
একজন নাট্যকর্মী, সাংস্কৃতিক সংগঠক, মেহনতি মানুষের অধিকার আাদায়ের লড়াকু সৈনিক মো: বশির আহমেদকে কালকে চির বিদায় দিয়ে আসলাম।
বশিরের
সাথে পরিচয় ৭৬ সালে, উদীচীর নাট্য বিভাগে তখন আমরা ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী।
খুব নরম স্ব ভাবের বশির আসতো মহিলা কলেজ রোড থেকে, দেশের বাড়ী চান্দিনা
বাবার চাকরী সুবাদে কুমিল্লা আসা এবং স্থয়ী নিবাস এখানে।তিন ভাই তিন বোনের
মধ্যে বশির কততম জানতাম না। ৭৬ এ এসএসসি পাশ করে বশির জড়িয়ে পড়ে সাংস্কৃতিক
অঙ্গনে, বশির ধুপের মতো গন্ধ বিলিয়ে যেত এ অঙ্গনে, তখন মহিলা কলেজ রোডের
আকতার হামিদ খানের বাড়ীর রাস্তাটায় প্রগতিশীল রাজনৈতিক অনেকের বাসা যার
মাঝে অন্যতম জুয়েল ভাই, বশির তাদের মাঝে একজন।
৭৮ সালে নাট্যাঙ্গনে
হৈচৈ ব্যাপার স্টেডিয়াম একজিবিশন মাঠে নাট্যউৎসব হবে আয়োজন করেছেন
কুমিল্লার তৎকালীন জেলা প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা এইচ এন আশিকুর রহমান।
উদীচীর তখনকার সাধারণ সম্পাদক এছানুর রহমান, তাঁর বাসাও মহিলা কলেজ রোড
বশিরের বাসার উল্টাদিকের গলি। ১৯৭৪ সাল কুমিল্লা উদীচীর প্রতিষ্ঠাকলীন সময়
থেকেই নাট্য বিভাগ শুরু আমি তার সার্বক্ষণিক কর্মী, ইতিমধ্যে আমরা বেশ
কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ করে ফেলেছি, রবিউল আলমের “জননীর মৃত্যু চাই” মমতাজ
উদ্দিন এর “স্পাটাকাস বিষয়ক জটিলতা”, “ফলাফল নিম্নচাপ” বাদল সরকারের
“শনিবার”। ঠিক হলো নাট্যউৎসবে উদীচী নাটক করবে পান্ডুলিপি ঠিক হলো মো:
এহসান উল্লাহর “কিংশুক যে মেরুতে” নির্দেশনা দেবেন বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম
উদ্দীন আহমেদ খসরু। কুমিল্লা উদীচীর প্রতিষ্ঠতাদের প্রায় সবাই ছিলেন
মুক্তিযোদ্ধা।
মহড়া শুরুহলো মহিলা কলেজ রোডে মিয়া বাদল বৈরাগীর বোনের
বাসা “শ্যামলীতে” (এখন হাসপাতাল) বশিরের বাসার সাথে। সেখানেই বশিরের
নাট্যঙ্গনে অভিষেক হলো কিংশুক যে মেরুতে নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে। এই শ্যামলী
বাসাছিল উদীচীর বহু মহড়ার স্থান। বাদলের ভগ্নীপতি একজন ডাকসাইটের ঠিকাদর
তার বাড়িটি ছিল তখনকার একটি আধুনিক বাড়ি, বিশাল ড্রইং রুম, আপা আমাদের
সন্তানতুল্য আদর করতেন। দুলাভাই ছিলেন একজন সরল মনের মানুষ। আপন শালার মতোই
আমরা তাঁর কাছে গণ্য ছিলাম। মহিলা কলেজ রোডে ছাত্র ইউনিয়ন, উদীচীর দাপটের
সবচেয়ে বড় সাহস ছিল ছাত্র ইউনিয়নের নেতা বাচ্চু ভাই যাকে শহরে একনামে “কলার
বাচ্চু” হিসাবে চিনতো এবং সমিহ করতো, অনেক রাজনৈতিক ঝড় ঝঞ্জা থেকে যিনি
আমদের আগলে রাখতেন। তার বাসাও ছিল ওমেন্স কলেজ রোডে।
’৭৮ এর
প্রদর্শনীতে উদীচীর নাটক পুরস্কার পেলো আমি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার
পেলাম। এ নাটকে (ছবিতে মধ্যে) প্রথম অভিনয় করলো সদ্য প্রয়াত বশির। নাটকের
নায়িকা ছিল মিনু (বাখরাবাদ গ্যাস সিষ্টেমস এর অবসর প্রাপ্ত এজিএম আমার
প্রথম নায়িকা) অন্য যারা অভিনয় করেছিল বাঁ থেকে কিরিট সিংহ (বর্তমানে
কানাডা প্রবাসী) পরাভেজ (বর্তমানে এমেরিকা প্রবাসী) সদ্য প্রয়াত বশির,
রঞ্জিত ও প্রয়াত লুৎফুল আমীন মুরাদ। উদীচী এক সময় রাজনৈতিক কারণে ভাগ
হওয়ার ফলে নাট্যবিভাগ ঝিমিয়ে পড়লো। আমি মুরাদ জনান্তিক নাট্য সম্প্রদায়ে
যোগ দিলাম বশির তপন সাহা ও নাজিম উদ্দীন খসরু তারা মিলে নাট্য সংগঠন করলো
“সংযোগ নাট্য সম্প্রদায়” বশির সেখানে বেশ কটি নাটক করেছে। তখন বশির ছিল
একটি উদ্যোমী তরুন সংগঠক, তবে বশির কখনো নিজকে জাহির করতো না নিরবে কাজ করে
যেত।
বশির একসময় ন্যাপের রাজনীেিত সিরিয়াস ভাবে ঝুকে পড়লো তাঁর
রাজনৈতিক গুরু ছিল কুমিল্লা ন্যাপের সভাপতি প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা জাকির
হোসেন। একসময় জাকির হোসেনের সর্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে গেল বশির এবং ন্যাপের
বিভিন্নকর্মসূচীতে সে থাকতো অগ্রভাগে। তার সাংগঠনিক দক্ষতার ফলে ১৯৮৯ সালে
তাকে বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য দল থেকেসোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) পাঠানো হলো।
বশির হয়ে গেল আমাদের নেতা। কিন্তু যা তার আচরণে কোনদিন প্রকাশ পেত না সে
আমাকে নাট্যগুরু হিসাবে ডাকতো।
বশিরের সাথে আবারও আমার কাজ করার সুযোগ
হয় কুমিল্লা টাউন হলের কাউন্সিলার হিসাবে সেখানে সাথে পেয়েছি তার সতীর্থ
জাকির ভাইয়ের ছোট ভাই টুটুলকে। আমরা তিনজনই ছাত্র ইউনিয়ন থেকে উঠে আসা।
কুমিল্লায়
এমন কোন আন্দোলন নেই যাতে বশিরের অংশগ্রহণ ছিল না। প্রতিটা আন্দোলনে সে
একজন নির্ভীক বক্তাছিল। কুমিল্লার সকল রাজনৈতিক নেতারাই বশিরকে সম্মান ও
স্নেহ কারতেন।
বশির শেষ জীবনে কবিতাও লিখতো, আবৃত্তি করতে চেষ্ঠা করতো।
বর্তমানে শহরের একমাত্র সরব ‘জোড়া শালিক’ পরিবারের একজন ছিল বশির, যার
প্রতিটি অনুষ্ঠানে সে যোগদিত আবৃত্তি ও বক্তব্য রাখতো। বশিরকে নিয়ে লিখতে
গেলে ফুরাবে না।
কুমিল্লা জেলা ঐক্য ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক, খেলাঘর
অন্তপ্রাণ বশির শেষ সময়ে জনান্তিক নাট্য সম্প্রদায়ে যোগদেয় এবং সেই
জনান্তিকের বার্ষিক পিকনিকের যায়গা ঠিক করে ফেরার পথে সিএনজি দুর্ঘটনায়
মারাত্মক ভাবে আহত হয়ে কদিন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে
গত ০৩.০২.২৬ বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে পরপারে চলে যায়। টুটুলের টেলিফোনে তাঁর
মৃত্যু সংবাদ শুনেই তার বাসায় যাই, কিছুক্ষণের মধ্যেই ৯৯৯ এর গাড়িতে তার
চিরচেনা পথ ধরে তাঁর নিথর দেহ নিয়ে তাঁর বাড়িতে গাড়ি এসে পৌঁছে। ততক্ষণে
তাঁর স্বজন, বন্ধুু, সংস্কৃতিজনরা তার বাড়িতে এসেযায়।
০৪.০২.২৬. বাদ
যোহর তাঁরই পদধূলিতে মুখরিত টাউন হল প্রাঙ্গণে নামাজে জানাজা শেষে তাঁর
ওসিয়ত অনুযায়ী টমছমব্রীজ কবরস্থানে তাঁর নেতা জাকির হোসেনের পাশে তাঁকে
সমাহিত করাহয়।
