বৃহস্পতিবার ২৫ জুন ২০২৬
১১ আষাঢ় ১৪৩৩
প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ সব কর্মস্থলে ডে-কেয়ার সেন্টার না থাকায়
অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে উঠছে কর্মজীবি নারীদের সন্তান
# শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সেন্টার খোলার দাবি রাশেদা বেগম হীরা এমপির
মোঃ এমদাদ উল্যাহ, চৌদ্দগ্রাম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ২:১৮ এএম আপডেট: ২৫.০৬.২০২৬ ২:২৫ এএম |

অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে উঠছে  কর্মজীবি নারীদের সন্তানহোছনা আক্তার। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। সম্প্রতি ছয় মাস মাতৃত্বকালিন ছুটি শেষে ফিরেছেন বিদ্যালয়ে। স্বামী কামাল হোসেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করেন। দুই সন্তান নিয়ে কুমিল্লা শহরে ভাড়া বাসায় থাকেন। হোছনা আক্তার প্রতিদিন সকালে ছোট সন্তানকে নিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান করান। কিন্তু বিদ্যালয়ে নিজের ছোট সন্তানের দেখাশোনার কেউ নেই। ফলে বাধ্য হয়ে কিছুক্ষণ শ্রেণীকক্ষে পাঠদান ও কিছুক্ষণ নিজের সন্তানের দেখাশোনা করতে হয়। একইভাবে পাঁচ বছর বয়সী সন্তানকে দেখাশোনা করেন স্বামী। যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডে-কেয়ার সেন্টার থাকতো, তাহলে হোছনা আক্তার ও তাঁর স্বামী কামাল হোসেনের মতো কাউকে কষ্ট পেতে হতো না। সারাদেশে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিসে ডে-কেয়ার সেন্টার না থাকায় হোছনা-কামাল দম্পত্তির মতো হাজার হাজার কর্মজীবি নারীর চাকরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে সন্তানের ভবিষ্যত চিন্তায় চাকরি ছাড়ছেন।
জানা গেছে, বর্তমান সমাজে শিশুর লালনপালন ও সার্বিক বিকাশে গর্ভধারিনী মাকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়। নবজাতকের সবচেয়ে নিরাপদ ও যত্নশীল আশ্রয়স্থল মায়ের কোল। মা তার উষ্ণ অনুভুতির সাহায্যে শিশুকে পরম মমতায় আগলে রাখেন। মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড ফ্রয়েড শিশুর প্রতি মায়ের স্নেহ-মমতার গুরুত্ব উপলব্ধি করে বলেন, স্নেহপূর্ণ পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্নতায় শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ ব্যাহত হয়। সুতরাং, বাচ্চার মানসিক বিকাশের জন্য সবার আগে মায়ের পাশে থাকা উচিত। শৈশবকালের প্রতিকূল অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হওয়ার পর নারীরা জাঁতাকলের মধ্যে পড়ে। একদিকে চাকরি, অন্যদিকে সন্তান লালনপালন। এজন্যই গত ৯ জুন জাতীয় সংসদ অধিবেশনে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সেন্টার খোলার দাবি করেছেন সংরক্ষিত সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরা।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলে ১,১৮,৬০৭ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ৬৫ শতাংশ শিক্ষক নারী। ৩ লাখ ৬২ হাজার ৭০৯ জন শিক্ষকের মধ্যে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭০ জন নারী এবং ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন পুরুষ শিক্ষক কর্মরত। নারী শিক্ষকদের অধিকাংশের রয়েছে শিশু সন্তান। এছাড়াও দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২১,০০০ এবং এতে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার। শিশু সন্তানদের দেখাশোনার জন্য বিদ্যালয়গুলোতে নেই ডে-কেয়ার সেন্টার। এতে শিক্ষিকাদের মানসিক ও শারিরীক সমস্যার পাশাপাশি সন্তানদের মানসিক বিকাশ ঘটছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দশকের তুলনায় নারীর ক্ষমতায়ন ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে চলছে। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে সিংহভাগ অংশে নারী। আজকের দ্রুতগতির জীবনযাত্রায় কর্মজীবি বাবা-মায়ের জন্য সন্তানের যত্ন এবং একই সাথে পেশাগত জীবন পরিচালনা করা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন পূর্বপরিচয় ও কোন প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় না থাকা একজন অপরিচিত গৃহকর্মীর কাছে সন্তানকে রেখে কর্মক্ষেত্রে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। যখন বাবা-মা উভয়েই বাড়ির বাইরে কর্মরত থাকেন, তখন সন্তানদের সঠিক যত্ন নেওয়ার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। এমন পরিস্থিতিতে ডে-কেয়ার সেন্টার কর্মজীবি বাবা-মায়ের জন্য নিঃসন্দেহে একটি সহায়ক উপায়। তবে এর সুবিধা সম্পর্কে সচেতন থেকে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করে সন্তানের উন্নয়ন ও পেশাগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব। 
গত দশ বছরে প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে নারী কর্মী নিযুক্ত রয়েছেন। বেশির ভাগ কর্মস্থলে ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ বা ‘দিবাযত্ন কেন্দ্র’ না থাকায় শিশুর লালন-পালনে নারী কর্মীদের অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করতে হচ্ছে। এমনকি পুরুষ সহকর্মীদের সামনে বাচ্চাকে ব্রেস্ট ফিডিং করাতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। যদি প্রত্যেকটি সেক্টরে নারীদের সুবিধার্থে ডে-কেয়ার সেন্টার থাকে, তাহলে তারা অসুবিধার সম্মুখীন হবে না। ডে-কেয়ারে শিশুদের থাকা-খাওয়া, খেলাধুলা, বিনোদন, ঘুম ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলে বাবা-মা অনেকটা নিশ্চিন্তে কর্মে মনোনিবেশ করতে পারবে। বাবা-মা কর্মস্থলে থাকার সময়টাতে ডে-কেয়ার সেন্টারগুলো শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে থাকে। এসব সেন্টারের প্রশিক্ষিত কর্মীরা শিশুদের সামাজিক, মানসিক ও শারীরিক দক্ষতা বিকাশেও সহযোগিতা করে। এতে কর্মক্ষেত্রে নারীদের সাফল্যের পরিমাণ বেড়ে যাবে। 
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী কর্মক্ষম নারীদের ৩৮.৪০ শতাংশ শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ করেছে। এরমধ্যে দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪.২ শতাংশ নারী রয়েছে। কর্মজীবি নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হলে প্রত্যেকটি কর্মস্থলে ডে-কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলার বিকল্প নেই। শুধু কর্মস্থলে নয়, নারীর উচ্চশিক্ষা সুনিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দিবাযত্ন কেন্দ্রের সু-ব্যবস্থা থাকা অতীব জরুরি। ডে-কেয়ার সেন্টারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পাবে নারীর ক্ষমতায়ন, উন্নততর কর্মপ্রত্যাশা, কর্মক্ষেত্রে সাফল্য ইত্যাদি। এছাড়াও প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একটি করে ডে-কেয়ার সেন্টার থাকলে নারীরা সমাজের ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ক্যারিয়ার গঠনে উদ্যমী হবে। 
সরকারের ‘জাতীয় শিশু দিবাযত্ন নীতিমালা ২০২১’-এ বলা হয়েছে, কর্মজীবি নারীদের কর্মক্ষেত্রে রাখার জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিছু ব্যাংক, বেসরকারি সংস্থা এবং মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ইতিমধ্যে এই সুবিধা চালু করেছে।তবে এই উদ্যোগ এখনও সীমিত। নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং শিশুদের নিরাপদ বিকাশ নিশ্চিত করতে ডে-কেয়ার ব্যবস্থার প্রসার ও মান নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার বাড়লেও এখনও ৩-৫ বছর বয়সী শিশুর একটি বড় অংশ এই সেবার বাইরে। পরিকল্পিত ডে-কেয়ার ব্যবস্থায় বড় হওয়া শিশুদের ভাষাগত দক্ষতা ও সামাজিকতা উন্নত হয়।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা দুই সন্তানের জননী শাহনাজ আক্তার বলেন, সরকার তো আমাদের বাচ্চাদের রাখার জন্য বেবি কেয়ার বা ডে-কেয়ার সেন্টার তৈরি করে দেয়নি। বাসায় কাজের লোক থাকলেও টানা ৭-৮ ঘন্টা বাচ্চাদেরকে তার কাছে রাখা নিরাপদ মনে করি না। এজন্য বাধ্য হয়ে আমি তাদের সঙ্গে নিয়ে আসি। যদি ডে-কেয়ার সেন্টার থাকতো, সেখানে সন্তানকে একটি নির্দিষ্ট রুটিন অনুযায়ী সুরক্ষিত এবং যত্নশীল পরিবেশে রাখা যায়, তখন অভিভাবকরা নিজেদের পেশাগত জীবনে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে। কর্মক্ষমতা ও কাজের প্রতি আত্মবিশ্বাস বাড়ে। ডে-কেয়ার সেন্টারে শিশু অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা, কথাবার্তা ও বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিয়ে সামাজিক দক্ষতা অর্জন করে। এতে আত্মবিশ্বাস ও সহযোগিতার মনোভাব তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।বেশিরভাগ ডে-কেয়ার সেন্টারে শিশুদের গান, নাচ, আঁকা কিংবা গল্প বলার মাধ্যমে শেখানো হয়। এসব কার্যক্রম শিশুর সৃজনশীলতা ও বুদ্ধির বিকাশে সহায়ক। এই সেন্টারে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ তাদের পরবর্তী স্কুলজীবনের জন্য প্রস্তুত করে। এছাড়াও নিয়মিত সময় ব্যবস্থাপনা ও নিজ দায়িত্ব পালনের অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই গড়ে ওঠে। 
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদাৎ হোসেন বলেন, কর্মস্থলে ডে-কেয়ার সেন্টার না থাকায় কর্মজীবি নারীারা শিশু সন্তান নিয়ে নানামুখী সমস্যা ভোগ করছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এনিয়ে কাজ করছে। 
















http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
কুমিল্লায় দুর্ঘটনার কবলে দুই ট্রেন
কুমিল্লায় মুফতি ফয়জুল করীমের বিরুদ্ধে মামলা, বাদীর পরিচয় নিয়ে বিতর্ক
লাকসামে ৬ বছরের বাকপ্রতিবন্ধী শিশুকে নিপীড়নের মামলায় ৫০ বছর বয়সী ব্যক্তি গ্রেপ্তার
কুমিল্লায় ওয়ালটন প্লাজার ফ্রি মেডিকেলক্যাম্পে সেবা পেলেন প্রায় ৫০০ মানুষ
দশক শ্রেণীর ছাত্র দিয়ে এসএসসির উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে তোলপাড়, তদন্ত কমিটি গঠন
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
অবসর ভেঙে ফুটবলে ফিরলেন ব্রাজিলের রোনালদিনহো
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সুনসান নীরবতা কুমিল্লার আওয়ামী লীগ অফিসে
দশম শ্রেণির ছাত্র দিয়ে এসএসসির খাতা মূল্যায়ন! ভিডিও ভাইরাল
সেই আট কলেজের খোঁজ নিতে শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশ
কুমিল্লায় ছাদ থেকে পড়ে স্কুল ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২