
ধর্ম এবং যুক্তির ভিতর
একটা দ্বন্দ্ব চলেছে। কখনো এরা সমন্বয়ে পৌঁছায়, কখনো নতুন করে দ্বন্দ্ব
শুরু হয়। এই ঘাত-প্রতিঘাতের একটা বাইরের রূপ আছে, একটা ভিতরের রূপ। সংসারে
কিছু মানুষ ধর্র্মবিশ্বাসী, কেউ বা ধর্মকে সন্দেহের চোখে দেখেন। এটা
বিভেদের বাহ্যরূপ। মনের মধ্যে ধর্মবিশ্বাস ও যুক্তিবাদের যে বিতর্ক দেখা
দেয়, সংশয়ের ঝড় ওঠে, সেটা ভিতরের রূপ। কারও ক্ষেত্রে ঈশ্বরে বিশ্বাস জয়ী
হয়েছে, কেউ হন নিরীশ্বরবাদী। দুটোই বিশ্বাসের এপিঠ-ওপিঠ। কিন্তু বিশ্বাসেরই
নয়, দ্বন্দ্বেরও মূল্য আছে। মনের ভেতর যে সংশয় আমাদের অস্থির করে, তারও
নিজস্ব মহত্ত্ব আছে। যাঁরা চিন্তাশীল ও সূহ্মচেতনাসম্পন্ন, তাঁদের অনেকেরই
মানসলোক একটা তীব্র দ্বন্দ্বের দ্বারা সমৃদ্ধ। বিশ্বাস ও সংশয় দুয়েরই মূল্য
আছে। এদের কী করে মেলানো যায়, সেটাই সমস্যা।
বিষয়টা স্পষ্ট করবার জন্য
দুয়েকটি উদাহরণই যথেষ্ট। বার্টান্ড রাসেল এযুগের একজন প্রখ্যাত নাস্তিক বলে
পরিচিত। কিন্তু কী গভীর বেদনায়, কত তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্বে, সেই নাস্তিক্য
বিধৃত, আমরা অনেকেই সে কথা মনে রাখি না। ১৯১৬ সালের ২৩শে অক্টোবরের একান্ত
ব্যক্তিগত একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন–ঞযব পবহঃৎব ড়ভ সব রং ধষধিুং ধহফ
বঃবৎহধষষু ধ ঃবৎৎরনষব ঢ়ধরহ...ধ ংবধৎপযরহম ভড়ৎ ংড়সবঃযরহম নবুড়হফ যিধঃ ঃযব
ড়িৎষফ পড়হঃধরহং, ংড়সবঃযরহম ঃৎধহংভরমঁৎবফ ধহফ রহভরহরঃব-ঃযব নবধঃরভরপ
ারংরড়হ-এড়ফ. ও ফড় হড়ঃ ভরহফ রঃ, ও ফড় হড়ঃ ঃযরহশ রঃ রং ঃড় নব ভড়ঁহফ....’
ঈশ্বরের অনস্তিত্বের এই ঘোষণা এমন আর্তনাদের ভাষায় এখানে ধ্বনিত হয়েছে যে,
সিদ্ধান্তের চেয়েও তার পিছনে যে বেদনা আছে সেটাই স্বরণীয় হয়ে উঠেছে। এ কোনো
আত্মসন্তুষ্ট নিরীশ্বরবাদ নয়। আবার নিশ্চিত নিঃসংশয় ঈশ্বরবাদ সম্বন্ধে
আমাদের সাবধান করে দিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতনের মন্দির ভাষণ
থেকে কয়েকটি বাক্য শোনা যাক। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন : ‘সংশয়ের যে বেদনা সেও যে
ভালো। কিন্তু যে প্রকাণ্ড জড়তার কুণ্ডলীর পাকে সংশয়কেও আবৃত করে থাকে তার
হাত থেকে যেন মুক্তিলাভ করি’। রাসেল অথবা রবীন্দ্রনাথ, কে কখন কোন
সিদ্ধান্তে গিয়ে পৌঁছেছিলেন, সেটাই একমাত্র উল্লেখযোগ্য ঘটনা নয়। চেতনার
ভিতরে যে দ্বন্দ্ব তাঁরা আজীবন বহন করেছেন, তার তাৎপর্য গভীর। সিদ্ধান্তের
চেয়েও জিজ্ঞাসার গুরুত্ব বেশি, প্রশ্নই চেতনাকে দেয় গতি। প্রশ্নের গভীরতায়
বিশ্বাসও গভীরতা পায়। ধর্ম ও যুক্তির ভিতর যে দ্বন্দ্ব তার আরেকটি
বৈশিষ্ট্যের কথা এরপর উল্লেখ করা প্রয়োজন। দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে ধর্ম ও
যুক্তি দুয়েরই চরিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু কোনোটিরই বিনাশের সম্ভবনা
দেখা যাচ্ছে না। দ্বন্দ্ব দুই রকমের হয়। একরকমের দ্বন্দ্ব বিনাশাত্মক;
অর্থাৎ একপক্ষের সম্পূর্ণ বিনাশই সেখানে লক্ষ্য। আরও একরকমের দ্বন্দ্ব আছে।
সেখানে ঘাত-প্রতিঘাতের ভিতর দিয়ে দুই পক্ষের সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটে,
কিন্তু কোনো পক্ষই বিনষ্ট হয় না। বরং দুই পক্ষই সম্ভবত দ্বন্দ্বের ভিতর
দিয়ে সমৃদ্ধ হয়। এই রকমের দ্বন্দ্বকে বলা যেতে পারে সমন্বয়মুখী। কোনো বিশেষ
দ্বন্দ্বকে আমরা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি সেটা জরুরি প্রশ্ন। কারণ সমগ্র
দৃশ্যপটই দৃষ্টিকোণের ওপর নির্ভর করছে।
পুরানো কমিউনিস্টশাসিত সমাজেও
ধর্মের প্রতি নতুন করে আগ্রহ দেখা দিয়েছে। পৃথিবী থেকে ধর্মবিশ্বাসীরা দূর
হয়ে যাবেন, এমন ধরনের নাস্তিকের স্বর্গ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা
নেই। যুক্তিবাদীরাও থেকেই যাবেন। এঁদের সবাইকে পাশাপাশি বাস করতে হবে।
সহাবস্থান যেখানে অনিবার্য সেখানে পরস্পরকে বোঝার একটা ঐকান্তিক প্রয়াস
বাঞ্ছনীয়, এমনকি আবশ্যক। শ্রদ্ধাহীন সহবাসের মতো বিড়ম্বনা কমই আছে। মূল
প্রশ্ন নিয়ে তর্ক চলুক, কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা রক্ষা করা চাই। তা নইলে
অনর্থক অশান্তি বাড়ে, তর্কটাও নিষ্ফল হয়।
এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়মে
বাঁধা। সবকিছুই চলমান আর বিশ্বের আংশস্বরূপ ক্ষুদ্র ও বৃহৎ কিছুই নিয়মের
বাইরে চলে না। সৌরমণ্ডলে সূর্যসহ পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহ যে
পরস্পর সম্পর্কে যুক্ত, এই যোগের সূত্রগুলো যে গণিতের ভাষায় যথাযথভাবে
প্রকাশ করা যায়, অযুত-নিয়ত বছর ধরে সূর্য প্রদক্ষিণের পথে এই নিয়মই যে
ঘোষিত হয়ে চলেছে, এই আবিষ্কার মানুষের চেতনায় একটা দিব্য বিস্ময়ের মতো
এসেছিল। সৌরমণ্ডলের যে ছবি বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিতে ধরা পড়ল,
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুর অভ্যন্তরেও দেখা গেল যেন তারই প্রতিচ্ছবি। আবার
সৌরমণ্ডলও যে বিশ্বজগতের অীত ক্ষুদ্র অংশ, সেই মহাবিশ্বে আছে নিয়মের
রাজত্বের সীমাহীন সম্প্রসারণ।
এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির সঙ্গে সুর মিলিয়ে
পাওয়া গেছে ঈশ্বর সম্বন্ধে একটা ধারণা। অতি প্রকাণ্ড, অতি সূহ্ম¥ এক
যন্ত্রের মতো চলেছে এই মহাবিশ্ব, যার ক্ষুদ্র-বৃহৎ প্রতিটি অঙ্গ যেন এক
বিশ্বকর্মার সৃষ্টি। মানুষের তৈরি কোনো নিখুঁত যন্ত্রের মতোই এই
বিশ্বপ্রকৃতি নিয়মের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তবে প্রভেদ এইখানে যে
জ্যোতির্মণ্ডলের প্রকাণ্ডতায়, পরমাণুর ক্ষুদ্রতায়, তার সর্বব্যাপী গূঢ়
সামঞ্জস্যের অব্যর্থ নৈপুণ্যে, মহাবিশ্ব এক অতুলনীয় পরমাশ্চর্য সৃষ্টি।
সৃষ্টির ভিতরই প্রচ্ছন্ন আছে স্রষ্টার পরিচয়।
ধর্ম নিয়ে একটি সংলাপ
(উরধষড়মঁবং ঈড়হপবৎহরহম ঘধঃঁৎধষ জবষরমরড়হ) রচনা করেছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক
হিউম। সেই সংলাপের অংশবিশেষ এইরকম : ‘খড়ড়শ ৎড়ঁহফ ঃযব ড়িৎষফ, পড়হঃবসঢ়ষধঃব
ঃযব যিড়ষব ধহফ বাবৎু ঢ়ধৎঃ ড়ভ রঃ; ুড়ঁ রিষষ ভরহফ রঃ ঃড় নব হড়ঃযরহম নঁঃ ড়হব
মৎবধঃ সধপযরহব, ংঁনফরারফবফ রহঃড় ধহ রহভরহরঃব হঁসনবৎ ড়ভ ষবংংবৎ সধপযরহবং....
অষষ ঃযবংব াধৎরড়ঁং সধপযরহবং, ধহফ বাবহ ঃযবরৎ সড়ংঃ সরহঁঃব ঢ়ধৎঃং, ধৎব
ধফলঁংঃবফ ঃড় বধপয ড়ঃযবৎ, রিঃয ধহ ধপপঁৎধপু যিরপয ৎধারংযবং রহঃড় ধফসরৎধঃরড়হ
ধষষ সবহ যিড় যধাব বাবৎ পড়হঃবসঢ়ষধঃবফ ঃযবস..... ঃযব অঁঃযড়ৎ ড়ভ হধঃঁৎব রং
ংড়সবযিধঃ ংরসরষধৎ ঃড় ঃযব সরহফ ড়ভ সধহ, ঃযড়ঁমযঃ ঢ়ড়ংংবংংবফ ড়ভ সঁপয ষধৎমবৎ
ভধপঁষঃরবং, ঢ়ৎড়ঢ়ড়ৎঃরড়হধষ ঃড় ঃযব মৎধহফবঁৎ ড়ভ ঃযব ড়িৎশ যিরপয যব যধং
বীবপঁঃবফ.’ এইভাবে সম্পূর্ণ যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঈশ্বর অস্তিত্বের
সপক্ষে একটা যুক্তি উপস্থিত করা হয়েছে। যুক্তিটা মূলত এই– মহাবিশ্ব
যন্ত্রের মতো চলেছে। এর অভ্যন্তরে এতই সামঞ্জস্য, অগণিত অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে
এতই সূহ্ম¥ যোগাযোগ ও পরস্পর-নির্ভরতা, যে এ সবের পেছনে একটা তুলনাতীত
শক্তিসম্পন্ন বুদ্ধি ও সৃষ্টিকৌশল নেই-এমন ভাবা যায় না। আল্লাই স্রষ্টা,
অতি সূহ্ম¥ নিয়মের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এই জগতের স্রষ্টা।
২
একরকমের
সুখ আছে যা ইন্দ্রিয়নির্ভর। জৈবসুখের এটাই ভিত্তিভূমি ‘যাবজ্জীবেৎ সুখং
জীবেৎ’ যাঁরা বলেন, তাঁদের কথা শুরু হয় ঐ ভিত্তি থেকে। কিছু অবস্থা
জৈবসুখের অনুকূল, কিছু প্রতিকূল। প্রতিটি ব্যক্তি স্বভাবত এমন চেষ্টাই করে
থাকে, যাতে অবস্থা যথাসম্ভব নিজ সুখের অনুকূল হয়। প্রোয়োবাদী দর্শনে
মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্বন্ধে এই রকম একটা ধারণা প্রচলিত আছে। এই মতবাদ কি
মানুষকে নির্ভরযোগ্য সুখের লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে? প্রেয় এবং শ্রেয়র
পারস্পরিক সম্বন্ধ নিয়ে একটা পুরানো তর্ক এখানে উঠে আসে।
প্রেয়োবাদের
সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের পর মূল সমালোচনা যেটা শোনা যায় তা হলো এই যে, সুখেরও
প্রকারভেদ আছে। নানা রকমের সুখের ভিতর গুণগত তারতম্য আছে, কাজেই তাদের
মধ্যে তুলনামূলক বিচার করে সর্বাধিক সুখ নির্ণয় করা কঠিন। আমাদের কিন্তু
মনে হয় যে, গুণবিভাগের তাত্ত্বিক আলোচনায় সরাসরি না গিয়ে বরং সংসারের
বাজারটা প্রথমে একবার ঘুরে এলে এ-বিষয়ে সিদ্ধান্ত সম্ভবত আরও একটু
নির্ভরযোগ্য হবে। শেষ অবধি বিচার অনিবার্যভাবে সূহ্ম¥ হয়ে উঠবে। তবে ভূমির
স্পর্শ থেকে আরম্ভ করাই ভালো।
প্রেয়োবাদী প্রত্যয় মেনে নিলে একটা মূল
সমস্যা এইরকম। প্রতি ব্যক্তি নিজ নিজ সুখ বৃদ্ধির চেষ্টায় নিযুক্ত। কিন্তু
এক ব্যক্তির সুখ বৃদ্ধির চেষ্টায় অন্য ব্যক্তির সুখের হানি ঘটতে পারে।
সামগ্রিকভাবে সমাজের সুখ বৃদ্ধিই সুনীতির উদ্দেশ্য। কোনো বিশেষ মানুষের নয়,
বরং সকল মানুষের সুখের যোগফল বৃদ্ধি করাই সমাজের কর্তব্য। যেখানে প্রতিটি
মানুষ নিজের সুখের জন্যই ব্যস্ত, সেখানে সকলের সুখের ব্যবস্থা কী করে হবে?
এই প্রশ্নের উত্তরে কয়েকটি কথা পরপর বলা সম্ভব।
মানুষের অনেক কাজই
ব্যক্তিগত স্বার্থে হয়ে থাকে। এইরকম সব কাজই অপরের স্বার্থের পক্ষে ক্ষতিকর
এমন নয়। পারস্পরিক স্বার্থে আবদ্ধ হয়ে আমরা এমন অনেক কাজ করি, যেসব কাজ
সকলের পক্ষেই কম-বেশি লাভজনক। যেমন বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতা প্রত্যেকেই
নিজ নিজ স্বার্থের অনুসরণ করে। তবু এই ক্রয়-বিক্রয়ের ভিতর দিয়ে সকলেরই
কম-বেশি স্বার্থসিদ্ধি হয়। উভয়পক্ষের স্বার্থসিদ্ধি সম্ভব বলেই উভয়পক্ষই
বাজারে উপস্থিত হয়। অবশ্য বিক্রেতা অন্যায়ভাবে ক্রেতাকে ঠকাতে পারে, তেলে
ভেজাল তার এক উদাহরণ। এইরকম অন্যায় ঠেকানোর জন্য রাষ্ট্রকে আইন তৈরি করতে
হয়, অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণও আবশ্যক হযে ওঠে। আইন এবং অন্যান্য
প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভিতর দিয়ে সমাজে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা
চাই, যে পরিবেশের ভিতর বিভিন্ন মানুষের স্বার্থসন্ধানী চেষ্টা মোটের ওপর
ক্ষতিকর না হয়ে হিতকর হবে। স্বার্থবুদ্ধিকে উপযুক্ত আইন ও প্রতিষ্ঠান দিয়ে
ঘিরে দিতে পারলেই আমরা বাঞ্ছিত সমাজের যথাসম্ভব কাছাকাছি চলে যাব। এককালে
প্রেয়োবাদীরা এইরকম বলতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু এমন আইন ও প্রতিষ্ঠান কি
রচনা করা সম্ভব, যাতে ছিদ্র নেই, পাপের প্রবেশপথ নেই? আইনের ভিতরও ক্রটি
থেকেই যায়। তাছাড়া আইনের উদ্দেশ্য ভালো হলেও স্বার্থসন্ধানী মানুষ আইন
ফাঁকি দেওয়ার নানা কৌশল উদ্ভাবন করে। সমস্যাটা আসলে আরও গভীর। ফাঁকির সব পথ
যদি বন্ধ করা যেত তবু কিন্তু সেটা বাঞ্ছনীয় অবস্থা হতো না। নিñদ্র আইন এবং
আইনের প্রহরী দিয়ে বেষ্টিত সেই সমাজ হয়ে উঠত একটা বৃহৎ কারাগার।
যদি
স্বার্থবুদ্ধি অথবা বাইরের নিয়ম ও প্রতিষ্ঠান অথবা এ দুই-এর কোনো প্রকার
সমাবন্ধের দ্বারা মানুষের দুঃখ নিবারণ সম্ভব হতো, তবে ধর্মের প্রয়োজন সহজেই
অস্বীকার করা যেত। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। বাইরের কোনো নিয়ম ও ব্যবস্থাই
বিবেক ও সদিচ্ছার বিকল্প হতে পারে না। এখানেই অনেকে ধর্মের প্রয়োজন দেখেন।
স্বার্থান্বেষী মানুষকে কর্তব্যবোধে ও পরার্থচিন্তায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য
ধর্মের একটা ভূমিকা আছে, এইরকম অনেকে বলেন। ধর্মের সপক্ষে এটাই সরল যুক্তি।
মানুষের সমাজকে একসঙ্গে ধরে রাখার জন্য স্বার্থ অথবা ব্যক্তিগত সুখের
অন্বেষণের অধিক কিছু মূল্যবোধ আবশ্যক। ধর্ম এই সমাজধারক মূল্যবোধের আধার।
এমন
অনেক যুক্তিবাদী আছেন, যাঁরা এইরকম মূল্যবোধের প্রয়োজন অস্বীকার করবেন না,
কিন্তু এজন্য ধর্মের দ্বারস্থ হতেও সম্মত হবেন না। শুধু ক্ষুদ্র
ব্যক্তিস্বার্থের অন্বেষণ নয়, অন্যের প্রতি সহানুভূতি, অপরের দুঃখে
দুঃখবোধ– এসবও মানুষের স্বাভাবিক বৃত্তি। এই পরার্থমুখী বৃত্তির বিকাশ ও
প্রয়োগের ভিতর দিয়ে একরকমের গভীর সুখ অনুভব করা যায়। স্বার্থপরতাই সুখলাভের
শ্রেষ্ঠ পথ নয়। ভাষান্তরে বলা যেতে পারে, স্বার্থেরও স্তরভেদ আছে। উচ্চতর
সুখের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে এক উচ্চতর স্বার্থ। যুক্তিবাদী এই পর্যন্ত
স্বীকার করবেন। কিন্তু তিনি হয়তো বলবেন যে, যুক্তিই আমাদের এই উচ্চতর
স্বার্থের পথে চালিত করতে পারে। এজন্য ধর্মের পরিভাষা নিষ্প্রয়োজন।
৩
মানুষের
ধর্ম এই, সে নিজেকে বারবার অতিক্রম করে যায়। এই অতিক্রমণের ব্যাপারে
যুক্তির ভূমিকা যে সহায়ক হয়, একথা স্বীকার্য। কিন্তু সেই সঙ্গে অন্য একটা
কথাও আছে। যুক্তির একক শক্তিতে মানুষের বিশ্ববোধ ও মূল্যবোধের উল্লম্ফন ঘটে
না। অন্য কোনো পথে ব্যক্তির চেতনায় নতুন অনুভূতি ও অর্šÍদৃষ্টির উদয় ঘটে।
যুক্তি নিজস্ব বিচার পদ্ধতিতে তাকে শনাক্ত করে, মূল্য ও স্থায়িত্ব দেয়।
এমনকি গণিতও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও উচ্চতর সৃজনশীল কাজে এইরকম লক্ষ করা গেছে।
শিল্প ও ধর্মের বেলায় এটা আরও স্পষ্ট। স্বজ্ঞা ও যুক্তির
যুগ্ম-ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পথে এইভাবে যে ব্যাপারটা ঘটে তার পরিচয় দিতে
গিয়ে পরিভাষা নিয়ে সমস্যা দেখা দেওয়া আশ্চর্য নয়, তর্কেরও তাই শেষ নেই।
ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াটা বুঝে নেওয়াই আসলে জরুরি। যুক্তির ভূমিকার গুরুত্ব
আছে। স্বজ্ঞার নাম নিয়ে অনেক মিথ্যা দাবি ও অন্ধসংস্কার এসে পড়ে। যুক্তি
সেখানে প্রয়োজনীয় দ্বাররক্ষী আবার আলোচনার মূল্যবান মাধ্যম। কিন্তু স্বজ্ঞা
থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যুক্তি সত্যের পথে বেশি দূর আরোহণ করতে পারে না।
সুখ-দুঃখের
প্রশ্ন নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, সেখান থেকে আমরা সুনীতি-দুর্নীতির
বিষয় ধরে কিছুদূর এগিয়ে গিয়েছিলাম। গোড়ার কথায় আবার ফিরে আসা যাক। চার্বাক ও
বুদ্ধের ভিতর পার্থক্য অনেক। বুদ্ধ দুঃখের কারণ খুঁজেছিলেন মানবপ্রকৃতিতে
এবং বিশ্বপ্রকৃতির কিছু মৌল বৈশিষ্ট্যে। চার্বাকের মতে সুখের চাবি আছে
বাইরের সম্পদে ও পরিস্থিতিতে। এ যুগের প্রেয়োবাদীরা জগতে সুখের বৃদ্ধি চান।
চার্বাকের সঙ্গে এঁদের কিছুটা মিল আছে। মার্কসবাদীরা ধষরবহধঃরড়হ অর্থাৎ
‘পারক্য’ বা বিচ্ছিন্নতাবোধের কথা বলেন। দুঃখের আলোচনায় এইখানে অন্য একটা
মাত্রা যোগ হয়েছে। সমাধানের চিন্তায় তবু পুরানো প্রশ্নটাই থেকে গেছে।
মার্কসীয় ধারণায় বিচ্ছিন্নতাবোধের মূল কারণগুলো পাওয়া যাবে মানবসমাজের
বাহ্য অবস্থায়। ঞড়ধিৎফং গধৎী পুস্তকে প্রবীণ জননেতা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ
যথার্থই বলেছেন : ‘গধৎী ঃযড়ঁমযঃ ঃযব ৎড়ড়ঃ ড়ভ ধষরবহধঃরড়হ ষধু হড়ঃ রহ ঃযব
হধঃঁৎব ড়ভ সধহ, হড়ঃ রহ যরং রফবধং, নঁঃ রহ ঃযব পড়হপৎবঃব পড়হফরঃরড়হং ড়ভ
ংড়পরধষ ষরভব. ঞযব পড়ৎড়ষষধৎু ভড়ষষড়ংি ঃযধঃ, নু পযধহমরহম ংড়পরধষ ষরভব রহ ধহ
ধঢ়ঢ়ৎড়ঢ়ৎরধঃব ধিু, সধহ পধহ ড়াবৎপড়সব ধষরবহধঃরড়হ.’ মার্কস দুঃখের মূল
খোঁজেননি মানবপ্রকৃতিতে অথবা বিশ্বপ্রকৃতির কোনো বৈশিষ্ট্যে। দুঃখ ও
বিচ্ছিন্নতাবোধের কারণ নিহিত আছে বাহ্য সামাজিক অবস্থায়। কাজেই বহু
জড়বাদীদের এই বিশ্বাস যে, সামাজিক ব্যবস্থার যথাযোগ্য পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে
পৃথিবীতে সুখের প্রতিষ্ঠা ও বিচ্ছিন্নতাবোধের দূরীকরণ সম্ভব। এই বিশ্বাসকে
কিন্তু নিত্যসত্য বলে মেনে নেওয়া যায় না। দারিদ্র্য যে অনেক দুঃখের কারণ এ
বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু দারিদ্র্য দূর হলেও দুঃখ দূর হলো না। সমাজে বহু
অন্যায় ব্যবস্থা আছে, যার অবসান আবশ্যক। দুঃখ দূর হোক বা না হোক, অন্যায়কে
সমর্থন করা যায় না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন এ যুগের এক প্রধান কীর্তি,
এদেশের এক প্রধান কর্তব্য। এসবই স্বীকার্য। কিন্তু তারপরও একথাটা মেনে
নেওয়াই ভালো যে, দুঃখের ও বিচ্ছিন্নতাবোধের কোনো সমাজসর্বস্ব ব্যাখ্যাই
যথেষ্ট নয়। সমাজের কোনো প্রকার পরিবর্তনেই দুঃখের সমস্ত কারণ দূর করা সম্ভব
নয়। এ কথাটা না বোঝা অবধি বিশ্বপ্রকৃতিতে মানুষের অবস্থাটা ঠিক বোঝা হয়ে
ওঠে না। ধর্মান্ধতা থেকে যেমন পারলৌকিক মোহের সৃষ্টি হয়, দুঃখনাশের
সমাজসর্বস্ব পথের প্রতিশ্রুতিও তেমনি লৌকিক মোহের কারণ হয়ে ওঠে। একটি মোহ
অন্যটিকে ব্যঙ্গ করে চলেছে। লৌকিক মোহ থেকে কম নির্দয়তার সৃষ্টি হয়নি।
মানুষের
সুখ-দুঃখের অনেকটা প্রেম, জরা ও মৃত্যুতে আশ্রিত। সমাজের কোনো পরিবর্তনের
ফলেই মানুষকে অমর করা যাবে না, গৃহে গৃহে প্রিয়জনের মৃত্যুকে রোধ করাও সম্ভ
হবে না। মানুষের আয়ু অবশ্য আরও দীর্ঘ করা যেতে পারে। কিন্তু যেখানে প্রেম
নেই, সেখানে আয়ুর দীর্ঘতায় সান্ত্বনা সামান্যই। জরা ও মৃত্যু আছে শুধু
দেহেরই নয়, ভালোবাসারও। একদিন যে ভালোবাসা ছিল উঞ্চ ও স্বতঃস্ফূর্ত, ক্রমে
সে তার উঞ্চতা হারায়; অভ্যস্ত প্রিয় সম্ভাষণ হয়ে ওঠে যান্ত্রিক, সততশূন্য ও
অর্থহীন। দুটি প্রেমকে জরা গ্রাস করে না একই গতিতে, একটি ক্ষয়িঞ্চু হৃদয়ের
অনিবার্য শীতলতার সাক্ষী হয়ে থাকে অন্য এক অসহায় ও বেদনাবিদ্ধ ভালোবাসা।
মানুষের অনেক কঠিনতা ও অনেক কান্নারই মূল এইখানে।
জরা ও মৃত্যুর বাইরেও
ব্যর্থতার অন্ত নেই। মানুষের চাওয়া ও পাওয়ার মধ্যে কোনো বাহ্য কৌশলেই
অসামঞ্জস্য দূর করা যায় না। আমরা প্রত্যেকেই যেমন অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে
চাই, তেমনি আকাক্সক্ষা করি নিজের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের মূল্যের স্বীকৃতি।
সেই মূল্য সম্বন্ধে নিজের বিচার আর অপরের বিচারের ভিতর মিল হয় না। যদি-বা
স্বীকৃতি আসে, তবু কতবার দেখা যায় তারও পিছনে আছে স্বার্থ। ব্যক্তির সঙ্গে
ব্যক্তির যোগ অপূর্ণ থেকে যায়। এসব কিছুই ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, প্রকৃতির
এইরকমই নিয়ম। আমরা এসব জানি আর মনে মনে সাবধান হয়ে উঠি। কিন্তু সাবধানতায়
অন্তরে অন্তরে আমরা আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ি। আধুনিক মনের এক প্রধান যন্ত্রণা–
একাকিত্ব। যুক্তি দিয়ে একে ঠেকানো যায় না, বাইরের সাফল্য দিয়েও নয়। আমরা
তাই বিস্মিত হই না, যখন রাসেলের আত্মজীবনীতে পাঠ করি এই স্বীকারোক্তি :
‘অষধিুং ঃযব ংবপঢ়ঃরপধষ রহঃবষষবপঃ, যিবহ ও যধাব সড়ংঃ রিংযবফ রঃ ংরষবহঃ, যধং
যিরংঢ়বৎবফ ফড়ঁনঃং ঃড় সব. টহফবৎষুরহম ধষষ ড়পপঁঢ়ধঃরড়হং ধহফ ধষষ ঢ়ষবধংঁৎবং ও
যধাব ভবষঃ ংরহপব বধৎষু ুড়ঁঃয ঃযব ঢ়ধরহ ড়ভ ংড়ষরঃঁফব.’ যুক্তি কিংবা সতর্ক
বুদ্ধির অভাবে নয়, বরং তার প্রভাবেই, রাসেল নিঃসংগতায় আক্রান্ত হয়েছেন
প্রথম যৌবন থেকেই। একাকিত্বের যে বেদনা তিনি অন্তরে বহন করেছিলেন, সেটা
নিতান্ত ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা নয়। বরং তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব এই যে, সেই
বেদনাকে তিনি একটা সার্থকতার দিকে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন।
৪
স্বার্থ ও
সাংসারিক উদ্দেশ্যনির্ভর যে দৃষ্টি, সেটাই একমাত্র দৃষ্টি নয়। একরকমের
নিরাসক্ত দৃষ্টিতেও বিশ্বের দিকে তাকানো যায়। স্পিনোজা সেইভাবে তাকাতে
চেয়েছিলেন। তাঁকে কেউ কেউ ঈশ্বরমত্ত বলেছেন। এই বর্ণনা সংগত বলে মনে হয় না।
বরং একরকমের শুদ্ধ যুক্তিনির্ভর আধ্যাত্মিকতার স্বাক্ষর তাঁর চিন্তায়।
সেইভাবে তাকিয়ে তিনি দেখেছিলেন বিশ্বময় সামঞ্জস্য, কোথাও কোনো অসামঞ্জস্য
নেই, নিয়মের কোনো ব্যত্যয় নেই। আমরা ক্ষুব্ধ হই, কাতর হই, কারণ আমাদের
স্বার্থে আঘাত পড়ে। কিন্তু যদি ভাবি যে, এই বিশ্ব তো আমার জন্য হয়নি, যদি
ব্যক্তিগত আশা-আকাক্সক্ষা ত্যাগ করে বিশ্বের অন্তহীন পথপরিক্রমার দিকে
তাকাই, তবে বিশ্বজোড়া সামঞ্জস্যময়তা আমাদের অন্য এক বিস্ময়ে আবিষ্ট করে।
চিত্তকে যে মুহূর্তে মানুষ ব্যক্তিগত বাসনা থেকে মুক্ত করে, সেই মুহূর্তে
অন্য এক অপ্রত্যাশিত অনাস্বাদিত আনন্দে চিত্তের সেই শূন্যতা পূর্ণ হয়ে ওঠে।
সাংসারিক সুখ-দুঃখের সঙ্গে এই আনন্দের মৌল প্রভেদ আছে। এখানে আমরা
আধ্যাত্মিকতা ও চিত্তশুদ্ধির যে ধারণা পাই তার সঙ্গে যুক্তির কোনো বিরোধ
নেই।
আপত্তি উঠতে পারে, সাংসারিক আকাক্সক্ষাবর্জিত এই দৃষ্টি সাধারণ
মানুষের আয়ত্তের ভিতর নয়। কিন্তু কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। ‘জ্যামিতিক’
প্রমাণের ভিতর আবদ্ধ করে স্পিনোজা তাঁর বিশ্বদৃষ্টিকে যে বিশেষ রূপ
দিয়েছেন, সেই দার্শনিক উচ্চতা ও প্রসার নিশ্চয়ই অসামান্য। কিন্তু সাংসারিক
উদ্দেশ্য নিয়ে বিশ্বজগতের দিকে তাকানোটাই মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক, আর
কিছুই স্বাভাবিক নয়, এই ধারণা সংসারী মানুষের একটা অভ্যস্ত সংস্কার। আসলে
মনুষ্যপ্রকৃতি ও বিশ্বপ্রকৃতির ভিতর যে সম্পর্ক তাতে স্বাভাবিকভাবেই নানা
উপাদান মিশ্রিত হয়ে আছে। শিশু জন্ম থেকেই সংসারী হয়ে ওঠে না। সে শিশুর
দৃষ্টি নিয়েই বিশ্বের দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টিতে একটা সরল বিস্ময় আছে। ক্রমে
নানা অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে সে সাবধানী হতে শেখে। শিশুরও চেতনা মিশ্র
উপাদানে গঠিত। একদিকে সে সবকিছুকে সহজে আপন করে নেয়। অন্যদিকে সে
খামখেয়ালি, অনায়াসে নিষ্ঠুর। বড় হয়ে ওঠনোর সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক আচারে আর
হিসাবি সর্তকতায় সে অভ্যস্ত হয়। হিংসাকে সে গোপন করতে শেখে, আর সেই সঙ্গে
সবকিছুকে আপন করার শক্তিও সাবধানতার আচ্ছাদনে ঢাকা পড়ে যায়। তবু বিশ্বের
প্রতি ঐ সহজ বিস্ময়বোধ এবং আত্ম্নার আত্মীয়তাবোধ সাংসারিকতার শত আক্রমণেও
মানুষের মন থেকে একেবারে লুপ্ত হতে চায় না। অতিসাধারণ মানুষের ভিতরও এইসব
কিছু কিছু থেকে যায়।
শৈশবই মনুষ্যত্বের জনক। ধর্মের সঙ্গে এর একটা গূঢ়
সংযোগ আছে। যিশুখ্রিষ্ট শিশুদের জন্য দ্বার উন্মুক্ত রাখতে বলেছিলেন। সেটা
শুধু বাইরের দ্বার নয়, ভিতরের দ্বারও। সংসারী মন পৃথিবীকে চেনে লাভ-ক্ষতির
হিসাব দিয়ে। বয়স্কদের জীবনের অনেকখানি জুড়ে আছে ঐ হিসাবি মন। তবু এরই ভিতর
আমরা কখনো কখনো অকারণে আনন্দিত হয়ে উঠি। শুধু চোখ মেলে আলোর দিকে চাওয়ার
মধ্যেই একটা চির নতুনের আনন্দ আছে। ‘আলোর আলোকময় করে হে এলো আলো আলো।’ আসলে
শৈশব শুধু একটা বিশেষ বয়সেরই নাম নয়, একটা প্রতীকী অর্থেরও দ্যুতি আছে ঐ
শব্দের মধ্যে। ‘যা পেয়েছি প্রথম দিনে সেই যেন পাই শেষে। দুহাত দিয়ে
বিশ্বেরে ছুঁই শিশুর মতো হেসে।’ এইসব গান যে আমাদের মনের ভিতর কোথাও একটা
স্পন্দন জাগাতে পারে, তাতেই প্রমাণ হয় যে, অন্য এক অনুভূতির পৃথিবী এখনও
আমাদের মধ্যে মৃত নয়। শৈশব ও কৈশোরের উপাদানে গঠিত এই পৃথিবী, উপেক্ষিত
হয়েও মূল্যবান। এ যদি না থাকত, সংসার তবে ভিতরে ভিতরে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত।
সংসার বেঁচে আছে এক উপেক্ষিত অকারণে প্রেমের অলক্ষিত সিঞ্চনে। এরই অভাবে
সমৃদ্ধির মধ্যেও আমরা শুনি হাহাকার, জাগতিক সাফল্যের মধ্যেও দেখি বিস্তৃত
এক ব্যর্থতাবোধ।
শৈশব যদিও জড়ত্বনাশী, তবু মানুষের ধর্ম এই দিয়ে পূর্ণ
হয় না। শিশুর ভিতর যে অকারণ আনন্দ ও বিস্ময়ের শক্তি আছে, সে মূল্যবান হয়েও
আত্মরক্ষায় অসমর্থ। নিজের ভিতর যে অমূল্য সম্পদ আছে, শিশু তাকে মূল্যবান
বলে চেনে না। মনুষ্যত্বের রক্ষার জন্য তাই শৈশবকে অতিক্রম করে যেতে হয়।
শিশুর মধ্যে স্থিরতা নেই, সহজে সে নিরুৎসাহ হয়ে পড়ে। সংসারের নানা কাঠিন্য ও
সমস্যার ভিতর দিয়ে আশা ও উদ্যম রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন হয় অন্য এক দৃঢ়তা,
বিশ্বাস ও সাধনা। মানুষের কত শ্রেষ্ঠ প্রয়াস তো ব্যর্থ হয়েছে বারবার।
আমাদের ভিতর যাঁরা সবচেয়ে শ্রদ্ধেয়, তাঁদেরও মাথায় পরিয়ে দেওয়া হয়েছে
বিদ্রুপের, কণ্টকের মুকুট। এইসব সাময়িক অথচ অনিবার্য ব্যর্থতা ও ধিক্কারের
ভিতরও বিশ্বাস রক্ষা করা যাবে কোন শক্তিতে?
মানুষের যা-কিছু শ্রেষ্ঠ
প্রয়াস তা ব্যক্তিবিশেষের কর্মে আবদ্ধ নয়। তার সঙ্গে যোগ আছে মানুষের দীর্ঘ
ইতিহাসের। আজকের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর কাজের পিছনে আছে অতীতের বহু বিজ্ঞানীর
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পর্যায়ক্রমে সাধনা। যে ভাষায় আমরা নিজেকে প্রকাশ
করি, সেই ভাষা কণায় কণায় গড়ে উঠেছে বহু প্রজন্মের ভিতর দিয়ে। কালের
পরীক্ষায় কিছু রক্ষা পেয়েছে, কিছু পরিত্যক্ত। যেসব আদর্শ আজ আমাদের
অনুপ্রাণিত করে তার পিছনেও আছে দীর্ঘ যুগ ধরে অনেক মানুষের সাধনা ও
আত্মত্যাগ। কোনো বড় উদ্দেশ্য নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা সামসময়িক মানুষের
কাছে প্রশংসা ও ধিক্কার যাই লাভ করুন না কেন, তাঁদের বিশ্বাসের ভিত্তি
সমকালকে অতিক্রম করে যায়। মনে মনে তাঁরা যুক্ত হন বৃহত্তর এক সত্তার সঙ্গে।
সেই সত্তা যে মানুষের সমগ্র ইতিহাসকেই ব্যাপ্ত করে আছে সে বিষয়ে সন্দেহ
নেই। তারও পিছে আরও কী আছে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গঠনের সঙ্গে মানুষের আদর্শের
যোগ কতখানি– সে বিষয়ে তর্ক সম্ভব। তার কোনো মীমাংসা আশা করা যায় না।
প্রমাণ-অপ্রমাণের সম্ভাবনাশূন্য সেই তর্কে আমরা আপাতত প্রবেশ করছি না। যে
কথা অনেকখানি নিঃসংশয়ে তবু বলা যায়, সে কেবল এই– ইতিহাসের ধারায় বাহিত
যা-কিছু শক্তি সবই সঞ্চারিত হয়েছে মানুষে। মানুষের অন্তরে তার অধিষ্ঠান।
আধ্যাত্মিকতার যে ধারণা এইসব নিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তার সঙ্গে মানবতাবাদের
বিরোধ থাকার কথা নয়।
অনন্ত বিস্ময়কর এ বিশ্বের নিয়মে বিধৃত নিপুণ
সামঞ্জস্য আর ভ্রান্তিশীল মানুষের বহু নিদারুণ ব্যর্থতার ভিতর দিয়েও
অন্ধকার থেকে আলোতে উত্তীর্ণ হওয়ার অদম্য প্রয়াস, এইসব মিলে উদ্ভাসিত হয়
কারুণ্যে ও লাবণ্যে মিশ্রিত অন্য এক জগৎ, যাকে মূল্য দিতে শিখে আমরা জীবনের
মূল্য খুঁজে পাই। এর বেশি অতিপ্রাকৃত যা-কিছু দাবি করা হয়, সেইসব ছাড়াই
ধর্ম সম্ভব। ধর্মের নামে প্রবঞ্চনার নিদর্শন তো ইতিহাসময় ছড়িয়ে আছে। তবু যে
মানুষ ধর্মের কাছে ফিরে ফিরে গেছে সেটাকে কেবলই কুসংস্কার বললে মানুষের
প্রতি অন্যায় করা হয়। সাংসারিক ও নিতান্ত ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, আশা-
নৈরাশ্যের ঊর্ধ্বে মানুষের উচ্চতর আদর্শ ও প্রয়াসের যদি কোনো আশ্রয় থাকে,
তবে তাকইে মহত্তর অর্থে ধর্ম বলা যেতে পারে। এই ধর্ম মানবধর্ম।
সম্প্রদায়বিশেষকে ধারণ করে এর কাজ সম্পূর্ণ হয় না। বরং মনুষ্যজাতির সঙ্গে
যুক্ত করে ব্যক্তিকে ধারণ করে এই ধর্ম। যে ধর্মে এ কাজ হয় না তার সঙ্গে
যুক্তির বিবাদ থাকাই ভালো। শুদ্ধ আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে নিঃস্বার্থ যুক্তির
বিরোধ নেই।
