
বাংলাদেশের
রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানত একজন শক্তিমান রাজনৈতিক নেতা,
গণতন্ত্রের অন্যতম রূপকার ও প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের একটি অধ্যায়, বিশেষ করে
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বীজবপনের ইতিহাসে তার ভূমিকা প্রায়শই আলোচনার আড়ালে
থেকে যায়। বাংলাদেশ যখন “ডিজিটাল বাংলাদেশ” এর যুগে পা রেখেছে, তখন এই
যাত্রার প্রাথমিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো রচিত হয়েছিল বেগম খালেদা
জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলেই। বিদ্যুৎ সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং
প্রযুক্তি বিষয়ে জনসচেতনতার অভাব—এই সব চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই এগোতে হয়েছে
সেই সময়ের সরকারকে। অনেক প্রকল্প প্রত্যাশিত গতিতে বাস্তবায়িত হয়নি। তবুও
ইতিহাসের নিরিখে এটি অনস্বীকার্য যে, বেগম খালেদা জিয়ার আমলে গৃহীত নীতিগত ও
প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তগুলোই আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশের শক্ত ভিত্তি রচনা
করেছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০০১ সালে বিএনপি
সরকার ক্ষমতায় আসার পর তথ্যপ্রযুক্তি খাতে গৃহীত উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক
অঙ্গনেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৩ সালে তৎকালীন মার্কিন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল বাংলাদেশ সফর করেন। সফরকালে তিনি
প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন এবং বিজ্ঞান ও
তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খানের সঙ্গেও বিস্তারিত আলোচনা করেন।
পাশাপাশি তিনি দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
পরবর্তীতে
জর্ডানের রাজধানী আম্মানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব উন্নয়ন ফোরামের এক উদ্বোধনী
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কলিন পাওয়েল তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের
সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইন্টারনেট ও
তথ্যপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের এই সাফল্য সিলিকন ভ্যালি বা ইউরোপের কোনো
উন্নত দেশের নয়-এটি বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্জন। তার
বক্তব্যে উঠে আসে, বাংলাদেশের ছোট শহর ও প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ইন্টারনেট
সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে তরুণদের জ্ঞান
অর্জন ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
দারিদ্র্য ও জনসংখ্যার চাপ
থাকা সত্ত্বেও দেশের প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার
লক্ষ্যে তৎকালীন সরকারের অঙ্গীকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন কলিন পাওয়েল। তিনি
বলেন, বাংলাদেশের মতো সংকটাপন্ন ও প্রয়োজনমুখী দেশে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত
ইন্টারনেট সম্প্রসারণ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তার
মতে, এই অভিজ্ঞতা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের জন্যই
শিক্ষণীয়।
এরশাদ সরকারের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া।
১৯৯১
সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় বাংলাদেশে
কম্পিউটার প্রযুক্তি ছিল সীমিত কয়েকটি সরকারি দপ্তর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের
আইবিএম মেইনফ্রেমের মধ্যে আবদ্ধ। ইন্টারনেট তখনো সাধারণ মানুষের কাছে প্রায়
অজানা ধারণা। অথচ সেই সময়েই বৈশ্বিক পরিম-লে তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের সূচনা
হচ্ছিল। ‘ইনফরমেশন সুপারহাইওয়ে’র ধারণা বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসছিল।
একটি
উন্নয়নশীল, সম্পদস্বল্প ও রাজনৈতিকভাবে অস্থির দেশের নেতৃত্বে থেকেও বেগম
খালেদা জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন—দারিদ্র্য মোকাবিলা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে
টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে রূপান্তরিত করতে
হবে। সে সময় তথ্যপ্রযুক্তিকে অনেকেই ‘বিলাসিতা’ হিসেবে দেখলেও তার সরকার
এটিকে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে গ্রহণ করে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত
সময়টি ছিল বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির ‘বীজ বপনের যুগ’। এই সময়ে বেশ কয়েকটি
যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা পরবর্তীকালে ডিজিটাল অগ্রযাত্রার পথ
সুগম করে।
১৯৯১ সালে যখন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর বিএনপি সরকার গঠিত
হয়, তখন বিশ্বের অনেক দেশ তথ্যপ্রযুক্তির দিক থেকে প্রাথমিক অবস্থায় ছিল।
ইন্টারনেট তখন সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছায়নি, মোবাইল ফোন তখনো সীমিত
পরিসরে। ঠিক সেই সময় বাংলাদেশে শুরু হয় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন স্যাটেলাইট
টেলিভিশনের অনুমোদন, বেতার ও টেলিযোগাযোগ খাতের উন্মুক্তকরণ এবং কম্পিউটার
ব্যবহারের প্রতি সরকারি উৎসাহ। সেই সময় বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো
ব্যক্তিগত খাতে টেলিযোগাযোগ খাত খুলে দেওয়া হয়, যা পরবর্তী সময়ে মোবাইল ফোন
সেবা বিকাশের পথ প্রশস্ত করে। ১৯৯৩ সালে বুলেটিন বোর্ড সিস্টেম বা বিবিএস
পদ্ধতির মাধ্যমে ডায়াল-আপ সংযোগ ব্যবহার করে ইমেইল ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি
হয়। এটি ছিল বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি ইতিহাসের এক যুগান্তকারী মুহূর্ত।
এরপর দেশে অফলাইন ইন্টারনেট চালু হয়, যার মাধ্যমে সীমিত পরিসরে ইমেইল
আদান-প্রদান ও তথ্য অ্যাক্সেসের সুযোগ তৈরি হয়। এ উদ্যোগগুলোর সবই গৃহীত
হয়েছিল বিএনপি সরকারের সময়। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির উদ্যোগে ঢাকায়
অনুষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম কম্পিউটার মেলা ‘বিসিএস কম্পিউটার শো-১৯৯৩’। সেই
আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষ কম্পিউটার প্রযুক্তির সঙ্গে
পরিচিত হয় এবং দেশে নতুন প্রযুক্তি সংস্কৃতির সূচনা ঘটে।
আবারো বেগম
খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০১-২০০৬) তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ পায়
নতুন মাত্রা। সরকার তখন উপলব্ধি করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা ও
প্রশাসনকে আধুনিকীকরণের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি অপরিহার্য। ফলে গঠন করা হয়,
নতুন একটি মন্ত্রণালয় বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. আব্দুল মঈন খান। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে
বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাত প্রথমবারের মতো আলাদা নীতিনির্ধারণী মর্যাদা
পায়। ২০০২ সালে প্রণীত হয় জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালা, যা দেশের প্রথম
আইসিটি পলিসি। এতে বলা হয় তথ্যপ্রযুক্তি হবে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের
হাতিয়ার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। একই বছর প্রতিষ্ঠিত হয়
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), যা টেলিকম খাতে
নীতিমালা নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে
মাইক্রোসফট করপোরেশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সেই সময়ের শীর্ষ ধনী বিল গেটস
প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফরে আসেন। সরকারের সঙ্গে, বিশেষ করে শিক্ষা
মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মাইক্রোসফট-সংক্রান্ত বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
এরপর বেগম খালেদা জিয়ার সরকার ধারাবাহিকভাবে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি
উন্নয়নকল্পে বিভিন্ন উদ্যোগ হাতে নেয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রতিষ্ঠা, প্রসার ঘটে এর মধ্যে। এই সময়েই প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা
জিয়া কালিয়াকৈরে হাই-টেক পার্ক স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করেন। তালিবাবাদ
আর্থ স্যাটেলাইট স্টেশনের কাছে কালিয়াকৈরে ২৩১.৬৮৫ একর জমি বরাদ্দ দিয়ে
দেশের প্রথম হাই-টেক পার্কটি নির্মাণ করা হয়। হাইটেক পার্কের ধারণাটি সে
সময় দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ছিল এবং বাংলাদেশই প্রথম দেশ হিসেবে এটি
বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ নেয়। এছাড়া প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে ২০০৩
সালে জেনেভায় তথ্যসমাজ সংক্রান্ত সন্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার তথ্য প্রযুক্তির
উন্নয়নে ডিজিটাল সংহতি তহবিল গঠনের উপর জোর সুপারিশ করেন বেগম খালেদা জিয়া।
২০০৬
সালে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্কের (এসএমডাব্লিউ-৪) সাথে
সংযুক্ত হয়, যা দেশে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবার নতুন যুগের সূচনা করে।
বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ এই অগ্রযাত্রা সহজ ছিল না। সে সময় বিদ্যুৎ সমস্যা,
প্রযুক্তি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অনীহা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ছিল বড়
চ্যালেঞ্জ। অনেক প্রকল্প ধীরগতিতে এগিয়েছে। কিন্তু তবুও এটা অনস্বীকার্য
যে, সেই সময়ে গৃহীত নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যতের জন্য একটি মজবুত ভিত্তি
তৈরি করেছিল। এই ভাবে বিভিন্ন তথ্য প্রযুক্তির সেক্টরে উন্নয়নের কাজ শূরু
হয়েছিল বেগম জিয়ার সরকারের আমলে।
সুতরাং বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির
ব্যাপক পরিচিতি ঘটে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের হাত ধরে, বিএনপি
শাসনামলে। বিস্ময়কর মনে হলেও সত্যি যে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর প্রাথমিক ও
মূল কাজের ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা
জিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত বিএনপি আমলেই গড়ে ওঠা। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির
অগ্রদূত তিনিই। তার সরকারের সময়েই তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত
হয়। তার কাজের প্রশংসা করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী কলিন
পাওয়েল। পরবর্তী সরকারগুলো সেই ভিত্তির ওপরই কাজ করেছে, যদিও অনেক
ক্ষেত্রেই সে কাজ হয়েছে দুর্বল ও অদক্ষভাবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ
