প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ২:১৭ এএম আপডেট: ০৯.০১.২০২৬ ২:৪৯ এএম |

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কুমিল্লার বেশিরভাগ আসলে বিএনপি তে
অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কারো মনোনয়ন বাতিল, মনোনয়নপত্রের তথ্য গোপনের
অভিযোগ, কোথাও আসন বিন্যাস জটিলতা এবং কোথাও বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ দল বিএনপির নির্বাচনী সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে এই জটিলতা যেন আরো বেড়েই চলছে।
কুমিল্লা-
১ ও কুমিল্লা-২ আসনের ভৌগলিক পুনর্বিন্যাসে হাইকোর্ট নতুন রায় দিয়েছেন।
দাউদকান্দি তিতাস এই দুই উপজেলা কে নিয়ে কুমিল্লা -১ আসন এবং হোমনা ও মেঘনা
এই দুই উপজেলা কে নিয়ে কুমিল্লা - ২ আসন পুনর্বহালের রায় দিয়েছে হাইকোর্ট।
কিন্তু তফসিল ঘোষনার পর থেকে দাউদকান্দি- মেঘনা উপজেলা নিয়ে কুমিল্লা -১
আসন এবং হোমনা - তিতাস নিয়ে কুমিল্লা -২ আসনে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা
করে আসছিলো বিএনপি।
এর আগে মেঘনা -হোমনা আসনের দাবিতে আন্দোলন
করেছিলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ সেলিম ভুইয়া। কিন্তু নির্বাচন
কমিশন সেইভাবে আসন বিন্যাস না করায় কুমিল্লা-২ আসন থেকে নির্বাচনের
প্রস্তুতি নেয়ায় তার মুখোমুখি হয়েছে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। বর্তমানে
কুমিল্লা-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার শক্ত
প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন একই দলের প্রার্থী বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক
এপিএস আব্দুল মতিন।
হাইকোর্টের আদেশে নির্বাচন কমিশন এখন নতুন সীমানা
নিয়ে যদি গেজেট প্রকাশ করে তাহলে পুরনো সব সমীকরণ ভুলে গিয়ে বিএনপির
প্রার্থীদের নতুন করে ভাবতে হবে নির্বাচনী পরিকল্পনা। বিদ্রোহীকে নিয়ে
পুরনো অস্থিরতার পাশাপাশি এখন নতুন করে যোগ হবে নতুন আসন বিন্যাসে
নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করা। যদিও কুমিল্লা - ১ আসনে বিএনপি মনোনীত
প্রার্থী দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডঃ খন্দকার মোশারফ হোসেন সেখান থেকে
সর্বোচ্চ শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে তার দলের কাছে বিবেচিত। কুমিল্লা- ২
আসন নিয়ে তাই দলটিকে নতুন করে ভাবতেই হবে।
এদিকে কুমিল্লা- ৩ মুরাদনগর
আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের ফলকনামায় দ্বৈত
নাগরিকত্বের বিষয়ে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামী জোটের অন্যতম
রাজনৈতিক দল এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ও সাবেক উপদেষ্টা
আসিফ মাহমুদ। এ নিয়ে কমিশনে কথা বলেছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা.
সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। প্রাথমিক মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের
মনোনয়নপত্র উত্তীর্ণ হয়ে গেলেও যতক্ষণ পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তার
সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল ও শুনানি শেষ না হচ্ছে এই আসনে বিএনপি'র দুর্গেও
অস্থিরতা থেকেই যাচ্ছে। সময়ের উপর নির্ভর করছে এখন বিএনপির এই অস্থিরতা কত
দ্রুত শেষ হবে।
অন্যদিকে কুমিল্লা - ৪ দেবিদ্বার আসনে বিএনপি মনোনীত
প্রার্থী মনজুরুল আহসান মুন্সি 'ঋণ খেলাপি' কিনা এমন পরিস্থিতিতে
হাইকোর্টের দেয়া স্থগিতাদেশ বাতিল করেছে চেম্বার জজ আদালত। এতে করে
নির্বাচন কমিশন থেকে মনজুরুল আহসান মুন্সির মনোনয়নপত্র বাতিল হবার সম্ভাবনা
সর্বোচ্চ পর্যায়ে দেখা দিয়েছে। এই আসন থেকে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামি
জোটের শরিক দল এনসিপির মনোনীত প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ রিটার্নিং
কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি
ঋণ খেলাপি কিনা সেই বিষয়ে প্রশ্ন তুলেন। ৮ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার চেম্বার
আদালত হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করায় মনজুরুল আহসান মুন্সির প্রার্থীরা
বাতিলের বিষয়টি জেলা বিএনপির নির্বাচনী ব্যবস্থায় মোটা দাগে অস্থিরতা তৈরি
করেছে।
কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং -ব্রাহ্মণপাড়া) আসনটি নিয়ে বিএনপি অনেকটা
স্বস্তিতে থাকলেও দলীয় বিদ্রোহের কারণে কুমিল্লা- ৬ (সদর ও সদর দক্ষিণ)
আসনটিতে বিএনপির অস্থিরতা মনোনয়ন ঘোষণার আগে থেকেই। এখনো পর্যন্ত এই আসনে
দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে রেখেছেন দলের
চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাজী আমিনুর রশিদ ইয়াসিন। এই আসন থেকে বিএনপির
মনোনীত প্রার্থী চেয়ারপারসনের অপর উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরীও শক্তিশালী
প্রতিদ্বন্দ্বী, তবে তার বিরুদ্ধে মনোনয়নপত্র তথ্য গোপন করার অভিযোগে
নির্বাচন কমিশনের যাচাই-বাছাইয়ে আপিল করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। একই দল
থেকে দুই জনের মনোনয়নপত্র জমা দেয়া আসনটির বিএনপির রাজনীতিতে বিভক্তি তৈরি
করেছে, জানিয়ে অস্থিরতা রয়েছে কুমিল্লা জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীদের
মধ্যে।
এদিকে কুমিল্লা-০৭ চান্দিনা আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী
হয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এলডিপির সাবেক মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ,
তিনি চান্দিনা তে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং সেখান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত
হন। কিন্তু বিগত সময় গুলোতে এই আসনে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন বর্তমান
উপজেলা বিএনপির সভাপতি আতিকুল আলম শাওন, তিনিও এই আসন থেকে বিএনপি'র
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে রেখেছেন। দলীয় সিদ্ধান্তের
রেদোয়ান আহমেদের ধানের শীষ প্রতীক পাওয়া এবং আতিকুল আলম শাওনের নির্বাচনে
অংশগ্রহণ করার বিষয়টি স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও
অস্থিরতা তৈরি করে রেখেছে।
কুমিল্লা-৮ বরুড়া আসনে বিএনপির রাজনৈতিক
তুলনামূলক স্বস্তির। তবে কুমিল্লা- ০৯ লাকসাম- মনোহরগঞ্জ আসনে বিএনপির
মনোনীত প্রার্থী আবুল কালামের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন একই দলের স্বতন্ত্র
প্রার্থী সামিরা আজিম দোলা। নির্বাচনে অংশ নিতে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিলেও
প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে সেটি বাতিল হয়ে যায়। তবে তিনি জানিয়েছেন রিটার্নিং
কর্মকর্তার এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। এই আসনটিতে যদি আপিল
শুনানিতে সামিরা আজিম তোলার মনোনয়নপত্র টিকে যায় তাহলে বিএমপির মনোনীত
প্রার্থীর সাথে স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই অঞ্চলে বিএনপি'র
বিভক্তির অস্থিরতাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। তবে সামিরা আজম দোলার মনোনয়নপত্র
চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়ে গেলেও লাকসাম মনোহরগঞ্জে এই দুই নেতার সমর্থকদের
মধ্যে দ্বন্দ্ব নির্বাচন পর্যন্ত অস্থিরতা তৈরী করে রাখতে পারে বলে মনে
করেন ভোটাররা।
এদিকে কুমিল্লা -১১ চৌদ্দগ্রাম আসনেও বিএনপির মনোনীত
প্রার্থী কামরুল হুদাকে নিয়ে রয়েছে বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেমস লিমিটেডের
বকেয়া বিল পরিশোধের অনিয়মের অভিযোগ। যদিও প্রাথমিক যাচাই-বাঝে রিটার্নিং
কর্মকর্তা তার মনোনয়নপত্রের বৈধতা দিয়েছেন - তারপরও দলীয় মনোনীত প্রার্থীর
বিরুদ্ধে এমন স্পর্শকাতর অভিযোগ ভোটারদেরকে ভাবাচ্ছে ভিন্নভাবে। এ
প্রার্থীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্রের সঠিক
এবং নির্ভুল তথ্য অন্তর্ভুক্ত করে জমা দিয়েছেন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের
দিন তার বিরুদ্ধে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের
আইনজীবী প্রশ্ন তোলেন এবং সে বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে ব্যাখ্যা
চান। কর্মকর্তার কাছে মনোনয়ন টি বৈধ বলে গণ্য হওয়ায় তিনি সেটিকে বাতিল
করেননি। তারপরেও দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নির্বাচনের আগে
বিএনপির রাজনীতিতে কিছুটা হলেও অস্থিরতা তৈরি করেছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক
বিশ্লেষকরা।
বিএনপি'র মনোনয়নপত্র বাতিলের ও আপিল প্রসঙ্গে বিএনপির
কেন্দ্রীয় সহ সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া জানান, 'কিছু বিষয়ে আইনের
উর্ধে যাবারা সুযোগ নেই আমাদের, তবে যেহেতু আইনগত প্রক্রিয়ায় আবারো সেগুলো
নিয়ে আবেদনের সুযোগ রয়েছে সেজন্য শেষ সময়ে না আসা পর্যন্ত কিছুই চুড়ান্ত
ভাবে বলা যাচ্ছে না।'
বিএনপি'র স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিষয়ে মোস্তাক
মিয়া বলেন, 'এ বিষয়ে নীতি নির্ধারকরা এখনো আলাপ আলোচনা ও কাজ করে যাচ্ছেন।
যেহেতু ২০ তারিখ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় রয়েছে, নিশ্চয়ই এই
সময়ের মধ্যে শখ জটিলতা শেষ হয়ে যাবে। আর যারা দলের বিরুদ্ধে যাবেন তাদের
বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই দল কোনো না কোনো ব্যবস্থা নিবেন।'