
সমাজ
থেকে উঠে আসা প্রবাদে কেন জীবনের সত্য চিত্র ফুটে ওঠে? আর এই প্রবাদগুলো কে
বা কখন বা কীভাবে তৈরি হয়েছে, তার তথ্য আমরা এখনো জানি না? কিংবা কোন
প্রবাদটি কোন অঞ্চলে বা কোথায় প্রবর্তিত হয়েছে-তারও তথ্য আমরা পাব না
কিন্তু প্রাচীনকাল থেকে এই বাংলা অঞ্চলে প্রবাদগুলো তৈরি হয়ে, সমাজ ও
জীবনের সত্য বয়ান দাঁড় করিয়েছে আমাদের সামনে। প্রবাদ বাক্যটি অত্যন্ত ছন্দ,
অলংকরণ ও গভীর ব্যঞ্জনাময় বাক্য। লোকমুখে প্রচলিত প্রবাদ সংক্ষিপ্ত বাক্য
হলেও এর মধ্যে নিহিত আছে নৈতিক শিক্ষা বা অভিজ্ঞতার নির্যাস। অসংখ্য প্রবাদ
সময়ের বাঁকে বাঁকে উঠে এসেছে, তারই একটি অন্যতম প্রবাদ হলো-‘কয়লা ধুইলে
ময়লা যায় না’। ভাবুন তো কী অসাধারণ কথা? আমরা জানি ও দেখি কয়লার রং কালো
অর্থাৎ একটি কয়লাদানার পুরোটাই কালো-তাই না? আপাতদৃষ্টিতে এবং সাধারণ কথায়,
কয়লাকে পানি দিয়ে ধুয়ে থাকলে কালো রংই বের হয়। অর্থাৎ কয়লাদানাটি শেষ
পর্যন্ত কালোই থাকে। এই যে উপলব্ধি, এই যে বাস্তব কথা বা দৃশ্য, তা আপনি
কীভাবে খণ্ডন করবেন? পুনরায় বলি, এই যে উপলব্ধি থেকে উদ্ভূত এই বাক্যটি,
সেটিকে মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে দেন, আপনি দেখবেন, একই সত্য লুকিয়ে আছে।
আসুন আমরা এ নিয়ে একটু সামনে আগাই।
দেখুন, ক্যামেরার চোখে আগে দুটি রংই
বের হতো-সাদা এবং কালো। এখন আপনি রঙিন অর্থাৎ সব রংই ক্যামেরায় পাচ্ছেন।
ক্যামেরা থেকে বাস্তব জীবনে যান, দেখবেন আধুনিক যুগের আগ পর্যন্ত অর্থাৎ
প্রাচীন ও মধ্যযুগ পুরোটা জুড়েই মানুষের জীবন ছিল, অতি সাধারণ, সাদা-মাটা,
সহজ-সরল-যাকে আমরা বলি রংবিহীন সাদা-কালো অতিবাহিত জীবন। এখন অনেকেই বলেন,
যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ (এটিও একটি প্রবাদ বাক্য)। আবার যারা ভোগবাদে
বিশ্বাসী, তারা অতীতকে অস্বীকার করেই যেন বলেন, ‘পৃথিবী সুন্দর, আনন্দময়,
তাই উপভোগ করো, পিছনটা ডার্টি’- এমন স্লোগানে বা ধোয়া উঠিয়ে। এখন এখানে
কয়েকটি প্রশ্নের মুখোমুখি আপনি চাইলে হতে পারেন। যেমন একদল বলেন, অতীতের
অভিজ্ঞতা ফুটে ওঠে বর্তমান ও ভবিষ্যতের আয়নায়, আবার আরেক দল ওই যে বললাম,
অতীতকে অস্বীকার করেন। এই বিতর্কে না জড়িয়ে অন্যদল বলেন, তিন কালই মানুষের
জীবনের জন্য প্রয়োজন অর্থাৎ তার বলতে চান, সাদা-কালো ও রঙিন-সব নিয়েই
চলাটাই শ্রেয় বা যুক্তিযুক্ত। এখানে অনেক কথাই বলা যায়-যেমন আপনি কি আপনার
জন্মদাতাকে অস্বীকার করতে পারবেন? যিনি আগেকার আমলের মানুষ, যার অধিকাংশ
অভ্যাস বা কার্যক্রম পুরোনো আমলের অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবেই তিনি সাদা-কালো
যুগকে ধারণ করেন। প্রশ্ন আসতে পারে-তাহলে তিনি কি উত্তরসূরির জীবন
বাস্তবতাকে গ্রহণ করবেন না? নিশ্চয়ই করবেন? কিন্তু বাপ-বেটার মধ্যে দূরত্বও
থাকবে বা থাকে। এই দূরত্ব কিছুটা অদেখা, কিছুটা অজান্তে বেড়ে ওঠা।
এবার
আসতে চাই-এই প্রবাদ বাক্যটির গভীর তলদেশে। তলদেশ বলতে মানুষের স্বভাবের
গভীরতা নিয়ে সামান্য আলোকপাত করতে। ওই যে বললাম, বাপ-বেটার কথা, যারা
পরম্পরা অর্থাৎ যারা পূর্বসূরি ও উত্তরসূরি। তাদের জীবনে যদি প্রবেশ করি,
তাহলে দেখব মানুষ তার স্বভাবে, আচরণে, বিদ্যাশিক্ষায়, চলনে-বলনে, বিচরণে
কেমন? খেয়াল করবেন, আমরা বলে থাকি-বাপকা বেটা অর্থাৎ যেমন বাপ তেমনি পোলা।
এই কথার অর্থ আমরা সবাই জানি অর্থাৎ বাবার স্বভাব-চরিত্র ফুটে ওঠে ছেলের
ভেতর। অর্থাৎ পিতা ভালো তো, পুত্র ভালো। তাহলে দাঁড়াল-একজন জন্মদাতা বাবাকে
একজন শুদ্ধ মানুষ হতে হবে। এই বাবা হবেন একজন নির্লোভ, সৎ, নিষ্ঠাবান,
পরিশ্রমী, জ্ঞানী, দূরদর্শী ও স্বপ্নদ্রষ্টা। যদিও এতগুলো বিষয় ধারণ করা
একজন মানুষের পক্ষে কঠিন, তবুও এই উদ্যোম এবং উদ্যোগ একজন মানুষের ভেতরে
থাকা উচিত। না থাকলে, সাদা মানুষটি কালো হয়ে যাবেন আর কালো হওয়া মানেই
আপনার এই রং, আপনার জীবন থেকে মুছতে পারবেন না? এবং যখন এই পরিচয়ে আপনি
সমাজে বাস করবেন তখন দুটি বিপদ-এক. আপনাকে সমাজ নিন্দা করবে আর দুই, আপনার
ঔরসজাত সন্তান আপনার মনোবৈকল্য গ্রহণ করলে, সন্তানটি পগাড়ে পড়ে যেতে পারে
অর্থাৎ সন্তানটি বিপদে ও বিপথে চলে যেতে পারে। এর সম্পূরকে এটা বলা যেতে
পারে যে, চোরের ছেলে চোরই হয়। এখন হয়তো নয়। কিন্তু আগে এটা অনেকটা সত্য ছিল
বা বাস্তবে দেখা গেছে-নিবিড় গ্রাম জীবনে।
কথায় এগিয়ে যাই-বলতে চাই,
আপনাকে শুরু থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে, আপনি কীভাবে জীবনকে সাজাবেন? কারণ
আপনার কাঁধে উঠবে পরবর্তী প্রজন্ম। যাকে কোলে-পিঠে, আঙুল ধরে হাঁটিয়ে,
সাঁতার শিখিয়ে, পড়াশোনা করিয়ে বড় করবেন এবং আপনার চেহারার সৌন্দর্য তার
চেহারায় দেখতে চাইবেন, তখনই আপনার ভেতরে উপলব্ধির জন্ম হবে যে, আপনাকে পচে
যাওয়া যাবে না, আপনাকে ব্যর্থ হওয়া যাবে না? একবার ব্যর্থ হয়ে গেলে, সফল
হওয়া দুরূহ হয়ে ওঠে। এই ব্যর্থতার উদাহরণ টানতে রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে
উদ্ধৃতি করি: ‘আজি যে-রজনী যায় ফিরাইব তায়/ কেমনে/ আমি বৃথা অভিসারে এ
যমুনাপারে এসেছি।/ বহি বৃথা মনোআশা এত ভালোবাসা/ গিফটের বাস্কেট বেসেছি।/
শেষে নিশিশেষে বদন মলিন,/ ক্লান্ত চরণ, মন উদাসীন,/ ফিরিয়া চলেছি কোন
সুখহীন ভবনে’! একটি নস্টালজিক আবহে রবীন্দ্রনাথ ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেছেন
কিন্তু বাস্তবের ব্যর্থতা আরও নির্মোহ বৈকি?
এখন আসুন, যিনি প্রথম
জীবনাভিজ্ঞতার আলোকে উচ্চারণ করেছিলেন এই বাক্যটি, ‘কয়লা ধুইলে ময়লা যায়
না’-তাতে নিশ্চয়ই নষ্ট বা ভ্রষ্ট মানুষের ব্যর্থতা বা কালো হয়ে যাওয়াকে
লক্ষ্য করেই বলেছিলেন। এবং এই বাকটি যুগ যুগ ধরে সত্য ও সুন্দর হয়ে আসছে।
তাই আমাদের ব্যর্থ হওয়া যাবে না, নষ্ট হওয়া যাবে না, পচে যাওয়া যাবে না,
কালো হওয়া যাবে না? আমরা যাতে আমাদের জীবনের কালো থেকেই বেরিয়ে যেতে পারি।
কালো মানে অন্ধকার, অন্ধকার মানে অচেনা জগৎ। একটাই যেহেতু জীবন পাব, তাই
জীবন রঙিন না হোক, সাদা অর্থাৎ স্বচ্ছ জীবন যেন হয়। এখন তো এই একুশ শতকে
জীবন আরও বেশি কঠিন ও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। তাই আমাদের মনে রাখতে হবে,
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা। বর্তমান যে প্রজন্ম আছে, তাদের
সুশিক্ষিত, পরিশীলিত, রুচিপূর্ণ, সংস্কৃতিবান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
প্রজন্ম পচে গেলে, সমাজ নষ্ট হবে। ভাববার সময় এখনই। আমাদের আরও মনে রাখতে
হবে, সব সময় আমাদের ভেতরে সত্য ও সুন্দরের জাগরণ থাকতে হবে। সমুদ্রের বিশাল
ঢেউয়ের মতো আমরা যেন সত্য ও সুন্দরকে নিয়ে সৈকতের দিকে ধাবিত হতে পারি।
নিশ্বাস নিতে পারি-সাগর উত্থিত বাতাস। আমাদের বুক যেন ভরে আত্মবিশ্বাসে,
অহংকারে। তাই আপনি আগামীকাল সকালেই, আপনার সন্তানকে আলোচ্য প্রবাদটি
উচ্চারণ করে আরও কয়েকটি প্রবাদ বাক্য বলুন-যেমন: ‘অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ’
‘অতি লোভে তাঁতী নষ্ট’ ‘অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী’ ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’ ‘আপনি
ভালো তো জগৎ ভালো’ ‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়’ ‘এক হাতে তালি বাজে না’ ‘কষ্ট না
করলে কেষ্ট মেলে না’ ‘গাইতে গাইতে গায়েন বাজাইতে বাজাইতে বায়েন’ ‘চোরা না
শুনে ধমের্র কাহিনী’ ‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’ ‘সদা সত্য কথা বলিবো’ ইত্যাদি।
খেয়াল করুন, যে কটি বাক্য এখানে তুলে ধরলাম, এই কটার মধ্যেই বাস্তব জীবনের
অনেক নিগূঢ় সত্য খুঁজে পাবেন। এসব বলার একটিই উদ্দেশ্য, যা বলে গেছেন
মধ্যযুগের বিখ্যাত কবি ভারতচন্দ্র রায়গুনাকার-‘আমার সন্তান যেন থাকে
দুধেভাতে’-আহা নিদারুণ চাওয়া!
লেখক: কবি
