
আমাদের
দেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি
চলছে। এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনি ইশতেহার নিয়ে কাজ করছে।
ক্ষমতায় গেলে দেশের কল্যাণে তাঁরা কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চায়, সে
ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছেন। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত
হবে, অর্থনৈতিক উন্নতি হবে, দেশের মানুষ শান্তিতে থাকবে-এটাই সবার
প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশা বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দলের চিন্তাভাবনায়
ছোটখাটো ভিন্নতা থাকলেও মূল লক্ষ্য ভিন্ন হওয়ার সুযোগ কম। আমাদের দেশের
উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি, পানিসহ বিভিন্ন খাতে আমরা যে
নীতিই গ্রহণ করি না কেন, তাতে মোটা দাগে একটি ঐকমত্য থাকা প্রয়োজন। জুলাই
বিপ্লবের চেতনার আলোকে এই ঐকমত্য গড়ে তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের
মধ্যে এখনই আলাপ-আলোচনা জোরদার করা জরুরি।
শিক্ষা খাত এমন একটি খাত,
যাতে সর্বজনীন ঐকমত্য দরকার। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে দেশের
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলেও, শিক্ষা ক্ষেত্রে এখনো
অনেক অরাজকতা বিরাজ করছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে কিছু কিছু ক্ষেত্রে
অবচয় হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার মান নিম্নগামী হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের
জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার দরকার। শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো
মানুষকে পূর্ণাঙ্গ, জ্ঞানসম্পন্ন, দায়িত্বশীল, সৎ ও কর্মক্ষম নাগরিক
হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবতার কল্যাণে অবদান রাখার যোগ্য
মানুষ তৈরি হয়। এতে বিভিন্ন দল ও মতের মধ্যে ভিন্নমত থাকার কারণ নেই। এই
অভিন্ন লক্ষ্যের ভিত্তিতে কর্মসূচি নির্ধারিত হলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
চরিত্রবান সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। তারা দক্ষ ও উদ্ভাবনমুখী মানবসম্পদে
পরিণত হয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। জুলাই বিপ্লবের
দাবি হলো বৈষম্যের অবসান। কাজেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হতে হবে
অন্তর্ভুক্তিমূলক, যাতে কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের
শিকার না হয়।
শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য নিয়ে আমরা একমত হলে সংস্কারের
জায়গাগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবায়নযোগ্য কার্যক্রম গ্রহণ করা সহজ হবে। সেই
ক্ষেত্রে দল-মত নির্বিশেষে সব অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ
করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের লক্ষ্যে অনেকগুলো কমিশন করলেও
শিক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কোনো কমিশন গঠন করেনি। কাজেই নতুন
নির্বাচিত সরকারের উচিত হবে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করা।
শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের জন্য খ্যাতনামা শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষা
প্রশাসকদের নেতৃত্বে এই কমিশন গঠন করতে হবে। এই কমিশন শিক্ষাবিষয়ক যেকোনো
সংস্কার কার্যক্রম যথাযথ প্রক্রিয়ায় অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণ করতে
পারবে।
নবগঠিত শিক্ষা কমিশন জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ ও জাতীয় শিক্ষাক্রম
রূপরেখা ২০২১ পুনর্মূল্যায়ন করবে এবং জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের
বাস্তবতা ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রয়োজনীয়তাকে বিবেচনায় নিয়ে নতুন
শিক্ষানীতি এবং তার আলোকে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করবে। মাধ্যমিক ও কারিগরি
শিক্ষায় সমমান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যেন মাধ্যমিক
পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা সহজেই কারিগরি শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।
মাধ্যমিক পর্যায়ের সমাপনী পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতি সংস্কার ও আধুনিকায়ন
করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী দক্ষতা, সৃজনশীলতা, মানসিক দক্ষতা
এবং মানবিক গুণাবলির যথাযথ মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে
স্থান-কাল-পাত্র ভেদে কেউ যাতে বৈষম্যের শিকার না হন।
শিক্ষা বাজেটে
বরাদ্দ বৃদ্ধি না পেলে কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। তাই
আসন্ন অর্থবছর থেকেই শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
পরে পর্যায়ক্রমে তা বৃদ্ধি করে ৪ শতাংশ করার পরিকল্পনা নিতে হবে। এই অর্থ
ব্যবহার করে শিক্ষক-প্রশিক্ষণ, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ের
অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ ও সব ধরনের শিক্ষার্থীর
অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষার্থীর
শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে বিদ্যালয় পর্যায়ে খেলার মাঠসহ ক্রীড়া
অবকাঠামো তৈরি এবং খেলাধুলায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি
বিদ্যালয়ে মাঠ নিশ্চিত করতে না পারলেও প্রতিটি ইউনিয়নে যেন একটি করে মাঠ
তৈরি করা যায়, সেই পরিকল্পনা নিতে হবে। খেলাধুলায় অবহেলা করে উন্নত জাতিগঠন
সম্ভব নয়।
আমাদের শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর যে মানের
শিক্ষা অর্জন করছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে সপ্তম গ্রেডপর্যায়ের মাত্র। শিক্ষা
প্রশাসনের কাজের মান যাচাই ও মূল্যায়নের জন্যও একটি স্বচ্ছ এবং
আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা অনুসরণ করতে হবে। আমাদের জনশক্তির
একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষাশেষে বিদেশের শ্রমবাজারে নিযুক্ত হয়ে থাকে।
কাজেই আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী মাধ্যমিক পর্যায়ে যেকোনো
একটি বিদেশি ভাষা শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আরবি,
চীনা ও ইংরেজিতে প্রাত্যহিক যোগাযোগে সক্ষমতা অর্জনের মতো ভাষা শিক্ষার
সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।
আমরা কর্মদক্ষ জনবল তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা চাই,
বেকার তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা চাই না। উন্নত বিশ্বে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক
শিক্ষায় নিবন্ধনের হার ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে, আমাদের দেশে ৫-১০
শতাংশের মতো। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায়
নিবন্ধনের হার বৃদ্ধির ব্যবস্থা করে ২০৪১ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ নিবন্ধনের
লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার কথা আছে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কারিগরি শিক্ষা ও
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন করা না হলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব
নয়। কারিগরি শিক্ষাকে শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারা হিসেবে গ্রহণযোগ্য করে
তুলতে হলে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের
অধীনে ভোকেশনাল কোর্স আরো সম্প্রসারণ করতে হবে। মাদরাসায় শিক্ষক
প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
কওমি মাদরাসাসহ সব মাদরাসায় কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ করতে হবে।
শিক্ষক
রাজনীতি বন্ধ ও শিক্ষা প্রশাসনকে বিরাজনীতিকরণ করতে না পারলে মানসম্মত
শিক্ষার চেষ্টা সফল হবে না। এ জন্য সব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধার
ভিত্তিতে স্বচ্ছভাবে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। সব ধরনের
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী বডিগুলো যেমন-সিনেট, সিন্ডিকেট, ট্রাস্টি
বোর্ড, কলেজ ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাপনা কমিটি ইত্যাদি রাজনৈতিক
প্রভাবমুক্ত রাখার ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দলকে নিশ্চয়তা দিতে হবে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজ, বাগচিাগাও, কুমিল্লা।
