গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয়
সংসদ নির্বাচনের দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে
মানুষ। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের ঘরমুখো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। ভোট দেওয়ার উৎসাহ আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর
আনন্দ থাকলেও, পথে পথে নানাবিধ ভোগান্তি সাধারণ মানুষের কপালে ফেলছে
চিন্তার ভাঁজ।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) থেকে নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে
টানা চারদিনের সরকারি ছুটি শুরু হচ্ছে। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানেও তিন
থেকে চার দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মচারীদের
ভোটাধিকার প্রয়োগের সুবিধার্থে আজ মঙ্গলবারও (১০ ফেব্রুয়ারি) ছুটি দিয়েছে।
ফলে
সকাল থেকেই সদরঘাটে পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, চাঁদপুর ও মুন্সীগঞ্জগামী
পন্টুনগুলোতে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুপুরের
পর থেকে যাত্রীর চাপ আরও বাড়তে শুরু করে। রাত পর্যন্ত যাত্রীদের চাপ থাকবে।
অনেকে
আগেভাগেই পরিবার পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, আজ নিজে যাচ্ছেন। লঞ্চঘাটের
স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। মাইকে বারবার লঞ্চের অবস্থান ও
নিরাপত্তা বার্তা প্রচার করা হচ্ছিল।
পথে পথে ভোগান্তি:
সরেজমিনে
দেখা যায়, আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাইলেও রাজধানীর যানজট ও সড়কে
অব্যবস্থাপনা যাত্রীদের নাজেহাল করে তুলেছে। বিশেষ করে সদরঘাট এলাকার
প্রবেশপথগুলোতে তীব্র জট দেখা গেছে। যাত্রীদের ঘাটে আসতে গণপরিবহন থেকে
নামতে হয়, প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে রায়সাহেব বাজার মোড়ে। এই সড়কটিতে
বর্তমানে রিক্সা, ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনের তীব্র যানজট থাকায় বাধ্য হয়ে
যাত্রীদের পায়ে হেঁটেই ঘাট পর্যন্ত আসতে হচ্ছে। আর সড়কের দুপাশে ফুটপাতের
ওপর অস্থায়ী দোকানপাট বসায় চলাচলের পথ হয়ে গেছে সরু। ফলে মালামাল ও
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘাট পর্যন্ত আসতে পড়তে হচ্ছে নানা ভোগান্তিতে।
আর এসব স্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তা কর্মীদের উপস্থিতিও কম ছিল।
গাজীপুর
থেকে সপরিবারে আসা আলী আহমেদ তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে জাগো নিউজকে বলেন,
বাসা থেকে বের হয়ে সদরঘাট আসার জন্য গণপরিবহন পেতেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে
হয়েছে। ভাড়াও গুনতে হয়েছে বেশি। বাস থেকে রায়সাহেব বাজার মোড়ে নামার পর
বিপত্তি আরও বাড়ে। সেখান থেকে লঞ্চঘাট পর্যন্ত পুরো রাস্তা যানবাহন আর
ভ্যানে স্থবির হয়ে ছিল। ফুটপাতগুলো হকারদের দখলে থাকায় পরিবার নিয়ে হেঁটে
আসাও অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তবে ঘাটে এসে লঞ্চের দেখা পেয়ে সব ক্লান্তি
ভুলেছি।
একই অভিযোগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামিম ইকবাল।
তিনি বলেন, ভোট দেওয়া নাগরিক দায়িত্ব, তাই বাড়ি যাচ্ছি। কিন্তু সদরঘাটের
সংযোগ সড়কগুলোর বিশৃঙ্খলা দূর না করলে সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তি কোনোদিনও
শেষ হবে না।
গৃহিণী রেহানা ইয়াসমীন বলেন, পরিবার আর দুই সন্তান নিয়ে
মিরপুর থেকে আসলাম। রাস্তার যে অবস্থা, বিশেষ করে রায়সাহেব বাজার থেকে
সদরঘাট পর্যন্ত হেঁটে আসা আমাদের জন্য বিভীষিকা ছিল। ছোট বাচ্চা নিয়ে
ফুটপাত দিয়ে হাঁটার উপায় নেই, সব দোকানদারদের দখলে। কর্তৃপক্ষ যদি এই
কয়েকটা দিন রাস্তা পরিষ্কার রাখতো, তবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অর্ধেক কমে
যেত।
ঘাটে অপেক্ষমাণ যাত্রী আব্দুল খালেক বলেন, শরীরের অবস্থা ভালো না
হলেও ভোটের টানে বাড়ি যাচ্ছি। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবো, এটা একটা
বড় পাওয়া। ভোগান্তি তো আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী, তবুও বাড়ির টানে সব সহ্য
করা যায়।
ভোট ও বাড়ি ফিরতে পারায় উচ্ছ্বাস:
ভোগান্তি থাকলেও
প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেখা গেছে বিশেষ
উদ্দীপনা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাফসান জনি বলেন, এবারই
প্রথম ভোটার হয়েছি। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে সরাসরি ব্যালটে ভোট দেবো। এই
উত্তেজনায় রাস্তার ভোগান্তি গায়ে লাগছে না। বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ করে বাড়ি
যাচ্ছি, আনন্দই আলাদা।
সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ আব্দুল হাই লাঠিতে ভর দিয়ে
লঞ্চে উঠছিলেন। তিনি বলেন, ভোট দেওয়া আমাগো আমানত। শরীর চলে না, তবুও
নাতি-পুতিদের নিয়ে গ্রামে যাচ্ছি যেন নিজের হকটা আদায় করতে পারি। বাড়িতে
সবাই একসঙ্গে হবো, এর চেয়ে বড় পাওনা আর নাই।
চাঁদপুর যাওয়া ইডেন কলেজ
শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন বলেন, আমি এবার প্রথম ভোটার হয়েছি। নিজের ভোটটা
নিজে দেওয়ার জন্য অনেকদিন ধরে অপেক্ষায় ছিলাম। ডিজিটাল বাংলাদেশের নাগরিক
হিসেবে ব্যালটে সিল মারাটা আমার কাছে একটা বড় ইভেন্ট। যদিও সদরঘাট পর্যন্ত
আসতে রিকশা আর ভ্যানের জটলায় দুই ঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছে, তাও ভোট দেওয়ার
রোমাঞ্চে সব কষ্ট ভুলে গেছি।
বরিশালে লঞ্চের অপেক্ষায় থাকা অবসরপ্রাপ্ত
সরকারি কর্মকর্তা হাজী মোজাফফর আলী বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে অনেক
নির্বাচন দেখেছি। নাগরিক দায়িত্ব পালনের জন্য গ্রামে যাচ্ছি। সদরঘাটে
মানুষের এই যে স্রোত, এটা প্রমাণ করে মানুষ এখনো গণতন্ত্র আর উৎসবকে কতটা
ভালোবাসে। তবে ফুটপাতগুলো যদি দখলমুক্ত থাকতো, তবে আমার মতো বয়স্কদের জন্য
যাতায়াতটা একটু সহজ হতো।
