বৃহস্পতিবার ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
২৩ মাঘ ১৪৩২
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ও পরিবেশ রক্ষায় একমাত্র সহায়
অধ্যাপক ডা: মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:৩৬ এএম আপডেট: ০৫.০২.২০২৬ ২:০৯ এএম |

 নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ও পরিবেশ রক্ষায় একমাত্র সহায়
বিদ্যুৎ খাত জীবাষ্ম জ্বালানি থেকে বের হতে পারছে না, গ্রিডের প্রায় ৪৩ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে গ্যাস থেকে, যদিও এর বড় অংশ এখন আমদানি করা এলএনজি যা আর সস্তা নয়। গ্যাস কমতে শুরু করলে সরকার তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ঝুঁকে পড়ে- ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলে। শুরুতে ফার্নেস অয়েল সস্তা মনে হলেও পরে ইউনিট প্রতি ১৭-২০ টাকায় পৌছায়। ডিজেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ আরও ব্যয়বহুল- ৩০-৩৫ টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে যোগ হয় ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের সুবিধা। এমনকি ২০১৮ সালে অপ্রয়োজনীয় একটি বড় ডিজেল কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। যা তিন বছরে খুব সামান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও বিপুল ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেয়া হয়েছে। অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ হয়নি। কাগজে কলমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বড় বড় লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে অগ্রগতি ছিল না। বর্তমান সরকার ২০২৩ সালে ২০ শতাংশ ও ২০৪১ সালে ৩০ শতাংশ নবাযনযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন। নীতিমালাও হয়েছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি চোখে পড়ে না, বরং বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিলের পর বেসরকারি খাতের ৩৭টি নবায়নযোগ্য প্রকল্পের সম্মতিপত্র বাতিল করা হয়েছে।
১৯৫৭ সনে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র দিয়েই দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার শুরু। দু:খজনক হলেও সত্য, এরপর দীর্ঘ সময় আমরা আর নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে এগোতে পারিনি। ২০০৫-০৭ সময়ে দেশে ব্যাপক বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হয়। ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিং ছিল। ২০০৮ সাল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে শুরু করে এবং আজ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় পাঁচগুন বেড়েছে, ২০১২-১৩ সালেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২.৫৮ শতাংশ। ঐ সময় থেকে প্রতিবছর দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়তে থাকে। আর উল্টোদিকে ২০১৯-২০ অর্থ বছর পর্যন্ত কমতে থাকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন। গত এক যুগে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বেড়েছে মাত্র ২.১৬ শতাংশ। তবে মহাপরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বারবার লক্ষ্য নির্ধারন করা হয়েছে। ২০১৬ সালে পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, ২০২১ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসবে। সেটি হয়নি পরে ২০২৫ সালের কথা বলা হল। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষে এসে দেখা হল, নবায়নযোগ্য উৎস থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হল ৪ শতাংশ।
সরকারের পরিবর্তন হল এবং মনে হয়েছিল এটি একটি বিরাট সুযোগ, কিন্তু দেখা গেল এ সরকারের আমলেই ঘাটতি ৯৪ শতাংশ বেড়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে ১২ টাকার উপরে। এখন আরও স্পষ্ট যে দেশে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু সম্পদ তৈরি হচ্ছে না। টাকা তৈরি হচ্ছে, আর সে টাকা পাচার হচ্ছে। শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, শুধু বিদ্যুৎ খাত থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। যেখানে রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে লুটপাট হয় এবং টাকা পাচার হয় সে অর্থনীতিতে নীতি দর্শন ঠিক থাকলেও মাস্টার প্লান ফেইল করতে বাধ্য। আজ বিদ্যুতের দাম যদি ১২ টাকায় থাকে আর প্রতিবেশি দেশ থেকে ৮-৯ টাকায় বিদ্যুৎ আসে, তাহলে এটা নিজেদের বাজারে আমদানির সুযোগ সৃষ্টি ছাড়া আর কি?  বিদায়ী সরকার ইডকলের সোলার হোম সিস্টেম ও মিনিগ্রেডের গল্প শুনিয়ে শেষ মুহূর্তে মিনিগ্রিড ন্যাশনালাইজ করে দিয়েছে। বিদ্যুৎ কেনার কথা বলা হলেও সেই বিদ্যুৎ কোথায় গেল। তার কোন হদিস নাই। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনার কথা বললেই বার বার জমির সংকটের কথা বলা হয়। কিন্তু ছাদ ভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বিশাল সম্ভাবনা আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। ভিয়েতনাম যেখানে ছাদ ব্যবহার করে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে সেখানে আমাদের সরকারি ভবনের ছাদে ঘোষিত লক্ষ্যের সামান্য অংশও অর্জিত হয়নি। কিছু অগ্রগতি হয়েছে শিল্প কারখানায় ছাদ ব্যবহার করে। তবুও গতি খুব ধীর। লক্ষ্য আছে, পরিকল্পনা আছে, কিন্তু বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও দৃঢ়তা নেই।
আমাদের ইনিষ্টিটিউশনগুলো এখনো ফাসিল ফুয়েলকেন্দ্রিক। এ কাঠামো দিয়ে এনার্জি ট্রানজিশন সম্ভব নয়। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য। বোর্ড, প্রশিক্ষণ, মানবসম্পদ সব জায়গায় ফসিল ফুয়েলের প্রভাব আছে।  সংযোগ দেয়ার দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রতিষ্ঠান সংযোগ দেয় না। কারণ, ফসিল প্লান্ট থেকে তাদের একধরনের আয় আসে। কাগজে ভাল কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নাই। ইপিএসএমপির ভেতরে নীতিতে ভ্রান্তি রয়েছে। টেকনিক্যাল পর্যায়ে কর্মরত জনবলের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যাকগ্রাউন্ড নাই, ফলে আগ্রহও নাই। মানব সম্পদ পর্যায় থেকেও বাধা তৈরি হচ্ছে। গত সকারের সময় সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি খাত বিদেশি কোম্পানী ও বিদেশী সরকারের মধ্যে একটি শক্ত নেক্সাস তৈরি হয়েছিল। এমন কি নীতি নির্ধারনী পর্যায়েও এর প্রভাব পড়েছে। ভিন দেশগুলো পলিসি প্রনয়নে ঢুকে পড়েছে, যেখানে এলএনজি ও কয়লাকে দিয়ে নবায়নযোগ্য খাত বানানোর চেষ্টা দেখা গেছে। সমাধানের পথে আমাদের ডিষ্ট্রিবিউটেড রিনিউয়েবল এনার্জিতে জোর দিতে হবে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও কার্যক্রম সীমিত। সীমিতসংখ্যক জনবল দিয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিপ্রনয়ন এবং কার্যক্রম বাস্তবায়নে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারতেছেনা। অন্যদিকে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বেসরকারী খাতের উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলো গ্রহণ বা সমন্বয় হচ্ছে না। শুরুতে বাংলাদেশে সীমিত মেগাওয়াট প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কম থাকলেও সরকারি ইউটিলিটি- স্কেল প্রকল্প এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতির দীর্ঘ মেয়াদি লক্ষ্য তুলে ধরে ধীরে ধীরে আস্থা তৈরি করা যাচ্ছে। প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই ও মান উন্নয়নের উপর জোর দেয়া হয়েছে। যাতে প্রযোজনীয় উন্নয়ন নিশ্চিত হলে প্রকল্পের অর্থায়ন সম্ভব হয়। স্পষ্ট প্রকল্প পাইপ লাইন, আন্তর্জাতিক মানের ভূমি প্রস্তুতি, এবং দীর্ঘমেয়াদী মেগাওয়াট লক্ষ্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে। একই সঙ্গে জ্বালানি রুপান্তর প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে হলে এখাতে যুক্ত নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকদের মধ্যে কার্যকর যোগসূত্র গড়ে তোলা জরুরী। এক্ষেত্রে উভয় পক্ষের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুতের গড় খরচ নিয়ে যে সংখ্যা আমরা দেখি, বাস্তবে তার পেছনে অনেক ব্যয় হিসাবের বাইরে থেকে যায়- গ্রিড অবকাঠামো, আমদানি জ্বালানির করমুক্ত সুবিধা, ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি অপচয় ও চুরি- এসব উপাদান বিবেচনায় না রেখে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ব্যয়বহুল বলা হচ্ছে। প্রযুক্তিগতভাবে সৌর বিদ্যুতের বড় কোন সীমাবদ্ধতা নাই- রিসাইক্লিং ছাড়া প্রায় সব দিকে এটি প্রতিযোগিতামূলক ও কার্যকর। তবু নীতিগত জটিলতা, অতিরিক্ত কর এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসুত্রিতা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। মাঠ পর্যায়ে বিএসটিআই পরীক্ষাসহ বিভিন্ন অনুমোদনে মাসের পর মাস সময় লাগে। একটি কারখানায় স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চার মাসেও সংযোগ পায় না- ফলে বিনিয়োগের সুদ, উৎপাদন ক্ষতি ও আবস্থার সংকট তৈরি হয়। এ বাস্তবতা ব্যবসায়ীদের ধৈর্য ভেঙ্গে দিচ্ছে। নীতিমালা প্রনয়নে অংশীজনের মতামত নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা উপেক্ষিত হয়- ফলে বড় লক্ষ্য ঘোষনা করেও বাস্তবে অগ্রগতি শুন্যের কাছাকাছি থাকে। সরকারেরও লক্ষ্য ২০২৩ সারে ২০ শতাংশ ও ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা অর্জন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও রোডম্যাপও সেভাবে স্বচ্ছ নয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিশেষজ্ঞদের অন্তভূর্ক্তি অনেক কম। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সঠিক ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নাই। বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসাবে ঋণ পূণবির্ন্যাস করে নবায়নযোগ্য প্রকল্পে ব্যবহার করার সুযোগ থাকা স্বত্ত্বেও তা এখানে কাজে লাগানো হচ্ছে না। বাংলাদেশে ফসিল- ফুয়েল নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য খাতের উত্তরন সম্ভব। কিন্তু তার জন্য দরকার স্বচ্ছ নীতিমালা, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সদ্ব্যবহার, মিডিয়ার স্বাধীন ভূমিকা, স্পষ্ট রোডম্যাপ ও দেশপ্রেমিক উদ্যোগ। নবায়নযোগ্য খাতের জন্য প্রযুক্তি বা টাকা কেবল অংশ মাত্র। গণমাধ্যম ও নীতিপ্রক্রিয়া মিলিয়ে কাজ না করলে বাংলাদেশের  ফসিল-ফুয়েল নির্ভরতা কমানো কঠিন। মনে রাখতে হবে বিদ্যুৎ ও কৃষিখাতে প্রয়োজনীয় ভতূর্কি দিয়ে হলেও জাতিকে অগ্রগামী করতে হবে।   (সংগৃহীত)  
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
কুমিল্লায় সবচেয়ে বেশি পোস্টাল ব্যালট নিবন্ধন
মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেই বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হবে: আবিদ
মনোহরগঞ্জে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা
তিতাসে বিএনপিতে যোগ দিতে এসে আ’লীগ নেতা আটক
অবৈধপথে ভারত থেকে আসার সময় নারীসহ আটক ৭
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
হাসনাতের আসনে আলোচনায় গণঅধিকারের জসিম
কুমিল্লা-১০ আসনে একই ছাতার নিচে বিএনপির তিন ভূঁইয়া
বাংলাদেশে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি করার অধিকার নেই- আবিদ
কুমিল্লাকে আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই
বিএনপি-জামায়াতের কাছ থেকে নতুন করে পাওয়ার কিছু নেই : মুফতি রেজাউল করিম
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২