রোববার ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
১৯ মাঘ ১৪৩২
নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী হতে হবে
ড. বদিউল আলম মজুমদার
প্রকাশ: রোববার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:১৬ এএম আপডেট: ০১.০২.২০২৬ ১:২২ এএম |

 নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী হতে হবে দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আমাদের নির্বাচনি অঙ্গনকে পরিচ্ছন্ন করতে হবে। রাজনৈতিক অঙ্গনকে পরিচ্ছন্ন করতে হবে। ভোটকেন্দ্রগুলো দুর্বৃত্তায়নমুক্ত করতে হবে। টাকার খেলা বন্ধ করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে। ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি করতে হবে। আমরা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই। সবাই যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে এবং নির্বাচন যেন কারসাজিমুক্ত ও স্বচ্ছ হয়। নির্বাচনে টাকার খেলা, টাকা দিয়ে ভোট কেনার ঘটনা যেন না ঘটে। ভোটকেন্দ্র দখল এবং কোনোরকম সহিংসতা যেন না হয়- এগুলো অবশ্যই আমরা চাই। তবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা নয়। আমাদের মূল প্রত্যাশা হচ্ছে গণতন্ত্রে উত্তরণ তথা গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। অতীতে আমাদের দেশে কয়েকটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে। তার মাধ্যমে সাময়িকভাবে মানুষের ভোট দেওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সত্যি; কিন্তু গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পথ নিশ্চিত হয়নি।
নির্বাচনের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আমাদের নির্বাচনি অঙ্গন স্বচ্ছ রাখা। এর আগে নির্বাচনি অঙ্গনে বহু ধরনের দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে। বহু অপরিচ্ছন্ন ব্যক্তি অতীতে নির্বাচিত হয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও সে আশঙ্কা রয়েছে। যারা নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান, তাদের একাংশের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ থাকে; দুর্বৃত্তপনা থেকে শুরু করে বহু ধরনের অপকর্মের অভিযোগ থাকে। এটি একটি বড় সমস্যা।
আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর আরও পরিচ্ছন্ন হওয়া দরকার। রাজনৈতিক দলগুলোও দুর্বৃত্তদের আখড়ায় পরিণত হয়ে যায়। আমাদের দেশে বেশির ভাগ অন্যায় হয় রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়ায়। বড় বড় দুর্নীতির সঙ্গে রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ীদের সংশ্লিষ্টতা থাকে। সে কারণে রাজনৈতিক দলগুলোরও পরিচ্ছন্ন হওয়া দরকার। এটাও সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনে টাকার খেলা, টাকা দিয়ে ভোট কেনা, ঋণখেলাপিদের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ, ব্যাপকভাবে মনোনয়ন বাণিজ্য- এসব বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয় শুধু মনিটরিং নয়, এ-সংক্রান্ত বিধিবিধান লঙ্ঘন যারা করবেন, নির্বাচন কমিশনকে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। নির্বাচনে তাদের অযোগ্য ঘোষণার ব্যবস্থা করতে হবে। নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব অডিট করতে হবে। প্রার্থীদের দেওয়া নির্বাচনি ব্যয়ের হিসেবে অডিটে গরমিল পাওয়া গেলে তাদের প্রার্থিতা বাতিল করতে হবে। নির্বাচিত হয়ে গেলেও তার নির্বাচন বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে প্রার্থী হলফনামায় ভুল তথ্য দিয়েছেন কি না বা তথ্য গোপন করেছেন কি না, তা গভীরভাবে যাচাইবাছাই করে তার মনোনয়নপত্র চূড়ান্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভোটের পরেও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে খতিয়ে দেখে কারও হলফনামায় ভুল তথ্য বা তথ্য গোপনের প্রমাণ মিললে নির্বাচন কমিশনকে তার নির্বাচনি ফল বাতিল করতে হবে।
গণভোটও এবার নির্বাচন-পরবর্তী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচন ও সংস্কার নিয়ে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম অতীতে তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এটার অবসান হওয়া দরকার। গণমাধ্যম যাতে সত্যিকার ভূমিকা পালন করতে পারে, তার জন্য এ-সংক্রান্ত আইনকানুন ও বিধিবিধানে পরিবর্তন আনা দরকার। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নির্বাচনি পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনি আইনগুলো প্রয়োগে সাহসী হতে হবে। আমাদের নির্বাচনি আইন অনেক শক্তিশালী। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের অনেক প্রস্তাব বাস্তবায়ন করলেও গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেয়নি, যেগুলো এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব। অনেক দল যোগ্যতা না থাকার পরও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হয়েছে। সেসব দলের নিবন্ধন তদন্তসাপেক্ষে বাতিল করতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনতে হবে। দলগুলোর অঙ্গ বা সহযোগী হিসেবে ছাত্র, শিক্ষক ও শ্রমিক সংগঠন, বিদেশে দলের শাখা নিষিদ্ধ করতে হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনসংক্রান্ত আইনেই এটা বলা আছে। আগের নির্বাচন কমিশনগুলো এ আইনের প্রয়োগ করেনি। এটা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা দরকার। এটি আসন্ন নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কিংবা নির্বাচনের পরও এটা করা যায়। এ ছাড়া কতকগুলো কাঠামোগত সংস্কার দরকার। আমাদের জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে। যদিও কিছু দলের কিছু বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট ছিল। কিন্তু ওভার হোল্ডিং মেজরিটির মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত যে ৪৭টি বিষয়ে প্রস্তাব রেখেছে, সেগুলোর কথা বলছি। সেই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে অনেক মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার হবে।
গণভোটে ‘না’ ভোট বেশি পড়লে এ সংস্কার নির্বাচিত সংসদের জন্য বাধ্যতামূলক হবে না। কিন্তু এতে গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পথে প্রতিকূলতা সৃষ্টি হবে। এ জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে জোরালো অবস্থান নেওয়া জরুরি। তাদের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মাধ্যমে এ সম্পর্কে জনমত সৃষ্টি করতে হবে। উগ্রবাদী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোও অস্থিতিশীলতার অপচেষ্টা করছে। এ ছাড়া নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা-কর্মীও নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে অন্তঃকোন্দলে লিপ্ত। এগুলোর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকেও নির্বাচনি আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও এ ক্ষেত্রে ইতিবাচকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। দলগুলো যদি তাদের নেতা-কর্মীদের এবং প্রার্থীদের শৃঙ্খলার মধ্যে রাখতে পারে, মারামারি-হানাহানি থেকে বিরত রাখতে পারে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। সে ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খরা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো যারা নির্বাচনে বিঘ্ন ঘটাতে চায় তাদের দিকে পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারবে।
গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য দেশে গণতন্ত্রের যে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণের জন্য নির্বাচিত সরকার মনোযোগ দেবে বলেই আমার প্রত্যাশা। একই সঙ্গে আমাদের শাসনতন্ত্রে যেসব গলদ আছে, তা দূর করার চেষ্টা করবে বলেও আশা রাখি। সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করবে। আমাদের দেশে তরুণদের সংখ্যা বেশি। তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থানের পথ বের করা হবে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের জন্য একটি বড় কাজ। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন- এসব বিষয়েও মনোযোগ দিতে হবে। দেশের অর্থনীতি চাঙা করতে হবে। লেজুড়বৃত্তি, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, চাঁদাবাজি- এসবের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে। 
লেখক: সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)














http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
‘আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার দেখতে চাই না’: ড. শফিকুর রহমান
একটি দল মুখে ‘হ্যাঁ’ বললেও তলে তলে ‘না’ এর কথা বলে জনসভায় মামুনুল হক
চৌদ্দগ্রামে সমাবেশ থেকে ফেরার পথে জামায়াত-বিএনপির সংঘর্ষে আহত ১০
হাসনাতের নির্বাচনী তহবিলে ১৪ লাখ টাকা দিল স্কুলের বন্ধুরা
একটি গোষ্ঠী জান্নাতের টিকেট বিক্রির নামে মানুষকে ধোকা দিচ্ছে -হাজী ইয়াছিন
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
১১ দলীয় জোটের গণজোয়ার দেখে অনেকে দিশেহারা
ময়নামতি ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের আন্তঃহাউজ বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা
গোমতির উত্তরেও কুমিল্লা শহর সম্প্রসারণ হবে
ক্ষমতায় গেলে কুমিল্লার নামেই বিভাগ করবো
চৌদ্দগ্রামে যুবলীগ নেতার বাড়ি থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২