
অমিয়
চক্রবর্তীর জন্ম ১৯০১ সালে। হুগলী জেলার শ্রীরামপুরে মাতুলালয়ে। পিতা
দ্বিজেশচন্দ্র চক্রবর্তী, মাতা অনিন্দিতা দেবী। তাঁদের আদি নিবাস ছিল পাবনা
জেলায়। দ্বিজেশচন্দ্র ছিলেন আসামের গৌরীপুর এস্টেটের দেওয়ান। অনিন্দিতা
দেবী বেদ, উপনিষৎ, ষড়্দর্শন ও প্রাচীন কাব্যসাহিত্যে পারদর্শিনী ছিলেন।
‘বঙ্গনারী’ ছদ্মনামে তিনি নারী-সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠাকল্পে একালে বহু
প্রবন্ধ রচনা করেছেন। অমিয় চক্রবর্তীর শৈশব অতিবাহিত হয়েছে গৌরীপুরে। তারপর
স্কুলের পাঠ নিতে এলেন কলকাতায়। হাজারিবাগ থেকে ইংরেজি সাহিত্য, দর্শন ও
উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে বি. এ. পাশ করলেন ১৯২১ সালে।
বি. এ. পাশ করার পরই
রবীন্দ্রনাথের সস্নেহ আহ্বানে অমিয় চক্রবর্তী শান্তিনিকেতনে যোগ দিলেন। সেই
বছরই শানিকেতন বিশ্বভারতীতে পরিণত হয়েছে। শান্তিনিকেতনে অমিয় এলেন
‘বিশ্বভারতীর অনুশীলন ছাত্ররূপে এবং স্বল্প অধ্যাপনার দায়িত্বে আবদ্ধ হয়ে।’
অর্থাৎ একাধারে ছাত্র ও শিক্ষক। বছর তিনেকের মধ্যেই, ১৯২৪ সালে, তিনি হলেন
কবির সচিব। ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন। এর মধ্যে তাঁর জীবনে অনেক
ঘটনা ঘটেছে। ১৯২৬ সালে পাটনা বিশ্ববিদ্যায় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম. এ.
পাশ করলেন। পর বৎসর, ১৯২৭ সালের ডিসেম্বরে, ডেনমার্কের কন্যা হিওর্ডিস
সিগোর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হল। রবীন্দ্রনাথ হিমের দেশের মেয়ের নামকরণ করলেন
হৈমন্তী।
১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এবং আমেরিকায়
ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন, তখন অমিয় ছিলেন তাঁর সঙ্গী। ১৯৩২ সালেও পারস্য ও
মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণে অমিয় কবির সঙ্গী ছিলেন।
কিন্তু কবির সচিব হিসাবে এই
অন্তরঙ্গতার অবসান হল ১৯৩৩ সালে। এই বছর জুলাই মাসে তিনি পদত্যাগ করেন। কেন
তিনি পদত্যাগ করেছিলেন তার আভাস দিয়ে তিনি বলছেন, ‘মহাপুরুষের ছত্রতলে
বিরাজ করার মধ্যে একটা অলীকতা আছে-ঐ রকম আশ্রয় মানুষের আত্মার পক্ষে
ক্ষতিকর যদিও প্রেরণার দিক দিয়ে যা পেয়েছি তাও অসীম।’
শান্তিনিকেতন
ছেড়ে অমিয় গেলেন অকসফোর্ডে। সেখানে তিনি টমাস হার্ডির কবিতা নিয়ে গবেষণা
করে ডি. ফিল. উপাধি পান। তাঁর 'উুহধংঃং ধহফ ঃযব ঢ়ড়ংঃ-ধিৎ অমব রহ চড়বঃৎু'
অক্স্ফোর্ড থেকেই প্রকাশিত হয়। এশিয়াবাসীদে মধ্যে তিনিই প্রথম অক্স্ফোর্ড
বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সিনিয়ার রিসার্চ ফেলো’ মনোনীত হন। তখন তাঁর গবেষণার বিষয়
ছিল আধুনিক ভারতের বিভিন্ন ধর্ম-আন্দোলন। ১৯৩৭ সালে ভারতে প্রত্যাবর্তন করে
লাহোরে আমেরিকান মেথীডস্টদের পরিচালিত ফরমান ক্রিশ্চান কলেজে কিছুদিন
অধ্যাপনা করেন। ১৯৩৩ সাল থেকে কবিগুরুর তিরোধান (১৯৪১) পর্যন্ত
-রবীন্দ্রজীবনের এই আট বৎসরে ‘মুক্ত নিঃসংসক্তভাবে’ উভয়ের সম্পর্ক যে
ঘনিষ্ঠতর হয়েছিল, তা নানা ঘটনায় এবং রবীন্দ্রনাথের পত্রাবলীতে স্পষ্ট হয়ে
উঠেছে। বিদেশে গিয়ে অমিয় কবিকে সমকালীন বিশ্বজীবন সম্পর্কে নানাভাবে অবহিত
রেখেছেন। কবিগুরুর শেষজীবনে প্রথম-সমরোত্তর পশ্চিম ইউরোপীয় চিন্তাধারা,
বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় সাধনের প্রধান সহায় ছিলেন অমিয়।
আটাত্তর বছর বয়সেও রবীন্দ্রনাথ সমকালীন পাশ্চাত্য সাহিত্যের দিকে দৃষ্টি
রেখেছেন। ১৯৩৮ সালের জুন মাসে এক চিঠিতে অমিয় চক্রবর্তীকে লিখেছেন 'অষফড়ঁং
ঐীঁষবু-র নতুন বইখানা পড়ে আমার এত আনন্দ হলো। তার ভাষায় তার ইঙ্গিতে কোথাও
বড়োকে বিদ্রƒপ করা হয় নি। এই বড়োই তো চিরকারের বড়ো, আমরা তো একেই মেনে
এসেছি-মহৎকে মহৎ বরতে সুন্দরকে সুন্দর মানতে আমাদের তো আনন্দ হয়েছে-ভালোকে
নিয়ে বেঁকিয়ে কথা বলতে আমাদের যে লজ্জাবোধ হয়।’
এই চিঠি থেকে বুঝতে পারা
যাচ্ছে, আধুনিক পাশ্চাত্য সাহিত্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের কৌতূহল ছিল
অপরিসীম। অমিয় চক্রবর্তী সেই কৌতূহলকে জাগিয়ে রেখেছিলেন। শুধু সাহিত্য
সাহিত্য নয়, আধুনিক সভ্যতার বিচিত্র দিকে কবিগুরুকে সচেতন রাখার জন্য অমিয়
নিত্যতৎপর ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ আশা করেছিলেন, অমিয় চক্রবর্তী অক্স্ফোর্ড
থেকে ফিরে এস (১৯৩৭) প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার সুযোগ পাবেন। কিন্তু তা
হল না। দেশে ফিরে অমিয় বিশ্বভারতীতেই যুক্ত হয়ে রইলেন। অবশেষে ১৯৪০ সালে
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান ডঃ হরেন্দ্রকুমার
মুখোপাধ্যায় তাঁকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে
গ্রহণ করলেন। ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত অমিয় এই পদে কাজ করেছেন।
যখন
পৃথিবী জুড়ে জাতিতে জাতিতে সংঘাত আর সংগ্রাম চলছে, তখন ভারতমন্ত্র অন্তরে
নিয়ে ‘সার্বিক মানুষের সমিতি’ রচনার আদর্শে প্রবুদ্ধ হয়ে দেশে দেশে মানুষে
মানুষে মৈত্রী ও মিলনের আকাক্সক্ষায় অমিয় চক্রবর্তী দূরযানী পরিব্রাজক।
বস্তুত
১৯৪৮ সাল থেকেই তাঁর এই বিশ্বপরিক্রমা মার্কিন দেশে বসবাস করেছেন।
অধ্যাপনা-সূত্রেই তিনি সেখানে যান। ১৯৪৮-৫০ সালে ওয়াশিংটনে হাওয়ার্ড
বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব ও ইংরেজি সাহিত্যের অতিথি-অধ্যাপক। ১৯৫০ সালে
আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফেলো এবং ইংরেজি কাব্যের ট্রুববুল
লেকচারার। ১৯৫১-৫৩ সালে কান্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে, কিছুদিন মিচিগানে, এবং
১৯৫৩ থেকৈ ৬৫ সাল পর্যন্ত বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক প্রাচ্যধর্ম ও
সাহিত্য এবং ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, পরে সেখানকার এমেরিটাস প্রফেসর।
সবশেষে স্টেট ইউনির্ভাসিটি অব ন্যুইয়র্কের অঙ্গীভূত ন্যুপল্জে অধ্যাপনা।
অমিয়
চক্রবর্তীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘খসড়া’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৪৫ সালের আশ্বিনে,
অর্থাৎ ১৯৩৮ সালের অক্টোবরে। তখন তাঁর বয়স ৩৭ বছর উত্তীর্ণ হয়েছে। অথচ
দেখা যাচ্ছে, তাঁর প্রথম কবিতা, ‘সমবয়সী’-নামে একটি সনেট রচিত হয় ১৯১৭ সালে
গৌরীপুরে। তখন তাঁর বয়স ষোলো বছর। অর্থাৎ প্রথম কবিতা রচনার একুশ বছর পরে
তিনি প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করলেন।
প্রকাশের সঙ্গে-সঙ্গেই ‘খসড়া’
অভিনন্দিত হল সেকালের ‘আধুনিক’ কবিসমাজে। বুদ্ধদেব বসু ‘কবিতা’য় লিখলেন,
‘বিস্ময়কর বই; খুলে পড়তে বসলে পাতায়-পাতায় মন চমকে ওঠে। বাংলা কবিতার
পাঠকের কানের ও মনের যতগুলো অভ্যেস আছে; তার একটাও প্রশ্রয় পায় না, বরং
প্রহৃত হয়। কিছুরই সঙ্গে এ কাব্য মেলে না; সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বা বিষ্ণু
দে-র মতো ‘দুরূহ’ কবির পাঠ্যভ্যাস বিশেষ কাজে লাগে না এখানে। এ একেবারেই
আধুনিক, একেবারেই অভিনব। বলতে ইচ্ছে হয়, উগ্র রকমের আধুনিক। ঠাট্টা করতে
লোভ হয়। কিন্তু দু-চারটি কবিতা পড়তে-পড়তে উপহাসের ঝোঁকটা লজ্জিত ও পরাস্ত
হয়; বিস্মিত মন সানন্দে স্বীকার করে যে এখানে প্রকৃত কবিত্বশক্তির সাক্ষাৎ
পেলাম।’
‘খসড়া’র এক বছর পরে বেরোলো ‘এক মুঠো’। [পৌষ ১৩৪৬, নভেম্বর
১৯৩৯]। ‘এক মুঠো’ রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করা হয়েছে। ‘খসড়া’ বেরোবার পর
রবীন্দ্রনাথ এই কাব্যের একটা সমালোচনা লিখবেন মনে করেছিলেন, কিন্তু তাঁর
‘ভয় হোলো পাছে বাংলার আধুনিকরা মনে করে আমি তাদেরই জয়ধ্বনি করছি।’ ‘এক
মুঠো’ প্রকাশিত হলে দ্বিধামুক্ত হ'য়ে কবি লিখলেন ‘নবযুগের কাব্য’। বললেন,
‘বর্তমান সাহিত্যে আমার অনভিজ্ঞতা আমি কবুল করি। তাই আমি খুঁজি এমন কোনো
পথচারীকে যিনি এ-পথের পথিকদের ঘনিষ্ঠভাবে জানেন, আধুনিক সাহিত্যে যাঁর
পরিচয় বই-পড়া পরিচয় নয়, যিনি কাছের থেকে নবীন কবিদের মনের সঙ্গে মন মিলিয়ে
নেবার সুযোগ পেয়েছেন। সদ্য সৃষ্টির শিল্পবিকাশের আবহাওয়ায় যাঁর চিত্তে আপন
মজ্জার ভিতর থেকে প্রকাশের চেষ্টা সহজ হয়ে দেখা দিয়েছে, তাঁর কাছ থেকে নতুন
ঋতু ফুল-ফসলের সত্য অব্যবহিত, দুূরের থেকে নকলের উদ্যম নয়।’
বিশ্বকে
নির্বিকার তদ্গতভাবে দেখার দৃষ্টি রবীন্দ্রনাথ খুঁজে পেয়েছিলেন অমিয়
চক্রবর্তীর কবিতায়। তাই ‘নবযুগের কাব্য’-র আলোচনার উপসংহারে তিনি বলেছেন,
‘আমি আনন্দ পেয়েছি অমিয়চন্দ্রের কাব্যে তাঁর স্বকীয় স্বাতন্ত্র্যে। এই
স্বাতন্ত্র্য সংকীর্ণ পরিধি নিয়ে নয়। এ নয় কেবল যৌন রসভোগের উদ্বেলতা, এ নয়
আঙ্গিকের বিস্ফোণে ভাষাকে উলটপালট ক'রে দেওয়া। অনুভূতির বিচিত্র সূক্ষ্ম
রহস্য আছে এর মধ্যে-বৃহৎ বিশ্বের মধ্যে আছে এর সঞ্চরণ।’
কবিতা যে
সার্বিক সর্বজনীনতার সচল চিত্র, একথা বোঝাতে লরেন্স ডারেল আধুনিক কবিতাকে
সবাক চলচ্চিত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন ঃ ‘ঈরহবসধ রং ধহ ধফসরৎধনষব সবঃধঢ়যড়ৎ
ভড়ৎ ঁং ঃড় পযড়ড়ংব যিবহ বি পড়সব ঃড় ফরংপঁংং সড়ফবৎহ ঢ়ড়বঃৎু.'
‘অভিজ্ঞান
বসন্ত'তে [১৩৫০/১৯৪৩] অমিয় চক্রবর্তীর কবিকৃতি নিজস্বতায় স্বাক্ষরে
উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছে। ‘অভিজ্ঞান বসন্ত’ সাতটি পর্যায়ে বিন্যস্ত: প্রাথমিক,
প্রদক্ষিণ, সূর্যখন্ডিত ছায়া, মন-মাধ্যাহ্নিক, সংসার, এবং দিনযাপন।
অমিয়
চক্রবর্তীকে সমকালীন কবিগণের মধ্যে ‘সবচেয়ে আধ্যাত্মিক কবি’ বললে হয়তো
তাঁর কবিমানসকে পরিপূর্ণ বোঝা যাবে না। পূর্বেই বলা হয়েছে, কবিতাসংগ্রহের
প্রথম খন্ডের ভূমিকায় তিনি বলেছেন, ‘মাটি, ধরণী, বসুন্ধরা যে-নামেই হোক
ভূমিস্পর্শ অভিযানই আমার স্বপ্রকাশ...সংসারে একটি মৃন্ময়ী বাসা বেঁধেছিলাম
সেই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতা।’ কবির নিজের এই আত্মবিশ্লেষণ মেনে নিয়েও
বলা যায়, সংগতির সুরই তাঁর জীবনের প্রধান সুর। আমরা অন্যত্র বলেছি,
জীবনানন্দ দাশ জীবনের সফেন সমুদ্র পেরিয়ে রোমান্টিক স্বপ্নে অন্ধকারের
জ্যোতির্ময়ী প্রতিমাকে খুঁজে পেয়েছেন। অমিয় চক্রবর্তী আরো গভীরে অনুবিষ্ট
হয়ে জ্বালিয়েছেন বিশ্বাসের আলো। তিনি এই অভিশপ্ত যুগ পায়ে হেঁটে পার হবার
ভরসায় হাতে তুলে নিয়েছেন আস্তিক্যবোধের আলোকবর্তিকা। তাঁর কণ্ঠে
যুগযন্ত্রণাকে ছাপিয়ে উঠেছে মৃত্যুঞ্জয়ী আশার সংগীত।
‘দূরযানী’ পঞ্চম
কাব্যগ্রন্থ [১৩৫১ । ১৯৪৪]-সম্পর্কে সবচেয়ে উল্লেখ্য বিষয় হল। বিশুদ্ধ
ছান্দসিক প্রকরণে কবির আত্মপ্রকাশ। এককালে অমিয় চক্রবর্তীর ছন্দ-প্রকরণ
নিয়ে অনেক আলোচনা ও গবেষণা হয়েছিল। কেউ-কেউ বলেছিলেন, তাঁর ছন্দ
হপ্কিন্সের ‘¯প্রাং রিদ্ম’-এর জেসুইটি পুরোহিত জেরার্ড ম্যানলি হপ্কিন্স
বিগত শতাব্দীর কবি [১৮৪৪-১৮৮৯]। কিন্তু ব্রিজেসের সম্পাদনায় তাঁর প্রথম
কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯১৮ সালে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর
কবিকৃতি-ভাব, ভাষা ও ছন্দ-প্রথম সমরোত্তর কবিসমাজে বিশেষ প্রভাব বিস্তার
করে। ম্যালার্মের মতো হপ্কিন্সও মুখ্যত ‘ভাষার কবি’- পোয়েট অব ল্যাংগোয়েজ।
¯প্রাং রিদ্ম সম্পর্কে তিনি বলছেন: 'রঃ রং হবধৎবংঃ ঃড় ঃযব ৎযুঃযস ড়ভ
ঢ়ৎড়ংব, ঃযধঃ রং ঃযব হধঃরাব ধহফ হধঃঁৎধষ ৎযুঃযস ড়ভ ংঢ়ববপয, ঃযব ষবধংঃ ভড়ৎপবফ
ঃযব সড়ংঃ ৎঃযবঃড়ৎরপধষ ধহফ বসঢ়যধঃরপ ড়ভ ধষষ ঢ়ড়ংংরনষব ৎযুঃযসং.'বলাই
বাহুল্য, অমিয় চক্রবর্তী ‘খসড়া’-‘এক মুঠো'তে এবং আরো কিছুকাল পর্যন্ত অসম
মাত্রা ও পর্ব নিয়ে যে-সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, সেগুলি ¯প্রাং রিদ্মের
চেয়ে ফ্রীভর্সের সমধিক সগোত্র। ‘দূরযানী’র আলোচনা প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসু
বলেছিলেন, তাঁর বিশ্বাস, ‘অমিয়বাবু বাংলায় ফ্রীভর্স আনবারই চেষ্টা করছেন।’
সঙ্গে-সঙ্গে সেদিন তিনি একথাও বলেছিলেন, ‘বাংলার স্বাভাবিক চালচলন
ফ্রীভর্সের পক্ষে অনুকূল কিনা সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে।’ কথাটা ভেবে
দেখবার মতো। বাংলার ছন্দ-মুক্তির প্রথম ঋত্বিক হলেন মহাকবি মধুসূদন। তাঁর
আমিত্রাক্ষর ছন্দে তিনি ‘মুক্তবন্ধ ছন্দের ভাবী সম্ভাবনার প্রথম
দ্বারোদ্ঘাটন করেছিলেন। তারপর বাংলায় গদ্যকবিতারও প্রচলন হয়েছে। আরো
পরবর্তীকালে কাব্যছন্দের সঙ্গে বাক্ছন্দের মিশ্রণ ঘটিয়ে ছন্দের ক্ষেত্রে
কতোটা স্বাধীনতা গ্রহণ করা যায় তারও চেষ্টা হয়েছে, এখনো হচ্ছে, এবং হয়তো
ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু বাংলায় আমিল মুক্তবন্ধ ছন্দই পদ্যছন্দের শেষকথা বলে
মনে হয়। তার পাশে পাশে রবীন্দ্রোত্তর কাব্যে গদ্যছন্দও সার্থক কবিতার বাহন
হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে। বলাই বাহুল্য, এই দুটিই রবীন্দ্রকাব্যের অন্তিম
পর্যায়ের উত্তরাধিকার। কিন্তু পদ্যছন্দের সঙ্গে গদ্যছন্দের মিশ্রণ বাংলা
ভাষার স্বাভাবিক চালচলনের পক্ষে অনুকূল বলে আমাদেরও মনে হয় না।
‘দূরযানী'তে
মোট আটাশটি কবিতা আছে। তার মধ্যে মিশ্রবৃত্ত রীতির কবিতা আছে পনেরটি,
কলাবৃত্ত রীতির ছ’টি, দলবৃত্ত রীতির চারটি। সবগুলিই অমিল মুক্তবন্ধ। আর আছে
তিনটি গদ্য-কবিতা। পদ্যছন্দে কখনো কবি স্বাধীনতা নিয়েছেন-কিন্তু সেগুলি
ব্যতিক্রম। ফ্রীভর্সের একটি উদাহরণও এই কাব্যে নেই। স্প্রাং রিদ্ম তো
একেবারেই অনুপস্থিত।
কবির ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ‘পারাপার’। প্রকাশ ১৩৬০।
১৯৫৩। ১৯৪৮ থেকে কবি মার্কিন দেশে প্রবাসী। কিন্তু ‘পারাপার’-এর অনেক কবিতা
স্বদেশের মাটিতে বসে বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর এবং সাম্প্রদায়িক
দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে রচিত। তাই ‘পারাপার'কে কবি চার ভাগে বন্যিস্ত
করেছেন-‘ছড়ানো মার্কিনি,’ ‘ভারতী,’ ‘ইউরোপা’ এবং ‘দুই তীর।’
‘পারাপার’-এ কবির সঙ্গে কল্যাণব্রতীর রাখীবন্ধন ঘটেছে।
অমিয়
চক্রবর্তী বলেছিলেন, ‘শিল্পীর মুক্তি যে কতো বড়ো, তার সবর্ত্রচারিতা
বহুদর্শিতা মানুষের পারস্পরিক সভ্যথার পক্ষে একান্ত কাম্য সেইকথা দলীয়
মতদ্বন্দ্বিতার দিনে বারবার অনুভব করতে হয়।’ এই সর্বত্রচারিতা ও
বহুদর্শিতার সার্থক শিল্পরূপ ‘পারাপার’-এর কবিতাগুলি। বিশেষত ‘ছড়ানো
মার্কিনি’ এবং ‘ইউরোপা’। -এই দুই পর্যায়ের বহু কবিতায় সর্বত্রচারী কবির
বহুদর্শিতার পরিচয় ছড়িয়ে আছে।
কবির সপ্তম কাব্যসংকলনের নাম ‘পালা-বদল’।
প্রকাশ ১৩৬২। ১৯৫৫। গ্রন্থখানি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘চিরন্তন বাংলাদেশকে।’
কবিতাগুলি পঞ্চাশোত্তর কবির রচনা।
কবির অষ্টম গ্রন্থ ‘ঘরে-ফেরার দিন’।
উৎসর্গ রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে। স্মরণীয় যে, কবির দ্বিতীয় কাব্য ‘এক মুঠো’ও
রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। ‘ঘরে-ফেরার দিন’ রবীন্দ্র-শতবর্ষের
কবিপ্রণাম। এই সংকলন ‘অন্তরা’ ও ‘অধুনা’-এই দুই পর্যায়ে বিন্যস্ত। উভয়
পর্যায়ের বেশির ভাগ কবিতাই বিশ্বভ্রামণিক কবির বিচিত্র অভিজ্ঞতার
স্মৃতিসঞ্চয়ন। এই ধরনের বৈচিত্র্য বাংলা সাহিত্যে আর কোথাও নেই।
রবীন্দ্রনাথও বিশ্বকবি। তাঁকে বলা হয়েছে ‘বিশ্বমনা বাক্পতি’। এই অর্থে অমিয়
চক্রবর্তীকে বিশ্বকবি বলা যাবে না। বরং তাঁকে বিশ্বপরিব্রজক কবি বলাই
সঙ্গত। পরিব্রাজকের জার্নাল লিরিকের রূপ নিয়ে কাব্য হয়ে উঠেছে। ব্যতিক্রমও
আছে; শুধু এই কাব্যগ্রন্থই নয়, মাঝেমাঝেই দেখা দিয়েছে নাট্যধর্মী
কাহিনী-কবিতা। কবি বলেছেন, ‘পৃথিবীতে এসে যা দেখা গেলো তার বিমিশ্র সহজ
একটি আক্ষরিক পরিচয় সাক্ষীর বিমুগ্ধ আত্মভাষায় স্বীকৃতি।’
বুদ্ধদেব বসু
‘ঘরের ফেরার দিন’-এর ভাববস্তু ও রচনারীতি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শুধু বিষয়টাই
মার্কিন নয়, রচনার রীতিটাও কোনো উৎকৃষ্ট মার্কিন কবির অনুরূপ-কোথাও কোথাও
রবার্ট ফ্রস্টকে মনে পড়ে।’ আমরা বলেছি, পরিব্রাজকের জার্নাল লিরিকের রূপ
নিয়ে কাব্য হয়ে উঠেছে। তার পরোক্ষ সমর্থন পাওয়া যাবে কবির নিজের মুখে। তিনি
বলেছেন, ‘এক-এক সময় মনে হয়, জীবনের যেখানে এস পৌঁছেছি সেখানে অভিজ্ঞতার
সামান্যতর ধ্বনিকে কবিতায় ঝংকৃত করে তোলা সম্ভব। যেমন করে মোহনার কাছে
যেতে-যেতে সব সুরেই সাগর-সংগমের অনুরণন মিশে যায়, হয়ে ওঠে সাগরসংগীত।’ ‘ঘরে
ফেরার দিন’-এর শেষ কবিতার নাম ‘মূল্য-বদল।’ কবির বাণীবিন্যাসে একটা
বৈশিষ্ট্য অবশ্য-লক্ষণীয়। বিষয়বস্তু যাই হোক্ না কেন, মাঝেমাঝেই তা প্রচলিত
বা অপ্রচলিত সংস্কৃত শব্দ বা বাক্যাংশের যোগে সমৃদ্ধ হয়েছে। শুধু অভিজাত
সাহিত্য থেকেই নয়, কবি ভারতের লোকায়ত সাহিত্য থেকেও ভাবকণিকা সংকলন করেছেন।
মূল্য-বদলের ধ্রুবপদ রচনা করেছে বাংলার লোকসাহিত্যের একটি স্মরণীয়
পংক্তি-‘খুলে পড়বে কানের সোনা শুনে বাঁশির সুর।’ এখানেও ‘মাটির দেয়াল’ এর
প্রত্যাশিত বিশ্বাস কবিমানসকে প্রাণিত করেছে। অতীতবাহিনী, অবগুণ্ঠিত
মহাভারতী ভাঙা শহরের উপর খুলবে মুখ-‘খুলে পড়বে কানের সোনা শুনে বাঁশির
সুর।’
কবির নবম কাব্যগ্রন্থ ‘হারানো অর্কিড।’ ১৩৭৩। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত।
কবি বলেছেন, গ্রন্থখানির আরেকটি নাম হতে পারত ‘দূরের সাক্ষী।’ জগৎ-জোড়া
দুঃখের দিনে ‘কিছু কথার ছবি’ ‘কল্পনার রঙিন সাক্ষ্য’ নিয়ে বাংলা দেশের
উদ্দেশে প্রবাসীর উপহার। গ্রন্থের ‘নান্দী'তে কবি বলেছেন, ‘সিকিমে
অপর্যাপ্ত গিরিসংকট এবং শীততুষারকে পরাস্ত ক'রে অবর্ণনীয় অর্কিড-পুষ্পের
বিস্তার; গ্যাংটকে হিমালয়-পরিবেশ দেখেছি সেই অপ্রতিহত বীর্যের প্রতীক।
আনন্দলহরী। কোনো শক্তির সাধ্য নেই তাকে ধ্বংস করে। আহত পুড়ন্ত ভিয়েৎনামের
অরণ্যে চোখে পড়েছিলো অনিন্দ্যসুন্দর বিজয়ী অর্কিড, গাছের ডালে জড়ানো, বর্বর
সংঘর্ষের ঊর্ধ্বে। কোনোদিনই হারাবে না।’
সমস্ত প্রতিকূলতা অস্বীকার করে
অর্কিড যেমন বিকশিত হয়, পৃথিবীজোড়া বিপর্যস্ত সর্বনাশের মধ্যেও তেমনি
বেঁচে থাকে প্রেম ও বিশ্বাস; এই প্রতীতিই অভিব্যঞ্জিত হয়েছে গ্রন্থের
নামকরণে। এখানে পুনরায় বলা প্রয়োজন, প্রকরণ যতই ভিন্ন হোক্ মৈত্রী-মঙ্গলের
অবিচলিত বিশ্বাসে অমিয় চক্রবর্তী শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রগোত্রের কবি।
‘হারানো
অর্কিড’-এর কবিতাগুলি কবির পঞ্চান্ন থেকে আটষট্টি বছরের মধ্যে লেখা। এই
বয়সেও তাঁর আকাশ-ভুবন-পরিক্রমা যেমন ক্লান্তহীন, অন্তরের অমৃত সন্ধানও
তেমনি পরম অনুরাগে মধুময়।
‘হারানো অর্কিড’-এর পরবর্তী কাব্যসংকলন
‘পুষ্পিত ইমেজ’ [১৩৪৭।১৯৬৭]। প্রেমের কবিতার সংকলন। গ্রন্থপরিচয়ে কবি
বলছেন, ‘লৌকিক পদাবলি, প্যাস্টেরাল, পুরোনো এলিজাবেথান লিরিক এবং আধুনিক
প্রত্যক্ষ ও প্রতীকে মিশিয়ে কিছু সাময়িক প্রেমের কবিতা গেঁথেছি।’ ‘পুষ্পিত
ইমেজ’ নামকরণের তাৎপর্য আছে ওই নামেরই কবিতাটিতে। উত্তমপুরুষের বাচনিকেই
কবি বলেছেন, ‘আমি তাকে চাই / সেই ধরণীতে - / একটুও বদল নয়, ঠিক সেই
গ্রীষ্মবেলা / যেন পাই / পুষ্পিত নিভৃতে; / চোখ বুক শরীরের ধন, / একেবারে
ঝাঁপ দেওয়া প্রাণ চিরন্তন। / ফুলের প্রতিমা সেই ফুলে-ফুলে উঠেছে কুসুমি’ /
চাই তাকে / দুজনার নাম ধরা-ডাকে।’
এই ‘চাওয়া’ কোনো প্রতীকী চাওয়া নয়-‘চোখ বুক শরীরের ধন’-এ যে-প্রেয়সী শরীরিণী হয়ে উঠেছেন তাঁকেই প্রত্যক্ষভাবে পাওয়ার ব্যাকুলতা।
কবির
উত্তর-সত্তর কবিতার তিনখঅনি কাব্যসংকলন ‘অমরাবতী’ [প্রকাশ: ১৩৭৯।১৯৭২]
‘অনিঃশেষ’ [প্রকাশ: ১৩৮৩।১৯৭৬] এবং ‘নতুন কবিতা’ [১৩৭৮।১৯৮০] ‘অমরাবতী’র
‘পরিচয়’-এ কবি লিখেছেন, ‘শেষ ক-বছরের কবিতা থেকে এই সংগ্রহ; এর মধ্যে বিশেষ
প্রসঙ্গিত অর্থাৎ দেশ-কাল-পাত্রে গাঁথা রচনা বাদ দিই নি’। প্রথম কবিতার
নাম ‘তীর্থ-পত্র’। এই ‘তীর্থ-পত্র’ কবিতায় আছে বিশ্ব-জীবন-তীর্থ-পরিক্রমার
স্মৃতি ও ছন্দ:
‘প্লেনের ট্রেনের গরুর গাড়ির
যাত্রা একই, সবার বাড়ির
বৃহৎ ধরায় সংসারে যাই
ঘোরাঘুরির ছন্দটা তাই।’
এই অনতিক্রম্য স্বদেশই ‘অমরাবতী’। ‘বাংলার ডায়েরি’ কবিতায় সেই অমরাবতীর সৌন্দর্য ও মাধুর্য স্নিগ্ধ মনোরম ভাষায় কাবরূপ পেয়েছে :
‘নদীচর কচিধান নয়ন-সবুজে দেখা তীর
ডুবে আছে চেতনায়, উলু-দেয়া বিয়ে, শাঁখ ধূপ
ময়নামতীর গান, গাঁথা সূক্ষ্ম রঙিন সূতোয়
নক্সিকাঁথার মাঠ, গুরু-মুর্সিদার ভক্ত দোহা,
নামাজ ভজন গাঁয়ে, চৈত্রের চড়কে
চিত্রার্পিত ছায়াতটে মেলা বসে, হাটে-হাটে
কদমা বাতাসা ¯তূপ, ঢাকাই শাড়ির শিল্পশোভা
মহরমে দশমীতে দামামা উৎসব, বারোয়ারি।’
শাশ্বাত
বাংলার এই লোকায়ত জীবনমাধুরী, পুরুষানুক্রমিক এই সংস্কৃতি, কবিমানসকে
আবিষ্ট করে রেখেছে। এই প্রত্যয় কবিকে ডেকে নিয়ে এল তাঁর স্বদেশের
অমরাবতীতে। ১৯৮৩ সালে অসুস্থ দেহ নিয়ে কবি পৌঁছছেন শান্তিনিকেতনে তাঁর
নিজগৃহে। এখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ১৯৮৬ সালের ১২ জুন।
দু’খন্ডে প্রকাশিত তাঁর ‘কবিতাসংগ্রহ’-এর একই ভূমিকা। তাতে তিনি বলেছেন,
‘মাটি, ধরণী, বসুন্ধরা যে-নামেই হোক্ ভূমিস্পর্শ অভিযানই আমার স্বপ্রকাশ,
তার অন্য ভাষা নেই, ভাষ্য নেই। সংসারে একটি মৃন্ময়ী বাসা বেঁধেছিলাম সেই
আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতা।’ বসুন্ধরার দেশে-দেশে মহাকাল-প্রবাহিত
যে-সর্বাস্তির ধারা প্রবহমান, ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় কবি তাকে পরমসত্য বলে
জেনেছেন, এখানেই তাঁর কবিমানসের অনন্যপরতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
