
আর মাত্র ১২ দিন পরেই জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। জাতি যে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেই গুরুত্বপূর্ণ পর্বের অবসান ঘটবে। এবারের নির্বাচন অতীতের তুলনায় ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রাক-নির্বাচনি পর্বে প্রচার-প্রচারণা শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্র উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচনে ঝুঁকির মাত্রাটা বেশি বলে উত্তাপও বেশি।
নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশের মোট ভোটকেন্দ্রের প্রায় অর্ধেক কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে। নির্বাচনে ৪২ হাজার ৭৬৬টি ভোটকেন্দ্র থাকবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে দেশের এই ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৭ হাজার ৫৫৬টি কেন্দ্র সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ, যা মোট কেন্দ্রের প্রায় ৪১ শতাংশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মিলিত বিশ্লেষণে প্রায় ২৫ হাজার কেন্দ্রকে নিরাপত্তা-সংবেদনশীল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মোট কেন্দ্রের প্রায় ৫৯ শতাংশ। বলা হয়েছে, এই নিরাপত্তা-সংবেদনশীল কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৮ হাজার ৭৮০টি কেন্দ্র আবার ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’, ১৬ হাজার ৫৪৮টি কেন্দ্র ‘ঝুঁকিপূর্ণ’। পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, এবারের ভোটের মাঠ কতটা স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল হয়ে আছে।
নির্বাচনি দৃষ্টিকোণ থেকে সেইসব ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয় যেসব কেন্দ্রে গোলযোগের শঙ্কা থাকে। নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাত্রা অনুসারে দেশের সব ভোটকেন্দ্রকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও সাধারণ–এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছে। পরিসংখ্যানেই বলা হচ্ছে, ৪১ শতাংশ ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। অবশিষ্ট ৫৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্রও যে নিরাপদ থাকবে তাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে দেশের প্রায় সব ভোটকেন্দ্রই কম-বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে বড় ধরনের সহিংসতা হতে পারে, পাশাপাশি অন্য কেন্দ্রগুলোতেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত হতে পারে।
সুষ্ঠু, অবাধ, ভয়ভীতিমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যে কোন সহিংসতার শঙ্কা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। পত্রিকার প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক সমন্বয় সেল এ ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বিশৃঙ্খলার কোনো সুযোগ তারা দেবে না। পরিস্থিতি বুঝে কঠোর সিদ্ধান্ত নেবে। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত রাখার প্রশাসনিক প্রস্তুতি রয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এরই মধ্যে জানিয়েছেন, ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটের দিন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা বা ব্যালট ছিনতাইয়ের সুযোগ দেওয়া হবে না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব প্রতিরোধে সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে এবং প্রয়োজনে কঠোর হবে। কিন্তু তার এই আশ্বাসের পরও প্রাক-নির্বাচনি প্রচারপর্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা-সংঘাত, এমনকি মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, তফসিল ঘোষণার পর সারাদেশে গত পরশু পর্যন্ত চার জনের রাজনৈতিক হত্যাসহ ১৪৪টি সংহিংস ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, সহিংসতা ততই বাড়ছে। সহিংসতার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। গত পরশু সর্বশেষ শেরপুরে যে অনুষ্ঠানে গিয়ে একজন সমর্থক মারা গেলেন, সেই অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল স্থানীয় প্রশাসন। প্রশাসন কেন অরাজনৈতিক অবস্থানে না থেকে ইশতেহার পাঠের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচির আয়োজন করতে গেল, বোধগম্য নয়। প্রশাসনের এই সম্পৃক্ততা যে বার্তা দেয়, তাও অনভিপ্রেত।
নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা তত বাড়ছে; সেইসঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে। ঝুঁকির এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একদিকে নিরপেক্ষ রাখা এবং অন্যদিকে সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে।
সতর্কতা হচ্ছে যে কোনো সহিংস ঘটনা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এই সতর্কতা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরই নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও অবাধ হবে তা নির্ভর করছে। বিশেষজ্ঞরাই বলছেন, এমনিতেই এবারের নির্বাচনে দেশের একটি বড় দল অংশ নিতে পারছে না, তার ওপর ভোটের প্রচার এবং ভোটকেন্দ্রগুলো যদি ঝুঁকিমুক্ত না হয়, তাহলে ভোটারদের উপস্থিতি আশানুরূপ হবে না।
নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সম্মিলিত ফলপ্রসূ উদ্যোগের মাধ্যমেই নির্বাচন ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারবে; দেশের এই ক্রান্তিকালে ভয়ভীতিমুক্ত, অবাধ, উৎসবমুখর নির্বাচনের ওপরই দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা নির্ভর করছে।
