
দৈনিক
কুমিল্লার কাগজ ২১ বছরে পদার্পণ করল। অত্যন্ত নীরবে প্রতিষ্ঠার দিনটি
অতিক্রম করল। কেন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা বের হলো না, তা জানি না। তবে
মনে একটি ‘প্রশ্ন’ রয়েই গেলো। বিগত ২০ বছর যাবত এ পত্রিকায় লেখালেখি করে
আমি একজন কলামিস্ট। এ অর্জন কাগজটি আমাকে দিয়েছে। সুতরাং দায়বদ্ধতা বলে
কথা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের মৌখিক পরীক্ষা। পরীক্ষক
প্রশ্ন করছেন- এ মুহূর্তে এমন একটি ঘটনার কথা বল, যা পত্রিকার খবর হতে
পারে। ছাত্রটি একটু ভেবে বলল- এখন যদি মাথার উপর ফ্যানটি আমাদের কারো মাথায়
পড়ে ও লোকটি মারা যায়, তাহলে তা পত্রিকায় খবর হতে পারে।
বিসিএস
পরীক্ষার মৌখিক পরীক্ষা। পাঁচজন পরীক্ষক। যিনি পরীক্ষা দিতে গেছেন, তিনি
পুলিশ ক্যাডারে চাকরির জন্য উত্তীর্ণ। একজন পরীক্ষক তাঁর সনদ ও লিখিত
পরীক্ষার নম্বর দেখে বলছেন, তুমি ১নং প্রশাসন ক্যাডার না দিয়ে পুলিশ
ক্যাডার পছন্দ করেছ কেন? চাকরি প্রার্থী বলছে- পুলিশে চাকরি করলে ক্ষমতা
দেখানো যায়। একসঙ্গে পাঁচজন পরীক্ষক ক্ষেপে উঠল। ক্ষমতা দেখানোর জন্য
পুলিশে চাকরি করতে চাও, পুলিশের কি ক্ষমতা আছে লিখ, কাগজ-কলম দেয়া হলো।
চাকরি-প্রার্থী অপ্রস্তুত হয়ে গেলো, কিছুই লিখতে পারল না। পরীক্ষকগণ
বললেন-‘যাও, তোমার চাকরি হবে না, ক্ষমতা দেখানোর জন্য চাকরি হয় না।’ তখন
প্রার্থী দরজা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে বললেন-‘স্যার, এখন আমার সঙ্গে যে আচরণ
করলেন। এটাই ক্ষমতা-দেখানো।’ প্রতিটি চাকরিতেই ক্ষমতা দেখানোর সুযোগ আছে।
যদি ক্ষমতা দেখাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু চাকর শব্দ থেকে যদি চাকরি কথাটি এসে
থাকে, তবে ক্ষমতা দেখানো অনৈতিক ও বিধিবর্হিভূত।
পত্রিকায় প্রকাশিত
সংবাদ সম্পর্কে এক সময় প্রচলিত ধারণা ছিল যে, সংবাদ রমণীয় হতে পারে না।
কুকুর মানুষ কামড়িয়েছে এটা কোনো সংবাদ নয়, ‘মানুষ কুকুরকে কামড়িয়েছে’ এটা
নিশ্চয়ই সংবাদ। প্রশ্ন হলো এ সংবাদটি কতটুকু গুরুত্ব পাবে, কোন পাতায় ছাপা
হবে, হরফের আকৃতি কী হবে ইত্যাদি। অনেকেই মনে করেন যে সব খবরই অস্বাভাবিক
হতে হবে, অর্থাৎ স্বভাব, প্রকৃতি, রীতি ইত্যাদির বিপরীতধর্মী তথ্যগুলোই
শুধু সংবাদের মর্যাদা পাবে, এই সীমায়িত বিশ্বাস সব সময় সব সম্পাদককে
গণ্ডিবদ্ধ করে রাখেনি। পাঠককেও নয়।
এখন পৃথিবী এক দুঃসময় অতিবাহিত করছে।
করোনা ভাইরাস এর মতো প্রতিটি দেশকে, প্রতিটি মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে
যাচ্ছে। একটা অসহায় আকাল। সেজন্য টেলিভিশনে, ইন্টারনেটে, পত্রিকায় এনিয়ে
নানা খবর, আক্রান্তের সংখ্যা, মৃত্যুর মিছিলের সংবাদ প্রচার হচ্ছে। সবই
নেতিবাচক। ইতিবাচক সংবাদ পরিবেশন করে না কেউ। যখন কোনো ফটো সাংবাদিকের
হাতকড়া লাগানো ছবি ছাপা হয়, টেলিভিশনে দেখানো হয়, তখন পাঠকের মনে মিশ্র
প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতেই পারে।
ওই সংকট কালে যে ভালো কাজ ধারাবাহিকভাবে
এগিয়ে চলছে, তা কিন্তু সংবাদ হয় না। আবার একশ পেকেট ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের
চিত্রটি ফলাও করে ছাপানো হয় তথাকথিত দানবীরের চেহারাকে দৃশ্যমান করে।
বলা
হয়ে থাকে ‘যাহা প্রাত্যহিক তাহা প্রাত্যহিক বিষয়বস্তু নয়।’ সংবাদ প্রায়
সর্বদাই দৈনন্দিনতার বিরুদ্ধে চলে। যা প্রতিদিনের ঘটনা নয়, তা রমণীয়ই হোক,
অরমণীয়ই হোক তাকেই বার্তা সম্পাদক সসম্মানে সন্ধান ও পরিবেশন করেন। কারণ?
যা অত্যন্ত দৈনন্দিনতার দ্বারা ক্লান্ত হয়েছে, সে ঘটনা পাঠকের কাছে ঘটনাই
নয়। যা প্রতিদিন ঘটে না, শুধু তাকেই বলি ঘটনা-এই ‘যুক্তিসঙ্গত’ নিয়মের
দ্বারা বেশির ভাগ দৈনিক পত্রিকা চালিত হয়। টিভি-র খবর তো কথাই নেই। অনাচার,
দুর্নীতি এবং অস্বাভাবিক ঘটনা ছাড়া টিভি-র ক্যামেরা অন্যত্র কোনও নজরই
দিতে চায় না। এই সংবাদ-সংজ্ঞা পণ্যবিতরণের পক্ষে উপযুক্ত হলেও এবং বিরাট
গরিষ্ঠসংখ্যক সংবাদ ক্রেতার বাজারে এই শ্রেণির সংবাদই ‘তাজা’, ‘খাস’ এবং
‘আসল’ খবর হিসেবে বিবেচিত হয়।
যা-বিচিত্র, কিংবা যা-ভিন্নধর্মী, সে ঘটনা
সংবাদ হিসেবে ভাল বিক্রি হয়, একথা যেমন সত্য, ঠিক তেমনই তাঁরা মনে করেন,
এই শ্রেণির সংবাদ সমাজের পক্ষে ক্ষতিকারক, অর্ধ সত্যকে স্বাভাবিকের চেয়ে বড়
করে দেখায়। যেমন ‘স্কুলের ছাত্ররা শিক্ষককে পিটিয়ে মেরেছে’ অথবা ‘ছেলের
ষড়যন্ত্রে মা বাবা দু’জনের নৃশংস মৃত্যু’, ‘বালকের গুলিতে খেলার সঙ্গিনী
বালিকা ‘খুন’-এ ধরনের কোনও না কোনও একটি খবর যদি প্রতিদিনই দৈনিক কাগজে,
কিংবা টিভিতে উচ্চকিত শিরোনাম দখল করে, তাহলে স্বভাবতই পাঠকের ধারণা হতে
পারে যে, এ যুগের সব বালকবালিকারাই জাহান্নামে গেছে।
সংবাদগুলো অসত্য, এ
কথা কেউ বলছে না। এগুলো ছাপা কি উচিত? সংবাদগুলো যে ব্যতিক্রম, বৃহৎ
জীবনপ্রবাহের সঙ্গে এই ঘটনাগুলোর যে কোনও সাদৃশ্য নেই এবং কোটি কোটি
ছেলেমেয়ে স্বাভাবিকভাবেই স্কুলে যাচ্ছে, নিজের সুস্থ উচ্চাশাকে পিতামাতার
পরামর্শ অনুযায়ী সযত্নে লালন করছে, একথাও বার বার বড় করে ছাপানো দরকার। তা
না হলে সংবাদের সামগ্রিক সত্যতা নষ্ট হয়ে যায়।
আসলে সংবাদের পণ্যায়ন এর
জন্য দায়ী। আরও গভীরে; সামাজিক রুচির বাণিজ্যায়নও এই কু-উপসর্গের পিছনে কাজ
করছে। যদি সৎ জীবন ও সুশীল আচরণ, অথবা অব্যতিক্রমী কিশোর-কিশোরীদের
জীবনযাত্রাকে সংবাদের শিরোনামে তুলে আনতে হয়, তাহলে সে খবর কীভাবে লিখতে
হবে? তা এখনও জানি না। সংবাদস্রোতের মধ্যে যে নতুন ধরনের সত্যবাদিতা সৃষ্টি
করা দরকার তার জন্য উপযুক্ত লেখক কোথায়? কে পাঠককে সুশীল সংবাদ দিয়েই
আকৃষ্ট করতে পারবেন? তাঁকে এখনও চিনি না।
সেজন্য টেলিভিশনের প্রচারিত
সংবাদগুলো পরিবেশনায় ভিন্নতা পরিদৃষ্ট হয় এবং দর্শক-শ্রোতারা সব চ্যানেলের
প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন না। সরকারি চ্যানেল তো কেউ দেখেন, তা মনে হয় না।
বেসরকারি চ্যানেল এককভাবে দর্শক-শ্রোতার বিশ্বাস যাপন করতে পারেও না।
পত্রিকার অবস্থাও তা-ই। বিশেষত, পত্রিকাগুলো রাজনৈতিক আদর্শের কারণে
শ্রেণিবিন্যাসে বিশ্বাসী। নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন না থাকায় পাঠকও বিভক্ত।
আলোচনায় যার যার অভিরুচি অনুযায়ী পত্রিকা-গ্রাহক হিসেবে স্পষ্টই ধরা পড়ে।
সুতরাং গণতন্ত্রে যেমন বহু মত, পত্রিকাও বহু মতের ধারক। কাজেই একটি পত্রিকা
পাঠে প্রকৃত পাঠক তৃপ্তি পান না।
পত্রিকা বা সংবাদপত্রকে বলা হয় তৃতীয়
রাষ্ট্র বা বিশ্ব। এ রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারিত নেই, কিন্তু
রাষ্ট্রযন্ত্রের মতো অলিখিত শক্তি বর্তমান। সংবাদপত্র কোনো কোনো ক্ষেত্রে
ততটাই শক্তিশালী, একজন রাষ্ট্রনায়ককে ক্ষমতায় বসাতেও পারেন, আবার নামিয়েও
দিতে পারেন। এক্ষেত্রে সংবাদপত্রের সঙ্গশক্তি একই মঞ্চে অবস্থান করতে হয়।
এখন এ সুযোগটা অত্যন্ত কম। কারণ সংবাদপত্রের আদর্শগত
অবস্থান-ডান-বাম-সরকারি ইত্যাদি ভাবে বিভক্ত। এক অবস্থানে থাকার সুযোগ কম।
এর পেছনের ইতিহাস আদর্শিক নয়, সময়ের স্বাভাবিক স্রোতে গা-ভাসানোর বাস্তবতা।
আসলে আমরা সকলেই যার যার অবস্থান থেকে ক্ষমতাবান হতে চাই, থাকতে চাই। এ ক্ষেত্রে আপসকামিতা নেই বললেই চলে।
যে
বিষয়টি এখন পীড়া দেয়, তা হচ্ছে অযাচিত সাংবাদিক হওয়ার প্রবণতা। তা পেশায়
কতটা আন্তরিকতা রয়েছে, তা জানি না। তবে তা সহজ পেশাদারিত্বে সয়লাভ হয়ে
ওঠেছে। ফলে সংবাদ পরিবেশনে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে হলুদ
সাংবাদিকতা বিষয়টি আজ স্পষ্ট রূপ ধারণ করেছে। তারপরও সংবাদপত্র নিত্যদিনের
খণ্ডকালীন মানসিক আশ্রয়ের ঠিকানা। পাঠক তৃপ্তি না পেলেও উপেক্ষা করতে পারে
না। আধুনিক কালে সংবাদপত্রের প্রাপ্তি ও সার্থকতা এখানেই।
দৈনিক
কুমিল্লার কাগজের ২১তমতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে যে বিষয়টি উল্লেখ করতে
চাই, তা হচ্ছে বিগত ২০ বছরে তার অর্জন কতটুকু? এখন পত্রিকাটি কৈশোর অতিক্রম
করতে চলেছে, আবেগ ও উত্তেজনা অনেকটা কমে গেছে, বাস্তবতার নিরিখে যে
অঙ্গীকার শিরোধার্য করে প্রথম পত্রিকাটি আমাদেরকে চমক সৃষ্টি করেছিল, তার
ধারাবাহিকতায় নীতি-আদর্শে থাকতে পেরেছে কীনা, না সময়ের বাজপাখিদের দাপটে
ম্রিয়মান হতে হয়েছে? আমার মনে হয়েছে, এ ক্ষেত্রে সম্পাদক কোনো আপসকামী
ভূমিকা নেননি। সংবাদপত্রের যে নিজস্ব শক্তি ও স্বাধীনতা রয়েছে, তার কাছে
আস্ফালন যে কাগুজে বাঘ তাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়েছে। আমার
সৌভাগ্য, আমি বিগত ২০ বছর যাবত দৈনিক কুমিল্লার কাগজের অন্ত:মূলের সঙ্গে
আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছি। আমার মফম্বলীয় উত্থানের হাতিয়ার এ কাগজ। কাগজটিকে
দেয়ার চেয়ে প্রাপ্তি অঢেল। তাই ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সম্পাদকসহ সকল
পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই। দৈনিক কুমিল্লার কাগজের
উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও সাফল্য কামনা করি। পরিশেষে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দের
ঊষালগ্নে সকলকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। সকল বাধাবিপত্তি বিভেদ ও
সহিংসতা ধ্বংস হোক। প্রতিটি মানুষের মানবিক চেতনাবোধে কল্যাণ প্রত্যাশা
করি।
শুভ ইংরেজি নববর্ষ।
