
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচন সামনে রেখে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো কৌশলগত ভূমিকায় রয়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত অবস্থানের কারণে
তারা আশাবাদী যে, সম্ভাব্য বিজয়ী দল তাদের সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক
বজায় রেখে দেশ পরিচালনা করবে। এ জন্য নির্বাচনে যে দল বা জোট জয়ী হবে,
তাদের নিয়েই ভূরাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে চাইবে তারা। এ লক্ষ্যে
নির্বাচনের সম্ভাব্য জয়ী দল বা দলগুলোর সঙ্গে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা
চালিয়ে যাচ্ছেন এই তিন দেশের কূটনীতিকরা। তাদের কাছে কোন দল ক্ষমতায় আসবে
এবং তাদের সমর্থন কোন দেশের দিকে ঝুঁকবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমরা
লক্ষ করেছি, নির্বাচনের আগেই তারা রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব বোঝার চেষ্টা
করছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা নির্বাচনের সম্ভাব্য জয়ী দল ও জোটের
প্রধানদের সঙ্গে ইতোমধ্যেই বৈঠক করেছেন। দেশের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে
পর্যবেক্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের জনগণের
প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং ভূরাজনৈতিক
কৌশলে দলগুলোর অবস্থান কী হতে পারে, তা জানার চেষ্টা করছে প্রভাবশালী এই
তিন দেশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূরাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ
অবস্থানে রয়েছে। বৃহত্তর ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় শক্তির প্রতিযোগিতার
কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে চীনকে টার্গেট করে আগামীতে মার্কিন
জোটের যে অবস্থান, তা বাংলাদেশের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত
হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী ও বাংলাদেশের চারদিক বেষ্টিত
ভারতের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক কৌশলে তাদেরও অবস্থান পরিবর্তিত হবে। ফলে এই
ত্রি-শক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা নতুন সরকারের
জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এ ক্ষেত্রে তিন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের
ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সাবেক
রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন একটি স্বাভাবিক
প্রক্রিয়া হলেও এখানে ভূরাজনৈতিক বাতাবরণ আছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও
ভারত এ নির্বাচন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছে। কারণ পরবর্তী সরকার কার
সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করবে, তা বুঝতে চাইছে এসব শক্তি। ছাত্র-জনতার
অভ্যুত্থান-পরবর্তী জনগণের প্রত্যাশা পূরণেও সরকারকে কাজ করতে হবে। কারণ
বাংলাদেশের জনগণ আধিপত্যবাদ পছন্দ করে না। বাংলাদেশ ইস্যুতে এ বিষয়টি
বহিঃশক্তির জন্যও প্রযোজ্য। এটি মাথায় রেখেই সরকারকে পররাষ্ট্রনীতি ঠিক
করতে হবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের দ্বিপক্ষীয়
সম্পর্ক ছাড়াও ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে এসব দেশ বাংলাদেশে প্রভাব
বিস্তার করতে চায়। অতীতে দেখা গেছে, এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন
দেশের কাছে নতজানু থেকেছে। এতে বৈদেশিক সম্পর্ক একটি পক্ষপাতমূলক ইস্যুতে
পরিণত হয়েছে। বর্তমানেও এ বিষয়টি সামনে এসেছে। আগস্ট-পরবর্তী লক্ষ করা
গেছে, এ দেশের মানুষ কর্তৃত্ববাদ মেনে নিতে চান না। বহিঃশক্তি তাদের
নিয়ন্ত্রণ করুক, তাও চান না। তাই নতুন সরকারকে তিন পরাশক্তির সঙ্গে সমন্বয়
করে কূটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। যাতে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে
অন্তর্ভুক্ত হতে না হয়। সে জন্য এ দেশকে সেই কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার
সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আশা করছি, আগামী নতুন সরকার দেশের স্বার্থকে
প্রাধান্য দিয়ে একটি ইতিবাচক ও টেকসই কূটনৈতিক কৌশল প্রয়োগে বিচক্ষণতার
পরিচয় দেবে।
