
মানুষের জন্যই এই
বিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে, একথা মনে করা সম্ভবত একটা মোহ। তবু বিশ্বময়
শক্তিপুঞ্জের ভিতর যে চেতনার উদ্ভবের সম্ভাবনা সুপ্ত ছিল, এটা কম বিস্ময়ের
কথা নয়। চেতনার তরঙ্গের সঙ্গে কোথাও বিশ্বের তরঙ্গের মিল আছে। কোনো মোহ না
রেখেও বিশ্বকে ভালোবাসা যায়। সাংসারিক প্রত্যাশাহীন এই নির্মোহ ভালোবাসা
মানুষের মনে একটা বিশেষ রসের সঞ্চার করে, যাকে অন্য কোনো সুখের সঙ্গে তুলনা
করা যায় না, তবু যাকে বলা হয়েছে আনন্দ। এ যুগে রবীন্দ্রনাথের গানে ও ভাষণে
এই আনন্দের কথা বরাবার আমরা শুনেছি। আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি
জায়ন্তে, এই বচনটি যে রবীন্দ্রনাথের এত প্রিয় ছিল তার কারণ নিশ্চয়ই এই যে,
তাঁর নিজস্ব কোনো বিশেষ অনুভূতিরই প্রতিধ্বনি তিনি শুনেছিলেন উপনিষদের ওই
শব্দগুচ্ছে। অথচ কবির ভিতর বেদনাবোধও কত যে তীব্র ছিল সে কথায় আমরা পরে
আসব।
এই বিশ্বকে মানুষ নানাভাবে দেখে, নানাভাবে জানে। আমরা যখন সংসারে
আবদ্ধ তখন একে দেখি সাংসারিক উদ্দেশ্য নিয়ে। বস্তুর সেই সব গুণই তখন আমাদের
কাছে গ্রাহ্য, সংসারে যেসব প্রয়োজনে লাগে। যেমন বস্তুকে তেমনি ব্যক্তিকেও
তখন আমরা ওইভাবেই চিনি। কাকে দিয়ে আমাদের কী দরকার, কখন কার কাছে কোনো কাজে
যেতে হবে, তাই দিয়ে সম্পূর্ণ হয় ব্যক্তির পরিচয়। এইভাবে একটা প্রয়োজনের
জগৎ তৈরি হয়ে যায়, আর সবকিছুকেই আমরা সাজিয়ে নিই, সবকিছুরই মূল্য ঠিক হয়ে
যায়, ওই ব্যবহারিক প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে। বাজারে যেমন প্রত্যেক জিনিসের
একটা বাজারদর নির্দিষ্ট হয়, এটাও সেই রকম। এই হলো আমাদের ব্যবহারিক জগৎ।
এতে প্রত্যেক বস্তুর ও ব্যক্তির পরিচয় নির্ধারিত হচ্ছে স্বার্থের সঙ্গে
যুক্ত হয়ে।
অন্যের ক্ষেত্রে এই পরিচয় দিয়ে হয়তো কাজ চলে যায়। কিন্তু
নিজের জন্য এই পরিচয়টাকেই কি আমরা যথেষ্ট মনে করি? যাদের আমরা কাছের
মানুষ-অন্তরঙ্গ বলে জানি, অন্তত তাদের কাছ থেকে কিন্তু এর অতিরিক্ত কিছু
আশা থাকে আমাদের, অন্য এক পরিচয়, অন্য কোনো মূল্য। বাইরের জগতে ভালোবাসা আর
সাংসারিক স্বার্থ জট পাকিয়ে যায় ঠিকই, ভিতর থেকে আমরা তবু এদের আলাদা বলে
অনুভব করি। যদি দেখি কেউ আমাদের অন্তরঙ্গতা দেখাচ্ছে কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে,
বিশেষ স্বার্থসিদ্ধির জন্য, তবে সেটাকে আমরা বলি কপট ভালোবাসা। ওই রকম
স্বার্থাশ্রিত ভালোবাসায় আমাদের ভিতরের নিঃসংগতা পূর্ণ হয় না। আমরা চাই
অন্য এক প্রীতি, হৃদয় থেকে যে বলতে পারে, তোমার কাছ থেকে আমি অন্য কিছুই
চাই না, তোমাকেই চাই, তুমি থেকো এইটুকুই চাই। অর্থাৎ, যাকে আমরা সত্যি
ভালোবাসি তার অস্তিত্ব– শুধু অস্তিত্বই আমাদের আনন্দিত করে। সে যদি অন্য
কোনো উপহার নিয়ে আসে তবে সেটা উপরি পাওনা। সে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, এটাই
একটা মধুর প্রাপ্তি। ‘দাঁড়াও আমার আঁখির আগে। তোমার দৃষ্টি হৃদয়ে লাগে।’
শুদ্ধ ভালোবাসার ভাষা এই। দুটি সত্তার মিলনের অনুভবই এখানে একমাত্র কথা।
বিশ্বকেও
এই দৃষ্টিতে দেখা যায়। সেও পারে শুধু অস্তিত্বের চমৎকারিত্ব দিয়েই আমাদের
রোমাঞ্চিত করতে। সতর্ক ‘আমি’-র সীমানা ভেঙে বৃহতের সঙ্গে তখন ঘটে একাত্মতার
অনুভব। বিশ্বপ্রকৃতি তো আমাদের জৈব প্রয়োজনে নানা কাজে লাগে ঠিকই। নিতান্ত
লৌকিক অর্থেই প্রকৃতি আমাদের বাঁচায় এবং মারে। কিন্তু এইসব লাভ-ক্ষতির
বাইরেও বিশ্বের অন্য এক আকর্ষণ ও বিস্ময়করতা আছে। তারই স্পর্শে কবির
উচ্চারণ হয়ে ওঠে প্রার্থনার মতো। ‘এই যে ধরণী চেয়ে বসে আছে ইহার মাধুরী
বাড়াও হে।’ কী সেই মাধুরী? সেই মাধুর্যের মূলে আছে, শুদ্ধ সত্তার সঙ্গে
শুদ্ধ সত্তার মিলনের অনুভূতি। কার কাছে প্রার্থনা, ‘ইহার মাধুরী বাড়াও হে?’
সেই স্রষ্টার কাছে যিনি কবিরই অন্তঃস্তিত এক প্রেমের শক্তির অন্য নাম। সেই
শক্তি আছে মানুষেরই ভিতর, মানুষ তাকে পেয়েও হারায়, হারিয়ে আবার খোঁজে।
শংকরের
বেদান্তদর্শনে ব্যবহারিক জগতের সঙ্গে প্রতিতুলনায় পারমার্থিক সত্যের কথা
বলা হয়েছে। সেই দর্শন এবং তার বিভিন্ন ব্যাখ্যা সম্বন্ধে আমাদের অভিমত যাই
হোক না কেন, একটা কথা বোধ হয় মেনে নেওয়া দরকার। সাংসারিক স্বার্থের
দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমাদের প্রয়োজনের মাপে যেমন জগৎটাকে একভাবে জানা যায়,
তেমনি আবার স্বার্থশূন্য ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকালে বিশ্বকে অন্য একভাবে
লাভ করা যায়। দৃষ্টিভেদে ঘটে রূপভেদ। এই দুয়ের ভিতর প্রভেদ এমনই আশ্চর্য
যে, সাংসারিক দৃষ্টির সঙ্গে প্রতিতুলনায় অন্যটিকে আধ্যাত্মিক দৃষ্টি বলা
অসংগত নয়।
এই অন্য দৃষ্টি সম্বন্ধে এবার তিনটি কথা অতি সংক্ষেপে পরপর
বলে নেওয়া যাক। প্রথম কথা, আধ্যাত্মিকতা সব মানুষের ভিতরই অল্পবিস্তর আছে;
তবে অনেকের ভিতরই এটা সুপ্ত, আত্মসচেতন নয়। যেমন কাব্যশক্তি কোনো মানুষের
মধ্যে বিশেষ মাত্রায় থাকলে তবেই তাঁকে কবি বলা হয়, আধ্যাত্মিক শক্তির
বেলাতেও সেইরকম। অল্প মানুষকেই আমরা আধ্যাত্মিক গুণসম্পন্ন বলে জানি।
দ্বিতীয়
কথা, সাংসারিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টির সহাবস্থানই মানুষের জীবনের স্বাভাবিক
অবস্থা। এই দুয়ের ভিতর প্রায়ই একটা কলহ অথবা ভুল বোঝাবুঝি দেখা যায়।
সামগ্রিক জীবনবোধের দিক থেকে কিন্তু কোনোটাই ত্যাজ্য নয়। আসলে এদের সম্পর্ক
একই সঙ্গে দ্বান্দ্বিক অথচ পরিপূরক। ব্যবহারিক দৃষ্টি সত্য-মিথ্যার
সংজ্ঞাটাকে এমনভাবেই নির্ধারিত করে নেয় যে, আধ্যাত্মিক অনুভবকে, প্রয়োজনের
অতিরিক্ত অতএব অবাস্তব, এইরকম বোধ হয়। আবার আধ্যাত্মিক দর্শনও ব্যবহারিক
ধারণাগুলোকে নিতান্তই সাময়িক প্রয়োজননির্ভর, অতএব আপেক্ষিক, খণ্ডিত, পরস্পর
সামঞ্জস্যহীন ও অসত্য মনে করে। ব্যবহারিক জ্ঞান ছাড়া যে মানুষের পক্ষে
জীবনধারণ সম্ভব নয় এটা বোঝা সহজ। সেই সঙ্গে কিন্তু অন্য একটা কথাও আছে,
যেটা বুঝতে একটু সময় লাগে। শুধু সাংসারিকতা দিয়ে সংসার রক্ষা পায় না।
মানুষের ভিতর একটা অকারণ আনন্দ ও নিঃশব্দ ক্ষমার শক্তি আছে, সেটা না থাকলে
সাংসারিকতা থেকে উত্থিত ক্ষোভ ও হিংসার সঞ্চিত বিষে সংসার কিছুদিনের ভিতর
ছারখার হয়ে যেত। সাংসারিকতা ও আধ্যাত্মিকতার ভিতর একটা নিত্য আরোহণ
অবরোহণের -ধারা চলেছে, নিঃশ্বাস– প্রশ্বাসের মতোই যেটা মানুষকে ক্রমাগত
প্রাণদান করে।
এরই সঙ্গে যুক্ত হয়ে চলে আসছে একটা তৃতীয় কথা। শুদ্ধ
আধ্যাত্মিক সত্যকে সাংসারিক দৃষ্টিতে যতই ‘অবাস্তব’ মনে হোক না কেন, যুক্তি
দিয়ে তাকে খণ্ডন করা যায় না। প্রত্যাশার ব্যথ্যতা থেকেই কোনো ধারণাকে আমরা
ভ্রান্ত বলে পরিত্যাগ করে থাকি। উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য জগৎ সম্বন্ধে যেসব
চিন্তাভাবনা তৈরি হয়ে ওঠে, সেই সবই জাগতিক সাফল্য বা ব্যর্থতা দিয়ে
ভ্রমমুক্ত বা ভ্রমযুক্ত বলে প্রতিপন্ন হয়। আধ্যাত্মিকতায় ব্যর্থতা নেই।
ক্ষমা থেকেও যদি আমাদের কোনো প্রত্যাশা থাকে তবে সেই ক্ষমা শুদ্ধ নয়।
প্রত্যাশাহীন ক্ষমায় অনিবার্যভাবে চিত্তশুদ্ধি ঘটে। বলা বাহুল্য, শুদ্ধ
আধ্যাত্মিক দৃষ্টি একটা লক্ষ্য মাত্র। যুক্তিও একটা লক্ষ্যই। তাকে আমরা
জীবনে সম্পূর্ণ আয়ত্ত করতে পারি না, তাতে তার মূল্য কমে না।
যু্িক্ত
দিয়ে যেসব বিশ্বাসকে প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা যায় ধর্মের মৌল প্রত্যয় তার
পরিধির ভিতর পড়ে না। কাজেই শুদ্ধ ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতার পক্ষ থেকে যুক্তিকে
ভয় করার কোনো কারণ নেই। একথা ধর্মে কখনো স্বীকৃত হয়েছে, আবার কখনো হয়নি।
স্বীকৃতির বিভিন্ন রকমের উদাহরণ পৃথিবীর নানা ধর্ম থেকে দেওয়া কঠিন নয়।
দৃষ্টান্ত বাড়াতে গেলে আলোচনা দীর্ঘ হয়ে পড়বে, কাজেই একটি দৃষ্টান্তই এখানে
দেওয়া যাচ্ছে। দৃষ্টান্তটি খ্রিষ্টধর্ম থেকে নেওয়া হয়েছে। ‘ঝঁসসধ ঈড়হঃৎধ
এবহঃরষবং’ নামে বিখ্যাত গ্রন্থে খ্রিষ্টধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্মগুরু
সেন্ট টমাস একুইনাস বলেছেন : অষঃযড়ঁময ঃযব ঃৎঁঃয ড়ভ ঃযব ঈযৎরংঃরধহ ভধরঃয
ংঁৎঢ়ধংংবং ঃযব পধঢ়ধপরঃু ড়ভ ঃযব ৎবধংড়হ, হবাবৎঃযবষবংং ঃযধঃ ঃৎঁঃয যিরপয ঃযব
যঁসধহ ৎবধংড়হ রং হধঃঁৎধষষু বহফড়বিফ ঃড় শহড়ি পধহহড়ঃ নব ড়ঢ়ঢ়ড়ংবফ ঃড় ঃযব ঃৎঁঃয
ড়ভ ঃযব ঈযৎরংঃধরহ ভধরঃয.
মূল কথা, আধ্যাত্মিক সত্য যুক্তিকে অতিক্রম
করে যায়, কিন্তু যুক্তির সঙ্গে তার বিরোধ থাকতে পারে না। এই প্রতিজ্ঞার গৃঢ়
অর্থ খ্রিষ্টীয় সমাজে সব সময় অনুধাবন ও অনুসরণ করা হয়নি। কিন্তু সেটা
ভিন্ন কথা।
২
আধ্যাত্মিক অনুভূতির একটা মৌল উপাদান হলো বিশ্বের
সঙ্গে একাত্মতাবোধ। এই অনুভূতির ফলে পৃথিবীকে বদলানোর ইচ্ছা দুর্বল হয়ে
যায়। অথচ পৃথিবীকে বদলানো দরকার। কিছু যুক্তিবাদীর এই এক আপত্তি।
বিশ্বের
সঙ্গে একাত্মবোধকে কোনো এক স্তরে এদেশের ভাষায় বলা যেতে পারে,
মোক্ষানুভূতি। মোক্ষ ও ধর্মের ভিতর পার্থক্য আছে। মোক্ষানুভূতি নিয়ে সাধক
যদি জগৎ থেকে দূরে সরে যান, তবে ধর্মাচরণ সম্পূর্ণ হয় না। ব্যক্তি যখন
বিশ্বের সঙ্গে একাত্মবোধ নিয়ে বিশ্বের কর্মে নিযুক্ত হন, তখনই ধর্ম
সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। এইসব স্বীকার করে নেওয়ার পরেও কিন্তু যুক্তিবাদির
সমালোচনায় চিন্তার যোগ্য বস্তু থেকে যায়।
ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিযুক্ত
করার পক্ষে আসলে দুই প্রান্ত থেকে দুরকম যুক্তি আছে, দুটিই সংগত যুক্তি।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের বিধানের পরিবর্তন আবশ্যক হয়। ধর্মীয়
আচার-বিচারে নেই সেই নমনীয়তা। উপরন্তু অধঃপতিত ধর্ম একরকমের অসহিঞ্চুতা ও
সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টি করে, যা থেকে রাজনীতিকে মুক্ত রাখা সর্বদা
বাঞ্ছনীয়। আবার উন্নত আধ্যাত্মিকতা কিছু মানুষকে সাধারণের চোখে এমন একটা
শ্রদ্ধার আসন দেয়, দলীয় রাজনীতির সংস্পর্শ থেকে যাকে রক্ষা করাই সমাজের
পক্ষে মঙ্গলজনক। এই শ্রদ্ধার স্থান লাভ করার জন্য কাউকে খোদাবিশ্বাসী হতেই
হবে, এমন কথা বলা যায় না। রাসেল নিরীশ্বরবাদী ছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয়
ক্ষমতার উচ্চপদে যাঁরা অধিষ্ঠিত তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে সতর্ক বাণী
উচ্চারণের ও প্রতিবাদ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার নৈতিক অধিকার তিনি লাভ
করেছিলেন। অনুমান করা যায় যে, দলীয় রাজনীতিতে আবদ্ধ হয়ে পড়লে এই বিশেষ
মর্যাদা তিনি অর্জন করতে পারতেন না। এদেশে ও বিদেশে কোনো কোনো ধর্মীয়
প্রতিষ্ঠানের নেতারা ক্ষমতাসীন রাজনীতিক দলের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
রক্ষা করতে এতই স্পষ্টত আগ্রহী যে, তাঁদের বাণীর নিরপেক্ষতায় জনসাধারণের
আস্থা দুর্বল হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। ধর্ম যদি সমাজে তার নৈতিক স্থানটি
অক্ষুণ্ন রাখতে চায় তবে রাজনীতিক ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সতর্কভাবে অনেকটা
দূরত্ব রক্ষা করাই শ্রেয়।
ধর্মের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদীদের আরেক অভিযোগ এই
যে, ধর্ম মানুষকে অদৃষ্টবাদী করে তোলে। স্রষ্টা যদি সর্বশক্তিমান হন, সবই
যদি তাঁর ইচ্ছায় ঘটে, তবে মানুষের উদ্যোগ কি নিরর্থক হয়ে ওঠে না? এদেশের
দরিদ্র ও নিরক্ষর মানুষ প্রাকৃতিক ও সামাজিক এত বিপর্যয় ও অনিশ্চয়তার ভিতর
সদাসর্বদা বাস করতে বাধ্য হয় যে, তাদের পক্ষে অদৃষ্টবাদী হওয়া বিস্ময়কর নয়।
তবে ধর্মের সঙ্গে অদৃষ্টবাদের সম্পর্কের ভিতর একটা ‘প্যারাডক্স’ বা
কূটাভাস আছে। একটা তুলনা টেনে সেটা দেখানো যায়। বিজ্ঞান বলে যে, বিশ্বের
প্রতিটি ঘটনারই একটা কারণ আছে, ঘটনাপ্রবাহ কার্যকারণে আবদ্ধ। এই থেকে মনে
করা যেতে পারত যে, সমস্ত ভবিষ্যৎই তবে অতীত দিয়ে নির্ধারিত, যা ঘটার তা
ঘটবেই। যা অবধারিত তাকে স্বীকার করে নেওয়াতেই মুক্তি, এইরকম কথা
বিজ্ঞানমনস্কতার সীমার ভিতরই বহুকাল থেকে শোনা গেছে। অথচ বিজ্ঞান ও
নিয়তিবাদের ভিতর নিশ্চয়ই কোনো অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ নেই। বরং বিজ্ঞানকে
বিশেষত আধুনিক যুগে মানুষের নিজস্ব উদ্যোগের সহায়ক হিসেবেই দেখানো হয়।
বিজ্ঞানের কাছ থেকে শক্তি সংগ্রহ করে মানুষ আরও উদ্যোগী হয়ে ওঠে। ধর্মের
ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ওই রকমই হওয়া সম্ভব। ধর্ম মানুষকে অনিবার্যভাবে
অদৃষ্টবাদী করে না। বরং আধ্যাত্মিকতা থেকে এক ধরনের নির্ভয়তা ও প্রেরণা লাভ
করা সম্ভব যাতে মানুষের উদ্যোগ বাড়ে। ইউরোপে মধ্যযুগের শেষে আর্থিক
উন্নয়নের নতুন যুগে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম মানুষকে উদ্যোগী হতে সাহায্য
করেছে। আসলে ধর্ম মানুষকে কর্মে উৎসাহী করবে কি না, সেটা অনেকখানি নির্ভর
করে বৃহত্তর সাসাজিক পরিস্থিতির ওপর।
প্রত্যাশা অথবা ফলাকাক্সক্ষা ছাড়া
কর্মে উৎসাহ থাকে না, ধর্মের সমালোচনায় এইরকম একটা কথাও শোনা গেছে। প্রথম
দৃষ্টিতে এই আপত্তিকে যতটা সারবান মনে হয় ততটা সে আসলে নয়। কর্ম সম্পাদনের
জন্য কিছু উপকরণের প্রয়োজন হয়। সেইসব পাওয়া না গেলে কাজে বাধা পড়ে, এই
পর্যন্ত স্বীকার করা যায়। কিন্তু ফলের আকাক্সক্ষা বেশি হলে কাজ ভালো হয়,
একথা মেনে নেওয়া যায় না। যেসব শিক্ষক অথবা কর্মী বেশি আকাক্সক্ষা করেন
তাঁরাই বেশি ভালো শিক্ষক ও কর্মী হন, অভিজ্ঞতা এমন কথা বলে না। ভালো শিক্ষক
পড়াতে ভালোবাসেন, সেটাই তাঁর প্রধান পুরস্কার, অর্থ ও খ্যাতির আকাক্সক্ষায়
প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কলহ ও ব্যর্থতাবোধ বাড়ে। কর্মকে কর্ম বলেই ভালোবাসতে না
পারলে সেটাকে শেষ পর্যন্ত শাস্তি বলে মনে হয়। ফলাকাক্সক্ষার চাঞ্চল্যে নয়,
একাগ্র আত্মনিযুক্তিতে কর্মের উৎকর্ষ বাড়ে।
সংগ্রাম ও শান্তির
বৈপরীত্যে আশ্রিত একটি কূটাভাসের উল্লেখ এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। অধর্ম
অথবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে কোরানে ও ভগবদ্গীতায় কর্তব্য বলে মান্য
করা হয়েছে। অথচ সময়ে আবদ্ধ কোনো যুদ্ধই মানুষের চরম লক্ষ্য হতে পারে না।
ধর্মকে তাই রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়েও অনাসক্তির কথা বলে যেতে হয়। অনাসক্ত
সংগ্রামের তত্ত্বে কোনো আত্মখণ্ডন নেই, বরং সমস্যার গভীরতার ইঙ্গিতেই আছে।
যুদ্ধের চাঞ্চল্য যদি মানুষের আত্মাকে গ্রাস করে নেয় তবে শেষ বিচারে সেটাই
মনুষ্যত্বের পরাভব।
৩
ধর্ম মানুষকে কতটা এক ছাঁচে তৈরি করবে সেটা
স্বভাবতই নির্ভর করে সেই ধর্ম ও সমাজের প্রকৃতির ওপর। স্রষ্টার সঙ্গে
একাত্ম হয়ে গেলে তো স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব বলে আর কিছু রইল না, এই বলে যে
তর্ক শুরু হয় তাতে মূল প্রশ্নটা ঠিকভাবে হাজির করা হয় না। মোক্ষ নয়, মোক্ষে
পৌঁছানোর পথ নিয়ে চিন্তা শুরু করা দরকার। সেই পথ এক নয়, অনেক। মোক্ষে তো
কেউই চিরকালের মতো পৌঁছে যান না। সেই পথে অগ্রসর হন এইমাত্র বলা যায়। আর
নানা মানুষ নানাভাবে অগ্রসর হন। সেইভাবে তাঁদের ব্যক্তিত্ব গঠিত হয়।
বঙ্গবন্ধু আর রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্বে কত পার্থক্য! আসলে বিভিন্ন মানুষ
বিভিন্ন রুচি নিয়ে, বিভিন্ন পরিস্থিতি থেকে, যাত্রা শুরু করে। তাদের জীবনের
অভিজ্ঞতায় থাকে বহু বৈচিত্র্যে। সেইসব অভিজ্ঞতার ভিতর থেকেই মুক্তির পথের
সন্ধান করতে হয়। আধ্যাত্মিকতা ব্যক্তিত্বনাশী, এইভাবে কথাটা তুলে লাভ নেই।
নিজস্ব উপলব্ধির মূল্যের কথাটাই বেশি জরুরি। আধ্যাত্মিক উপলব্ধি কখনো
যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি হতে পারে না। সেই উপলব্ধিতে ব্যক্তি বিশ্বের সঙ্গে
যুক্ত হয়ে নিজেকে নতুন করে পায়। এটাকে ব্যক্তিত্বের বিলোপ বললে ভ্যুল হয়।
এইসঙ্গে
একটা সাবধানী বাক্য যোগ করা ভালো। ‘অন্যান্য’ অভিজ্ঞতার লোভও মানুষকে
ধ্বংসের পথে টানতে পারে। সেই বিধ্বংসী আকর্ষণ এতই দুর্নিবার হয়, তার পিছনে
মিথ্যা যুক্তি এমন প্রবল হয়ে ওঠে যে, তার হাত থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন।
কোনো সহজ পথে এর সমাধান আছে এমন আমি জানি না। কীসে ব্যক্তিতে ক্রমে সবল করে
তোলে, ব্যক্তিত্বকে বিকাশের পথে নিয়ে যায়, আর কোনো আকর্ষণ তাকে দুর্বল ও
নেশাগ্রস্ত করে ফেলে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা ছাড়া উপায় নেই।
আরও মৌল
একটা সংশয়ের কথা এরপর দূরে ঠেলে রাখা যায় না। কেউ নিশ্চয়ই প্রশ্ন তুলতে
পারেন, বিশ্বের সঙ্গে একাত্মতাকেই লক্ষ্য বলে মেনে নিতে হবে কেন? বিশ্বকে
বিরোধী শক্তি বলে ধরে নেওয়াই তো বেশি বাস্তবসম্মত। ঈশ্বরহীন বিশ্বে
ব্যক্তিকে তাঁর পথ খুঁজে নিতে হবে। ধর্মবিশ্বাসী কি মানুষকে সেই বিদ্বেষী
চিন্তার স্বাধীনতা দিতে রাজি আছেন? এর উত্তরে বলতে হয়, সেই স্বাধীনতা
ব্যক্তির থাকাই উচিত। কোনো ব্যক্তিকে তো জোর করে বিশ্বপ্রেমে ঠেলে তোলা যায়
না। তাঁকে তো নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আসলে প্রেম ও
বিদ্বেষ, বিশ্বাস ও অবিশ্বাস, দুয়েরই সমস্ত বিশ্বকে গ্রাস করে নেওয়ার শক্তি
আছে। ধর্মবিশ্বাসী শুধু এটাই চাইতে পারেন যে, অবিশ্বাসীর পাশে পাশে
বিশ্বাসীকেও তাঁর নিজ মত ও নিজ পথ অনুসারে স্বেচ্ছায় চলতে দেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্বেষী যদি বৈরভাবে বিশ্বের পুজো করতে চান তো ধর্মবিশ্বাসীর তাতে
বাধা দেওয়ার অধিকার নেই।
স্বীকার করে নেওয়াই ভালো যে, বিশ্ববিদ্বেষ
নিতান্ত অস্বাভাবিক নয়। সত্যমেব জয়তে, এই তাত্ত্বিক বাণী কি আমাদের পরিচিত
জীবনে প্রতি মুহূর্তেই খণ্ডিত হয়ে চলছে না? এ জগতে কোনো প্রত্যাশারই কি
মূল্য আছে? আমাদের ভিতর যাঁরা শ্রেষ্ঠ, যাঁরা স্বাভাবিক প্রতিভা এবং অবিচল
অনুশীলনের দ্বারা প্রায় পূর্ণ মনুষ্যত্বের দৃষ্টান্তস্বরূপ হয়েছেন, তাঁরাও
জীবনে যে পরিমাণ দুঃখ ও লাঞ্ছনা ভোগ করেছেন তাতে জগতের বিধান সম্বন্ধে
নিরাশ বোধ না করাই কঠিন। যাঁরা মানবহিতৈষী তাঁদেরও শত্রুর অভাব নেই, যাঁরা
দয়াবান তাঁদের প্রতিও মানুষ নির্দয়। যে রবীন্দ্রনাথ একদিন পরম সারল্যে
বলেছিলেন, “এই বসুধার/মৃত্তিকার পাত্রখানি ভরি বারম্বার/তোমার অমৃত ঢালি
দিবে অবিরত/নানাবর্ণগন্ধময়”, তাঁরই জীবনের শেষপ্রান্তে এক অসাধারণ
আবেগকম্পিত গানে ‘মানবপুত্রের’ মুখ থেকে যখন শুনি, ‘এ পানপাত্র নিদারুণ
বিষে ভরা,’ তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কবির দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে
পরমপিতার প্রতি উচ্চারিত খ্রিষ্টের ওই নিদারুণ উক্তির কোথাও মিল ছিল। আর
সেই সঙ্গে মনে পড়ে যায় গ্যয়টের লেখায় তরুণ হের্থেরের মর্মন্তুদ সেই প্রশ্ন :
‘অহফ রভ ঃযব এড়ফ ভৎড়স যবধাবহ ভড়ঁহফ ঃযব পঁঢ় ঃড়ড় নরঃঃবৎ ভড়ৎ যরং যঁসধহ
ষরঢ়ং, যিু ংযড়ঁষফ ও বীধষঃ সুংবষভ ধহফ ধপঃ ধং রভ রঃ ঃধংঃবফ ংবিবঃ ঃড় সব?’
স্বর্গ থেকে আগত ইশ্বরপুত্রের ওষ্ঠেও যদি জীবনের স্বাদ এমন অসহ্য তিক্ত
ঠেকেছিল, তবে আমি কোন উল্লাসে কী করে বলব যে জীবন মধুর?
অর্থাৎ,
বিশ্ববিদ্বেষের সপক্ষে কারণের অভাব নেই। বিপক্ষে তবু ভাবার মতো একটি কথা
আছে। বিশ্বের বিরুদ্ধে বিদ্বেষে মানুষ নিজেই ক্ষতবিক্ষত হয়, নির্বিকার
বিশ্ব তার নির্ধারিত পথ ধরে চলে। জীবনের প্রতি বিদ্বেষের শতসহস্র যতই কারণ
থাকুক না কেন, তাতে বিদ্বিষ্ট বিশ্বের কোনো শাস্তি অথবা সংশোধন হয় না,
যন্ত্রণা ভোগ করে বিদ্বেষী মানুষ। একথা জেনে আমরা আবার এই অনাদি অনন্ত
জগৎধারার দিকে তাকাই। আমরা জানি, এর বিরুদ্ধে অভিমান করা অর্থহীন। চোখে পড়ে
মানুষের রক্তাক্ত হৃদয়, আমাদের মন তখন করুণায় ভরে ওঠে। সেই করুণার
দৃষ্টিতে যখন মানুষের এই চলমান মহাসংসারকে দেখি তখন তাকেও মনে হয় এক
মহাকাব্য মহাভারতের মতো। সেই কাব্যে হিংসা লোভ মিথ্যা কিছুরই অভাব নেই, তবু
সেই মহাকাব্য।
৪
প্রত্যাশা থেকে বিদ্বেষ আসে, প্রত্যাশাহীন দৃষ্টি
মনকে মুক্ত করে। বিদ্যাসাগর ঠিকই বলেছিলেন, ‘সাংসারিক বিষয়ে লিপ্ত থাকিয়া
ক্লেশ ভোগ করা নিরবচ্ছিন্ন মূর্খতার কর্ম।’ নির্লিপ্ত দৃষ্টি ছাড়া সেই
ক্লেশের হ্রাস হয় না। যেহেতু সংসার ত্যাগ করা মানুষের সাধারণ ধর্ম হতে পারে
না, কাজেই সংসারের ভিতরই যথাসম্ভব মুক্তির পথ খোঁজা ছাড়া সকল মানুষের
পক্ষে অন্য পথ নেই। সংসারে বাস করে বিশ্বের প্রতি বিদ্বেষমুক্ত দৃষ্টিতে
তাকানো কত কঠিন, আমরা সবাই সে কথা জানি। বারবার আমরা আকণ্ঠ তিক্ততায় ডুবি,
বারবার মুক্তি খুঁজি। আমরা যে প্রত্যেকেই মুক্ত হতে পারব, এমন কোনো
নিশ্চয়তা নেই। তবু পথের সন্ধান ত্যাগ করা যায় না।
ঈশ্বরের কাছে
রবীন্দ্রনাথের প্রশ্ন ছিল : ‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?’ ঈশ্বর থাকুন বা না
থাকুন, জীবনই অবশেষে সকলের বিচার করে। তবে সব বিচারের শেষে ক্ষমা ছাড়া উপায়
কী? যাকে আমরা ক্ষমা করি না, ক্ষমাহীনতার বজ্রবন্ধনে সে-ই আমাদের আবদ্ধ
করে। ক্ষমা ছাড়া মুক্তি নেই।
সাংসারিক যুক্তির অভ্যস্ত ভাষা এটা নয়।
কিন্তু বিচার ও ক্ষমার যে দ্বন্দ্ব ধর্মের ভিতর একটা বিশ্বস্ত ভাষা খুঁজে
পেয়েছে, সেটা যুক্তির কাছেও অবোধ্য নয়। তার ভিতরও একটা সীমাভাঙ্গার শক্তি
আছে, তাকে সাংসারিকতায় আবদ্ধ থাকতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। সর্বকালের এক
শ্রেষ্ঠ গ্রিক দার্শনিক নিষ্কাম যুক্তির কথা বলেছিলেন। আবার অনাসক্তিই,
আমাদের ঐতিহ্যে, চিত্তশুদ্ধির পথ। ধর্ম ও যুক্তি এইভাবে কাছাকাছি চলে আসে।
এই যোগটাই মঙ্গলজনক। তবে একেও কোনো চিরকালীন সমন্বয়ের মধ্যে বাঁধতে চেষ্টা
করা ভুল। চিরকালীন সমন্বয় হয়ে ওঠে ভঙ্গিসর্বস্ব। সংসার ও মুক্তির ভিতর যে
অন্তহীন আরোহণ-অবরোহণ জীবনের প্রাণবস্তু, তারই মধ্যে ধর্ম ও যুক্তিকে স্থান
করে নিতে হবে।
মোক্ষে মানুষ খোঁজে অন্তরের মুক্তি। ধর্মের আদর্শ
লক্ষ্য, সমাজকে ধরে রাখা, ভ্রাতৃত্বের সূত্রে, সর্বমানবের কল্যাণের জন্য।
আচারসর্বস্বতায় নেই অন্তরের মুক্তি, নেই কল্যাণের যোগ। যুক্তিবাদীরা এটাই
লক্ষ করেন। তবে সমাজকে স্রষ্টার বিশ্বাসী এবং নিরীশ্বরবাদী, এই দুই কট্টর
শিবিরে ভাগ করেও একরকমের সাম্প্রদায়িক বিভাগ সৃষ্টি করা হয়। তাতে সমাজের
প্রকৃত উপকার হয় না। অন্তরের মুক্তি আর মানুষের সঙ্গে মানুষের স্বচ্ছন্দ
যোগাযোগ রক্ষা, এই যদি উদ্দেশ্য হয় তবে বাইরের ভাষা থেকেও ভিতরের ভাবটাকে
বেশি মূল্য দেওয়া প্রয়োজন।
মানুষের স্বভাবে আছে একটা গভীর দ্বৈত, একই
সঙ্গে সে মহত্ত্বে ও নীচতায় চিহ্নিত। সেই দ্বন্দ্ব যেমন প্রতিফলিত হয়েছে
ধর্মে তেমনি বিজ্ঞানে। দুয়েরই একটা আদর্শরূপ আছে। আবার দুয়েরই বিকৃতি হয়ে
ওঠে কঠিন দুশ্চিন্তার কারণ। বিজ্ঞানের যেটা আদর্শরূপ তার মূলে পাই শুদ্ধ
জিজ্ঞাসা, আধ্যাত্মিকতার মূলে শুদ্ধ প্রেম। বাস্তবে বিজ্ঞান তবু যুক্ত হয়
নানা সাংসারিক প্রয়োজনের সঙ্গে, যার ফলে একদিকে সে হয়েছে ঐহিক উন্নতির
সহায়, অন্যদিকে খুলে গেছে বিচিত্র অপব্যবহারের পথ। এ যুগে বিজ্ঞানের সবচেয়ে
উল্লেখ্য অপপ্রয়োগ ঘটেছে যুদ্ধের আয়োজনে আর ভোগবাদের আতিশয্যের উপায়
উদ্ভাবনে। ধর্মকেও নেমে আসতে হয় সংসারে। তার যোগ ঘটে ভয়-লোভ-হিংসার সঙ্গে।
কদর্য সেই বিকৃতি।
বিজ্ঞানের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শোনা গেছে
সমাজহিতৈষী নানা মানুষের পক্ষ থেকে। ধর্ম ও অহিংসার দৃষ্টি থেকে যে
প্রতিবাদ, তার একটা বিশেষ মূল্য আছে। ধর্মের বিকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আরও
সুপ্রাচীন। তার অনেকখানি এসেছে ভক্তি আন্দোলনের ভিতর থেকে। কিন্তু যুক্তির
ভিত্তিতে ধর্মীয় অধঃপতনের যে বিচারনির্ভর সমালোচনা, তার একটা বিশেষ মূল্য
আছে। এমনি করে ধর্ম ও যুক্তি হয়ে ওঠে পরস্পরের সংশোধক ও পরিপূরক। যেখানে
বিকৃতি, সেখানে এদের দ্বন্দ্ব। তার ঊর্ধ্বে মৈত্রীপূর্ণ সহাবস্থান। এই
দ্বন্দ্ব এবং মৈত্রী, দুয়েরই মূল্য স্বীকার্য।
মানুষের কিছু মৌল দুঃখ
আছে যেসব কোনো কৌশলেই দূর করা যাবে না। এরই ভিতর শুদ্ধ প্রেম ও জিজ্ঞাসা
আমাদের মুক্তির স্বাদ এনে দেয়। যদিও এই সমবায় দুঃসাধ্য, তবু সেই লক্ষ্যের
বিকল্প নেই। লক্ষ্য না বলে পথ বলাই ভালো। সেটাই ধর্মেরও ভাষা। সেই পথ গিয়ে
পৌঁছেছে অকূল মোহানায়, তখন পথের অভ্যস্ত নিয়মগুলোও বাধা হয়ে ওঠে। যেসব
আচারে আমরা পরিচিত, সবই সেখানে পরিত্যাগ করতে হয়। শিশুর নগ্নতা থেকে সাধুর
নগ্নতায় প্রত্যাবর্তন।
এইখানে এসে ভাষাও আমাদের প্রতারণা করে। কিছু
বোঝাতে চাইলেই উপমা আবশ্যক, অথচ কোনো উপামই লক্ষ্যভেদী নয়, দ্ব্যর্থতাহীন
নয়। বলার যোগ্য কত কথাই তে বলে ওঠা যায় না। রচনার স্বচ্ছতার জন্য প্রসিদ্ধ
ছিলেন যে বার্ট্রান্ড রাসেল, আর ধর্মের ভাষাকে যিনি স্বভাবতই সন্দেহের চোখে
দেখতেন, তাঁরও মুখ থেকে শুনি এই কথা। তাঁর আত্ম্নজীবনীর পাতায় পাই
স্বরণযোগ্য এই বাক্যটি : ঞযব ঃযরহমং ড়হব ংধুং ধৎব ধষষ ঁহংঁপপবংংভঁষ
ধঃঃবসঢ়ঃং ঃড় ংধু ংড়সবঃযরহম বষংব- ংড়সবঃযরহম ঃযধঃ ঢ়বৎযধঢ়ং নু রঃং াবৎু
হধঃঁৎব পধহহড়ঃ নব ংধরফ. (ঞযব অঁঃড়নরড়মৎধঢ়যু ড়ভ ইবৎঃৎধহফ জঁংংবষষ ১৯১৪-১৯৪৪,
ঢ়. ১১৬,) যা বলা হয় সে সবই অন্য কোনো কথা বলার অসফল চেষ্টা– যে কথা সম্ভবত
কিছুতেই বলা যায় না। জীবনের পরম লগ্নে এইরকমই বারবার ঘটে। যুক্তি আমাদের
অসম্ভবের এই স্বীকৃতির দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে। এরপর অধিক তর্ক
নিষ্ফল। বিতর্ক মূল্যবান, তবু থামতে জানাও চাই। ভাষায় এই অনির্দিষ্টতা আছে
বলেই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সব মানুষের গভীর বিশ্বাস উচ্চারিত হয় না একই ধর্মে
অথবা দর্শনে। তবু তাঁরা হতে পারেন কিছু মানবীয় মূল্যবোধে সহমর্মী, নতুন
সমাজ নির্মাণের প্রচেষ্টায় সহকর্মী।
