উজাড় করা
হয়েছে। সদরের জামবাড়ি বন ও বুড়িচংয়ের কালীকৃষ্ণনগর থেকে মেশিনের সাহায্যে
কাটা হয়েছে এসব গাছ। শিকড়সহ উপড়ানো হয়েছে আকাশমণি গাছ।
স্থানীয়
সূত্রমতে, এসব বাগানের ৫৫ শতাংশ সরকারি মালিকানাধীন। ৪৫ শতাংশের মালিক
স্থানীয় উপকারভোগীরা। কুমিল্লার সদরের সীমান্তবর্তী আমড়াতলী ইউনিয়নে ১৩৮
একরের বনাঞ্চল জামবাড়ি। এ বনভূমি থেকে বিক্ষিপ্তভাবে কাটা হয়েছে শতশত গাছ।
স্থানীয় তোতা মিয়ার বাগান থেকে সর্বাধিক বৃক্ষ নিধন করা হয়েছে; উপড়ে ফেলা
হয়েছে অধিকাংশ গাছের শিকড়।
সেখানে সরেজমিনে গেলে ছবি তুলতে নিষেধ করেন একজন ব্যক্তি। তিনি নিজের পরিচয় দেন এই বাগানের গার্ড হিসেবে, যার নাম বাবুল মিয়া।
জামবাড়ি
গ্রামেন বাসিন্দা হাবিবুর রহমান জানান, কোরবানির ঈদের বন্ধে অটো করাত
মেশিনে এসব গাছ কাটা হয়েছে। দুই দফায় অন্তত চার ট্রাক গাছের গুঁড়ি তিন
কিলোমিটার দূরে মামুন স’মিলে পাঠানো হয়েছে৷ তিনি আরও জানান, এসব গাছ কাটার
বিষয়ে জানতে চাইলে বন কর্মকর্তা তাকে মামলার হুমকি প্রদান করেন।
সামাজিক
বনায়ন বিধিমালা, ২০০৪ অনুযায়ী স্থানীয় দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে
বনায়ন কার্যক্রমে অংশীদার করার জন্য উপকারভোগী হিসেবে সুনির্দিষ্ট কাজের
বিনিময়ে সুযোগ-সুবিধার কথা বলা আছে।
১৩৮ একর বনভূমির ৯টি উপকারভোগী পরিবারের মধ্যে তিনটি পরিবারের সাথে কথা বলেছেন প্রতিবেদক।
জামবাড়ি
মাঠের দোকানদার ও উপকারভোগী মো. খোরশেদ আলম জানান, বন কর্মকর্তারা আমাদের
সাথে কোনো পরামর্শ বা দরপত্র ছাড়াই কয়েকবার গাছ কেটে নিয়ে গেছেন। আমরা এ
বিষয়ে প্রশ্ন করলে তারা আমাদের ধমকের ওপর রাখেন।
আরেক উপকারভোগী, প্রয়াত
তোতা মিয়ার ছেলে মো. কবির হোসেন বলেন, সব ধরনের চিকন ও মোটা কাঠের গাছ
কাটা হয়েছে। এই সংখ্যা একশর চেয়ে বেশি হবে। একটি ট্রাক ৫-৭ বারে এসব গাছের
গুঁড়ি নিয়ে গেছে। স্থানীয় লোকজন যদি কোনো গাছ কাটে, তবে তাতে দা বা কুড়ালের
চিহ্ন থাকে। কিন্তু বন বিভাগ সব গাছ পাওয়ার স (করাত) মেশিন দিয়ে কেটেছে।
নাম
প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন মুঠোফোনে জানান, প্রতিবেদক চলে যাওয়ার
এক দিন পর, যেসকল কাটা গাছের ছবি তোলা হয়েছিল, সেগুলো মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া
হয়েছে। এমনকি কিছু গাছের শিকড়ও উপড়ে ফেলা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাগান থেকে তিন কিলোমিটার দূরে আমড়াতলী বাজারের মামুন স’মিলে গিয়ে জামবাড়ি বাগানের গাছের গুঁড়ি দেখা যায়।
বন
কর্মকর্তার ক্রেতা পরিচয় দিলে একজন শ্রমিক গাছের গুঁড়িগুলো দেখিয়ে দেন।
তবে স’মিলের মালিক প্রথমে এ বিষয়ে অস্বীকৃতি জানান। দীর্ঘ সময় আলাপের পর
মো. মামুন জানান, ৮-১০ দিন পর আসেন। চাঁদপুর থেকে ভালো গাছ আসবে। বন
বিভাগের আকাশমণি কাঠ ভালো হবে।
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা বন কর্মকর্তা
মো. রফিকুল ইসলাম জানান, জামবাড়িতে গাছ কাটার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।
খোঁজখবর নিয়ে পরে জানাতে পারব। পাবলিক কত কথাই বলে!
বুড়িচং
কালীকৃষ্ণনগর বনভূমিতে গিয়ে দেখা যায় একই চিত্র। উপকারভোগী মো. মিজানুর
রহমান বলেন, ৪৮৭ একর বন ভূমির মধ্যে ১৮৭ একরে বনায়ন করা হয়েছে৷ ঈদুল আজহার
বন্ধে বন কর্মকর্তা মো. ইয়াজুল হক কয়েকশ গাছ কেটে সংকুচাইল বাজারে সিপন
স'মিলে অবৈধভাবে বিক্রি করে। আমরা ইয়াজুলকে হাতেনাতে ধরেছি। ট্রাক, গাছসহ
ছবি ভিডিও করেছি। তাৎক্ষণিক বনকর্মকর্তা কানে ধরে ক্ষমা চেয়েছেন। আমরা
বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নিকট প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ দিয়েছি৷
অন্যদিকে
বরুড়ার ধনেশ্বর সড়কে দু'পাশ থেকে ২০২৪ সালে ছয় লাখ টাকা মূল্যের ১৮টি
আকাশমণি গাছ কর্তন করেন উপজেলা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম। তবে তাকে কোনো
প্রকার শাস্তি প্রধান করেনি কর্তৃপক্ষ।
গাছ চুরির পর সংকুচাইল বাজারে
সিপন চ মিলে ভিডিও করেন স্থানীয় উপকারভোগী দুলাল মিয়া। তিনি জানান, বন
কর্মকর্তা মো. ইয়াজুল হক কান ধরে ক্ষমা পেয়েছেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ
আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ হুমায়ুন
কবীর মাসউদ বলেন, রক্ষক এখানে ভক্ষক। যারা গাছের যত্ন নিবে। তারাই গাছ
কর্তন করেন। অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে এ জাতীয় অপরাধ কমে
আসবে।
কুমিল্লার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন,
কালীকৃষ্ণনগরে শতাধিক আকাশমণি গাছ কাটার অভিযোগ পেয়েছি। আমি তদন্ত কমিটি
করে দিয়েছি। প্রতিবেদনের আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জামবাড়ি বনে গাছ
কর্তন হয়েছে শুনেছি। উপকারভোগী কমিটির কোনো সদস্য অভিযোগ করেনি। আর বরুড়ার
বিষয়টি আমার জানা নেই। যোগদান করেছি এ মাসে।
কালীকৃষ্ণনগর বিটের বন
কর্মকর্তা মো. ইয়াজুল হক বলেন, এ বিষয়ে আমি কথা বলবো না৷ গণমাধ্যমে কথা বলা
নিষেধ। এ বলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন৷