
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম সূচকগুলোর অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। দেশে কর্মসংস্থান নেই, বেকারত্ব বাড়ছে, বিনিয়োগে রয়েছে খরা। রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকায় মূল্যস্ফীতি কমছে না। এতে সরকারের অর্থসংকট আরও বেড়েছে। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচিত সরকার এলেও এ সংকট কাটিয়ে অর্থনীতিতে গতি আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। বর্তমানে বেশির ভাগ নীতি ব্যবসাবান্ধব নয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই সংশোধিত শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে। ব্যাংকঋণে সুদের হারে ছাড় নেই। এলসি (ঋণপত্র) খোলায় কড়াকড়ি করা হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকায় বিদেশিরা বিনিয়োগে আস্থা পাচ্ছেন না। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর অচল হয়ে পড়েছে। বন্দরের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসেছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ দেশে এসে ব্যবসা পরিচালনা করতে নিরুৎসাহিত হবেন। বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা বাংলাদেশ সরকার যে-ই জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ার হিসাব করুক না কেন, এটা স্পষ্ট যে অর্থনীতির এই পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়বে না। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, গত এবং চলতি অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচক প্রায় একই আছে। চলতি অর্থবছরের জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ার তেমন প্রভাব নেই অর্থনীতিতে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমবে। নতুন সরকার কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করলে শিল্প খাত শক্তিশালী হবে এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। এতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে। তবে ঝুঁকির কথা হলো, মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর করায় ঋণের প্রবাহ কমেছে, যা ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিবিএসের তথ্যানুসারে, এক দশক ধরেই দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫ থেকে ২৭ লাখের মধ্যে। গত কয়েক বছরে দেশে বাণিজ্য চক্রজনিত বেকারত্ব বাড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। প্রতিবছর দেশে অন্তত ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে আসছে। গত কয়েক বছরে ১৪ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে। আগের বেকারের সঙ্গে নতুন বেকার যোগ হয়ে অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি এক থেকে দেড় বছর পর ৬ শতাংশ আসতে অর্থনীতিতে যে প্রস্তুতি দরকার, তা যে সরকারই দেশ পরিচালনায় থাকবে তার পক্ষে কঠিন হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক অর্থনীতির বিশ্লেষক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। হিসাব মেলানোর জন্য কিছু প্রাক্কলন করা হলেও তা বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। একটা নির্বাচিত সরকার এলেও রাতারাতি দেশে বিনিয়োগ বাড়বে না। শিল্পকারখানা নির্মাণে সময় লাগবে। রাজস্ব আয় বাড়বে না। অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীদের বেতনের বাড়তি অর্থ জোগাড়, প্রকল্প বাস্তবায়ন নতুন সরকারের জন্য কঠিন হবে।
দেশের অর্থনীতি ক্ষত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরে। সংকট উত্তরণে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা খুব একটা সফল হয়নি। কারণ আগে থেকেই অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে নেতিবাচক ধারা প্রবহমান ছিল। সেই ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার। এ জন্য সরকারকে কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অর্থনীতির ক্ষত সারিয়ে তুলতে বেসরকারি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বেকারত্ব দূর করতে হলে কর্মসংস্থান বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকার অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে একটি কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করবে, এটাই কাম্য।
