
বেসরকারি খাতকে অর্থনীতির প্রাণ বলা হয়। অথচ বাংলাদেশে সেই বেসরকারি খাত যেন মরতে বসেছে।
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে অনেক শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। ডলার সংকট, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানিসংকটে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিসহ নানা কারণে কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা ও ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। এর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে ব্যাংকঋণের সুদহার অনেক বেড়ে গেছে। ১৫-১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে লাভজনকভাবে ব্যবসা পরিচালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ থেকে শিল্পোৎপাদন সর্বক্ষেত্রে।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কঠোর কড়াকড়িতে বলতে গেলে ঋণই পাচ্ছেন না বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত থেকে বেসরকারি খাতের ঋণের এমন দুর্ভাগ্যজনক চিত্র পাওয়া গেছে।
গত মার্চ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৪.৭২ শতাংশে এসে ঠেকেছে। এটি গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। বাংলাদেশ ব্যাংক দুই দশকের বেশি তথ্য সংরক্ষণ করে না। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বাস্তবে এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম ঋণপ্রবাহ।
বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক চাপ কিছুটা কমলেও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়নি, বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি, নীতিগত অস্পষ্টতা ও জ্বালানিসংকট একসঙ্গে বিনিয়োগকে নিরুৎসাহ করছে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ হার। বর্তমানে বেসরকারি খাতের ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত। এই সুদহারে বিনিয়োগ করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা প্রায় কঠিন। এমন অবস্থায় কেউ ঋণ নিতে আগ্রহী নয়। ফলে কমতে কমতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সর্বকালের সর্বনিম্ন স্তরে এসে ঠেকেছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আংশিক ফিরলেও বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য শর্ত এখনো অনুপস্থিত। মূল্যস্ফীতি, লজিস্টিক ব্যয় ও সামগ্রিক অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের নতুন করে ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহ করছে। মার্চ মাসে জ্বালানিসংকট পরিস্থিতিকে আরো চাপের মধ্যে ফেলেছে। একাধিক সমস্যা আগে থেকেই ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানিসংকট।’
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক তিন দফায় নীতি সুদ হার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করেছে। আর সে কারণে ব্যাংকঋণের সুদের হার দ্রুত বেড়েছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানায় তার নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরে বারবার নীতি সুদ হার কমানোর দাবি তুলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর তা আমলেই নেননি। উন্নত বিশ্বের সব কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অনেক উন্নয়নশীল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও নীতি সুদ হার উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনছে। বাংলাদেশের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায়ও নীতি সুদ হার ২.৭৫ থেকে ৫.২৫ শতাংশের মধ্যে। এর পরও বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন অনমনীয় মনোভাব কেন?
অর্থনীতির স্বার্থে বেসরকারি খাতে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে। আর সে জন্য ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানোর কোনো বিকল্প নেই।
