মাঠের পর মাঠ জুড়ে এখন কেবলই হলুদের হাতছানি। শীতের শিশিরভেজা সকালে সরিষা ফুলের মৌ-মৌ গন্ধে মাতোয়ারা কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার জনপদ। বিস্তীর্ণ দিগন্তজুড়ে হলুদ গালিচায় যেন প্রকৃতির এক অপরূপ মিতালি। আর এই হলুদের মাঝেই নিজেদের সোনালী স্বপ্ন বুনছেন স্থানীয় হাজারো কৃষক। অনুকূল আবহাওয়া আর কৃষি অফিসের সঠিক নির্দেশনায় এবার মুরাদনগরে সরিষার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, মুরাদনগরের ২২টি ইউনিয়নেই এবার সরিষার ব্যাপক আবাদ হয়েছে। গত ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে ৮৯০০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৮৮৯৮ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছিল, যেখান থেকে উৎপাদিত হয়েছিল ১৩,৪৭১ মেট্রিক টন ফসল। সাফল্যের সেই ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরেও ৮৮৯৮ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে প্রায় ১৩,৫০০ মেট্রিক টন ফলন আশা করছে কৃষি বিভাগ।
উপজেলার মধ্যে শ্রীকাইল, আকবপুর, আন্দিকুট, রামচন্দ্রপুর উত্তর ও দক্ষিণ এবং বাঙ্গরা পশ্চিম ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি সরিষার চাষ হয়েছে।
ফলন বাড়াতে কৃষকরা এবার উচ্চফলনশীল জাতের দিকেই বেশি ঝুঁকেছেন। মাঠে মাঠে এখন শোভা পাচ্ছে বারি সরিষা-১৪, ১৭, ১৮, ২০ এবং বিনা সরিষা-৯, ১১ ও ১২ সহ বিভিন্ন উন্নত জাত। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এ বছর উপজেলার ৫০০০ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মাঝে উন্নত মানের বীজ ও সারসহ বিশেষ কৃষি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
উপজেলার তেমুরিয়া এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, "এ বছর আবহাওয়া বেশ ভালো। গত বছরের তুলনায় রোগ-বালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ অনেক কম। সব ঠিক থাকলে এবার ঘরভর্তি সরিষা তুলব বলে আশা করছি।"
অন্যদিকে, বি-চাপিতলা মাঠের কৃষক আব্দুল আউয়াল সরকারি সহায়তায় সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, সময়মতো সরকারি বীজ ও সার পাওয়ায় চাষ সহজ হয়েছে। কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠে এসে পরামর্শ দিচ্ছেন। ফসল দেখে বুকটা ভরে যাচ্ছে।
বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ সরিষা প্রায় ৪২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকরা আশা করছেন, ফলন ভালো হওয়ায় ভালো লাভ থাকবে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, ফসল কর্তন পুরোদমে শুরু হলে বাজারে সরবরাহ বাড়ার কারণে দাম কিছুটা কমে আসতে পারে।
মুরাদনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ পাভেল খাঁন পাপ্পু বলেন, ড্রেজারের কারণে প্রতিবছর গড়ে এই উপজেলায় ৪০-৫০ হেক্টর কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। তবে এ বছর আবহাওয়া সরিষা চাষের জন্য পুরোপুরি অনুকূলে। আমরা ৫০০০ কৃষকের হাতে প্রণোদনা পৌঁছে দিয়েছি এবং মাঠ পর্যায়ে তদারকি অব্যাহত রেখেছি। রোগ-বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব কম থাকায় আমরা আশা করছি এ বছর উপজেলায় সরিষার রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন বা বাম্পার ফলন হবে।
সরিষার এই বাম্পার ফলন কেবল স্থানীয় ভোজ্যতেলের চাহিদাই মেটাবে না, বরং অর্থনৈতিকভাবেও এই অঞ্চলের কৃষকদের স্বাবলম্বী করে তুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
