মঙ্গলবার ২৩ জুন ২০২৬
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাবা দিবসে আব্বাকে নিয়ে কিছু স্মৃতি কথা
সৈয়দ মুজিবুর রহমান দুলাল
প্রকাশ: রোববার, ২১ জুন, ২০২৬, ১২:৫৯ এএম আপডেট: ২১.০৬.২০২৬ ১:৪৯ এএম |

বাবা দিবসে আব্বাকে নিয়ে কিছু স্মৃতি কথা

গতকাল ছিলো ২০ জুন। আজ থেকে ২৩ বছর আগে ২০০৩ সালের এই দিন ভোরে যখন মসজিদের মাইকে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসছিল আজান'র ধ্বণি, "আসসালাতু খাইরুম মিনান্নাউম"--ঠিক ওই সময় মহান রব'র কালিমা- লা ইলালাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুল্লাহ (সাঃ) পড়তে পড়তে এই ইহজগতের সফর শেষ করে মহান রব'র সান্নিধ্যে পরজগতে পাড়ি জমিয়েছেন।
বলছিলাম, আমার জন্মদাতা আব্বার কথা। ১৯৯৮ সালের পহেলা জানুয়ারি, পহেলা রমজান, আমার মায়ের ইন্তেকালের পর আব্বা মানসিকভাবে খুব ভেঙ্গে পড়েছিল। একদিকে বার্ধক্য, অপরদিকে সাথী হারানোর ব্যথা। ছোট বোনটি তখন নবম শ্রেণিতে পড়ে। মা চলে গেলো, তিনি আবার কখন চলে যান। আব্বা ছোট বোনটিকে চিন্তা-ভাবনায় অস্থির। আমি বুঝি, আব্বার মনের ব্যকূলতা।
আমার আব্বা ছিলেন, অত্যন্ত চাপা স্বভাবের। যতই দুঃখ কষ্ট, অর্থনৈতিক অভাব-অনটন থাকুক কাউকে বুঝতে দিতেন না। ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবনে ছিলেন অত্যন্ত সৎ, নিষ্ঠাবান, মিতব্যয়ী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তিনি ছিলেন ন্যয়পরায়ণ ও ধার্মিক। আমি দেখেছি, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীনও তিনি জীবন বাজি রেখে নিয়মিত কর্মস্থলে যেতেন। একদিন আব্বাকে বললাম, আব্বা যেভাবে গোলাগুলি হচ্ছে, মর্টারসেল পড়ছে, এই অবস্থায় ডিউটিতে যাওয়ার দরকার নেই। একথা কেবল আমার নয়; মা এবং পরিবারের সবার কথা। কিন্তু আব্বা বলতেন, ডিউটিতে না গিয়ে বেতনের টাকাটা নেওয়া কি ন্যয়সঙ্গত হবে?
আমার আব্বা জনাব মো. শরাফত উল্যাহ, বাংলাদেশ রেলওয়ের (টিইএক্সআর) একজন কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি আসাম বেঙ্গল (এবিআর) রেলওয়ে চাকুরীত যোগদান করেন। ইস্ট পাকিস্তান রেলওয়ে (ইবিআর), সর্বশেষ বাংলাদেশ রেলওয়ের (বিআর) থেকে অবসর গ্রহণ করেন। আব্বা চাকুরীকালীন সময় চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, লাকসাম, লালমনিরহাট, শান্তাহার, পাকশীসহ নানাহ জায়গায় ছিলেন।
রেলওয়ের নিয়মানুসারে সারাদেশে ট্রেন ভ্রমণের জন্য আব্বা পাস পেতেন। নিজের জন্য এবং পরিবারের সবার ক্ষেত্রে। কিন্তু অনেক সময় দেখা গেছে, কোথাও ট্রেন ভ্রমণে যাচ্ছি। পাস আছে আব্বার। তিনিও সঙ্গে রয়েছেন। রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আব্বাকে ভালোভাবেই চিনতেন। অনেক সমীহ করতেন। টিকিট চাইতেন না। তবুও আব্বা আমাদের জন্য টিকেট কিনে নিতেন। বলতেন আমার নামে পাস রয়েছে, তোমাদের তো নেই। এই ছিলো আমার আব্বা।
আমার আব্বা রেলওয়ের চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণের পর সামাজিক কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদরাসা, ঈদগাহ, সামাজিক দেন-দরবারসহ নানাবিধ সামাজিক কার্যক্রমে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এক সময় তিনি "গ্রাম সরকার" হিসেবেও দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। 
আমার মায়ের ইন্তেকালের পর আব্বা দিনে দিনে মানসিক ও শারীরিকভাবে ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েন। আমি এবং আমার মেঝো বোন তখন পশ্চিমগাঁওয়ে থাকি। আব্বাও আমাদের সঙ্গে থাকেন। বাড়িতে বড় বোন ও বড় ভাই থাকেন। আব্বা কখনো বাড়ি, কখনো পশ্চিমগাঁও থাকতেন। একদিন তো আমার বাসায় মায়ের কথা মনে করে বলতে গিয়ে হাউ মাউ করে শিশুদের মতো কান্না করলেন।
আমি সাংবাদিকতার পাশাপাশি একটি ইন্স্যরেন্স কোম্পানীর বিভাগীয় ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্বে ছিলাম। তখন আমার অনেক সহকর্মী ছিলো। তন্মধ্যে লালমাই উপজেলার (তৎকালীন লাকসাম) শানিচৌঁ গ্রামের আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ নামে একজন সহকর্মী ছিলো। বর্তমানে "দৈনিক ডাক প্রতিদিন'র সহযোগী সম্পাদক ও দৈনিক কালবেলার লালমাই প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত। তিনি কেবল আমার সহকর্মীই ছিলো না ; সে ছিলো আমার পরিবারের একজন সদস্য। 
আব্বা যখনই আমার অফিসে যেতেন, জাফর অস্থির হয়ে পড়তো কখন আব্বাকে আপ্যায়ণ করবে। আব্বা তাকে অনেক আদর করতেন। সে সুবাদে আমার বাসা, গ্রামের বাড়িতে নিয়মিত জাফরের নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিলো। শুধু তাই নয়; দুই পরিবারসহ উভয়ের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে গড়ে ওঠে চমৎকার মেলবন্ধন।
১৯৯৭ সালে আমার বিয়ে উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাফর, তার পরিবার, চট্টগ্রাম থেকে আসা খালু-খালাম্মা, খালাতো ভাই মোহন, মামুন, শিফনসহ আমার আব্বা, মা, ভাই-বোন, আত্নীয়জন সবাই মিলে কি যে আনন্দ হয়েছে, ওই মুহূর্তগুলো বর্ণনা করে বুঝানো যাবে না। সেই আনন্দ ঠিক পাঁচ মাস পূর্ণ হতেই আমাদের জীবনে নেমে আসে অমানিশার অন্ধকার। জীবনের তরে হারিয়ে ফেলি মাকে। তখন জীবনটা এলোমেলো হয়ে যায়। তখন বটবৃক্ষসম অভিভাবক একমাত্র আব্বা।
আব্বা সম্পর্কে আগেই বলছি, তিনি একটু চাপা স্বভাবের ছিলেন। শত কষ্ট হলেও কিছু প্রকাশ করতেন না। বার্ধক্য তো আছেই। এরমধ্যে শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। কাউকে বলেন না। নিজে নিজেই চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করতেন। এক সময় জানলাম আব্বার লিভার সিরোসিস। চিকিৎসক দেখালাম। তখন শেষ সময়। বাড়ি নিয়ে আসলাম। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবন চলছে।
২০০৩ সালের জানুয়ারি মাস। ছোট বোনটির বিয়ে হলো। এতে আব্বা ভীষণ খুশি। যেনো তাঁর বুকের ওপর থেকে একটি বড্ড ওজনের পাথর সরেছে।অর্থাৎ জীবদ্দশায় মা হারা ছোট মেয়ের বিয়ে দিতে পেরেছে। আব্বা আনন্দে কেঁদে ফেললেন। আবার দুঃখ করলেন, সবার ছোট মেয়ের বিয়েতে আজ মা নেই।
আব্বা পশ্চিমগাঁও মেঝো বোনের বাসায়। একটু একটু জ্বর। বললাম আব্বা, ডাক্তারের কাছে চলেন। আপনাকে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ আনবো। আব্বা বললেন লাগবে না। এমনিতেই সেরে যাবে। তখন বললাম, বাড়ি যাবেন না? আপার বাসায় কতোদিন থাকবেন, দু'তিন দিন হয়ে গেলো। বললেন, আরো কয়েকদিন থাকবো। পরে বললেন, আগামীকাল চলে যাবো। পরদিন সোমবার বাড়ি আসলেন।
আমাদের বাড়িতে পশ্চিম ভিটায় আরেকটি ঘর রয়েছে। আমার দাদা-দাদি, জেঠা জীবদ্দশায় যে ঘরে থাকতেন। সে ঘরে কেউ থাকে না। অর্থাৎ থাকার লোকজনও নেই। আব্বা বললেন, আমি ওই ঘরে থাকবো। সেখানে বিছানাপত্র এবং আনুষাঙ্গিক সবকিছু ঠিকঠাক করে দেওয়া হলো। আমি ওই ঘরে আবার সঙ্গে থাকি।
বৃহস্পতিবার বিকেলে গ্রামের অনেক মুরব্বী আব্বাকে দেখতে এলেন। আব্বা শুয়ে আছেন। হালকা জ্বর। খাওয়া-দাওয়া তেমন করেন না। সন্ধায় আব্বার জ্বর একটু বেড়ে গেছে। মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করলেন। বললাম, আব্বা কি খাবেন? জবাব দিলেন কিছু খাবেন না। কিছু না খেলে ওষুধ খাবেন কীভাবে? বলতেই বললেন, তাহলে একটু শাগু দে। শাগু এবং রাতের ওষুধ খেয়ে শুয়ে আছেন আব্বা। ঘন্টাখানেক পর ছটফট শুরু করলেন। বললেন, ভালো লাগছে না। ভাবলাম, সকাল হলে আব্বাকে আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।
রাত যতো গভীর হচ্ছে, আব্বার অস্থিরতা ততোটাই বেড়ে যাচ্ছে। তখন আব্বার শিহরে বসে অন্যান্য ভাই-বোনসহ দোয়া-দুরুদ, কোরআন তেলোয়াত করছি। আর প্রহর গুণছি, কখন রাত পোহাবে। আব্বাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। এমতবস্থায় বাড়ির একটু অদূরে মসজিদের মাইকে মুয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল কানে। "আসসালাতু খাইরুম মিনান্নাউম"। আর ঠিক তখনই আব্বার মুখে ছোট্ট ছোট্ট করে আল্লাহ আল্লাহ জিকির উচ্চারিত হচ্ছিলো। আজান শেষ আব্বা মধুর কালেমা- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুল্লাহ (সাঃ) পাঠ করতেই চোখ দু'টি বন্ধ করে ফেললেন। আমাদের শোক সাগরে ভাসিয়ে চিরকালের জন্য আব্বা মহান রব'র সান্নিধ্যে চলে গেলেন। 
আজ আব্বাকে হারানোর ২৩ বছর। মা হারানোর ২৯ বছর। আমরা ভাই-বোন চির এতিম। সারাক্ষণ আব্বা-মা দু'জনের মায়াবী চেহারাখানী চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কোনোভাবেই তাঁদের মায়া-মমতার কথা, জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা স্মৃতিগুলো ভুলতে পারি না।
আব্বা, আজ তুমি নেই, মা ও নেই। কিন্তু তোমাদের ভালোবাসা এখনো ছায়ার মতো ঘিরে আছে আমার চারপাশে। তোমাদের অনুপস্থিতি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা। সবাই বলে সময় নাকি সব ভুলিয়ে দেয়, কিন্তু আব্বা, তোমাকে, মাকে ভুলিয়ে দেয়নি! তোমারা চিরদিন আমার হৃদয়ে, আমার দোয়ায়, আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে তোমরা মিশে আছো। 
আব্বা-মা, তোমাদের কথা খুব মনে পড়ে প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ। তোমাদের সেই হাসি, সেই কণ্ঠস্বর, আদর-শাসন, হাতের স্পর্শ, সবকিছুই যেনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তোমরা ছিলে আমাদের গর্ব। সকল প্রেরণার উৎস, শক্তি-সাহস, নিরাপদ আশ্রয়।
মহান আল্লাহ তায়ালা'র নিকট দোয়া করি, তিনি যেনো তোমাদের দু'জনকেই জান্নাতুল ফেরদাউস'র মেহমান হিসেবে কবুল করেন। আমীন। "রাব্বির হামহুমা কা'আমা রাবাবাইয়ানী ছাগিরা।" 
লেখক:- সাংবাদিক, কবি ও মানবাধিকারকর্মী।













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
সুইডেনকে নিয়ে নেদারল্যান্ডসের ছেলেখেলা
বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ
হাম উপসর্গে আরও ৭ জনের মৃত্যু
কুমিল্লায় ঈদের ছুটিতে বনের শতশত গাছ অদৃশ্য
কুমিল্লায় ক্যাডেট এএসআই নিয়োগের প্রাথমিক বাছাই পর্বের শেষ দিনের কার্যক্রম সম্পন্ন
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কুমিল্লা বিসিকে অনুমোদনহীন কারখানা থেকে অনুমোদনহীন ২১ পদের ঔষধ জব্দ
কুমিল্লার উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে
কুমিল্লায় ঈদের ছুটিতে বনের শতশত গাছ অদৃশ্য
৬ মাসের মধ্যে চালু হচ্ছে কুমিল্লার সেই বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালটি
মাদক কারবারিদের শেল্টার দেয় কারা?
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২