শনিবার ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
২৫ মাঘ ১৪৩২
নির্বাচনি প্রশাসনের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত
ড. সুলতান মাহমুদ রানা
প্রকাশ: শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:১৪ এএম আপডেট: ০৭.০২.২০২৬ ১২:৩৫ এএম |

 নির্বাচনি প্রশাসনের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত
যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেই পরীক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে নির্বাচনকালীন প্রশাসনের কার্যক্রম। প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ থাকে, আইনের শাসন নিশ্চিত করে এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান মাঠ তৈরি করতে পারে, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন- তা জনগণের কাছে আস্থা অর্জন করতে পারে। কিন্তু প্রশাসন যখন পক্ষপাতমূলক আচরণ করে তখন পরিস্থিতি ভিন্নরকম হয়। পারস্পরিক অনাস্থার পরিবেশ তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। এতে নির্বাচনি প্রক্রিয়া এবং গণতন্ত্র হয়ে ওঠে প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে প্রশাসনের ভূমিকা বরাবরই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। নির্বাচনকালীন মাঠ প্রশাসন, পুলিশ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। নির্বাচনকালীন কখনো একদল আরেক দলের সভা-সমাবেশে বাধা, কখনো হামলা, হত্যা, জখম প্রভৃতি প্রসঙ্গ নিত্য হয়ে ওঠে। এ ছাড়া কখনো নির্বাচনি আচরণবিধির অসম প্রয়োগ, আবার কখনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ উঠে আসে। ফলে নির্বাচন শুরু হওয়ার আগেই জনমনে সন্দেহ জন্ম নেয়। আর এ সন্দেহ থেকে নির্বাচন আদৌ কতটা অবাধ ও নিরপেক্ষ হতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলেও বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আস্থার সংকট এখনো কাটেনি। এ সংকট শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সাধারণ ভোটারও প্রশ্ন করছে। ভোট দেওয়ার পরিবেশ আদৌ নিরাপদ ও সমান হবে কি না- এ প্রশ্নটিও সামনে আসছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গণতন্ত্রে নিরপেক্ষতার প্রশ্ন ওঠা সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়। কারণ যখন ভোটারের আস্থা নষ্ট হয়, তখন ভোটাধিকার অর্থহীন হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন গণভোটকে কেন্দ্র করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে নামানোর এক ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে, যা বিদ্যমান দেশের নির্বাচনি আইন ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর ৮৬ অনুচ্ছেদ এবং গণভোট অধ্যাদেশের ২১ ধারা অত্যন্ত স্পষ্ট। এতে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি যদি তার পদমর্যাদার অপব্যবহার করে নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, তবে তা দণ্ডনীয় অপরাধ। নির্বাচন কমিশনও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছে যে, সরকারি কর্মচারীরা কেবল ভোটারদের সচেতন করতে পারেন, কিন্তু কোনোভাবেই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনোটির পক্ষে প্রচার চালাতে পারেন না। এমনকি রিটার্নিং বা প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বৈধতাই সংকটে পড়বে। 
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পাঠানো নির্দেশনায় ২১ লাখ সরকারি কর্মচারীকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় সম্পৃক্ত করার খবরটি উদ্বেগজনক।
নির্বাচনকালীন দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো, নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রশাসনের যেকোনো ধরনের একপেশে তৎপরতা বন্ধে কঠোর ভূমিকা নেবে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা যেন কোনো বিশেষ আদর্শ বা পক্ষের সেবক না হয়ে কেবল আইনের সেবকে পরিণত হন, তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি নেতারা পাল্টাপাল্টি দাবি করেছেন যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নির্বাচন-সম্পর্কিত কর্মকর্তারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাত দেখাচ্ছে এবং মাঠে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা ‘সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ’ তৈরি হচ্ছে না। এমনকি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল অভিযোগ তুলেছে যে, ব্যবস্থাপনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আচরণ একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক ভূমিকা নিচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা দাবি করেছেন যে, প্রশাসন ও পুলিশ নিরপেক্ষ আচরণ করছে না এবং প্রথম দিনেই তার নিজের নির্বাচনি প্রচার কাজ সহজভাবে করতে বাধা দিয়েছে- এজন্য তিনি প্রশাসনের আচরণকে পক্ষপাতমূলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও বিষয়গুলো প্রমাণিত নয়, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এ ধরনের অভিযোগ এবং অভিযোগের সত্যতা যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে নির্বাচনকালীন প্রশাসনের নিরপেক্ষতা কঠোরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত বিষয়। যুক্তরাজ্যে নির্বাচনের সময় সিভিল সার্ভিসকে কার্যত ‘নীরব রাষ্ট্রযন্ত্র’ হিসেবে কাজ করতে হয়। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন না। নির্বাচনের আগে ও পরে সরকারের ক্ষমতা সীমিত থাকে, যাতে প্রশাসন কোনো পক্ষকে সুবিধা দিতে না পারে। এই রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা সেখানে প্রশাসনিক সংস্কৃতির অংশ, কোনো ব্যক্তিগত সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়।
কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে নির্বাচন কমিশন কেবল ভোট আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি প্রশাসনের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে সক্ষম একটি শক্তিশালী সংস্থা। নির্বাচনি সময়ে কোন কর্মকর্তা কোথায় দায়িত্ব পালন করবেন, কে বদলি হবেন, কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য- সবকিছুই কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ফলে সরকার চাইলেও প্রশাসনকে সরাসরি ব্যবহার করতে পারে না। প্রশাসন এখানে রাষ্ট্রের, কোনো দলের নয়, এ ধারণাটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত।
আফ্রিকার কিছু উদীয়মান গণতন্ত্র এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ঘানায় নির্বাচনকালীন প্রশাসনের ওপর নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের নজরদারি একটি স্বীকৃত প্রক্রিয়া। প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত জনপর্যবেক্ষণের আওতায় থাকে বলে কর্মকর্তারা পক্ষপাতমূলক আচরণ করতে সাহস পান না। এখানে নির্বাচন শুধু রাষ্ট্রের বিষয় নয়, সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তারা চাইলে প্রমাণ করতে পারে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র দলনিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, আইন সবার জন্য সমান হতে পারে এবং ভোটার নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে। এটি করতে হলে প্রশাসনকে কেবল নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মানলেই চলবে না; নিজেদের আচরণ, সিদ্ধান্ত ও ভাষার মধ্যদিয়েও নিরপেক্ষতার বার্তা দিতে হবে। প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ থাকে, নির্বাচন আপনাআপনি বিশ্বাসযোগ্য হয়। আর প্রশাসন যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তখন সবচেয়ে সুন্দর নির্বাচনি আইনও মূল্যহীন হয়ে পড়ে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
ঘাঁটি পুনরুদ্ধারের লড়াই বিএনপির দৃঢ় অবস্থানে জামায়াত-এনসিপি
জিয়াউর রহমানের আদর্শের বিএনপি এখন আর নাই
দি কাজী ফাউন্ডেশন এর আয়োজনে কুমিল্লায় ফ্রি হেলথ ক্যাম্প
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সনাতনী সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- মনিরচৌধুরী
বরুড়ায় বিএনপি প্রার্থীর উঠান বৈঠক-পথসভা
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
হাসনাতের আসনে গণঅধিকারের জসিম উদ্দিনকে বিএনপির সমর্থন
লাশ পোড়ানোর মামলায় ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড
আপনারা জানেনও না, নীরবে বিপ্লব ঘটে গিয়েছে
৩০০ টাকার ঘুষের ভিডিও প্রচার না করতে ২৯ হাজার টাকা প্রদান
কুমিল্লায় বাসচাপায় আহত ছাত্রীর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২