
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দিতে বাস দূর্ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে শিশুসহ চারজন নিহত হয়েছেন। ৯ জানুয়ারী শুক্রবার দুপুর পৌনে ১টায় উপজেলার বানিয়াপাড়া এলাকায় এদূর্ঘটনায় ২৬ জন আহত হয়েছেন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানাযায়, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কুমিল্লাগামী একটি যাত্রীবাহী বাস বানিয়াপাড়া এলাকায় একটি ট্রাককে ওভারটেক করতে গিয়ে এদূর্ঘটনা ঘটে। বাসটি ওভারটেক করার সময় সামনে একটি মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা বাঁচাতে গিয়ে হার্ড ব্রেক করলে বাসটি সড়কের উপর উল্টে মোটরসাইকেলসহ ছেচড়ে অনেকদুর যায়। এতে বাসটিতে আগুন ধরে যায়।
নিহতরা হলো, মোটরসাইকেল চালক দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের পেন্নাই (পলুদ্দিপাড়) গ্রামের সামছুল আলমের ছেলে মো. শামীম (৪১) ও তার ছেলে নাদিম(৬) এবং নারায়নগঞ্জের সোনারগাও থানার মাঝেরচর গ্রামের সুমন মিয়ার ছেলে হোসাইন(২) ও চল্লিশোর্ধ্ব অজ্ঞাত এক নারী।
আহত বাসযাত্রী মো. সুমন বলেন, আমার স্ত্রী এবং ১৬ মাসের ছেলেকে নিয়ে মোগড়াপাড়া থেকে ফেনীর উদ্দেশ্যে বাসে উঠি। গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডে যাওযার পর যাত্রীর জন্য বাসটি অনেকক্ষণ দেরি করে। এতে বাসের যাত্রীরা চালকের সাথে চিল্লাচিল্লি করে। পরে চালক যাত্রীদের সাথে রাগ দেখিয়ে এলোপাতাড়িভাবে বাসটি বেপরোয়া চালাতে শুরু করে। আমরা চিৎকার করলেও চালক শুনেনি।একটু পরেই বাসটি হোন্ডা অটোরিকশা নিয়ে সড়কে উল্টে বাসে আগুন ধরে যায়। আমি এবং আমার স্ত্রী কোন রকমে বের হলেও দেড় বছরের ছেলে মো. হোসাইনকে বের করতে পারিনি। আহত সুমন নারায়নগঞ্জের সোনারগাও থানার মাঝেরচর গ্রামের রিপন মিয়ার ছেলে। এদিকে মোটরসাইকেল চালক মো. শামীম তার ছেলেকে নিয়ে বানিয়াপাড়া দরবার শরিফে জুম্মার নামাজ পড়তে গিয়ে এদূর্ঘটনার নিহত হয়।
দূর্ঘটনার সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষণিক দাউদকান্দি ফায়ার সার্ভিসের এসও ইশরাদ হোসাইন এর নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। একই সঙ্গে হাইওয়ে পুলিশ, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ও স্থানীয়রা উদ্ধার তৎপরতা চালায়।
যাত্রীরা জানান, বাসটি প্রথমে খুব ধীরে ধীরে চলছিল। পরে হঠাৎ করেই গতি বাড়িয়ে দেয়। বাসটি তখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রথমে সামনে থাকা একটি অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয়, এতে অটোরিকশাটি রাস্তার পাশে খাদে পড়ে যায়। পরে সেটি গিয়ে মোটরসাইকেলের উপর উঠে যায়।
বাস যাত্রী মো. সুমন জানান দুর্ঘটনার আগে যাত্রীদের সঙ্গে বাসের চালক ও সুপারভাইজারের ঝগড়া হয়। কারণ, চালক বাসটি খুব কম গতিতে চালাচ্ছিলেন। আর সুপারভাইজার যেখানে সেখানে থামিয়ে রাস্তা থেকে লোক তুলছিলেন। ঝগড়ার মধ্যে হঠাৎ করেই চালক গতি বাড়িয়ে দেন। তখন তিনি বাসটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন আর দুর্ঘটনা ঘটে।
দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার সাব-ইন্সপেক্টর মো. আছিফ জানান, দুর্ঘটনার পরপরই যাত্রীবাহী বাসে (ঢাকা মেট্রো-ব-১১-১৮৫৮) ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ যৌথভাবে উদ্ধার কাজ করে। দুর্ঘটনায় বাস ও মোটরসাইকেল আগুনে সম্পন্ন পুড়ে যায়। এতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে দুই শিশু, এক নারীসহ চারজন নিহত হয়েছেন।
দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রিয়াদ মাহমুদ ও মেডিকেল অফিসার (এমও) ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন জানান, ৪ জন যাত্রী ঘটনাস্থলেই দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। গুরুতর দগ্ধ ১২ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। ১৪ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।
দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইকবাল বাহার মজুমদার বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বাসের সঙ্গে সংঘর্ষের পর মোটরসাইকেলের জ্বালানির ট্যাংক থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। এতে পুরো বাসে আগুন ধরে যায়। ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তখন আমরা ঘটনাস্থলে চারজনের দগ্ধ মরদেহ পড়ে থাকতে দেখি। পরে হতাহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়।
দুর্ঘটনায় কবলিত আগুনে পোড়া বাস ও মোটরসাইকেলসহ ইজিবাইক থানা হেফাজতে আছে। বাসটির চালক পলাতক। মরদেহ নিহতের স্বজনদের নিকট হস্তান্তর প্রক্রিয়াধীন।
দাউদকান্দি ফায়ার সার্ভিসের এসও ইশরাদ হোসাইন বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, বাসটি মোটরসাইকেলকে চাপা দেয়। এতে মোটরসাইকেলের জ্বালানির ট্যাংক রাস্তায় ঘর্ষণের ফলে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে মোটরসাইকেলের অকটেন ছড়িয়ে পড়লে আগুনও বেড়ে যায়। হয়ত ধোঁয়ার কারণে যাত্রীরা বাস থেকে বের হতে পারেনি। তারপরও আমরা তদন্ত করে দেখছি দুর্ঘটনার মূল কারণ কী?
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) দাউদকান্দি উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, মহাসড়কে ব্যাপকহারে থ্রি হুইলার অবাধে চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বাড়ছে দূর্ঘটনার সংখ্যা। আমরা নিয়মিত ভাবে থ্রি হুইলার বন্ধে জনসচেতনতা করছি। এবিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।