নবীকন্যা ফাতিমার (রা.) বিশেষ ৩ গুণ
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ছোট ও প্রিয় মেয়ে ছিলেন হজরত ফাতিমা (রা.)। মাত্র ২৯ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি ইন্তেকাল করেন। তবে এই সময়ের জীবনে তিনি যেভাবে নিজের তারুণ্যকে অতিবাহিত করেছেন, তা আজ বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের জন্য এক পরম অনুপ্রেরণা।
হজরত উসামা বিন জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, সাহাবিরা যখন মহানবী (সা.)-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে তার পরিবারের মধ্যে কে তার সবচেয়ে প্রিয়, রাসুল (সা.) স্পষ্টভাবে উত্তর দিয়েছিলেন-ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ।
হজরত ফাতিমাকে আজ-জাহরা উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল, যার অর্থ দীপ্তিময় বা উজ্জ্বল আভার অধিকারী। এ ছাড়া তাকে উম্মে আবিহা বা তার পিতার মা বলেও ডাকা হতো। কারণ মায়ের ইন্তেকালের পর তিনি যেভাবে ছায়ার মতো থেকে মহানবী (সা.)-এর সেবা ও যত্ন করেছিলেন, তা শুধু একজন স্নেহময়ী মায়ের পক্ষেই সম্ভব।
হজরত ফাতিমা (রা.)-এর জীবনের তিনটি অনন্য গুণ নিচে আলোচনা করা হলো:
মানসিক দৃঢ়তা ও অসীম সাহসিকতা
হজরত ফাতিমা (রা.) পিতার মতোই অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। শৈশব থেকেই তাকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতা ও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে এই চ্যালেঞ্জগুলো তাকে দুর্বল করেনি, বরং সমবয়সী অন্যদের চেয়ে আরও বেশি দৃঢ় ও সাহসী করে তুলেছিল।
তখনও তিনি কৈশোরে পা দেননি, এমন এক বয়সে তিনি সাহসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। একদিন মহানবী (সা.) কাবার সামনে নামাজ আদায় করছিলেন, এ সময় ওকবা বিন আবি মুইত নামের এক কাফের রাসুল (সা.)-কে অপমান ও শারীরিক আঘাত করার চেষ্টা করে। এই খবর শুনে ছোট্ট ফাতিমা এক মুহূর্তও দেরি না করে দৌড়ে কাবার চত্বরে যান এবং বাবাকে আগলে রেখে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করেন।
জীবনের অগ্রাধিকার সঠিকভাবে নির্ধারণ করা
হজরত ফাতিমা (রা.) প্রতিদিনের সাংসারিক ব্যস্ততা ও কষ্টের মাঝেও ইবাদত-বন্দেগিতে প্রচুর সময় কাটাতেন। বিয়ের পর বাবার বাড়ি থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পরও মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে তার আত্মিক ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর।
মহানবী (সা.)-এর অন্তিম শয্যাশায়ী হওয়ার দিনগুলোর একটি ঘটনা হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন। রাসুল (সা.) একদিন ফাতিমাকে কাছে ডেকে কানে কানে কিছু একটা বললেন, তা শুনে ফাতিমা কেঁদে উঠলেন। এরপর রাসুল (সা.) আবার তার কানে কানে কিছু বললেন, এবার ফাতিমা হেসে উঠলেন। হজরত আয়েশা (রা.) পরবর্তীতে ফাতিমার কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমবার বাবা আমাকে তার ইন্তেকালের খবর জানিয়েছিলেন, তাই আমি কেঁদেছিলাম। আর দ্বিতীয়বার তিনি আমাকে বললেন যে তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আমিই প্রথম তার সঙ্গে পরলোকে মিলিত হব, এই আনন্দের খবর শুনে আমি হেসেছিলাম। (সহিহ মুসলিম)
পিতার বিচ্ছেদের বেদনায় ব্যাকুল হলেও, পরকালে দ্রুত তার সঙ্গে দেখা হবে-এই বিশ্বাসে তিনি আনন্দিত হয়েছিলেন।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, মহানবী (সা.) তাকে জানিয়েছিলেন যে তিনি হবেন জান্নাতের সমস্ত নারীদের নেত্রী বা সর্দার। হজরত ফাতিমা (রা.) খুব ভালো করেই জানতেন যে দুনিয়ার এই দুঃখ-কষ্ট সাময়িক, আর মানুষের আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত পরকালের চিরস্থায়ী সুখ অর্জন করা।
রাসুল (সা.)-কে অনুসরণের মাধ্যমে ভালোবাসার প্রমাণ
মহানবী (সা.)-এর সন্তানদের মধ্যে একমাত্র হজরত ফাতিমা (রা.)-ই রাসুল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর কিছুদিন বেঁচে ছিলেন। জীবনের সিংহভাগ সময় মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষকের সান্নিধ্যে কাটানোর ফলে তিনি নিজে নারীজাতির জন্য এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠেছিলেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, আমি চালচলন, আচার-ব্যবহার এবং বসা ও দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ফাতিমা বিনতে রাসুলুল্লাহর চেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ আর কাউকে দেখিনি। (জামে আত-তিরমিজি)
আমাদের চিরচেনা অভ্যাস বা জীবনধারা হঠাৎ করে পরিবর্তন করে মহানবী (সা.) বা হজরত ফাতিমা (রা.)-এর আদর্শ পুরোপুরি ধারণ করা হয়তো কঠিন। কিন্তু আমাদের অন্তত একটি ছোট পদক্ষেপ দিয়ে শুরু করা উচিত।
আমরা প্রতিদিন মহানবী (সা.), তার পরিবার ও সাহাবিদের জীবনী পড়ার অভ্যাস করতে পারি। যুগের পরিবর্তনে আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো হয়তো ভিন্ন, কিন্তু তাদের জীবনকাহিনীতে যে শিক্ষা রয়েছে, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। যেকোনো কথা বলা বা কাজ করার আগে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত-আজ যদি মহানবী (সা.) বা হজরত ফাতিমা (রা.) এই পরিস্থিতিতে থাকতেন, তবে তারা কী করতেন?
দাম্পত্য সুখী হবে এই ৩ উপায়েসুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের প্রথম ধাপ হলো পরিবার। পরিবারের মূল ভিত্তি হলো স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্ক। সমসাময়িক বাস্তবতায় নানাবিধ টানাপোড়েনের কারণে পারিবারিক সুখ-শান্তি বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। এই মুহূর্তে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পারিবারিক জীবন আমাদের জন্য হতে পারে সর্বোত্তম অনুকরণীয় আদর্শ। তিনি ছিলেন একাধারে একজন দায়িত্বশীল স্বামী, স্নেহময় পিতা ও আদর্শ দাদা-নানা।
পারিবারিক জীবনকে শান্তিময় করতে মহানবী (সা.)-এর দেখানো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
খোদাভীতি, পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্মান
একটি সফল দাম্পত্য জীবন ও সুখী পরিবারের মূল চাবিকাঠি হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভালো সম্পর্ক। মহানবী (সা.) দেখিয়েছেন যে, দাম্পত্য জীবনে মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে হলে পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ থাকা অপরিহার্য। তিনি নিজের পরিবারের প্রতি সর্বদা দয়ালু, কোমল, সহনশীল ও সম্মান প্রদর্শনকারী ছিলেন।
পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ। অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য আরাম, পবিত্রতা ও সুরক্ষার প্রতীক।
ভালোবাসা দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর করে, তবে ইসলামে তাকওয়া বা খোদাভীতিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বাহ্যিক বা আবেগীয় ভালোবাসা কিছুটা কমলেও তাকওয়া থাকলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা কখনো শেষ হয় না।
ইসলামের প্রাথমিক যুগের বিখ্যাত পণ্ডিত হাসান আল-বসরী এক বাবাকে তার মেয়ের বিয়ের পাত্র চয়নের ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, তোমার মেয়েকে এমন এক ব্যক্তির কাছে বিয়ে দাও যার অন্তরে তাকওয়া বা খোদাভীতি আছে। কারণ সে যদি তোমার মেয়েকে ভালোবাসে তবে তাকে সম্মান করবে, আর যদি কোনো কারণে ভালোবাসায় কমতিও আসে, সে অন্তত তার ওপর জুলুম করবে না।
পরিবারের প্রতি সদয় আচরণ
ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারেন না, যতক্ষণ না সে তার পরিবারের প্রতি সদয় হয়। মহানবী (সা.) এমন এক সময়ে ইসলাম প্রচার শুরু করেছিলেন যখন তৎকালীন আরব সমাজে নারীর কোনো অধিকার ছিল না। নারীদের শুধু সম্পত্তি হিসেবে দেখা হতো এবং কন্যাসন্তানদের জ্যান্ত কবর দেওয়া ছিল অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। সেই অন্ধকার যুগে মহানবী (সা.) নারীদের সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ডাক দেন।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, যার দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে এবং সে তাদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তাদের সঙ্গে সদয় আচরণ করে, তবে ওই কন্যাসন্তানরাই তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে।
দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সদয় আচরণই হচ্ছে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ। অন্য এক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে সেরা।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন, মুমিনদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী হলেন সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর। আর তোমাদের মধ্যে তারাই উত্তম, যারা তাদের স্ত্রীদের কাছে উত্তম।
মহানবী (সা.)-এর জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি তার স্ত্রীদের প্রতি অত্যন্ত কুশলী ও স্নেহশীল ছিলেন। হজরত আয়েশা (রা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে তিনি প্রায়ই তার কোলে মাথা রেখে শুতেন এবং আদর করে তাকে হুমায়রা বা লালচে ফর্সা বলে ডাকতেন। ঘরের কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করা, নিজের কাপড় নিজে ধোয়া-এসবে মহানবী (সা.) কখনো দ্বিধা করেননি। চরম ধৈর্যের পরীক্ষার মুহূর্তেও তিনি কখনো পরিবারের প্রতি কোনো কঠোর ভাষা বা আচরণ করেননি।
পারস্পরিক যোগাযোগ ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া
যেকোনো সম্পর্কের প্রাণ হলো সুন্দর যোগাযোগ বা কথোপকথন। মহানবী (সা.)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তার কোমল কণ্ঠ ও সুন্দর বাচনভঙ্গি। তিনি কখনো কারও সঙ্গে কটু কথা বলেননি। স্ত্রী ও সন্তানদের কোনো বিষয়ে সংশোধন করার প্রয়োজন হলেও তিনি অত্যন্ত নরমভাবে কথা বলতেন। মহানবীর পরিবারে সবার কথা শোনার ও বলার চমৎকার পরিবেশ ছিল। তিনি তার স্ত্রীদের মতামত ও পরামর্শকে অত্যন্ত মূল্যায়ন করতেন, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন।
কন্যা হজরত ফাতিমা (রা.)-কে মহানবী (সা.) এতটাই ভালোবাসতেন যে, ফাতিমা যখনই তার ঘরে আসতেন, তিনি নিজে আসন থেকে উঠে দাঁড়াতেন, তাকে চুম্বন করতেন এবং নিজের বসার জায়গায় তাকে বসাতেন। পরিবার ও সন্তানদের প্রতি তার এই গভীর মমতা ও কোমলতা আজ প্রতিটি পরিবারের জন্য এক পরম শিক্ষণীয় বিষয়। একটি ভালোবাসাময় ও শান্তিময় পরিবার গঠনে মহানবী (সা.)-এর এই আদর্শগুলো যুগে যুগে প্রতিটি মানুষের জন্য সেরা অনুপ্রেরণা।
হিজরি ১২ মাসের নামকরণের ইতিহাসহিজরি সন বা ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রতিটি মাসের নামের পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস, আরবদের প্রাচীন সংস্কৃতি ও প্রকৃতির বৈচিত্র্য। চান্দ্রবর্ষের ঘূর্ণনশীল নিয়মের কারণে ঋতু পরিবর্তন হলেও এই নামগুলো এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। একই সঙ্গে মুসলমানদের ধর্মীয় ইবাদত ও শরিয়তের বিভিন্ন বিধান পালনে এই বর্ষপঞ্জির গুরুত্ব অপরিসীম।
মুহাররম
এই মাসে সব ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা হারাম ছিল বলে এর নাম রাখা হয়েছে মুহাররম। মুফাসসিরদের মতে, পবিত্র কোরআনের সূরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে যে চারটি যুদ্ধনিষিদ্ধ পবিত্র মাসের কথা বলা হয়েছে, মুহাররম তার অন্যতম।
সফর
সফর শব্দের অর্থ শূন্য বা খালি। আরবরা যখন যুদ্ধের জন্য মক্কা ছেড়ে চলে যেত, তখন তাদের ঘরবাড়ি একদম জনশূন্য বা খালি হয়ে পড়ত। এই জনমানবহীন শূন্যতা থেকেই মাসটির নাম হয়েছে সফর।
রবিউল আউয়াল
হিজরি ক্যালেন্ডার চূড়ান্ত করার সময় এই মাসটি পড়েছিল চমৎকার বসন্ত ঋতুতে। আরবিতে রবি শব্দের অর্থ বসন্ত। যদিও চান্দ্রবর্ষের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর এই মাসটি একই ঋতুতে থাকে না, তবুও প্রথম বসন্তের মাস হিসেবে এর নাম রবিউল আউয়ালই রয়ে গেছে।
রবিউস সানি
রবিউল আউয়ালের মতো এই মাসটিও তৎকালীন সময়ে বসন্ত ঋতুতেই পড়েছিল। রবিউল আউয়ালের ঠিক পর পরই এর অবস্থান হওয়ায় একে রবিউস সানি বা দ্বিতীয় বসন্তের মাস বলা হয়।
জমাদিউল আউয়াল
নাম নির্ধারণের সময় এই মাসটি এসেছিল তীব্র শীতের মৌসুমে। সে সময় শীতের প্রকোপে পানি জমে বরফ হয়ে যেত। আরবি জামাদ বা জুমাদা শব্দের অর্থ জমে যাওয়া। সেই জমাট বাঁধা শীতের প্রথম মাস হিসেবে এর এই নামকরণ।
জমাদিউস সানি
জমাদিউল আউয়ালের মতো এটিও শীতেরই মাস এবং এর ঠিক পরেই এর অবস্থান। শীতের তীব্রতায় পানি জমে যাওয়ার দ্বিতীয় মাস হিসেবে একে জমাদিউস সানি বলা হয়।
রজব
এটিও একটি যুদ্ধনিষিদ্ধ পবিত্র মাস। প্রাচীন আরবরা এই মাসে যুদ্ধের সব ধরনের প্রস্তুতি বন্ধ রাখত, এমনকি বল্লমের মাথা থেকে ধারালো ফলা বা নাল খুলে রাখত যাতে কেউ যুদ্ধ করতে না পারে। এই সম্মান ও যুদ্ধবিরতি থেকেই এর নাম রাখা হয়েছে রজব।
শাবান
এই মাসের নামকরণের পেছনে দুটি মত রয়েছে। কেউ বলেন, তীব্র গরমে পানির সন্ধানে আরবরা এই মাসে চারিদিকে ছড়িয়ে বা বিভক্ত হয়ে পড়ত। আবার কারো মতে, পবিত্র রজব মাসে যুদ্ধ বন্ধ থাকার পর এই মাস শুরু হতেই আরবরা আবার যুদ্ধের জন্য বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে মাঠে নামত। এই ছড়িয়ে পড়া বা বিভক্ত হওয়া থেকেই নাম হয়েছে শাবান।
রমজান
রমজান শব্দটি এসেছে রমদা থেকে, যার অর্থ প্রচণ্ড উত্তাপ বা তীব্র গরম।মাসগুলোর নাম নির্ধারণের সময় এই মাসটি প্রচণ্ড গরমের মধ্যে পড়েছিল। ইসলাম আগমনের পর এই পবিত্র মাসেই মুসলমানদের জন্য সিয়াম বা রোজা পালন ফরজ করা হয়।
শাওয়াল
মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর এই মাসেই উদযাপিত হয়। আরবরা লক্ষ্য করেছিল, এই সময়ে উটের দুধ শুকিয়ে যেত এবং ওজনে কম হতো। উটের দুধ কমে যাওয়া বা শুকিয়ে যাওয়ার এই অবস্থাকে আরবিতে শওলান বলা হতো, যা থেকে পরবর্তীতে শাওয়াল নামের উৎপত্তি।
জিলকদ
এটি ইসলামের চার পবিত্র ও যুদ্ধনিষিদ্ধ মাসের প্রথম মাস। এই মাসে আরবরা যুদ্ধবিগ্রহ, ভ্রমণ ও দূরদূরান্তে যাতায়াত বন্ধ করে ঘরে বসে থাকত বা শান্ত হয়ে থিতু হতো। এই বসে থাকা বা যুদ্ধ থেকে বিরত থাকা থেকেই মাসটির নাম রাখা হয় জিলকদ।
জিলহজ
ইসলামপূর্ব যুগেও আরবরা এই মাসে পবিত্র কাবা শরিফ জিয়ারত বা হজ করতে যেত। হজ পালনের এই মাসটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও যুদ্ধনিষিদ্ধ। হজের মাস হওয়ার কারণেই এর নাম রাখা হয়েছে জিলহজ।
ধর্মীয় বিষয়ে হিজরি সনের গুরুত্ব
ইসলামি শরিয়তের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিধান ও হুকুম-আহকাম হিজরি সনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। বিবাহবিচ্ছেদের পর নারীদের ইদ্দত পালনের সময়সীমা এবং স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা নারীর ইদ্দতের দিন গণনা করা হয় এই হিজরি বা চান্দ্রবর্ষের হিসাবে। এছাড়া ধনীদের ওপর জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের এক বছর পূর্ণ হওয়ার হিসাবটিও হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী করতে হয়। এর পাশাপাশি পবিত্র রমজানের রোজা, হজের নির্দিষ্ট সময়, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা এবং পবিত্র আশুরার মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দিন ও উৎসবগুলো নির্ধারণে হিজরি সনই একমাত্র ভিত্তি।
নতুন গিলাফে সজ্জিত পবিত্র কাবানতুন হিজরি বছরের শুরুতেই পবিত্র কাবা শরীফে পরানো হয়েছে নতুন গিলাফ। প্রতি বছরের মতো এবারও এক রাজকীয় ও মর্যাদাপূর্ণ আবহে এই বার্ষিক কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছে, যা শত শত বছর ধরে চলে আসা ইসলামি ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পবিত্র মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববী বিষয়ক সাধারণ কর্তৃপক্ষ এবং কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্সের একদল বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত সৌদি কারিগর এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। শুরুতে গিলাফে থাকা সোনার প্রলেপযুক্ত ও রুপার তৈরি বিভিন্ন ক্যালিগ্রাফি, নকশা, লণ্ঠন আকৃতির অলঙ্করণ এবং কাবা শরীফের দরজার পর্দাটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খুলে ফেলা হয়। এরপর পুরনো গিলাফটি নামিয়ে কমপ্লেক্স থেকে আনা নতুন গিলাফটি নিখুঁতভাবে পরানোর কাজ শুরু হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সর্বোচ্চ মান ও নিখুঁত সুরক্ষা নিশ্চিত করে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা হয়েছে।
কাবা শরীফের গিলাফ পরিবর্তন শুধু একটি কাপড় বদলে ফেলার সাধারণ কোনো প্রক্রিয়া নয়। এটি মূলত বছরের পর বছর ধরে চলা দীর্ঘ পরিকল্পনা এবং কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্সের কারিগরদের নিরলস পরিশ্রমের ফসল। আল্লাহর ঘরের মর্যাদার সঙ্গে সংগতি রেখে এখানকার প্রতিটি অংশ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়।
এই অনন্য শিল্পকর্মটি তৈরিতে বিপুল পরিমাণ উচ্চমানের কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৮২৫ কেজি খাঁটি প্রাকৃতিক সিল্ক, যা গিলাফের বাইরের অংশ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বাইরের মূল অবয়বের জন্য ৪৭ থান কালো সিল্ক এবং ভেতরের লাইনিং বা আস্তরের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ৪০০ কেজি খাঁটি তুলা।
গিলাফের মূল আকর্ষণ হলো এর সোনা ও রুপার জমকালো ক্যালিগ্রাফি। অত্যন্ত সুক্ষ্ম এমব্রয়ডারির কাজের জন্য এতে প্রায় ৬০ কেজি খাঁটি রুপা ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপশি পবিত্র কোরআনের আয়াত এবং অন্যান্য নকশা ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে ১২ কেজি সোনা জড়ানো রুপার সুতো।
তবে এই কাঁচামালগুলো গিলাফে রূপ নেওয়ার আগে কমপ্লেক্সের বিশেষ পরীক্ষাগারে দীর্ঘ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। জলবায়ুর বিভিন্ন প্রতিকূলতা ও আবহাওয়ার পরিবর্তন সহ্য করে এই গিলাফ যেন পুরো এক বছর মান ধরে রাখতে পারে, তা নিশ্চিত করতেই সিল্কের সুতো ও কাপড়ের স্থায়িত্ব পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষাগারে উত্তীর্ণ হওয়ার পর কাপড়টিকে একটি জীবন্ত ক্যানভাসে রূপ দেওয়া হয়। কাপড়ের ওপর প্রথমে কোরআনের আয়াত ও ইসলামিক নকশার আউটলাইন বা স্কেচ আঁকা হয়। এরপর শুরু হয় সবচেয়ে সুক্ষ্ম ও ধৈর্যের কাজ-এমব্রয়ডারি। অত্যন্ত দক্ষ সৌদি কারিগরেরা গভীর মনোযোগ ও ধৈর্যের সঙ্গে সোনা ও রুপার সুতো দিয়ে এই নকশাগুলো ফুটিয়ে তোলেন।
মেশিনের পাশাপাশি এই গিলাফ তৈরিতে বংশপরম্পরায় চলে আসা ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের ছোঁয়াও রয়েছে। কিছু বিশেষ অংশ ও জটিল নকশা শুধুমাত্র অভিজ্ঞ কারিগরদের হাতেই বোনা হয়, যা গিলাফের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত রূপ ধরে রাখতে সাহায্য করে। সব কটি অংশ আলাদাভাবে তৈরির পর শুরু হয় চূড়ান্ত সংযোজন বা জোড়া দেওয়ার কাজ। পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার পর গিলাফটি কঠোর নিরাপত্তায় মসজিদুল হারামে নিয়ে আসা হয়।
আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাচীন ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে এই গিলাফ তৈরির প্রক্রিয়াটি মোট সাতটি ধাপে সম্পন্ন হয়। ধাপগুলো হলো- সুতো রাঙানো বা ডাইং, মেশিনে কাপড় বোনা, ল্যাব টেস্ট, প্রিন্টিং বা ক্যানভাস প্রস্তুত, এমব্রয়ডারি, হাতে কাপড় বোনা এবং চূড়ান্ত সংযোজন।
বিগত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সৌদি আরব অত্যন্ত ভক্তি ও যত্নের সঙ্গে পবিত্র দুই মসজিদের খেদমত হিসেবে কাবা শরিফের এই গিলাফ পরিবর্তনের কাজটি করে আসছে। প্রতি বছর হিজরি নববর্ষের শুরুতে কাবার গিলাফ পরিবর্তনের এই মহিমান্বিত দৃশ্য দেখার জন্য বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলমান অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন, যা মুসলিম উম্মাহর গভীর আবেগ ও ঐতিহ্যের প্রতীক।