নামের
পাশে তকমা লেগেছে ‘সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়’। কিন্তু ভেতরে শুধুই
শূন্যতা। প্রধান শিক্ষক নেই, সহকারী প্রধান শিক্ষক নেই, বিজ্ঞান পড়ানোর
শিক্ষক নেই, এমনকি রাতে স্কুল পাহারা দেওয়ার জন্য কোনো নৈশপ্রহরীও নেই।
কুমিল্লার মুরাদনগরের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান 'মুরাদনগর
ডি.আর. সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়' এখন তীব্র শিক্ষক ও জনবল সংকটে
আইসিইউতে পড়ার মতো অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা এই অচলাবস্থায়
ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান, কমছে শিক্ষার মান, আর চরম হতাশায় দিন কাটছে
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে
কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নেই। ডিজিটাল বাংলাদেশের
যুগে এই সরকারি স্কুলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের কোনো
শিক্ষক নেই। এছাড়া বিজ্ঞানের প্রধান দুই ভিত্তি ভৌতবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান
বিষয়েরও কোনো শিক্ষক নেই।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবস্থাও একই রকম
শোচনীয় ঃ গণিত ২টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ১ জন, ইংরেজি ২টি পদের বিপরীতে
আছেন মাত্র ১ জন, ব্যবসায় শিক্ষা ২টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ১ জন।
শুধু
ক্লাসরুমই নয়, প্রশাসনিক ও দৈনন্দিন কাজের জন্য নেই কোনো অফিস সহকারী,
কম্পিউটার অপারেটর, পিয়ন, ঝাড়ুদার বা নাইট গার্ড। বর্তমানে অস্থায়ী কিছু
কর্মী দিয়ে কোনোমতে টেনেটুনে চালানো হচ্ছে এই বিশাল প্রতিষ্ঠানের
কার্যক্রম।
পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী বা নৈশপ্রহরী না থাকায় রাতের আঁধারে
অরক্ষিত হয়ে পড়ে বিদ্যালয়টি। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন কক্ষের জানালার দামি থাই
গ্লাসসহ বিদ্যালয়ের নানা মূল্যবান সামগ্রী চুরির ঘটনা ঘটেছে। সরকারি সম্পদ
রক্ষায় এখন চরম বেগ পেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ,
বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক
শিক্ষা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে আগের সেই গৌরবোজ্জ্বল ফলাফল এখন
অতীত। স্কুলের শিক্ষাদানের ঘাটতি পূরণ করতে বাধ্য হয়ে দরিদ্র পরিবারের
সন্তানদেরও চড়া মূল্যে প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল হতে
হচ্ছে, যা অনেক পরিবারের জন্যই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যালয়ের
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ময়নাল হোসেন সরকার তাঁর অসহায়ত্ব প্রকাশ করে
বলেন, "শিক্ষক ও জনবল সংকটের বিষয়টি আমরা একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে
লিখিতভাবে জানিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে শিক্ষার মান ধরে রাখা কীভাবে সম্ভব?"
যোগাযোগ
করা হলে কুমিল্লার জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম সমস্যার কথা
স্বীকার করে দৈনিক কুমিল্লার কাগজকে জানান, বিষয়টি সমাধানে প্রয়োজনীয়
ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি)
কুমিল্লা অঞ্চলের আঞ্চলিক উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম দৈনিক
কুমিল্লার কাগজকে জানান, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অফিসিয়ালভাবে আবেদন করলে
বিষয়টি দ্রুত পদায়নের জন্য মাউশির মহাপরিচালকের কাছে সুপারিশ করা হবে।
এলাকাবাসীর
দাবি, একটি সরকারি বিদ্যালয়ে বছরের পর বছর ধরে মূল পদগুলো শূন্য থাকা
প্রশাসনের চরম উদাসীনতার প্রমাণ। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না হলে
বিদ্যালয়টি শিক্ষার্থী শূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের স্পষ্ট কথা
"ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষক ও
কর্মচারী নিয়োগ দিতে হবে। আর কত বছর অপেক্ষা করলে আমাদের সন্তানেরা ক্লাসে
শিক্ষক পাবে, এই জবাব এখন পুরো মুরাদনগরবাসী জানতে চায়।"
