
এলপিজির বাজারে চরম নৈরাজ্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে দুই সপ্তাহ ধরে কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে তেমন কঠোর ভূমিকা নিতে দেখা যাচ্ছে না। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ভোক্তাদের। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাবাসীর জন্য গৃহস্থালীতে অপরিহার্য উপাদান এলপিজি সিলিন্ডার। সরকারি হিসাবে ১২ কেজির একটা সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও বাজারে এর কোনো প্রতিফলন নেই অর্থাৎ চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সমস্যা শুরু হয়েছে ডিস্ট্রিবিউশন বা পরিবেশক পর্যায় থেকে। পাইকারিতে সরবরাহ কম, তাছাড়া বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, শীতকালে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে নিয়মিত পরিবহনে ব্যবহৃত কিছু জাহাজও সংকটে পড়েছে। এতে ডিসেম্বর মাসে দেশের আমদানি কমে প্রায় ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। এ ছাড়া পাইপলাইনেও গ্যাস কম রয়েছে। রাজধানীর অনেক আবাসিক এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিতরণ কোম্পানি তিতাস জানিয়েছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় গ্যাসের সংকট রয়েছে। পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ ২৫০ কোটি ঘনফুটের বেশি বাড়ানো যাচ্ছে না।
তথ্য মতে, মাসে গড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হলেও ডিসেম্বরে তা নেমেছে প্রায় ৯০ হাজার টনে। এতে সরবরাহ কমে গেছে। বাজার অস্থিরতা নিয়ে ভোক্তা অধিকার বিষয়ক সংগঠন ক্যাব বলছে, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ ক্ষমতার ঘাটতির কারণে এ ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। বিইআরসি জানিয়েছে, আমদানি খরচ বাড়লে কোম্পানিগুলো প্রমাণসহ কমিশনে তথ্য জমা দেবে, এরপর মূল্য সমন্বয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। এর আগে বাড়তি দামে বিক্রির সুযোগ নেই।
গত শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ক্যাব জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজারে এলপিজি, সয়াবিন ও পাম তেলের দামে ধারাবাহিক বৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে চরম হতাশা, উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এ মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। যা তাদের জীবনযাত্রায় মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার ও বিইআরসির নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে। চাহিদা বৃদ্ধির অজুহাতে আমদানিকারক ও পরিবেশকদের একটি অংশ বাজারে কারসাজি করছে। এটি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবেরই প্রতিফলন।
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। বাজারে এমন নৈরাজ্যের কারণে ব্যবস্থা নিতে গত বৃহস্পতিবার এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াবকে চিঠি দিয়েছে বিইআরসি। এরপরও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে কমিশনে অভিযোগ এসেছে। কমিশনের আদেশ অনুসারে, এলপিজি মজুত ও বোতলজাতকরণ, ডিস্ট্রিবিউটর এবং ভোক্তার কাছে খুচরা বিক্রেতার কোনো পর্যায়েই বাড়তি দামে বিক্রি করা যাবে না। তাই সব পর্যায়ে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়। এরপরও এ সংকটের কোনো সুরাহা হচ্ছে না। অনেকে দায়ী করছেন সংস্থাটিকে। তারা বলছেন, কমিশন শুধু চিঠি দিয়ে দায়িত্ব সেরেছে। তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। এতে সিন্ডিকেট চক্র বাজারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা লাগামহীনভাবে দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এবং বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন সবাইকে একযোগে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। যেসব ব্যবসায়ী নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছেন তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রত্যাশা করছি, সরকার অচিরেই ভোক্তার ভোগান্তি দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
