
সংবাদপত্র
নাগরিক জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ, সমাজের আয়না। আয়নায় যেমন নিজের চেহারা
প্রতিবিম্বিত হয়, তেমনি সমাজের চিত্র ফুটে উঠে পত্রিকার মাধ্যমে। সমকালীন
বিশ্ব, দেশ, জাতি ও সমাজের চলমান ঘটনা, জীবনযাত্রা, চিন্তাচেতনা,
সংবাদপত্রের পাতায় ছাপা হয়। সংবাদপত্রকে প্রায়শই জাতির বিবেক হিসেবে দেখা
হয়, যা দেশের প্রধান সমস্যা ও ঘটনাবলিকে প্রতিফলিত করে। স্বাধীন
সংবাদমাধ্যম হলো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ৪র্থ স্তম্ভ। যুক্তরাষ্ট্রের
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল রচয়িতাদের অন্যতম জেফারসন বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি
এই বিকল্পটি দেওয়া হয় যে তুমি কি সংবাদপত্রবিহীন সরকার চাও, না সরকারবিহীন
সংবাদপত্র চাও? তখন আমি পরেরটা বেছে নেব। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ান
বোনাপার্ট সংবাদপত্রকে বেয়নেটের চেয়েও আক্রমণাত্বক বলে মন্তব্য করেছেন।
অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, ‘কোনো দেশে স্বাধীন গণমাধ্যম থাকলে সে দেশে
দুর্ভিক্ষ হানা দিতে পারে না’। বিদগ্ধজনদের এসব প্রতিক্রিয়া থেকেই
সংবাদপত্রের গুরুত বোঝানোর জন্য যথেষ্ট।
আধুনিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে
সাংবাদিকতার সূচনা হয়আঠারো শতকে ইউরোপে। এ উপমহাদেশে ১৭৮০ সালে কলকাতা থেকে
বেঙ্গল গেজেট বা হিকির বেঙ্গল গেজেট প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে মুদ্রণ
সাংবাদিকতার শুরু হয় । উনিশ শতকের শুরুতে ১৮১৮ সালে বাংলা সাংবাদিকতার
যাত্রা শুরু হয়। গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য কর্তৃক প্রকাশিত 'বাঙ্গাল গেজেট'
ছিল বাঙালিদের দ্বারা প্রকাশিত প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা, 'দিগদর্শন'
ছিল প্রথম বাংলা মাসিক পত্রিকা এবং 'সমাচার দর্পণ' ছিল প্রথম বাংলা
সাপ্তাহিক সংবাদপত্র। বিশ শতকের শুরুতে সাংবাদিকতা পেশার বিস্তৃতি ঘটে।
পরবর্তীতে নানা পথপরিক্রমায় সময়ের চাহিদা পূরণে সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটেছে।
টেলিভিশন, বেতার ও চলচ্চিত্র গণমাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত
হয়েছে । ইন্টারনেটের আবির্ভাব ও অনলাইন সাংবাদিকতা স্বল্প সময়ের মধ্যে
সাংবাদিকতার জগতে নাটকীয় পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা
অধিদপ্তরের হিসেব মতে সেপ্টেম্বর, ২০২৫ পর্যন্ত দেশে সংবাদপত্রের সংখ্যা
৩৩৪৮ টি, তার মধ্যে দৈনিক সংবাদপত্রের সংখ্যা-১৩৯৬ টি (ঢাকা মহানগর-৫৭৩ টি
এবং ঢাকা মহানগরের বাইরে-৮২৩ টি) ।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রসারে
সংবাদপত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংবাদপত্র ও বস্তুনিষ্ঠ
সাংবাদিকতা গণতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্য অঙ্গ। সংবাদপত্র বিভিন্ন দেশীয় ও
আন্তর্জাতিক ঘটনা, সামাজিক সমস্যা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জনগণকে
অবহিত করার মাধ্যমে জনমত গঠন এবং নাগরিকদের সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম
করে তোলে। সংবাদপত্র সরকার ও জনগণের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে, বিভিন্ন
সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় সম্পর্কে তথ্য এবং বিশ্লেষণ সরবরাহ করে এবং একটি
সুস্থ ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের ভিত্তি গড়ে তোলে। একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল
সংবাদপত্র বিভিন্ন পর্যায়ে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভালো -মন্দ তুলে ধরে
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। আমাদের এ ভূখ-েও সংবাদপত্র বরাবর
সমৃদ্ধ আগামী বিনির্মাণে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেছে। বায়ান্নর ভাষা
আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে
সংবাদপত্র জাতীয় স্বার্থ, মানবাধিকার উন্নয়নে ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণে,
গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করেছে।
সংবাদপত্র
একটি দেশ ও জাতিকে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ ও গণতান্ত্রিক আশা-আকাংক্ষা
পূরণে অন্যতম হাতিয়ার। সংবাদ বলতে অতীত ও বর্তমান ঘটনাপ্রবাহের একগুচ্ছ
নির্বাচিত তথ্যের সমষ্টি যা যোগাযোগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
পরবর্তিতে এসব তথ্যের উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতের পথ নকশা রচিত হয়। সেই অর্থে
সংবাদ হলো আজকের মোড়কে দেওয়া আগামী দিনের ইতিহাস। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ
বলেছেন, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে। একজন সাংবাদিকের সহজিয়া ভাষায় রচিত
তথ্যবহুল রিপোর্ট পাঠককে আকর্ষণ করে, সংবাদপত্র পঠনে মনোযোগী করে তোলে।
সংবাদ প্রকাশের দায় মূলত সাংবাদিক, সম্পাদক এবং সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা
প্রতিষ্ঠানের। প্রতিবেদনের সত্যতা, নিরপেক্ষতা এবং বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিত
করার প্রধান দায় তাঁদের। তাঁদের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে সংবাদ প্রকাশিত
হয়। একজন সংবাদপত্র সম্পাদকের দায়িত্ব থাকে সংবাদপত্রের বিষয়বস্তু এবং
উৎপাদন তত্ত্বাবধান করা, এটি সঠিক, আকর্ষণীয় এবং সময়মতো প্রকাশিত হওয়া
নিশ্চিত করা। সম্পাদকের দায়িত্ব হলো দল পরিচলনা করা, নিবন্ধ সম্পদনা এবং
তথ্য-পরীক্ষা করা এবং বিন্যাস এবং নকশার বিষয়ে চূড়ান্ত সিন্ধান্ত নেওয়া।
সম্পাদকরা বিষয়বন্তু কৌশলও তৈরি করেন, সাংবাদিকতার মান বজায় রাখেন এবং
সম্পাদকীয় বাজেট এবং সময়সীমা পরিচালনা করেন। সংবাদ ছাপানোর আগে একটি
অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা এবং পেশাগত নৈতিকতা
বজায় রাখা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। এই দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য
সত্যতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অপরিহার্য।
রাষ্ট্র,
সমাজ ও মানুষকে সত্য সংবাদ প্রাপ্তির সুযোগ করে দেয়াই একজন সাংবাদিকের
প্রথম দায়বদ্ধতা। সাংবাদিকতার মূল নীতি হলো সত্যনিষ্ঠ তথ্য পরিবেশন করা,
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে পক্ষপাতিত্ব না করে নিরপেক্ষভাবে সংবাদ
পরিবেশন করা। একজন সাংবাদিককে অবশ্যই নৈতিক, সংবেদনশীল, এবং আপোষহীন হতে
হবে, যিনি দেশ ও জনগণের পক্ষে কাজ করবেন। সংবাদের বিষয়বস্তু এমনভাবে
উপস্থাপন করা যাতে জনগণের, বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সম্মান ও
সংবেদনশীলতা থাকে। সাংবাদিকের মূল দায়িত্ব হলো সত্য উদঘাটন করা এবং তা
নিরপেক্ষভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরা। এর মধ্যে রয়েছে তথ্য যাচাই করা, সমাজের
ভুলত্রুটি তুলে ধরা । আন্তরিকতার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালন করা এবং
পক্ষপাতহীনভাবে কাজ করা সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্ব। দায়িত্বশীল ও পেশাদার
সাংবাদিক হিসেবে কাজ করলে আইনি সুরক্ষা পাওয়া যায়।
সাংবাদিকাতা একটি
অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং পেশা এবং এ পেশা দিন দিন বিপদজনক হয়ে উঠছে।
সাংবাদিকাতা কাজ করতে গিয়ে পদে পদে ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে
সমাজের, রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানদের বিপক্ষে কোন সংবাদ প্রচারিত হলে
প্রতিবেদককে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করা
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস
(সিপিজে)’র এক প্রতিবেদন মতে ২০২৪ সালে বিশ্বের ১৮টি দেশে অন্তত ১২৪ জন
সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। যা ২০২৩ সালে ছিল ১০২ জন এবং ২০২২ সালে ছিল ৬৯ জন।
সিপিজে’র আর একটি তথ্য মতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বব্যপি ৩৬১ জন
সাংবাদিক কারাগারে যেতে বাধ্য হয়েছে।
পত্রিকার পাঠকদের প্রধান দায় হলো
সংবাদের সত্যতা যাচাই করা এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণ করা।
বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্যকে সমালোচনামূলকভাবে যাচাই করা উচিত। শুধু একটি
মাধ্যমের উপর নির্ভর না করে, একাধিক উৎস থেকে তথ্য যাচাই করে একটি
সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। কেবল ভাইরাল বা চটকদার খবর না পড়ে, বরং নিরপেক্ষ
এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে সংবাদ
মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ভুল বা ভিত্তিহীন তথ্যের প্রচার প্রতিহত করতে সচেতন
পাঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা উচিত। ভুল তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা এবং
অন্যদেরও সচেতন করা জরুরি। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং পেশাদারিত্বের প্রতি
সম্মান জানানো, তাদের কাজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং অপসাংবাদিকতা ও
হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া উচিত। এটি সংবাদপত্রের ও
সাংবাদিকতার মান উন্নয়নে সাহায্য করে। সংবাদপত্রের মাধ্যমে নিজেদের জ্ঞান ও
সচেতনতা বৃদ্ধি করা উচিত। এটি শুধু স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী
সম্পর্কে জানতেই সাহায্য করে না, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নেও সহায়ক হয়।
বাংলাদেশের
জনসংখ্যার বাড়ছে। সেই সাথে তাল মিলিয়ে সংবাদপত্রও বাড়ছে (অনলাই/অফলাইন)।
সংবাদপত্রও বাড়ছে তবে সে অনুপাতে সংবাদপত্রের পাঠকের সংখ্যা বাড়ছে কিনা তা
নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে সংবাদপত্রের গুরুত্ব দিন দিন বেড়ে চলেছে। কিছু কিছু
সংবাদপত্র সংবাদের গুণগত মান ও উপস্থাপনার কারণে পাঠকের মন জয় করতে পারছে,
কোন কোনটা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ঝড়ে পড়ছে। ঢাকার বাইরে জেলা/উপজেলা
পর্যায়ে বিজ্ঞাপনের অভাবে সংবাদপত্র প্রকাশ করা ও চালিয়ে নেওয়া খুবই
চ্যালেঞ্জিং একটি বিষয়।
সংবাদপত্র এক অর্থে সমাজমনষ্ক পাঠক তৈরী করে
আবার অন্যদিকে সমাজমনস্ক পাঠকরাই হচ্ছে সংবাদপত্রের প্রাণশক্তি। সংবাদপত্র
পাঠকের মনের খোরাক জোগায়, বিবিধ বিষয়ে ধারনা দিয়ে তাঁর মনোজগতে প্রভাব
বিস্তার করে সাধারণ পাঠককেও সপ্রতিভ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে।
একজন সচেতন নাগরিক নিজের কল্যাণ সাধনের পাশাপাশি জাতির উন্নয়ন ধারায় নিজেকে
নিয়োজিত করতে পারে। এখানেই সংবাদপত্রের স্বার্থকতা। একটি মানসম্মত
সংবাদপত্র ও দেশপ্রেম উদ্বুদ্ধ একজন দক্ষ ও বিচক্ষণ সাংবাদিক দেশ ও জাতি
গঠনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সংবাদপত্র-সাংবাদিক- সংবাদপত্র পাঠক এ
ত্রয়ীর কার্যকরী মেলবন্ধন সার্বিক বিবেচনায় দেশ ও জাতি গঠনে অত্যন্ত
জরুরি। তাই মানসম্মত পত্রিকা প্রকাশিত হোক, সমাজকে আলোকিত করুক, দেশের
উন্নয়ন যাত্রার সারথী হোক। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনা এবং অন্যয়ের বিরুদ্ধে
প্রতিবাদী ভূমিকা রেখে পজেটিভ খবর প্রকাশনার মাধ্যমে তরুণ-যুব সমাজকে
দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করুক, বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের মধ্যে মেলবন্ধন গড়ে
তুলতে ভূমিকা রাখুক, পৃথিবীকে সতেজ করে তুলুক।
লেখকঃ পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যব¯’াপনা বিভাগে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত।
