বুধবার ২৪ জুন ২০২৬
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
অধ্যাত্মচিন্তা ও আধ্যাত্মিকতা
জুলফিকার নিউটন
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ১:১০ এএম আপডেট: ২৪.০৬.২০২৬ ১:৩৩ এএম |

  অধ্যাত্মচিন্তা ও আধ্যাত্মিকতা
আমাদের ধরাছোঁয়ার মধ্যেই অনুভূতির নানা স্তর আছে। বিভিন্ন স্তরের অনুভূতির ভিতর গুণগত পার্থক্য লক্ষ করা যায়। মুক্তি বলতে যে অভিজ্ঞতা বোঝায়, অন্তত কিছু পরিমাণে সেটা সাধারণেরও লভ্য। ধর্মকে কতিপয় অসাধারণ মানুষের মুক্তির পথ বলে মেনে নেওয়া, অথবা অধিকাংশ মানুষ পরীক্ষায় ফেল করেও কয়েকজন পির-দরবেশের মধ্যস্থতায় কোনোক্রমে পাশ করে যাবে এই রকম বিশ্বাস করা, ধর্মের ভবিষ্যতের পক্ষে বিপজ্জনক। বাস্তব ঘটনা এই যে, একই মানুষ অভিজ্ঞতার একাধিক স্তরে বাস করে, তবে অনেক সময় মূল্যবান অভিজ্ঞতাকে সে মূল্যবান বলে চিনে নিতে পারে না। ধর্ম যদি কিছু পরিমাণেও সাধারণ মানুষের জীবনে এই মূল্যবোধের সংস্থাপনে সাহায্য করে তবেই ভবিষ্যতের সমাজের দৃষ্টিতে সেই ধর্ম মূল্যবানে বলে বিবেচিত হবে। ধর্মকে সাধারণের লভ্য করতে গিয়ে যদি তাকে কুসংস্কার করে তোলা হয়, তবে সেই যুক্তিহীন ধর্মকে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ঁহড়িৎঃৎযু ংঁঢ়বৎংঃরঃরড়হ” বলে বিদায় দেওয়াই শ্রেয়। ধর্মের সঙ্গে যুক্তির মেলবন্ধনের প্রয়োজন এইখানেই।
ধর্মের মূলে যে আধ্যাত্মিক অনুভূতি আছে, এ দেশের ভক্তিআন্দোলনের সন্তরা তাকে বলেছেন, প্রেম। শুধু এ দেশের নয়, সব দেশের ধর্মেই এটা একটা প্রধান কথা। আধ্যাত্মিক প্রেমের কিছু বিশেষ লক্ষণ আছে। এজন্য বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যে বিশেষ বিশেষ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। যেমন পাশ্চাত্য আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে পাই ‘ধমধঢ়ব’ শব্দটি, সেটা ‘বৎড়ং’ থেকে পৃথক। ঐতিহ্যে আশ্রিত শব্দ ক্রমে অতিশয় রহস্যাবৃত হয়ে পড়ে। এই আবরণ থেকে উন্মুক্ত করে বিষয়টা সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করা দরকার। আধ্যাত্মিক প্রেম জৈব উদ্দেশ্য দিয়ে সীমাবদ্ধ নয়, সারা জগতে ছড়িয়ে পড়া তার স্বভাব। বিজ্ঞানীর জিজ্ঞাসা যেমন বিশ্বের প্রতি প্রসারিত এও সেইরকম। যে প্রেমের এই গুণ নেই, ঈর্ষা যার ছায়া, তাকে বিশ্বপ্রেম বলা যাবে না। সন্তরা বলেছেন, সকল জগৎ ‘আমাতে’ এসে মিলেছে, অথবা ভাষান্তরে ‘তাতে’ মিলেছে। বিশ্বের সঙ্গে এই একাত্মতাবোধ, এই অভেদানুভূতি, আধ্যাত্মিক ভাবের বৈশিষ্ট্য। সন্তদের প্রেম, বিশ্বপ্রেম।
প্রথম দৃৃষ্টিতে একে অবাস্তব মনে হতে পারে। বিশ্বপ্রেম সাধারণের লভ্য নয়, এইরকম বোধ হতে পারে। কিন্তু বিশ্বকে জানার ইচ্ছা যেমন মানবশিশুর মনে সুপ্ত থাকে, যদিও কয়েকজন প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিকের ভিতর তার বিশেষ বিকাশ ঘটে, বিশ্বকে ভালোবাসার ইচ্ছাও সেইরকম। সদর্থক ধর্মবিশ্বাসের সহজ ভিত্তি বলে একে চিনে নেওয়া যায়। আমাদের সকলের জীবনেই মাঝে মাঝে এইরকম মুহূর্ত আসে যখন সকলের প্রতি আমরা শুভেচ্ছা বোধ করি। আমরা যখন সাংসারিকতায় লিপ্ত তখন যে ব্যক্তি আমাদের সাংসারিক স্বার্থের সহায় তাকেই ভালো চোখে দেখি, আর যে-ব্যক্তি বিরোধী তাকে মন্দ ভাবি। কিন্তু এমন মুহূর্তও আসে যখন আমরা আর স্বার্থের জালে তেমনভাবে আবদ্ধ নই। বিদ্বেষমুক্ত সেইসব মুহূর্তে মনে আর কোনো তিক্ততা থাকে না। এ যদি না হতো তবে সংসার থেকে উত্থিত বিষাক্ত বাষ্পের মতো গ্লানিতে অনেক আগেই মানুষের মৃত্যু হত। মনের একটা স্বাভাবিক শক্তি আছে, তিক্ততা থেকে নিজেকে মুক্ত করার, সহজ আনন্দে বিশ্বের দিকে ফিরে তাকানোর। এই শক্তি দুর্বল হয়ে গেলে অন্য কোনো সুখই মানুষকে বাঁচাতে পারে না। একে তাই বিশেষ মূল্য দিয়ে রক্ষা করা আবশ্যক।
ধর্মে এর স্বীকৃতি আছে। বিভিন্ন ধর্মে আনুষ্ঠানিকভাবে এক একটি দিন চিহ্নিত থাকে যখন শক্রমিত্র নির্বিশেষে, অভ্যস্ত ভেদাভেদ ভুলে, সবাই সবাইকে আলিঙ্গন করবে এইরকম বিধি। মিলনের উৎসবও অবশ্য অনেক সময় তার গূঢ় অর্থ হারিয়ে প্রাণহীন আচারে পরিণত হয়। কিন্তু সে কথা ভিন্ন। মূল ভাবটাকে নতুন করে বুঝে নেওয়া দরকার। স্বার্থ ও ভেদাভেদ অতিক্রম করে শুদ্ধ মিলনের একটা আনন্দ আছে। সাধারণ সাংসারিক অভিজ্ঞতাকে সেটা অতিক্রম করে যায়। তাঁর কম বয়সের এক কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “হৃদয় আজি মোর কেমন গেল খুলি, জগৎ আসি সেথা করিছে কোলাকুলি।” আরও বহু বছর আগে নানক বলেছিলেন, “না কো বৈরী নহী বেগানা। সগল সংগ হম কো বন আই।” শুদ্ধ মিলনের এই-যে অনুভূতি একে আধ্যাত্মিক অনুভূতি বললে অসংগত হয় না।
বিশ্বের সঙ্গে একাত্মতার যে অভিজ্ঞতা, তার আরেকটি লক্ষণ উল্লেখযোগ্য। এতে নিজের ভিতর একটা ভয়শূন্যতা এবং বিশেষ শক্তির সঞ্চার অনুভব করা যায়। ছোট ছোট দেওয়ালগুলো যখন ভেঙে যায় আর বৃহত্তর এক সত্তার সঙ্গে আমরা মিলিত হই, তখন এটা ঘটে। অবশ্য ক্রোধের আবেশেও দেহে অন্য এক রকমের শক্তি আসে। ধর্মের ভাষায় ক্রোধের সেই শক্তিকে যদি বলি দানবিক, তবে আধ্যাত্মিক মিলনের শক্তিকে বলতে হয় দিব্য। এসব কিছুই প্রকৃতির বাইরে ঘটে না। প্রকৃতির ভিতরই বিভিন্ন স্তর আছে। আর বিভিন্ন স্তরের গুণগত পার্থক্যকে স্বীকার করার জন্য ভাষার বিশেষ ব্যবহার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
মনে রাখা ভালো যে, প্রকতিতে এই সবই মিলেমিশে যায়। কখনো তৈরি হয়, যাকে রবীন্দ্রনাথ শেষজীবনে বলেছেন, “মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ”। বুদ্ধের শিক্ষা, অতন্দ্র থাকতে হবে। অতন্দ্রতার বিকল্প নেই। সন্দেহগ্রস্ততা নয়, যা আমাদের শুধুই ক্লান্ত করে। বরং সেই সজাগতা যাতে মিথ্যা বিশ্বাসে আমরা ধরা পড়ি না, তবু বিশ্বের সঙ্গে যোগের আনন্দকে সহজ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করে নিই। আনন্দ ও ভয়শূন্যতা আধ্যাত্মিক অনুভবের দুটি প্রধান লক্ষণ। আবার মোক্ষ এবং ধর্ম এক বস্তু নয়। যিনি মোক্ষ লাভ করেছেন তিনি সংসারের ঊর্ধেŸ একটি স্থিতি লাভ করেছেন। তবু ধর্মাচরণের জন্য সংসারে প্রত্যাবর্তন আবশ্যক। দুঃখতপ্ত জীবের সেবা এবং সমাজজীবনে নীতির পরিপোষণ ধার্মিকের কর্তব্য। শিল্পের সঙ্গে ধর্মের একটা প্রধান পার্থক্য এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা ভালো। শিল্প অথবা সাহিত্যের স্বাদকে ব্রহ্মস্বাদের সহোদর বলা হয়েছে। এইখানে ধর্মের সঙ্গে তার মিল। কিন্তু শিল্পীকে আর্তজীবের সেবা করতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই। যদি তিনি আর্তের সেবা করেন তবে তিনি সাধুর কিছুটা কাছাকাছি চলে আসেন। সাধুরই কিন্তু সেটা স্বধর্ম, শিল্পী এ ব্যাপারে স্বাধীন। শিল্পীকে সেবাধর্মের নিয়ম মেনে চলতে হবে– এমন কোনো কথা নেই। 
সাংসারিকতার ঊর্ধ্বে আরোহণ আর তারপর সংসারে অবরোহণ, এ দুয়ের কোনো একটি বাদ পড়লেই ধর্ম অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই অর্থে ধর্ম সমাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সংসারকে একেবারে ত্যাগ করে মোক্ষ যদি-বা সম্ভব, ধর্ম নয়। সমাজ পরিবর্তিত হয়ে চলেছে; ধর্মও পরিবর্তনহীন নয়। স্রষ্টা যদি বা কালাতীত, ধর্ম কালের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রভাব গিয়ে পড়ে ধর্মব্যবস্থার ওপর। সামাজিক অন্যায়ও ধর্মের সমর্থন খোঁজে। এই থেকে দেখা দেয় ধর্মের বহু জটিলতা। এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে তোলা যুক্তিশীল সমালোচনার অন্যতম কর্তব্য। ধর্মের অধঃপতন রোধ করার জন্য এই সমালোচনার প্রয়োজন আছে। 

বিজ্ঞানীদের কিছু মূল বিশ্বাস আছে, যেমন, বিশ্বজগৎ নিয়মের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই বিশ্বাস থেকে বিজ্ঞানী সহজে সরবেন না। কিন্তু এর ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব তত্ত্ব তৈরি হচ্ছে, তাদের ক্রমাগত বিচার চলেছে এবং সংশোধন হচ্ছে। ধর্মবিশ্বাসীর কিছু মূল প্রত্যয় আছে, অহিংসা প্রেম এই সব নিয়ে। তার ওপর ভিত্তি করে শাস্ত্র ও সামাজিক বিধান তৈরি হচ্ছে অন্তন শাস্ত্রকারদের দাবি এইরকম। ধর্মের মূল প্রত্যয় সহজে বদলানোর নয়। কিন্তু সামাজিক বিধানগুলোর বিচার ও পরিবর্তন প্রয়োজন। পাঁচ বছরের ছেলের জন্য যে বিধান তৈরি হয়, পঁচিশ বছরের সেসব প্রযোজ্য নয়। অবশ্য পাঁচ বছরের ছেলের পক্ষেও প্রচলিত বিধানে ভুল থাকেত পারে। কিন্তু সেগুলো যদি নির্ভুলও হয় তবু পঁচিশ বছরের জন্য ভিন্ন বিধান প্রয়োজন হবে। হাজার বছর আগের সমাজের জন্য যে বিধান ছিল, আজকের সমাজে সেসব চলবে না। প্রজাকে রাজা সন্তানের মতো দেখবেন, এই অনুশাসন কোনো এক যুগে হয়তো মন্দ ছিল না। অন্য এক যুগে পৌঁছে তবু বলা প্রয়োজন হয়, প্রজাই হবে রাজা।
ধর্মের ব্যাপারে মুশকিলটা এই যে, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কিছু স্বীকৃত পদ্ধতি আছে, কিন্তু ধর্মীয় বিধানের জন্য তেমনি কোনো পরিষ্কার বিচারপদ্ধতি নেই। উপরন্তু ধর্মীয় বিশ্বাসের ভেতরেই এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যার ফলে ধর্মের সামাজিক অপপ্রয়োগের সমূহ সম্ভাবনা। বিষয়টা এইখানে সংক্ষেপে আলোচনা করা অনুচিত হবে না।
সাধারণ সাংসারিক অভিজ্ঞতা ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার ভিতর গুণগত পার্থক্যের কথা আগেই বলা হয়েছে। অভিজ্ঞতার গুণগত ভেদ জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও আছে, যেমন দোকানদারির সঙ্গে কাব্য রসানুভূতির পার্থক্য। তবে ধর্মের ক্ষেত্রে একটা সমস্যা দেখা দেয় যেটা কাব্যে অনুপস্থিত। কবিরা শাস্ত্রকারদের মতো সরাসরি সামাজিক বিধান প্রণয়নের কাজে অগ্রসর হন না। শাস্ত্রকার অভিজ্ঞতার প্রকল্পিত ভেদকে ভিত্তি করে সামাজিক স্তরভেদকে ন্যায্যতা দিয়েছেন এমন উদাহরণের অভাব নেই। এছাড়া আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার ভিতর এটা রহস্যের ভাব আছে যেটাকে নানাভাবে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। সেই ভাবটি যদি নেশার মতো যুক্তিকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে ফেলে তবে শেষ অবধি তাতে আধ্যাত্মিকতারও ক্ষতি, সমাজেরও। আবার বিশ্বের সঙ্গে একাত্মতার অনুভবের মধ্যে যে শক্তিসঞ্চারী গুণ দেখা যায়, তারও অপপ্রয়োগ সহজ। এইসব প্রলোভন ঠেকানো কঠিন। বলা বাহুল্য, এ জাতীয় বিপদ ধর্মেই সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানেরও অপপ্রয়োগ ঘটে, রাজনীতির তো বটেই। তবে ধর্মের ক্ষেত্রে আদর্শ আর বাস্তবের মধ্যে অসামঞ্জস্য বড় ভীষণ হয়ে ওঠে। সেজন্য সতর্কতার বিশেষ প্রয়োজন। 
‘জ্ঞান শব্দ কোষ’-এ ইংরেজি ফরষবসসধ-র পরিভাষা দেওয়া হয়েছে ‘ধর্মসংকট’। শব্দটি অর্থবহ। অধ্যাত্ম্নচিন্তার গভীর স্তরেও ‘ডিলেমা’ আছে। যেমন জীবনের গভীরে তেমনি ধর্মজীবনে কিছু মৌল সংকট, কিছু আদর্শের দ্বন্দ্ব, দেখা যায়। বিভিন্ন ধর্মে এই দ্বন্দ্বের প্রধান রূপ বিভিন্ন। কুসংস্কার যদিও যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করা যায়, ‘ধর্মসংকট’ যায় না। বরং এ বিষয়ে চিন্তনের ফলে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবন সম্বন্ধে আমাদের বোধ গভীরতা লাভ করে, তুলনামূলক ধর্মের পাঠ অন্য এক প্রশ্নের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়। দুয়েকটি উদাহরণের ভিতর দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক।
প্রাচীন ইহুদি ধর্ম ও পরবর্তীকালে ইসলামের একটি প্রধান আদর্শ হলো, ন্যায়বিচার। এই ন্যায়বিচারের মূলকথা, অপরাধ ও দণ্ডের ভিতর তুল্যমূল্যতা। রক্তের বদলে রক্ত চাই, আমাদের পরিচিত এই ধ্বনি যতই ক্ষমাহীন মনে হোক না কেন, ন্যায়বিচারের প্রাচীন ধারণার সঙ্গে এর অনেকটা মিল আছে। হত্যাকারীর জন্য চাই মৃত্যুদণ্ড, দাঁতের বদলে দাঁত, চোখের বদলে চোখ।’ ুঐব ঃযধঃ ংসরঃবঃ ধ সধহ, ংড় ঃযধঃ যব ফরব, ংযধষষ নব ংঁৎবষু ঢ়ঁঃ ঃড় ফবধঃয.” ুঊুব ভড়ৎ বুব, ঃড়ড়ঃয ভড়ৎ ঃড়ড়ঃয.” –এই হলো স্রষ্টার আদিষ্ট নিয়ম। দয়া বা করুণার কথা সেখানে নেই এমন নয়, তবু কঠোর ন্যায়বিচারের সুরটাই প্রাধান্য পেয়েছে। এরই প্রতিধ্বনি আছে কোরানে সেই অংশে যেখানে চৌর্যের শাস্তি হিসেবে চোরের হাত কেটে ফেলার কথা বলা হয়েছে।
ন্যায়দণ্ডের পাশাপাশি আশ্চর্যভাবে শোনা গেল করুণার বাণী। ইহুদি ঐতিহ্যের ভিতরই জন্ম নিয়েছিলেন যিশুখ্রিষ্ট। বাইবেলের পুরানো বিধানের সঙ্গে তিনি পরিচিত। সেই বিধান তিনি ভাঙতে আসেননি, বরং পূর্ণ করতে এসেছেন, একথা তিনি ঘোষণা করেছেন। ম্যাথুকথিত সুসমাচারের পঞ্চম অধ্যায়ে দেখি যিশু বলছেন, ঞযরহশ হড়ঃ ঃযধঃ ও ধস পড়সব ঃড় ফবংঃৎড়ু ঃযব ষধ,ি ড়ৎ ঃযব ঢ়ৎড়ঢ়যবঃং; ও ধস হড়ঃ পড়সব ঃড় ফবংঃৎড়ু, নঁঃ ঃড় ভঁষভরষ.” আমাদের বিস্মিত করে একই অধ্যায়ে কিছুক্ষণ পরেই তিনি বলেন, ণব যধাব যবধৎফ ঃযধঃ রঃ যধঃয নববহ ংধরফ, অহ বুব ভধৎ ধহ বুব, ধহফ ধ ঃড়ড়ঃয ভড়ৎ ধ ঃড়ড়ঃয; ইঁঃ ও ংধু ঁহঃড় ুড়ঁ ঃযধঃ ুব ৎবংরংঃ হড়ঃ বারষ; নঁঃ যিড়ংড়বাবৎ ংযধষষ ংসরঃব ঃযবব ড়হ ঃযু ৎরমযঃ পযববশ, ঃঁৎহ ঃড় যরস ঃযব ড়ঃযবৎ ধষংড়.” যিশুর উচ্চারণে কোনো অস্পষ্টতা নেই। ‘তোমরা শুনেছ চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত, এই কথা; কিন্তু আমি বলছি, প্রতিরোধ করো না, বরং যদি কেউ তোমার এক গালে আঘাত করে, তাকে অন্য গাল এগিয়ে দাও।’ হিংসাকে জয় করতে হবে ক্ষমা দিয়ে যিশুর বাণী।
আদর্শের দ্বন্দ্বটা এর চেয়ে স্মরণীয়ভাবে বলা সম্ভব ছিল না। এ কোনো তুচ্ছ উভয়সংকট নয়। কেউ হয় তো বলবেন, বিচার ও দণ্ডের চেয়ে ক্ষমাই নিশ্চিতভাবে উচ্চতর ধর্ম। এইভাবে বললে কিন্তু সংকটের সমাধান অতি বেশি সরল করে ফেলা হয়। এতে দ্বন্দ্বের গভীরতর তাৎপর্য বোঝা হয় না। সম্যক দৃষ্টি নিয়ে তাকালে দেখা যায়, দ্বন্দ্বটা অটলভাবে, অনিবার্যভাবে, বাস্তবে প্রোথিত। বিশ্বপ্রকৃতি একদিকে নিয়মের ওপর প্রতিষ্ঠিত, প্রতিটি কার্যের পরিণাম নিয়মের দ্বারা কঠিনভাবে নির্ধারিত। অন্যদিকে সৃষ্টি আনন্দে বিধৃত, প্রেমের ভিতর দিয়েই সেই সত্য আবিষ্কার করা সম্ভব, প্রেম ছাড়া পথ নেই। বিশ্বজগতের এই যে দ্বৈত, তারই প্রতিফলন সংসারেও। ন্যায়বিচার ছাড়া সমাজ রক্ষা পাবে না। আবার প্রেম ছাড়াই গতি নেই। ধর্মের এই এক মূল রহস্য।

বাংলার কোনো কোনো আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে ধর্মসংকটের অন্য এক-দিক সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বোধিবৃক্ষের নিচে উপবিষ্ট সত্যান্বেষী সিদ্ধার্থ মারের প্রচণ্ড আক্রমণ ও নানা প্রলোভনের সম্মুখীন হয়েছিলেন। সেটা ছিল কঠিন পরীক্ষা; কিন্তু তাতে কোনো নৈতিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাশ ছিল না। মারের আক্রমণ সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করাই তো প্রশ্নাতীত কর্তব্য। বুদ্ধত্বপ্রাপ্তির পর সিন্ধার্থ অন্য যে প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন সেটা কিন্তু এক মৌল প্রশ্ন। সিদ্ধার্থ এখন দুঃখের কারণ জেনেছেন, দুঃখকে অতিক্রম করার পথও। সে পথে একাই ভ্রমণ করা তার পক্ষে সম্ভব। কিন্তু সংসারে আরও সংখ্যাতীত দুঃখতপ্ত মানুষ আছে, যারা বোধি থেকে বঞ্চিত। বুদ্ধ কি তাদের পথের সন্ধান দেওয়ার জন্য সংসারে ফিরে যাবেন? তিনি সেই দুঃখী মানুষের ভিতরেই ফিরে গিয়েছিলেন। এটাই বুদ্ধের করুণা। যিনি স্বচ্ছন্দে নির্বাণে প্রবেশ করতে পারতেন, তিনি দুঃখে আবদ্ধ মানুষদের পথ দেখার জন্য থেকে গেলেন। এদেশের ধর্মের ঐতিহ্যে এটা এক স্মরণীয় ঘটনা।
মুক্তিপথের সন্ধানে ব্যাকুল সাধক সংসার থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে ধ্যানে প্রবেশ করেন, নিজেকে নিয়ে কঠিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন, এটা কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। কিন্তু পথের সন্ধান পাওয়ার পর তিনি সংসারে প্রত্যাবর্তন করবেন কি না, এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে যায়। এই দ্বিধা অনেকের কাছে অর্থহীন, এমনকি হৃদয়হীন, মনে হতে পারে। মানুষের মাঝে ফিরে আসার বিরুদ্ধে যু্িক্ত কোথায়? জীবে দয়াই তো স্বাভাবিক ধর্ম। কিন্তু এইভাবে দেখলে আসল প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ানোই হয় না। সমস্যার মূল খুঁজতে হবে অন্যত্র।
প্রত্যেক মানুষকেই কি নিজের মুক্তির পথ নিজেই খুঁজে নিতে হয় না? উপলব্ধ সত্যের আলোতে সাধক নিজের জীবনচর্যা নিজে নির্ধারিত করে নেন। আর সেটাই অন্যের কাছে একটা উদাহরণস্বরূপ হয়ে ওঠা সম্ভব। মুক্তির পথে কেউ কি কারও জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু করতে পারে? এইরকম কিছু প্রশ্ন, দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব এদেশের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে অবিস্মরণীয়ভাবে আঁকা হয়ে আছ। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে, হাসানরাজার জীবনেও একটা মুহূর্ত এসেছিল যখন তাঁকে সিন্ধান্ত নিতে হয়েছিল যে, তিনি একক মুক্তির পথে অগ্রসর হবেন, না পীড়িত মানুষের সেবার জন্য সংসারে থেকে যাবেন। দ্বিতীয় পথই তিনিও বেছে নিয়েছিলেন।
আর্তের সেবায় ধর্মের সাধক আত্মনিয়োগ করবেন কি না, আসল প্রশ্ন সেটা নয়। তিনি ধর্মগুরু হয়ে সংসারে ফিরে আসবেন কি না, সেটাই মূল প্রশ্ন। আর এ প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক শুধু ধর্মের ক্ষেত্রেই নয়, জীবনদর্শনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও। গুরু যিনিই হোন, যিশুখ্রিষ্ট অথবা মহামতি মার্কস, সেই ভূমিকার কিছু সাধারণ পরিণাম এড়ানো কঠিন। গুরুকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, সেটা তাঁর কাম্য হোক বা না হোক। প্রতিষ্ঠানের ভিতর সাংগঠনিক নিয়ম, অতএব নিয়মানুবর্তিতার বাধ্যবাধকতা আর সাংগঠনিক ঐক্যরক্ষার কিছু যান্ত্রিক পদ্ধতি অনিবার্যভাবে এসে যায়। সেই সঙ্গে দেখা দেয় সংগঠনের ভিতর পদাধিকার নিয়ে নানা সমস্যা। সাধক কিংবা সত্যসন্ধানী যখন সংসারে প্রত্যাবর্তন করেন অজ্ঞ মানুষকে পথ দেখাতে, তখন পথ দেখানোর বাইরেও এইরকম অন্য এক ইতিহাসের সূত্রপাত হয়। এই পরিণামের সঙ্গে আমরা পরিচিত– ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তির ফলে। তবু একে ঠেকানো যায়নি।

গৌতম বুদ্ধ কি চেয়েছিলেন কোনো সংগঠিত ধর্মসম্প্রদায়? এ বিষয়ে কিছু মতভেদ আছে। অনুবর্তীদের জন্য তিনি রেখে গিয়েছিলেন এই অন্তিম উপদেশ-আত্মদীপ হও। অর্থাৎ, নিজ আত্মার আলোতে পথ চিনে চলো। এটা গুরুবাদ নয়। তবু তিনি গুরু হয়েই উঠেছিলেন। প্রধান প্রধান সব ধর্মেই এইরকম হয়েছে।
সংসারে প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটা বুঝতে হবে এই সমগ্র ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে। কোনো বুদ্ধই কি সংসারে ফিরে আসতে পারেন ধর্মগুরু না হয়ে? তিনি কি ধর্মগুরু হতে পারেন সংগঠন ও সম্প্রদায় সৃষ্টি না করে? সংগঠিত ধর্ম কি লালন করে না অসহিঞ্চুতা ও দুর্নীতি? এরপরও হয়তো প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্তটাই সঠিক। কিন্তু সেই মুহূর্তের ঐ দ্বিধাটাকে এরপর আর তুচ্ছ বলা যাবে না, সেটা চিহ্নিত হয়ে থাকবে এক নতুন ঐতিহাসিক মহত্ত্বে। ধর্মের বিবর্তনে যুক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ দুই দিক থেকে। এক হলো অধ্যাত্মচেতনার উন্মোচনটাই প্রধান কথা। এইসব আগেই ইঙ্গিত করা আছে। আরও দুই-একটি কথা এইবার যোগ করা যাবে। সাংগঠনিক ও আধ্যাত্মিক দুই সংকটের ভিতর দিয়ে ধর্মকে পথ কেটে যেতে হয়।
প্রথমে সংগঠনের ভিতর দিয়ে ধর্মকে পথ কেটে বিশ্লেষণ খানিকটা বদলে বলা যায়, সমাজ ও ধর্মের বিবর্তনে দুটি পর্যায় ঘুরে ঘুরে আসে; এক পর্যায়ে সংগঠনের প্রাধান্য, অন্য পর্যায়ে প্রতিবাদ। সমাজ সংগঠনের জন্য ধর্মের প্রয়োজন হয়, অন্তত এইরকমই ঘটেছে। কিন্তু সংগঠন যতই প্রবল হয়ে ওঠে, ততই তার ভিতর দুর্নীতি জমে ওঠে। বৃহত্তর সমাজের কায়েমি স্বার্থের সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের একটা যোগ গড়ে ওঠে। এটাই স্বাভাবিক। ন্যায়বিচারের প্রশ্ন ধর্মের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু বৃহত্তর সমাজের ক্ষমতার কাঠামোকে উপেক্ষা করে কোনো বিধানকেই কার্যকর করা সম্ভব নয়। কাজেই প্রতিযুগে সেই সময়ের ক্ষমতার বিন্যাসকে মেনে নিয়েই ন্যায়নীতির বিধান রচিত হয়। ধর্ম বলে বটে, বিচারকে দয়ার স্পর্শে বিনম্র কর, হিংসাকে সংযত কর। কিন্তু সেই সংযমের সীমানাও নির্ধারিত হয়ে যায় ক্ষমতার স্বীকৃত কাঠামো দিয়ে। তাছাড়া, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভিতর কিছু নিজস্ব দুর্নীতি দেখা দেয়, তাকে পরানো হয় পুষ্পিত বাক্যের মুখোশ। প্রাচীন ধর্মের আরেক দোষ, সে আচারসর্বস্ব হয়ে ওঠে। দুর্নীতির চেয়েও এই আচারসর্বস্বতা সমাজের উন্নতির পথে বড় বাধা।
গৌতমবুদ্ধের জন্ম রাজবংশে। এ যুগে ব্রাহ্মসমাজের নেতারা অধিকাংশই উচ্চবর্ণের। এই আন্দোলনের ভক্তি ও যুক্তির সমন্বয়ের দিকে ঝোঁক উল্লেখযোগ্য। রোমান ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে প্রোটেস্ট্যান্ট প্রতিবাদেও ভক্তি ও যুক্তির একটা নতুন সমন্বয়ের চেষ্টা দেখা গেছে। সেটা ঘটেছে এক নতুন অর্থনৈতিক যুগসন্ধিতে, যার প্রভাব এসে পড়েছে ঐ প্রতিবাদী আন্দোলনে। এখানে লক্ষ করা যেতে পারে যে, ধর্মের বিরুদ্ধে বারবার প্রতিবাদ দেখা দেয় ধর্মের ভিত্তিতেই। নতুন আন্দোলনের নেতারা পুরানো ধর্মের মূলে ফিরে যান। তাঁদের যুক্তি শুরু হয় সেইখানে থেকে।
প্রতিবাদী আন্দোলন থেকে জন্ম নেয় নতুন সংগঠন। সংগঠন-প্রতিবাদ-সংগঠন, এইভাবে বললে একটা চক্রাকার গতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অধ্যাত্মচেতনার ভিতর অগ্রগতির ধারণা। এ থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। সেইদিকে এবার দৃষ্টিপাত করা যাক। অধ্যাত্মচেতনার একটা লক্ষণ এই যে, এতে ধরা পড়ে বিশ্বের সমগ্রতার প্রতি ব্যক্তিসত্তার একটা সাড়া। রাম-শ্যাম অথবা যদু সম্বন্ধে আমরা কে কী ভাবছি সেটা এখানে তেমন প্রাসঙ্গিক নয়, মানুষ সম্বন্ধে কী ভাবছি সেটাই প্রাসঙ্গিক। আমরা বিশেষ ভালো অথবা মন্দ জিনিস কীভাবে গ্রহণ করছি সেটা মূল প্রশ্ন নয়। ভালোয়-মন্দে মিশ্রিত এই সমগ্র বিশ্বটাকে আমরা কীভাবে গ্রহণ করছি সেটাই আরও মূল কথা।
এই পৃথিবীর কিছুটা আমাদের জানা, অনেকটাই অজানা। জানা-অজানার মেশানো মহাবিশ্বের প্রতি মানুষের একটা অন্ধ ভয় আছে, আবার একটা পরিব্যাপ্ত প্রেমও আছে। আদিম অধ্যাত্মচেতনায় এই ভয় এবং প্রেম মিলেমিশে গেছে। সমালোচকরা বলেন, ধর্মের ভিত্তিতে ভয়টাই হলো আসল। স্রষ্টাকে মানুষ তৈরি করে নিয়েছে তার ভয়ার্ত চিত্তের প্রার্থনা জানানোর জন্য। কথাটা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। ভয় এবং প্রেম দুই-ই আছে ধর্মের ভিত্তিতে। ভয়ের কুজ্ঝাটিকার ভিতর থেকে রূপ গ্রহণ করেছে অন্য এক আলোকিত বিস্ময়।
বিশ্বের প্রতি মানুষের যে অন্ধ ভয় তার কারণ বোঝা কঠিন নয়। আমাদের সত্তা নানা দিক থেকে সতত বিপন্ন। একটি মানুষকে সংকটে ফেলার জন্য বন্যা, ভূমিকম্প বা অগ্ন্যুৎপাতের মতো বড় কোনো দুর্ঘটনার প্রয়োজন হয় না। অতি তুচ্ছ কারণ থেকে অঙ্গহানি ঘটে, মনের স্থৈর্য ভেঙে চুরমার হয়। ব্যাধি, জরা, মৃত্যুর হাত থেকে মানুষের শৈশব থেকেই একটা ভীতি থাকা স্বাভাবিক। বিশ্বের প্রতি প্রেমের কারণটাই বুঝিয়ে বলা কঠিন। প্রকৃতির কাছ থেকে আমরা সুখকর অনেক কিছু পাই বটে, কিন্তু এইসব খণ্ড খণ্ড সুখকর বস্তুকে অতিক্রম করেও তারায় ভরা আকাশের প্রতি, অন্ধকার রাতের প্রতি, জগৎজোড়া এই অন্তহীন নাট্যের প্রতি মানুষের একটা অকারণ প্রেম আছে।
আদিম বিশ্বচেতনায় ভয়ের ভাবটার প্রাধান্য ছিল। তাই থেকে মানুষের সংস্কৃতিতে বহু নিষ্ঠুর আচার-অনুষ্ঠান এসে গেছে। আমরা মাঝে মাঝেই চারদিকে অসংখ্য ডাইনির অস্তিত্ব আজও অনুভব করি, আর তাদের কিছুতেই মেরে শেষ করে উঠতে পারি না। 
এই যে তামসিক ভয়ের শাসন, এ থেকে চেতনাকে ক্রমে মুক্ত করা আধ্যাত্মিক উন্নতির এক প্রধান শর্ত। আর এইখানেই যুক্তি ও বিজ্ঞানের একটা বড় ভূমিকা দেখা দেয়। আমাদের কালে, রবীন্দ্রনাথের লেখায় ও লালনের পরিণত দর্শনে এ কথা স্বীকৃত। যে আধ্যাত্মিক যুক্তিকে নিজের অঙ্গীভূত করে নেয়নি, তার একটা দুর্বলতা থেকে যায়। বিশ্বপ্রকৃতি সম্বদ্ধে অন্ধ ভয়ের প্রভাব থেকে নিজেকে সে সহজে মুক্ত করে নিতে পারে না। আধ্যাত্মিকতার নামে একটা প্রচণ্ড তামসিকতা তখন মানুষকে অধিকার করে বসে, অন্ধকারকেই আলোক বলে ভ্রম হয়। এইখানে যুক্তির প্রয়োজন। হাসনরাজা যখন বলেছিলেন যে, যুক্তি দিয়ে ধর্মের যে অংশকে মিথ্যা বলে প্রমাণ করা যায়, তাকে মিথ্যা বলে মেনে নেওয়াই ভালো, তখন তিনি ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার পক্ষে একটি অতি মূল্যবান কথাই বলেছিলেন।
শুদ্ধ বিজ্ঞানের মূলে আছে বিশ্ব সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা। এ থেকে আমরা যে জ্ঞান লাভ করি তা সংসারের নানা প্রয়োজনে লাগে। কিন্তু বিজ্ঞানীর জিজ্ঞাসা সংসারের প্রয়োজন দিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তেমনি শুদ্ধ ধর্মের মূলে আছে বিশ্বের প্রতি প্রেম। সে প্রেমও জৈব প্রয়োজনকে অতিক্রম করে যায়। এই অতিরিক্ত জিজ্ঞাসা ও অতিরিক্ত প্রেমের ভিতর কোনো বিরোধ নেই। যদিও সংসারের অভ্যস্ত হিসেবে এদের প্রয়োজনাতিরিক্ত মনে হয়, তবু এরা সংসারকে রক্ষা করে আছে।
সাংসারিকতার এমন শক্তি নেই যে সংসারে সঞ্জাত, লোভ ভয় ও ক্রোধকে সে যথেষ্ট সংযত করতে পারে। ধর্ম যদি শুদ্ধ সত্যধর্ম হয়, তবে সেই শক্তি তাতে আছে। সেই ধর্মে আচার ও সংগঠনের চেয়ে চেতনার প্রাধান্য; বলা হয়, আদিম আধ্যাত্মিকতাকে ভয় থেকে মুক্ত করার জন্যই তার প্রয়োজন। সেই আধ্যাত্মিকতা যদি অন্য ভয় জয় করার পর যুক্তিকে ভয় করে, তবে জানতে হবে যে সেটা সম্ভবত শুদ্ধ আধ্যাত্মিকতা নয়। সুখ নয় শান্তি; আধ্যাত্মিকতা ও উচ্চতর ধর্মের বিকাশের মূলে আছে যু্িক্ত, প্রীতি ও করুণার সমন্বয়ে ধৃত এক শান্তির আকর্ষণ।













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
রোনালদোর জোড়া গোলে উজবেকিস্তানকে উড়িয়ে দিলো পর্তুগাল
ফারিহা হত্যা মামলায় স্বামী হৃদয়ের জামিন ফের নামঞ্জুর
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সুনসান নীরবতা কুমিল্লার আওয়ামী লীগ অফিসে
কুমিল্লায় ছাদ থেকে পড়ে স্কুল ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু
চান্দিনায় তিন দিনের পুলিশি অভিযানে আ’লীগের ১১ নেতা-কর্মী আটক
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কুমিল্লা বিসিকে অনুমোদনহীন কারখানা থেকে অনুমোদনহীন ২১ পদের ঔষধ জব্দ
কুমিল্লায় ঈদের ছুটিতে বনের শতশত গাছ অদৃশ্য
মাদক কারবারিদের শেল্টার দেয় কারা?
কুমিল্লায় ক্যাডেট এএসআই নিয়োগের প্রাথমিক বাছাই পর্বের শেষ দিনের কার্যক্রম সম্পন্ন
কুমিল্লায় ডা. জুবায়ের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও সমাবেশ
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২