
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে চারদিকে প্রচার চলছে। প্রার্থীরা যার যার ভোট নিজেদের আয়ত্তে আনতে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যোগ দিচ্ছেন ‘হেভিওয়েট’ নেতারা। লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের মধ্যে বেশ কিছু উদ্ধার হলেও এখনো উল্লেখযোগ্য অংশ রয়ে গেছে অপরাধীদের হাতে। এসব আগ্নেয়াস্ত্র রাজনীতির মাঠে ব্যবহার করা হতে পারে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। বিষয়টি প্রার্থীদের শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি লক্ষ করা গেছে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হতাহতের বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, ২০১৬ সালে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণে তৎকালীন সরকার একটি পরিপত্র জারি করেছিল। এর ফলে তখন থেকেই বৈধ অস্ত্রের ব্যবসা অনেকাংশে কমতে থাকে। পক্ষান্তরে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা বা পেশাদার অপরাধীদের তৎপরতা বেড়ে যায় বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার সুযোগে একশ্রেণির পেশাদার অপরাধী অস্ত্রের মজুত বাড়িয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন থানা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লুট হওয়া বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদও চলে গেছে দুর্ধর্ষ অপরাধীদের হাতে। লুট হওয়া অস্ত্র গোলাবারুদ বা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সেরকম সাফল্য বা তৎপরতা চোখে পড়ছে না। এসব পরিস্থিতি প্রতিনিয়তই বাড়াচ্ছে অজানা শঙ্কা।
এরই মধ্যে সরকার ১৫ ডিসেম্বর রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগ নীতিমালা জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ নীতিমালার অনুকূলে অনেকেই অস্ত্রের লাইসেন্স বা অস্ত্র নিয়েছেন বলে জানা যায়। অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে বৈধ অস্ত্রগুলো থানায় জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও স্থাপনায় হামলা চালায় বিক্ষুব্ধরা। এ সময়ে পুলিশের ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। লুট হওয়া এসব অস্ত্রের মধ্যে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ১ হাজার ৩৩১টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব মারণাস্ত্রের কোনো হদিস নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় জননিরাপত্তার জন্য শঙ্কা বা ঝুঁকি রয়ে যাচ্ছে। এ অস্ত্রগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব অস্ত্র দিয়ে ভয়ভীতি সৃষ্টি করে দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। কিন্তু কেউ ভয়ে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না। নির্বাচনের পরও এসব আগ্নেয়াস্ত্রের বেশ ঝুঁকি থাকবে। লুট হওয়া এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদের বহুমুখী প্রভাব রয়েছে। যার মধ্যে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক অস্থিরতার বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরেও অবৈধ অস্ত্র বাংলাদেশে অবাধে ঢুকছে। এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র বা অবৈধ অস্ত্র এগুলো সমাজে চরম ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করছে। নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য এসব অস্ত্র মারাত্মক হুমকি। সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে পুরোপুরি সফলতা দেখাতে পারেনি। পাশাপাশি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় রয়ে গেছে। এসব আগ্নেয়াস্ত্র রাজনীতির মাঠে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে পারে। ফলে নাগরিকদের নিরাপত্তা সুরক্ষার স্বার্থে যেকোনোভাবে লুট হওয়া এবং অবৈধ অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা জরুরি।
লুণ্ঠিত এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারির পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। দেশের গোয়েন্দা বিভাগকে আরও তৎপর হতে হবে। জননিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সফলতা দেখাতে হবে। নির্বাচনি মাঠে আতঙ্ক যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য সরকার কঠোরভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করবে, এটাই প্রত্যাশা।
