
সরকারের সঠিক পরিকল্পনার অভাবে দেশের শস্যভান্ডারখ্যাত উত্তরাঞ্চলে বোরো ধান বিক্রি করে চাষিদের লোকসান গুনতে হয়েছে। সরকার ১০ দিন দেরি করে ধান কেনার কারণে চাষিরা দালাল-ফড়িয়াদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাজারে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এলাকা ও ধানের জাতভেদে প্রতি মণে চাষিদের লোকসান গুনতে হয়েছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ গত বছর একই সময়ে বোরো ধান বিক্রি করে চাষিদের এলাকা আর ধানের জাতভেদে লাভ হয়েছে কমপক্ষে ৪০০ টাকা। চাষিরা অভিযোগ করে বলছেন, ফলন ভালো হওয়ার পরও তাদের লোকসান গুনতে হয়েছে। এ ছাড়া অসময়ে বৃষ্টি এবং শ্রমিকসংকট রয়েছে। চলনবিলের অনেক এলাকা এখন বৃষ্টির পানিতে ডুবে আছে। নষ্ট হচ্ছে ধান আর শ্রমিকসংকটের কারণে অনেক স্থানে পাকা ধান কাটতে পারছেন না চাষিরা। যেসব এলাকায় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে গত বছরের তুলনায় খরচ অনেক বেশি। এ ছাড়া খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা এবং কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, লোকসানের মূল কারণ ধান-চাল কেনার সময় নির্ধারণের ভুল সিদ্ধান্ত আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তাই সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ- চাষিদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে এলাকাভিত্তিক দাম ও ধানের ধরন ঠিক করে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
খাদ্য অধিদপ্তর চলতি বোরো মৌসুমে ৩৬ টাকা কেজি দামে ৫ লাখ মেট্রিক টন ধান, ৪৯ টাকা কেজি দামে ১২ লাখ মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল আর ৪৮ টাকা কেজি দামে ৫০ হাজার মেট্রিক টন আতপ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের হিসাবে বলা হয়েছে, গত বছরের তুলনায় ১০ দিন পর ধান-চাল কেনা শুরু হলেও এবার চাষিরা আসছেন সরকারি গুদামে। গত ১২ মে পর্যন্ত ১০ দিনে খাদ্য অধিদপ্তর সারা দেশে সংগ্রহ করতে পেরেছে ৩ হাজার ৮৩ মেট্রিক টন ধান, ৮ হাজার ১৫ মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল, আর আতপ চাল পেয়েছে ১ হাজার ৪৩৯ মেট্রিক টন।
চলতি বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশে ৫০ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর থেকে ২ কোটি ২৬ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। জাতীয় গড় ফলন নির্ধারণ করা হয়েছে হেক্টরপ্রতি ৬ দশমিক ৬৯ মেট্রিক টন। ধান উৎপাদনের দিক থেকে যেসব উপজেলা এগিয়ে, তার মধ্যে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা অন্যতম। চলতি বছর উপজেলায় বোরো ধান চাষ হয়েছে ২২ হাজার ৪১০ হেক্টর।
উত্তরাঞ্চলের সব জেলায় ধান কাটা-মাড়াই একসঙ্গে শুরু হয় না, চাষের ক্ষেত্রেও তাই। ধানের দাম ভালো পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে খাদ্য অধিদপ্তরের ক্রয় পরিকল্পনার ওপর। কারণ মৌসুমের শুরুতে সরকার ধান-চাল কেনা শুরু করলে বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হারায় দালাল-ফড়িয়া চক্র। আর তখন কষ্টের ফসল বিক্রি করে লাভের মুখ দেখেন চাষিরা। কিন্তু এবার উত্তরাঞ্চলে সেই প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় ঘটেছে। সরকারের সঠিক পরিকল্পনার অভাবে চাষিরা তাদের ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে একটি সঠিক ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কৃষকদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে ধানের জাত ও মানভেদে দাম নির্ধারণ করতে হবে। দালাল বা ফড়িয়ারা যাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে এবং চাষিরা যাতে লাভবান হন, সে জন্য সরকারকে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ধান কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
