
মোঃ
শাহনেওয়াজুর রহমান আয়ান(১৩)। কুমিল্লা মডার্ণ স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর
ছাত্র। চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র মিজানুর রহমানের একমাত্র
ছেলে। সে ঈদুল আজহার ছুটিতে গ্রামের বাড়ি নাটাপাড়ায় বেড়াতে আসে। গত ১ জুন
সোমবার বন্ধুদের সাথে মাঠে খেলা শেষে দুপুরে বাড়ি ফিরছিল। ‘শরীরে কাঁদা’
থাকায় মা বকবে ভেবে পথিমধ্যে ডোবায় গোসল করতে নেমে আর উঠতে পারেনি।
কিছুক্ষণ পর পরিবারের লোকজন খবর পেয়ে তাঁর নিথর উদ্ধার করে। এর কয়েক ঘন্টা
আগে একইভাবে উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের বাংপাই গ্রামের মোহাম্মদ হাসানের
ছেলে মোঃ শাহাদাত(৬) পাশের মরা ডাকাতিয়া নদীতে ও কনকাপৈত ইউনিয়নের কালকোট
গ্রামের ফরহান ইবনে মোস্তফা ছেলে মোহাম্মদ(২) বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে
মৃত্যুবরণ করে।
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শিহাব(১৭)। চট্টগ্রাম নৌবাহিনী
কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র। গত ২৯ মে শুক্রবার দুপুরে দুই বন্ধুসহ
চৌদ্দগ্রাম ও নাঙ্গলকোট উপজেলার সীমান্তবর্তী ডাকাতিয়া নদী পার হওয়ার সময়
নিখোঁজ হয়। দীর্ঘ ১৮ ঘন্টা পর শনিবার সকালে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল
নদীর কুচুরিপানার নিচ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে। সে পাশ^বর্তী নারান্দিয়া
গ্রামের জহিরুল ইসলামের ছেলে। বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন নিহতদের গর্ভধারিনী মা
ও পিতা।
ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসে পুকুর, ডোবা বা ছোট
নদীতে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন গর্ভধারিনী মা ও
পিতাসহ স্বজনরা। তবে কি কারণে বেশি পরিমাণ শিশু মারা যাচ্ছে পানিতে ডুবে?
এমন প্রশ্ন এখন সকলের মুখে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী,
পানিতে ডুবে বেশি শিশুর মৃত্যু ঘটে এশিয়াতেই, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায়।
সেখানে আবার পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। বলা হচ্ছে,
দেশটিতে গড়ে দিনে ৪০ শিশু মারা যাচ্ছে পানিতে ডুবে।
গবেষণা আর
পরিসংখ্যান বলছে, সারা বছর যত শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়, তার ৩৫ শতাংশ
মারা যায় বিভিন্ন লম্বা ছুটিতে নানাবাড়ি, দাদাবাড়ি ও আত্মীয়স্বজনের বাড়ি
বেড়াতে গিয়ে পানিতে ডুবে শিশু মারা যাচ্ছে। ডুবে যাওয়া শিশুদের একটা
উল্লেখযোগ্য অংশের আগে থেকেই খিঁচুনি এবং শ্বাসকষ্টের প্রবণতা ছিল। শিশুদের
ক্ষেত্রে ০-১৭ বছর বয়সীরা ডুবেই মারা যায় বেশি। প্রতি বছর ১৪ হাজারের মতো
শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ৪০ জন শিশু প্রাণ হারাচ্ছে
পানিতে ডুবে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার মতো এটি চোখে পড়ে না। সে কারণে
আলোচনাতেও আসে না।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর
আটটি কারণ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে-১. চারদিকে বিভিন্ন ধরণের প্রচুর
জলাশয়-পুকুর, নদী, ডোবা, খাল, বিল; ২. বড় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সাঁতার না
জানা; ৩. দেখ-ভাল করার অভাব: ৬০ শতাংশ ডুবে মৃত্যুর ঘটনা সকাল নয়টা থেকে
বেলা একটার মধ্যে। কারণ এ সময় মায়েরা ব্যস্ত থাকেন। বাবারা কাজে ঘরের বাইরে
এবং বড় ভাই-বোন থাকলে তারা হয়তো স্কুল বা মাদরাসায় থাকে; ৪. দরিদ্র গরীব
পরিবারে শিশু মৃত্যু বেশি; ৫. সবচেয়ে বিপজ্জনক পুকুর (৮০ শতাংশ দুর্ঘটনা
পুকুরেই হয় যেটি বাড়ির সীমানা বা ঘরের ২০ মিটারের মধ্যে); ৬. তাৎক্ষনিক
প্রাথমিক চিকিৎসা জ্ঞান না থাকা। ফলে পানিতে ডুবলে সেখান থেকে উঠিয়ে কি করা
হবে সেটাই অনেকে জানে না-বিশেষ করে হার্ট ও শ্বাস-প্রশ্বাস চালুর প্রাথমিক
চেষ্টা থাকে না; ৭. নানা কুসংস্কার- যেমন মাকে ধরতে না দেওয়া বা অনেক সময়
শিশুকে মাথায় তুলে চারদিকে ঘোরানো; এবং ৮. হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা: অনেক
ক্ষেত্রে ডুবে যাওয়া শিশুকে কি করা হবে বা ফার্স্ট রেসপন্স সম্পর্কে
প্রশিক্ষিত ব্যক্তির অভাব থাকে।
মৃত্যু প্রতিরোধে করণীয়: ১. সাঁতার
শেখানো: প্রশিক্ষিত ব্যক্তি বা প্রাপ্তবয়স্ক কারো সহায়তায় ৬-১০ বছর বয়সী
শিশুদেরকে সাঁতার শেখানো। ২. ঝুঁকি কমিয়ে আনা: খোলা জলাশয়ের চারপাশে শক্ত
বেড়া দেওয়া ও ঘরের দরজায় প্রতিবন্ধক তৈরি করা যাতে শিশু ঘরের বাইরে যেতে না
পারে। ৩. সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান করা: বাড়িতে সবসময় শিশুকে প্রাপ্ত বয়স্ক
কারো তত্ত্বাবধানে রাখা বা শিশুকে নিকটস্থ শিশুযত্ন কেন্দ্রে পাঠানো।
পানিতে
থেকে তোলার পর বর্জনীয় কাজ: ১.মাথায় নিয়ে ঘুরানো যাবে না। ২. পেটে চাপ
দিয়ে পানি বের করার চেষ্টা করা যাবে না। ৩. ছাই বা লবণ দিয়ে শরীর ঢাকা যাবে
না ও ৪. বমি করানোর চেষ্টা করা যাবে না।
গত দুই সপ্তাহ যাবৎ
চৌদ্দগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পানিতে ডুবে শিশুদের মারা যাওয়ার ঘটনা
অনুসন্ধান করেছে এ প্রতিবেদক। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান সময়ে অনেক
পরিবার ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার জন্য শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। সেখানে
শিশুরা বাসায় গোসল করে। ছুটিতে বেড়াতে কোথাও গেলে ডোবা, পুকুর বা নদীর পানি
দেখলে তাদের গোসল করতে আগ্রহ দেখা যায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা
সাঁতার না জানায় পানিতে ডুবে যায়। সাধারণত ৫-১০ মিনিট অক্সিজেন না থাকলে
মানুষ মারা যায়। সেখানে পানিতে ডুবে শিশুদের শরীরে অক্সিজেন না থাকলে
মুহুর্তেই ফুসফুস বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়। এছাড়াও শিশুরা বাড়িতে থাকলে বা
বেড়াতে আসলে অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের পাহাড়া দিয়ে রাখা। আবার শিশুদের
সুরক্ষায় বাড়ির পাশের পুকুর পাড়ে বেড়া নির্মাণের বিষয়ে মত দিয়েছেন অনেকে।
সর্বোপরি পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে অভিভাবক, মসজিদের ইমাম, শিক্ষক,
সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সভা-সেমিনারের আয়োজন করে জনসচেতনতা তৈরি করতে
হবে।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ রশিদ আহমেদ চৌধুরী
শনিবার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে।
অধিকাংশ শিশুকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনার আগেই মৃত্যু
হয়। অসাবধানতা ও সচেতনতার অভাবে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। শিশুদের নিরাপত্তা
নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের সচেতনতার পাশাপাশি ঘরের কাছের পুকুর পাড়ে বেড়া
দিতে হবে।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদাৎ হোসেন বলেন, পানিতে ডুবে মৃত্যু কমাতে শিশুদের অভিভাবকদের আরো সচেতন হতে হবে।
