শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০২৪
৪ শ্রাবণ ১৪৩১
আগামী বাজেট ও কিছু বিবেচ্য বিষয়
অ্যাডভোকেট মো. মিজানুর রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ মে, ২০২৪, ১২:০১ এএম |

 আগামী বাজেট ও কিছু বিবেচ্য বিষয়
আগামী ৬ই জুন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেট মহান জাতীয় সংসদে পেশ করবেন। এটি বর্তমান সরকারের ১৬তম এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল হাসান মাহমুদ আলীর ১ম বাজেট। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের বাজেট ক্ষমতাশীল আওয়ামী লীগের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে অস্থিতিশীল বিশ^ রাজনীতি অপরদিকে ক্রমবর্ধমান জ¦ালানী ও ডলার সংকট এবং মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা সাধারন মানুষ। এমতাবস্থায় এবারের বাজেটে বড় কোন চমক থাকবে বলে আমার মনে হচ্ছে না। পত্র-পত্রিকা এবং বিভিন্ন গণ-মাধ্যমে যতটুকু জেনেছি এবারের বাজেটের আকার হবে প্রায় ৭ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা যা অনেকটা গতবারের বাজেটের সমানই বলা চলে।
যেহেতু বৈশি^ক অর্থনীতি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে বর্তমানে অনেকটাই টালমাতাল অবস্থা বিরাজ করছে, ফলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির দিকে খুব একটা নজর দেওয়া এবার প্রয়োজন নেই। তবে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এবারের বাজেটে বিশেষ নির্দেশনা থাকা উচিত। দেশের ১৮ কোটি মানুষের মাঝে মাত্র ৩০ লাখ করদাতা প্রতি বছর কর প্রদান করে। এবারের বাজেটে নিয়মিত করদাতাদের জন্য প্রনোদনা রেখে করযোগ্য করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ নির্দেশনা থাকা উচিত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে এক্ষেত্রে আরো বেশি সচেষ্ট হতে হবে। প্রয়োজনে আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় কার কয়টি বাড়ি আছে, কার কোন ব্যাংকে কত টাকা আছে, কার নামে কয়টি মোবাইল সিম আছে, মোবাইল ফোনে কে কত টাকা ব্যায় করছে, কে বছরে কয়বার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন ইত্যাদির তথ্যের উপর ভিত্তি করে নতুন করদাতার সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। মোট কথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে তাদের সক্ষমতা বাড়াতে আরো বেশি উদ্যোমী হতে হবে।
তবে বরাবরের মতো এছরও সরকারের অন্যতম প্রধান দুশ্চিন্তা হবে ঘাটতি বাজেট। পূর্বে যেমন ঘাটতি বাজেট পূরণে সরকার ব্যাংকিং খাতের উপর নির্ভর করতো, এবছর হয়তোবা সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ঠিক সেরকম প্রত্যাশিত সহায়তা নাও পেতে পারে- কারন সারা ব্যাংকিং খাতেই বর্তমানে তীব্র তারল্য সংকট বিরাজ করছে। এদিকে সরকারের বেশ কয়েকটি মেগা প্রজেক্ট বর্তমানে চলমান রয়েছে, ফলে চলমান প্রজেক্টগুলোতে প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দেওয়াও এবারের বাজেটের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। পত্রিকায় দেখেছি মেট্রো রেলের উপর নাকি ৫% ভ্যাট বসানোর চিন্তা করছে সরকার। এটা নি:সন্দেহে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আমার মনে হয় না বাজেটে এটা করা উচিত। কারন মেট্রো রেল ঢাকা শহরের অসহনীয় ট্রাফিক জ্যাম নিরসনে বিশেষ ভুমিকা রাখছে। এমতাবস্থায় এর উপর করারোপ করলে তা যাত্রীদের উপর থেকেই আদায় করতে হবে যা অনেকটা মরার উপর খারার ঘাঁ হবে। সাধারন মানুষের মনে মেট্রো সম্পর্কে যেই আবেগ ও উচ্ছ্বাস ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে, তা অনেকটাই ম্লান হয়ে যাবে। তবে রাজস্ব বাড়াতে সকল প্রকার তামাকজাত পন্যের উপর বর্ধিত হারে বিশেষ সম্পূরক করের প্রস্তাব করতে পারে। এর ফলে সরকার শুধু এক তামাক দ্রব্য থেকেই প্রায় সাড়ে দশ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে পারে। বর্ধিত করারোপের ফলে একদিকে যেমন সরকার বিশাল রাজস্ব আদায় করবে, ঠিক তেমনিভাবে অনেকে নিরুৎসাহিত হয়ে ধূমপান ত্যাগ করতে পারে।
চলমান ডলার সংকটের সময় অপ্রয়োজনীয় বিলাসী পণ্যের আমদানির উপর বর্ধিত করারোপ করা যেতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কৃষি পণ্যের উপর থেকে ভর্তুকি তুলে নেবার যে প্রস্তাব করেছে তা কোনভাবেই মানা যাবে না। বস্ততপক্ষে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে এক্ষেত্রে আমিও একমত যে আমরা কৃষিতে ভর্তুকি দেই না বরং কৃষিতে বিনিয়োগ করি। প্রকৃতপক্ষে আমাদের প্রধানমন্ত্রী এটা যথার্থই বলেছেন। বাংলাদেশ কৃষি নির্ভর দেশ হওয়ায় কৃষির উপর সরকারের সুনজর সব সময়ই থাকতে হবে। আমরা কোভিডের সময়ও দেখেছি অর্থনীতির সবগুলো খাত যখন নি¤œমুখী ছিল, কৃষিখাত ঠিক তখনও ঊর্ধমুখী ছিল। বস্তুতপক্ষে কৃষিখাত আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যে কি বিশাল ভূমিকা রাখছে তা আমরা খোলা চোখে হয়তোবা বুঝতে পারছি না। কিন্ত আমাদেরকে যদি কৃষি পন্য আমদানি করতে হতো তাহলে বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যায় হতো শুধু কৃষি পণ্য আমদানি করতেই। সব দিক বিবেচনা করে কৃষিখাতে ভর্তুকি এবারের বাজেটেও অব্যাহত রাখা উচিত বলে আমি মনে করি।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়েও আমি খুব একটা চিন্তিত নই। বিশেষ করে আমাদের প্রবাসীদের কষ্টার্জিত আয় যদি হুন্ডির বদলে ব্যাংকিং চ্যানেলে আনা যায় তাহলে আমাদের রিজার্ভে ভাল একটা প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশ ব্যাংক গত কয়েকদিন পূর্বে ডলারের দাম বৃদ্ধি করেছে ফলে অনেকেই এর বিরুদ্ধে কথা বললেও আমি এর পক্ষে বরাবরই অবস্থান নিয়েছি। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ডলারের দাম ১১৭ টাকা আর হুন্ডিতে ১২০ টাকা হওয়ার ফলে হুন্ডির সাথে এখন এই পার্থক্য মাত্র ৩ টাকা। এই পার্থক্য যত কম হবে হুন্ডির বদলে ব্যাংকিং চ্যানেলের মানুষ তত বেশি টাকা পাঠাবে।
বর্তমান সরকার স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মানের দিকে যেহেতু অগ্রসর হচ্ছে, সেহেতু তথ্য প্রযুক্তি খাতে বর্ধিত করারোপ করার কোন মানে হয় না। তবে, শহরের নামিদামি হাসপাতালের উপর উচ্চহারে করারোপ করা যেতে পার্।ে কিন্তু গ্রামের অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা ব্যায়ের উপর যেনো কোন প্রভাব না পরে সেদিকেও বিশেষ সুনজর থাকতে হবে এবারের বাজেটে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষার মূল কারিগর প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব থাকা উচিত এবারের বাজেটে।
বাংলাদেশ ব্যাংককে আমি বিশেষভাবে সাধুবাদ জানাই “৬-৯” তথা “সিঙ্গেল ডিজিট” নামক অমূলক অর্থনীতির ধারনাটিকে উঠিয়ে নেবার জন্য। এই সিঙ্গেল ডিজিটের কারনে আমাদের অর্থনীতিতে বিরাট ক্ষতি সাধিত হয়েছে। সরকার স্বীকার করুক আর নাই করুক দেশে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কম করে হলেও ১২% এর উপরে। সেক্ষেত্রে একজন ব্যবসায়ী কিভাবে ৯% হারে ব্যাংক থেকে ঋণের জন্য আবেদন করে? বলতে গেলে এতদিনতো ব্যবসায়ীরা বিনা সুদেই ঋণ সুবিধা পাচ্ছিল। এটা কোনভাবেই চলতে দেয়া যায় না।
নতুন অর্থমন্ত্রী এবারের বাজেটে দুটি ক্ষেত্রে চমক দেখাতে পারেন; একটি হল মূল্যস্থীতি নিয়ন্ত্রন আর অপরটি হল ক্লাইমেট ফাইন্যান্সিং। অপ্রিয় হলেও সত্য, সমাজের ঊচ্চ শ্রেণীর জনগন ব্যাতিত প্রায় সবাই চলমান ঊচ্চ মূল্যস্ফীতিতে অতিষ্ঠ হয়ে আছে। আগামী বাজেটে সাধারন মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগপণ্যের উপর নতুন করে যেনো কোন করারোপ না করা হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। যেহেতু বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধি শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং সারা পৃথিবীরই সমস্যা, সেহেতু এবারের বাজেটে কার্বন নি:সরণের নিমিত্তে এতদ্ সংক্রান্ত প্রকল্পে সরকারের বিশেষ বরাদ্দ থাকবে বলে আমি আশা করি। আর যেই সমস্ত ব্যাংক যত বেশি গ্রিণ ফাইন্যান্স করবে, তাদের জন্যও বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে।
চলমান বিদ্যুৎ সমস্যা নিয়েও আমি খুব একটা চিন্তিত নই। আমাদের যেই কয়েকটি বড় বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প চলমান আছে এগুলোর অসমাপ্ত কাজ যখন পুরোপুরি শেষ হয়ে উৎপাদনে যাবে, তখন আর আমাদেরকে বিদ্যুৎ নিয়ে কোন চিন্তাই করতে হবে না। তবে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পকে উৎসাহিত করার জন্য বিশেষ প্রনোদনা রাখা উচিত এবারের বাজেটে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সাথে কমবেশি প্রায় ১ কোটি বিনিয়োগকারী জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে যে ঋণাত্মক ধারা চলছে, এবারের বাজেটে যদি পুঁজিবাজার সংক্রান্ত বিশেষ কোন প্রনোদনার ঘোষণা থাকে তাহলে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে।
আমাদের স্থানীয় সরকারকে শুধু সরকারের আর্থিক সহায়তার দিকে না চেয়ে থেকে বরং নিজেদের অভ্যন্তরীণ আয় বাড়ানোর দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমানো এবং চলমান তারল্য সমস্যার সমাধানে বিশেষ নির্দেশনা এবারের বাজেটে থাকবে বলে আমার বিশ^াস। ২০২৬ সালে যেহেতু বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ করবো, ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই অনেকগুলো শিল্প প্রতিষ্ঠান তখন আর রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা পাবে না। বাজেটে এইসকল প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ সুবিধা যেমন মূল্য সংযোজন কর কমানো, বিদ্যুৎ বিল কমানো ইত্যাদি বিকল্প প্রনোদনার ব্যবস্থা রাখা উচিত।  
পরিশেষে, আসছে বাজেট বর্তমান সরকারের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজেট। একদিকে চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতা মোকাবেলা অপরদিকে ২০৪১ সালের উন্নত দেশের মর্যাদায় উন্নীত হবার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে যথেষ্ট সুকৌশলে আমাদের নতুন অর্থমন্ত্রীকে এবারের বাজেট পেশ করতে হবে।
লেখক:
অ্যাডভোকেট মো. মিজানুর রহমান
সহযোগী সদস্য, দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি)












সর্বশেষ সংবাদ
কুমিল্লার কোটবাড়ি বিশ্বরোডে ৫ ঘন্টার রণক্ষেত্র, অন্তত ১শ জন হাসপাতালে ভর্তি
কুমিল্লার কোটবাড়ির রণক্ষেত্র দফায় দফায় সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক
তারা যখনই বসবে আমরা রাজি আছি : আইনমন্ত্রী
চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে কথা বলবেন আইনমন্ত্রী
উত্তরায় গুলিতে নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ শিক্ষার্থী নিহত
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সব স্কুল–কলেজ অনির্দিষ্টকাল বন্ধ
নিজের লাশ কী করতে হবে, আগেই জানিয়েছিলেন আবু সাঈদ!
এইচএসসির বৃহস্পতিবারের পরীক্ষা স্থগিত
এইচএসসির বৃহস্পতিবারের পরীক্ষা স্থগিত
কোটা আন্দোলনে নিহত সাঈদের পোস্ট ভাইরাল
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২ | Developed By: i2soft