ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে কুমিল্লা উত্তর জেলায় বেশ নির্বাচনী আমেজ। প্রার্থীরা প্রতীক পাওয়ার পর এই হাওয়া যেন গতি পেয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে একতরফা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মাঠে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কম থাকলেও ৫ আগস্টের পর বদলে গেছে ওই অঞ্চলের পুরো রাজনৈতিক চিত্র। রাজনৈতিক সাংগঠনিক কারণে কুমিল্লার দুই ভাগের একটি উত্তর জেলা, এই অঞ্চলে৫টি আসনেবিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর তীব্র চেষ্টা; আর ১১ দলীয় জোটজাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি, জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশষ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দলের মাঠ পর্যায়ের সক্রিয় তৎপরতা উত্তরাঞ্চলের রাজনীতিকে দিয়েছে সরব মাত্রা। ভোটার সংখ্যা ও কাঠামো, স্থানীয় রাজনীতিতে বিভক্তি ও সহাবস্থান, প্রার্থীদের পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান ও দলীয় সমীকরণ, আর নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা রাজনৈতিক দল সমর্থিত ভোটারদের ভোটÑসব মিলিয়ে উত্তরের পাঁচটি আসনকে কেন্দ্র করে কুমিল্লায় এখন জমজমাট নির্বাচনী আলোচনা ও প্রচারণা।
উত্তরের কুমিল্লা-০২ (হোমনা -তিতাস) ও কুমিল্লা-০৭ (চান্দিনা) আসনে রয়েছে বিএনপি বিদ্রোহী এবং কুমিল্লা-০৪ (দেবিদ্বার) আসনে বিএনপির প্রার্থী নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এছাড়া কুমিল্লা-০১ (দাউদকান্দি-মেঘনা) ও কুমিল্লা-০৩ (মুরাদনগরে) বিএনপির প্রবীণ নেতাদের প্রতিদ্বন্দী জামায়াতের নবীন প্রার্থী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সংবাদকর্মী মাসুক আলতাফ চৌধুরী বলেন, এই অঞ্চলের কোন কোন আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দীতা আছে। তাই আওয়ামীলীগের যে ভোটটা -সেটা ফ্যাক্টও হয়ে দাঁড়াবে। সামাজিক নিরাপত্তা, স্থানীয় স্বার্থ ও ব্যক্তিগত সুবিধা ও যোগাযোগের কারণে সার্বিক দৃষ্টিতে যে এলাকায় যে প্রার্থীর অবস্থান শক্ত সেটা সেদিকে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। আর সেটাই বড় কারণ হতে পারে জয় পরাজয়ে।
কুমিল্লা উত্তর জেলার ৫টি আসনে বর্তমানে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা হলোÑবিএনপি পুরনো ঘাঁটি পুনরুদ্ধারে সর্বশক্তি ঢেলেছে, এনসিপি দেবীদ্বারে সর্বাধিক আলোচিত শক্তি, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা সাংগঠনিক ভাবে সুশৃঙ্খল। দীর্ঘ একতরফা নির্বাচন বাস্তবতার পর প্রথমবারের মতো কুমিল্লা উত্তর জেলায় বহুপ্রার্থী, বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ভোটারদের প্রত্যাশাÑএবার তারা প্রকৃত জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাবেন।
কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা): পুরনো ঘাঁটিতে বিএনপির প্রত্যাবর্তনের লড়াই
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কঘেঁষা কুমিল্লা-১ আসনটি দেশের ভৌগলিক ও রাজনৈতিক কৌশলগত কারনে গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর মধ্যে একটি। রাজধানী থেকে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার দাউদকান্দি উপজেলা ও মেঘনা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৩০ হাজার ১৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ১৭ হাজার ৩৮৯, মহিলা ২ লাখ ১২ হাজার ৬২৮। মোট ভোট কেন্দ্র ১৪৫টির মধ্যে ৯৪টি প্রাথমিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হয়েছে।
বিএনপির পুরনো ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে দলটির প্রতি জনসমর্থন চোখে পড়ার মতো হলেও বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী চায় এখানে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে। ইতোমধ্যে এই আসনে প্রার্থী ৭ জন।
১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখেন। পরে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে দীর্ঘ সময় আসনটি হাতছাড়া হলেও গত বছর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর এখানে আবারও বিএনপি তার পুরোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকেই সামনে এনেছে। বয়সজনিত অসুস্থতার কারণে মোশাররফ হোসেন সব জায়গায় সব অনুষ্ঠানে থাকতে না পারলেও তাঁর ছেলে খন্দকার মারুফ হোসেন দলের দায়িত্ব পালনে মাঠে জোরদার ভূমিকা রাখছেন।
এ আসনে এবার ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমিয়ে তুলেছে জামায়াতে ইসলামী। জামায়াত মনোনয়ন দিয়েছে উত্তর জেলা কর্মপরিষদ সদস্য ও দাউদকান্দি উপজেলা আমীর মনিরুজ্জামানকে। মাঠে থেকে গণসংযোগ করছেন তিনি।
এই আসনের ভোটাররা বলছেন, ব্যক্তি পছন্দ, দলীয় প্রতীক এবং এলাকাভিত্তিক জনপ্রিয়তা- সবকিছুই সংসদ নির্বাচনে প্রাধান্য পাবে ভোটারদের কাছে। নিরাপদ সড়ক চাই, দাউদকান্দি উপজেলা শাখার সভাপতি লিটন সরকার বাদল বলেন, দাউদকান্দি ও মেঘনা দুই উপজেলা নিয়ে একটি আসন হলেও- এই দুই উপজেলার মাঝেই কোন সরাসরি সড়ক যোগাযোগ নেই। দুই উপজেলারই ভোটারদের প্রত্যাশা এই আসনে সড়ক ব্যবস্থাপনার আমুল পরিবর্তন হোক। তারা ওই বিষয়টি মাথায় রেখেই এবার ভোট দিবে।
স্থানীয় ভোটার ও সংবাদকর্মী মোঃ সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘বিএনপির খন্দকার মোশাররফ, জামায়াতের মনিরুজ্জামান বাহালুল এবং মাওলানা বশির আহমেদ- তিন জনের বাড়িই এই আসনের দাউদকান্দি উপজেলায়; সুতরাং আসনের অপর উপজেলা মেঘনার ভোটারদের টানতে তাদের অতিরিক্ত সময় ও চেষ্টা থাকতে হবে। এমনও হতে পারে মেঘনার ভোট কুমিল্লা-০১ আসনে ফ্যাক্টও হিসেবে কাজ করবে।’
বিএনপির প্রার্থী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, এ আসনের জনগন দীর্ঘদিন ভোট বিহীন জনপ্রতিনিধি পেয়েছিলো। জনগণ এবার নিজের হাতে প্রকৃত জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে চায়। তারা ধানের শীষেই ভোট দিবে। আগামী সরকার হবে জনগণের সরকার।
জামায়াতের প্রার্থী মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা কাজ করছি নির্বাচনে জয়ী হবার জন্য। মানুষও আমাদের দাড়িপাল্লা মার্কার প্রতি ব্যাপক সাড়া দিচ্ছে। মেঘনাতেও আমাদের কার্যক্রম সমান ভাবে চলছে। আশা করি আমরা বিজয়ী হবো।’
কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি ও মেঘনা) আসনে নির্বাচনে বৈধ প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন , জামায়াত ইসলামীর মনিরুজ্জামান বাহলুল , ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বশির আহমেদ, খেলাফত মজলিসের সৈয়দ আব্দুল কাদের (জামাল) , বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. আবুল কালাম।
কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস): কোন্দল নিয়ে অস্থির বিএনপি, সক্রিয় জামায়াত ও জাপার পুরোনো এমপি
হোমনা ও তিতাস উপজেলা নিয়েকুমিল্লা-০২ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৭৭৭জন। এখানে পুরুষ ভোটার জন ১ লাখ ৮৯ হাজার ও নারী ভোটার ১ লাখ ৭৮ হাজার জন। এই আসনে ১৬৩টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৪৭টিকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় রেখেছে প্রশাসন।
মেঘনা, গোমতী ও তিতাস নদী বিধৌত এই জনপদের বেশির বাসিন্দাই প্রান্তিক এলাকায় বসবাস। ২০১৪ সাল থেকে দীর্ঘ সময় কখনো জাতীয় পার্টি, আবার কখনো আওয়ামী শাসনে থাকা এই আসনটি ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, যা এ আসনের নির্বাচনী মনোভাবকে নতুনভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এছাড়া হোমনা-তিতাস এলাকায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ধানের শীষের প্রতি সহানুভূতি থাকলেও দলীয় নেতৃত্বের বিভক্তি নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
আসনটি একসময় ছিলো বিএনপির শীর্ষ নেতা প্রয়াতএম কে আনোয়ারের শক্ত ঘাঁটি। তাঁর মৃত্যুর পর এ আসনে নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হয়। ২০১৮ সালে এখানে ড. মোশাররফকে প্রার্থী করলেও এবার এই আসনটিতে বিএনপির ধারক-বাহকরা কখনোই আসতে পারেন নি সামনের সারিতে। বর্তমানে দলটির মনোনীত প্রার্থী ও মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকায় আসনটিতে বিএনপিতে অস্থিরতারয়েছে। এছাড়া এবার আবারো এই আসন থেকে নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য আমির হোসেন।
বিএনপি থেকে মনোনয়ন ঘোষণার দ্বিতীয় ধাপে বিএনপির কেন্দ্রিয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (কুমিল্লা বিভাগ) অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়াকে ধানের শীষের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। তবে এখানে ধানের শীষ না পাওয়ায় বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন প্রয়াত বেগম জিয়ার সাবেক এপিএস আবদুল মতিন, তার মার্কা তালা। ইতোমধ্যে প্রচারণার শুরুর দিনে সেলিম ভুইয়া ও আবদুল মতিনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষেও ঘটনাও ঘটেছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দিন মোল্লাকে।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ সেলিম ভুইয়া বলেন, ‘হোমনা-তিতাসের মানুষ বিএনপিকেই ভালোবাসে। বিএনপি যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, তারা তাকেই ভোট দিবে। আমরা চাই বিরোধীতা ছেড়ে সবাই ধানের শীষের জয়ে কাজ করবে। আমরা মানুষের কল্যানে কাজ করতে ঐক্যবদ্ধ ভাবে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে চাই।’
বিদ্রোহী ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মতিন খান বলেন, জনগণের ইচ্ছায় আমি এখান থেকে নির্বাচন করতে চাই। আমরা কোন বহিরাগত কাউকে এই আসনে নিজেদের প্রতিনিধি করতে পারি না। তাই আমি নির্বাচন করছি- এই এলাকার মানুষের জন্য।
জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী নাজিম উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘আমরা মানুষকে বুঝানোর চেষ্টা করছি- জামায়াত কিভাবে মানুষের কল্যানে কাজ করবে এবং করছে। বাংলাদেশের কল্যানে জামায়াত কাজ করছে। তাই আমরা প্রত্যাশা করি সাধারণ মানুষ আমাকে সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী করবে। তিনি আরো বলেন, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কাছে প্রত্যাশা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। আমরা যেন হোমনা তিতাসের মানুষের কাছে নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারি।’
কুমিল্লা-২ (হোমনা ও তিতাস) আসনে প্রার্থী বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া, বিএনপির স্বতন্ত্র আবদুল মতিন , জামায়াতের নাজিম উদ্দিন মোল্লা, জাতীয় পার্টিমো. আমির হোসেন ভূঁইয়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ আশরাফুল আলম, বাংলাদেশ ইসলামী ফন্ট্রের আবদুস সালাম।
কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর): কায়কোবাদের মাঠে ফেরা ও জামায়াতের সমর্থনেসাবেক উপদেষ্টার প্রভাব
মুরাদনগর উপজেলা একাই বিশাল ভোট ব্যাংক। ২২টি ইউনিয়নের এ আসনে ভোটার ৪ লাখ ৯১ হাজার ২২৮ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৪৯ হাজার এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৪১ হাজার। একটি উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লার মধ্যে সর্ববৃহৎ এ আসনটি দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ এর বলয় হিসেবে দাবী কওে বিএনপি। ৫ আগষ্টের পর স্বেচ্ছানির্বাসন থেকে ফিরে তিনি বর্তমানে এলাকায় মানবিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দল তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।কায়কোবাদ এখনো পর্যন্ত ছয়বার নির্বাচনে অংশ নিয়ে পাঁচবার বিজয়ী Ñএটি তাঁর রাজনৈতিক স্থায়িত্ব ও জনপ্রিয়তারই প্রমাণ। এর মধ্যে দুই বার জাতীয় পার্টি, একবার স্বতন্ত্র এবং দুইবার বিএনপি থেকে নির্বাচিত হন।
এবার এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছে উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান, জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থি ইউসুফ সোহেল। ইউসুফ সোহেলের পক্ষে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের কর্মী-সমর্থকদেও সমর্থন এবং সোহেলের পূর্ববর্তী বিজয়ী পরিচিতি তাকে উল্লেখযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত করছে করেছে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ বলেন, আমরা উন্নয়নের রাজনীতি করি। মানুষের কল্যানে রাজনীতি করতে চাই। এবার ভোটের মাধ্যমে বিজয়ী হয়েই আবার মুরাদনগরের মাটি ও মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। আমি এখানে ছিলাম, আছি এবং থাকবো।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইউসুফ সোহেল বলেন, আমি দলের মনোনীত প্রার্থী। আমি মুরাদনগরের কল্যানে নিজেকে সব সময় প্রস্তুত রাখি। তাই এবারও লড়াইয়ে আছি।
২০১৪ থেকে ২০২৪ আওয়ামীলীগের দুই নেতা ছিলেন এই আসনের সংসদ সদস্য। ৫ আগষ্ট আওয়ামীলীগের পতনের পর তাদেও মতাদর্শীদের ভোট আসন্ন নির্বাচনে যেমন ফ্যাক্টর হতে পারে, তেমনি সম্প্রতি মুরাদনগরের রাজনীতিতে এনসিপি’র যোগ হওয়া এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান ও কাজে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের পরিবার ও তার সমর্থিত নেতা কর্মীদের প্রভাব প্রকাশ্য রয়েছে- যা জয় পরাজয়ে ফ্যাক্টও বলছে ভোটাররা।
কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনে বৈধ প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. খোরশেদ আলম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আহমদ আবদুল কাইয়ুম , এনডিএম এর রিয়াজ মো. শরীফ , আমজনতার দল চৌধুরী রকিবুল হক, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. শরীফ উদ্দিন সরকার ।
কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার): বিএনপির সমর্থনে গণঅধিকারের ট্রাক,সুবিধাজনক অবস্থানে এনসিপির হাসনাত
দেবীদ্বার উপজেলা ১টি পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৫৪ জন। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫ হাজার ৮৪৮ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬০৩ জন। এই আসনের ১১৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ৭০টি কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ন।
কুমিল্লার উত্তরের সবচেয়ে আলোচিত আসন এটি। এখানে বিএনপির প্রতিপক্ষ শক্তির রাজনৈতিক শক্তিগুলোর তৎপরতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এখনো পর্যন্ত এই আসনে ভোটের লড়াইয়ের আগেই মনোনয়ন নিয়ে বৈধতা নিয়ে লড়াই হয়েছে বিএনপির মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী ও এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহর মধ্যে। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন বৈধতা পায় নি উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগেও। মুন্সীর প্রার্থীতা বাতিল হওয়ায় জোটের প্রার্থী হিসেবে গণঅধিকার পরিষদের জসিম উদ্দিন গুরুত্¦ পাবেন। ইতোমধ্যে বৈধতা হারানো বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ এফ এম তারেক মুন্সীর নেতৃত্বের বিএনপি তাকে সমর্থন দিয়ে মাঠে নেমেছে।
জামায়াত ইসলামী মনোনীত প্রার্থী সাইফুল ইসলাম শহিদ এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহকে ছাড় দেয়ায় নতুন প্রার্থী হলেও তার পাল্লা ভারী হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে তাঁর মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন কর্মসূচি, উঠান বৈঠক, গণসংযোগে তিনি সক্রিয়। এছাড়া খেলাফত মজলিসসহ ১১ দলীয় সমমনা দলগুলোও তাকে সমর্থক দিচ্ছে।
হাসনাত আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করতেই নির্বাচনে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেবীদ্বারের মানুষ প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে উন্নয়নবঞ্চিত ও অবহেলিত। এই অঞ্চল থেকে বহু রাজনৈতিক নেতা তৈরি হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। এবার সুযোগ এসেছে সত্যিকারের জনসেবার মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। আমি বিশ্বাস করি, আগামী নির্বাচনে দেবীদ্বারের জনগণ সত্য, উন্নয়ন ও ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতির পক্ষে তাদের মূল্যবান রায় দেবেন।
গণ অধিকারপরিষদেও ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী জসিম উদ্দিন বলেন, আমি আগে থেকেই নিজের মত মাঠ গুছিয়ে রেখেছি। আমি নিজের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। বিএনপি আমাকে সমর্থন দিয়েছে। যদি শেষ পর্যন্ত সাথে থাকে তাহলে আমি বিজয়ী হবো।
এই আসনটিতে হাসনাত আবদুল্লাতে সমর্থন জানিয়ে ইতিমধ্যে সরে দাঁড়িয়েছেন খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মোজাফর রহমান।
কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা): বিএনপিতে টানাপোড়েন, জামায়াতের সক্রিয় তৎপরতা
কুমিল্লা-০৭ আসনে চান্দিনা উপজেলা ১টি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়নভিত্তিক। এখানে ভোটার ৩ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৬৩ হাজার ৯০০ জন এবং নারী ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫৭৮ জন। এই আসনে ১০৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৯টিকে গুরুদ্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনায় রেখেছে প্রশাসন। আসনটির মূল আলোচনা বিএনপির বিভক্তি।
এলডিপির সাবেক মহাসচিব, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সদ্য বিএনপিতে যোগ দেয়া ড. রেদোয়ান আহমেদ কুমিল্লা-০৭ চান্দিনা আসনে চারবারের এমপি। একই সাথে তিনি বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের জন্য মনোনীতও হয়েছেন। দীর্ঘদিন এলডিপির ব্যানারে রাজনীতি করে এখন আবার বিএনপিতে যোগ দেয়ায় স্থানীয় বিএনপির সাথে রেদোয়ান আহমেদ এর দূরত্ব ঘুচানো এই মুহুর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে এই আসন থেকে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আতিকুল আলম শাওনকে বহিষ্কার করেছে দল। এছাড়া তার পুরো কমিটিও বাতিল করা হয়েছে। তারপর তিনি কলসি প্রতিকে নির্বাচনের জন্য প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়েই বিভিন্ন এলাকায় তার শোডাউন চলছে।
ড. রেদোয়ান আহমেদ বলেন, আমি আগেও বিএনপির রাজনীতি করেছি, পরে এলডিপির হয়ে রাজনীতি করলেও বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে জোটবদ্ধভাবে আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। আমি যুবদলের প্রতিষ্ঠাকালীনও সদস্য। আমি চান্দিনায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন যোদ্ধা। তাই আমি চান্দিনার বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রতি অনুরোধ আপনারা ধানের শীষকে বিজয়ী করতে আমাকে সহযোগিতা করবেন। আমি যদি বিজয়ী হই, আমি কখনো কে এলডিপি করেছে বা কে বিএনপির করেছে - তা নিয়ে বৈষম্য করবো না। এখন আমার কাছে সবাই একই ভাবে মূল্যায়িত হবেন। আমি চান্দিনার উন্নয়নে আবারো অবদান রাখতে চাই।
তবে নির্বাচন নিয়ে জানতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আতিকুল আলম শাওনকে বার বার ফোন দিয়েও পাওয়া যায় নি।
কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) চান্দিনা উপজেলা জামায়াতের নায়েব আমির মাওলানা মোশারফ হোসেন মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেয়ায় এই আসন থেকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের দেয়াল ঘড়ি প্রতিকের সোলাইমান খাঁন।
