
ভূমিদস্যুতার নতুন নজির স্থাপিত হয়েছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়। ছলে-বলে-কৌশলে ফসলি জমির মালিকদের কাছ থেকে জমির মাটি কেটে ইটভাটায় ব্যবহার করে ধ্বংস করা হচ্ছে পরিবেশ। এমনকি অবৈধভাবে জমির মাটি আত্মসাৎ করার জন্য ১০০ একর ফসলি জমির মাঝখান দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বাঁধ। সাতকানিয়া উপজেলার মৌলভীর দোকান থেকে সাতকানিয়া বাজার পর্যন্ত এই ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পশ্চিম পাশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে কয়েক বছর ধরে চলছে মাটির হরিলুট। সেখানকার সম্পূর্ণ মাটির ব্যবসা চলে গেছে ভূমিদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে। মাটি লুটের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন এমন এক ব্যক্তি, যিনি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আগে ক্ষমতার দাপটে তিনি যেভাবে দস্যুতা চালিয়ে গেছেন, এখনো তেমনি সক্রিয়। থানা-কোর্টে অভিযোগ করেও হারানো জমির মালিকরা তাকে থামাতে পারেননি। কিন্তু এত কিছুর পরও প্রশাসনের এই লুটপাট নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। নির্বিচার দস্যুতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মূল জমির মালিকরা একে একে হারাচ্ছেন তাদের উর্বর ফসলের জমি। এ-সংক্রান্ত যে সংবাদ পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয়েছে, তা যেমন রোমহর্ষক, তেমনি মাফিয়া পর্যায়ের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সাতকানিয়া উপজেলার মহাসড়কের দুই পাশে রয়েছে অসংখ্য ইটভাটা। এই ইটভাটাগুলোর চাহিদা মেটাতে গিয়ে আশপাশের টিলা ও উঁচু জমির মাটি অনেক আগেই শেষ করে ফেলা হয়েছে। মাটিখেকোরা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের পাশের মাটিও কেটে বিক্রি করে দিয়েছেন। এরপর তাদের নজর পড়েছে ফসলি জমির মাটির ওপর। এই মালিকদেরই একজন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উপজেলা কমিটির সদস্য বাবর আহমদ বাবু প্রথমে মৎস্য চাষের কথা বলে কিছু জমির মালিকের কাছ থেকে জমি ইজারা নেন। পরে এই জমিকে ইটভাটার মাটির উৎস হিসেবে ব্যবহার করে নির্বিচারে মাটি কেটে নিয়ে যেতে থাকেন। জমির মালিকরা যখন তার এই অপকর্ম সম্পর্কে অবগত হয়ে জমি দিতে অস্বীকার করেন, তখন তিনি নানা ফন্দিফিকির করে পুরো এলাকার ফসলি জমি দখল বা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন।
প্রথমত, তিনি চড়া দামে একটা জমি কিনে নেন। সেই জমির মাটি কেটে বিরাট গর্ত করেন। ওই গর্তের কারণে আশপাশের জমির পানি হয় সরে শুকিয়ে যায় অথবা পাশের জমিতে ভাঙন দেখা দেয়। চাষাবাদের উপযোগী থাকে না। এভাবেই তিনি আশপাশের ক্ষতিগ্রস্ত জমিগুলো কিনে নেন। দ্বিতীয় আরেকটি কৌশলে তিনি জমির দখল নেন। রাতের আঁধারে তার শ্রমিকরা অন্যের জমির মাটি কেটে নিয়ে যান। পরে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলে সেই জমি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে তার কাছে বিক্রি করতে বাধ্য করেন। এভাবেই রসুলাবাদ এলাকার তিন ফসলি কৃষিজমি কালক্রমে বিশাল জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। এই দস্যুতা নিয়ে সাতকানিয়া থানায় অভিযোগ করতে গেলে থানা মামলা নেয়নি। পরে ভুক্তভোগীরা মাটি লুটের বিষয়টি লিখিত আকারে চট্টগ্রামের ডিআইজিকে জানান। যার বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ, সেই বাবর আহমদ বাবুর বিরুদ্ধে আগে থেকেই অনেক অভিযোগ করা হয়েছে এবং মামলা রয়েছে। চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারেও ছিলেন। কৃষিজমির মাটি লুট ও বিভিন্ন ইটভাটা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অন্তত দেড় ডজন অভিযোগ, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও মামলা হয়েছে। এসব অভিযোগ থানা, আদালত, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা প্রশাসক (ডিসি), পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশের বিভিন্ন স্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে ওই এলাকার ইটভাটার ওপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সাধারণ কৃষকরা কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
আমরা মনে করি, অবিলম্বে এই দস্যুতা, মাটি লুট এবং ইটভাটাগুলো বন্ধ করা প্রয়োজন। এই লুটপাট একাধারে ফসলি জমিকে ধ্বংস করছে, সেই সঙ্গে পরিবেশের যে বিপর্যয় ঘটছে, কোনো কিছুর বিনিময়ে তা পূরণ হওয়ার নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেবল দুর্নীতি রোধে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিভিত্তিক এবং নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। সাতকানিয়ায় যে ভূমিদস্যুতা চলছে, তাও ভূমিকেন্দ্রিক ও পরিবেশকেন্দ্রিক একধরনের দুর্নীতি। এই দস্যুতা বন্ধে সর্বোচ্চ আদালত যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন, সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগী হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
