
অন্তর্বর্তী
সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এর আগে একাধিকবার বলেছেন,
আগামী দিনে যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তা হবে বাংলাদেশের
ইতিহাসে সবচেয়ে নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। উল্লেখ্য, চব্বিশের
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে স্বৈরাচারের পতনের পর এক বিশেষ পরিস্থিতিতে
অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। বাংলাদেশের
ইতিহাসে এর আগে বেশ কয়েকবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সন্তোষজনকভাবে
জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবার তারই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী
সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
অন্তর্বর্তী
সরকার গঠিত হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। নানামুখী সংস্কার কার্যক্রম সম্পাদনের
চেষ্টা করা হলেও এই সরকারের মূল দায়িত্ব হচ্ছে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে জনসমর্থিত রাজনৈতিক সরকারের কাছে
দায়িত্ব বা ক্ষমতা হস্তান্তর করা। দেশের এই ক্রান্তিকালে গ্রহণযোগ্য জাতীয়
সংসদ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। আমরা যদি জাতিকে একটি ভালো নির্বাচন
উপহার দিতে না পারি, তাহলে দেশ আবারও স্বৈরাচারের অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে
পারে। ব্যর্থ হতে পারে জুলাই শহিদদের আত্মদান।
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে
আলোচিত প্রসঙ্গ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ঘোষিত
মোতাবেক আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয়
সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন থেকে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা
হয়েছে যে তারা জাতিকে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, নিরপেক্ষ এবং জাতীয় ও
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে সম্পূর্ণ
প্রস্তুত এবং বদ্ধপরিকর। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কোনো কোনো মহল
থেকে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তাতে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য নির্বাচন
কমিশন থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জনগণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আসন্ন
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সরকার গঠনে তাদের
সার্বভৌম ক্ষমতা ব্যবহারের জন্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবাসী
বাংলাদেশি ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছেন। দেশের
মানুষের মধ্যে এই নির্বাচন নিয়ে প্রচণ্ড আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। শীতের
তীব্রতা উপেক্ষা করে শহর থেকে গ্রাম-সর্বত্রই এখন নির্বাচনি ব্যস্ততা।
জনগণ
রাষ্ট্রের মালিক। বছরের অন্য সময় তা প্রতীয়মান না হলেও জাতীয় সংসদ
নির্বাচনের সময় এটি প্রত্যক্ষ করা যায়। জনগণ যাদের ভোট দেবে, তারাই পরবর্তী
পাঁচ বছরের জন্য দেশ শাসনের অধিকার লাভ করবেন। ২০০৯ সালে যারা
প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছেন, তারা এবারই প্রথম তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
কারণ, বিগত ১৬ বছরে দলীয় সরকারের অধীনে দেশে যে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন
(২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে সাধারণ ভোটাররা অংশগ্রহণের সুযোগ
পাননি। সেসব নির্বাচন ছিল একতরফা এবং ভোটারবিহীন। এসব প্রহসনমূলক নির্বাচন
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে সমালোচিত এবং নিন্দিত হয়েছে।
নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে পছন্দনীয় সরকার গঠন করতে না পারার কারণে
বিগত সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষ প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিল। আগামী জাতীয় সংসদ
নির্বাচনে সাধারণ মানুষ যদি নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না
পারে, তাহলে সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও ক্ষুণ্ন হবে। সেই অবস্থায়
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে ‘দায়’ এড়ানোর কোনো সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে
নির্বাচন কমিশন তার গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।
প্রথমেই বলি, দেশে বিদ্যমান
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রসঙ্গটি। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন
ঘটলে কয়েক দিন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, এটিই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশে অতীতে একাধিকবার গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর কিছুদিন
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছিল, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন
ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুতই স্বাভাবিক হয়ে আসে।
কারণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে
ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হতে পারবেন না।
নির্বাচনে অংশগ্রহণপূর্বক তাদের
ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে জাতি। তাদের সেই
আকাক্সক্ষা যাতে কোনোভাবেই ব্যর্থ না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন
কমিশন তথা সরকারের। আগামী দিনে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ
করবেন, তাদের বৈধতাও নির্ভর করবে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ওপর।
ভয়ভীতিহীন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য বেশ কিছু
শর্ত পালন করতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব শর্ত পরিপালনে কিছুটা হলেও
ঘাটতি প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময়
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এক শ্রেণির সদস্য ও কর্মকর্তা বিক্ষোভকারীদের দমনের
নামে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তারা
ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। অনেকেই কর্মস্থল থেকে পালিয়ে গেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা থেকে পুলিশ সদস্যদের অনেকেই প্রাণভয়ে
পালিয়ে গেছেন। বিগত সরকার আমলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যেসব সদস্য
রাজনৈতিক বিবেচনায় নানা ধরনের অনৈতিক সুবিধা ভোগ করেছেন, তারা অন্তর্বর্তী
সরকারকে বিব্রত করার জন্য চেষ্টা করতে পারেন। একটি মহল উদ্দেশ্যমূলকভাবে
রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি
ঘটানোর চেষ্টা করছে বলে অনেকেই অভিযোগ করছেন। অতি দ্রুত দেশের বিদ্যমান
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিকীকরণের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যাতে কোনো
ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি না হয় সে জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যারা দলীয়
রাজনীতিচর্চায় নিয়োজিত ছিলেন, তাদের নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করা থেকে বিরত
রাখা যেতে পারে। নির্বাচনকালে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সর্বোচ্চ
নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করতে হবে। কোনো বিশেষ দল বা মহলের প্রতি অনুরাগ বা
বিরাগ প্রদর্শন করা যাবে না। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দলীয় সরকারের
অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনই প্রশ্নমুক্ত ছিল না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের
অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন মুক্ত এবং অবাধ
ছিল। কোনো কারণে যদি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে সে জন্য পুরো জাতিকে
মাশুল দিতে হবে। অন্যদিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকারকে
মহিমান্বিতও করতে পারে। আবার এই নির্বাচনই তাদের ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে
নিক্ষেপ করতে পারে। তাই অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে উঠে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট
সবাইকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন
প্রার্থীদের জন্য আচরণবিধি ঘোষণা করে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক
প্রার্থী যাতে সঠিকভাবে আচরণবিধি মেনে চলেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। বড় দলের
প্রার্থী অথবা ছোট দলের প্রার্থী বিবেচনায় কারও প্রতি বৈরী আচরণ করা যাবে
না। প্রতিবারই লক্ষ করা যায়, নির্বাচনে অর্থ ব্যয়ের যে সীমা থাকে, তা বেশির
ভাগ প্রার্থীই লঙ্ঘন করেন। এবারের নির্বাচনে যেন তেমনটি না ঘটে, তার
ব্যবস্থা করতে হবে। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ভোটারদের সচেতন এবং সতর্ক থাকতে
হবে। ব্যক্তিগতভাবে তুলনামূলক সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে। একটি
জনপ্রিয় নির্বাচনি স্লোগান হচ্ছে, ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব।’
কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ভোট যাকে খুশি তাকে প্রদানের বস্তু নয়। আমার
দেওয়া ভোটে নির্বাচিত হয়ে কোনো প্রার্থী যদি অন্যায়-অপকর্ম করেন, এর ‘দায়’
কিছুটা হলেও আমার ওপর বর্তাবে। কাজেই ভোটাধিকার প্রয়োগের সময় সর্বোচ্চ
সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনোভাবেই দলীয় পরিচয় অথবা অন্য কোনো কারণে একজন
অযোগ্য প্রার্থী যাতে নির্বাচিত না হতে পারেন সে ব্যাপারে আমাদের সতর্ক
দৃষ্টি রাখতে হবে, এমনটাই কামনা।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
