সোমবার ৫ জানুয়ারি ২০২৬
২২ পৌষ ১৪৩২
সার্টিফিকেটের চোখে দেখা রাজনীতি
চারু হক
প্রকাশ: রোববার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:০১ এএম আপডেট: ০৪.০১.২০২৬ ১:৫১ এএম |

 সার্টিফিকেটের চোখে দেখা রাজনীতি
সার্টিফিকেট দিয়ে মানুষ মাপার অভ্যাসটা আসলে অনেক পুরোনো এক ধরনের সামাজিক আলস্য। কাউকে বুঝতে সময়, শ্রম দেওয়া লাগে, ধৈর্য লাগে। তার কথা শুনতে হয়, তার কাজের ধারাবাহিকতা দেখতে হয়, তার ভুল থেকে শেখার ক্ষমতা বিচার করতে হয়। এই সবই কষ্টসাধ্য। এর চেয়ে একটি কাগজ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ, অনেক আরামদায়ক। আমাদের দেশে এই সহজ পথটাই সবচেয়ে জনপ্রিয়। ফলে ব্যক্তির কাজ, সিদ্ধান্ত, নৈতিকতা, চিন্তার গভীরতা কিংবা জনস্বার্থে অবস্থানের ইতিহাস গৌণ হয়ে পড়ে। না গুনলেও চলে, এমন এক মানসিকতা তৈরি হয়।
বাঙালি মুসলমানের চিন্তার বড় বড় বাঁকগুলো এসেছে ঠিক এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমার বাইরে থেকেই। রাজনীতি, সমাজসংস্কার কিংবা সাংস্কৃতিক নেতৃত্বে যারা প্রকৃত অর্থে ভাঙচুর ঘটিয়েছেন, তাদের বড় অংশই ডিগ্রির বিচারে তথাকথিত ‘অসম্পূর্ণ’। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সীমিত, কিন্তু উপমহাদেশের কৃষক রাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা ও মেহনতি মানুষের ভাষা রাজনীতিতে উঠিয়ে আনার ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। তার নেতৃত্ব কোনো সার্টিফিকেটের জোরে নয়, ছিল নৈতিক অবস্থান, জীবনের অভিজ্ঞতা আর নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে একাত্মতায় জড়িয়ে।
শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল অগোছালো, অসম্পূর্ণ, রাজনৈতিক সংগ্রামের ভেতর ছিন্নভিন্ন। কিন্তু তিনি যে রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি, সংগঠকসুলভ ক্ষমতা এবং মানুষের আবেগ বুঝে কথা বলার দক্ষতা দেখিয়েছেন, তা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম থেকে আসেনি। তার শক্তি ছিল ইতিহাসের পাঠ নেওয়ার ক্ষমতায়, মানুষের মনের ভাষা ধরতে পারায় এবং সিদ্ধান্তের প্রশ্নে ঝুঁকি নেওয়ার সাহসে। এইসব গুণ কোনো প্রতিষ্ঠানের গ্রেডশিটে ধরা পড়ে না।
২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যেমন দেখা গেছে, কথিত ‘এইট পাস অশিক্ষিত’ খালেদা জিয়ার বিপরীতে যথেষ্ট ‘শিক্ষিত’ শেখ হাসিনা তার উচ্চশিক্ষিত মন্ত্রী-আমলাদের নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। দীর্ঘকালীন ফ্যাসিবাদী শাসন, গুম-খুন ও অর্থপাচারের দায়ে তীব্র জনরোষের মুখে তাদের ক্ষমতার করুণ পরিসমাপ্তি ঘটে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন অন্তরীণ, অসুস্থ খালেদা জিয়া মৃত্যুর পর দেশের স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জানাজার সম্মান লাভ করেন, আর তার নির্বাসিত এইচএসসি পাস ছেলে কোটি মানুষের ভালোবাসা ও ভরসা নিয়ে দেশে ফিরে আসেন।
সাহিত্যের ক্ষেত্রেও চিত্র অভিন্ন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় রীতিমতন ব্যর্থই বলা যায়। নিয়মিত কলেজ-শিক্ষা তিনি সম্পন্ন করেননি। তবু আধুনিক বাঙালি মনন, ভাষা, নৈতিকতা ও বিশ্ববোধ নির্মাণে তার ভূমিকা তুলনাহীন। কাজী নজরুল ইসলামেরও কোনো ডিগ্রি ছিল না, কিন্তু তার বিদ্রোহী কণ্ঠ ছিল। তার লেখার সাহস, সাম্যের আহ্বান আর ধর্মীয় ও সামাজিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে অবস্থান আজও প্রাসঙ্গিক। মীর মশাররফ হোসেন কিংবা নজিবর রহমানের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, সাহিত্য তাদের কাছে ছিল সমাজ বোঝার হাতিয়ার, ডিগ্রি অর্জনের অনুশীলন নয়।
সুফিয়া কামাল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন সীমিত পরিসরে, কিন্তু নারীর অধিকার, ভাষা আন্দোলন ও স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে তার ভূমিকা তাকে কেবল কবি নয়, এক অনিবার্য সামাজিক বিবেক করে তুলেছে। এই মানুষগুলোর চিন্তা সমাজের চেতনা নাড়িয়ে দিয়েছে। সেই নড়াচড়া শুধু সাহিত্য বা দর্শনের ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল না; শেষ পর্যন্ত রাজনীতির মাটিকেও উর্বর করেছে। প্রশ্ন তুলেছে, কর্তৃত্বকে অস্বস্তিতে ফেলেছে, সাধারণ মানুষকে ভাবতে শিখিয়েছে।
এখানেই প্রচলিত শিক্ষা-দর্শনের মৌলিক সমস্যাটা ধরা পড়ে। আমরা ধরেই নিই-শিক্ষা মানেই জ্ঞান, আর জ্ঞান মানেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। বাস্তবে শিক্ষা হলো একধরনের সামাজিক শৃঙ্খলা। এটি মানুষকে নির্দিষ্ট দক্ষতায় অভ্যস্ত করে, নির্দিষ্ট আচরণে শাসিত করে, নির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতরে কাজ করতে শেখায়। আধুনিক বাজারমুখী শিক্ষা এই কাজটাই খুব দক্ষতার সঙ্গে করে থাকে। মানুষকে কার্যকর কর্মী বানায়, আরও হিসেবি বানায়, আরও চালাকচতুর করে তোলে। কিন্তু এসবের সঙ্গে প্রজ্ঞা থাকতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই।
বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যত এগিয়ে, প্রশ্ন করার সাহস তত কমে আসে। প্রশ্নের জায়গায় আসে ক্যারিয়ার, নৈতিকতার জায়গায় আসে সুবিধাবাদ, দায়বোধের জায়গায় আসে নিরাপত্তার অজুহাত। প্রজ্ঞা আসে অন্য জায়গা থেকে। আসে অভিজ্ঞতা থেকে, নিজের ভুলের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতা থেকে, নৈতিক দ্বন্দ্বের সঙ্গে বসবাসের বোঝাপড়া থেকে, আর বাস্তব জীবনের সংঘাতকে এড়িয়ে না গিয়ে তার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সাহস থেকে। বই-কেতাবের বাইরে মানব-কেতাব থেকে অর্জিত এইসব জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা কোনো সার্টিফিকেটে ধরা পড়ে না, কোনো গ্রেডশিটে মেজার করা যায় না।
তবু কেন ডিগ্রির প্রতি এই অতিরিক্ত মোহ? এর পেছনে সবচেয়ে বড় দায় আসলে সামাজিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার। মানুষের মনে ভয় থাকে, আবারও হয়তো ভুল লোক ক্ষমতায় বসে পড়বে। এই ভয় থেকেই ধারণা তৈরি হয়, নামকরা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নেওয়া মানুষ মানেই কম ভুল করবে, কম ক্ষতি করবে, কম অপরাধ করবে। ডিগ্রি এখানে একধরনের নৈতিক বীমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু ইতিহাস এই ধারণাকে সমর্থন করে না। বরং ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুলগুলো অনেক সময় সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষের হাত দিয়েই সংঘটিত হয়েছে।
যে জন্যে যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে, যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের বড় অংশ অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, হার্ভার্ড বা ইয়েলের মতো প্রতিষ্ঠানের গ্র্যাজুয়েট, তাদের ওপরেই উল্টো যুদ্ধ, বৈষম্য আর প্রাণপ্রকৃতি ধ্বংসের দায়সমস্ত জমা হয়ে যাচ্ছে। কেননা, এইসব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই অনেক সময় ক্ষমতাকে আরও পরিশীলিত ভাষা দেয়, সর্বনাশকে আরও গ্রহণযোগ্য বয়ানে উপস্থাপন করতে শেখায়। তখন ক্ষতিটা কমে না, কেবল তার ব্যাখ্যা আরও ঝকঝকে হয়। সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়, আর ক্ষমতাবানরা নিজেদের গা বাঁচিয়ে আরও সামষ্টিক সর্বনাশের দিকে এগিয়ে যায়।
এই বাস্তবতার ভেতর দাঁড়িয়ে রাজনীতিকে যদি একাডেমিক ক্লাবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে সেটি সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে উল্টো আরও নতুন সমস্যা তৈরি করবে। তবু আশ্চর্যের বিষয়, বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রে এই চাহিদায় জোগান দেওয়ার চেষ্টাচরিত্র দেখা যাচ্ছে। অভূতপূর্ব আশাজাগানিয়া অন্তর্র্বতী সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্কার কমিশনে এমনকি জনপ্রতিনিধিদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের সুপারিশ এসেছে। আজ যদি স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যান কিংবা মেয়রের জন্য স্নাতক বাধ্যতামূলক করা হয়, কাল এমপির জন্য এমএ-এমফিল, পরশু হয়তো আরও উঁচু কিছুর দাবি উঠবে। এই ধারাবাহিকতা রাজনীতিকে ক্রমে প্রতিনিধিত্বসুলভতা থেকে দূরে, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাবে।
কারণ এই সমাজ, দেশ এবং বিশ্বজুড়েই অসংখ্য মানুষ আছেন যারা সমাজ বোঝেন, মানুষ বোঝেন, ক্ষমতার কূটচাল বোঝেন, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠেননি। এদের কেউ কেউ সুযোগ পেয়েও তা করেননি–দার্শনিক কারণে, সচেতন বিরোধিতার জায়গা থেকে। তাদের অভিজ্ঞতা, তাদের উপলব্ধি কোনো ডিগ্রির ঘরে ধরা পড়ে না। কিন্তু প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে তাদের বাদ দিলে রাজনীতি আরও সংকীর্ণ, আরও এলিট, আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
এই প্রেক্ষাপটেই এনসিপি নেতা সারোয়ার তুষারের প্রসঙ্গ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, একটি অনুষঙ্গ হিসেবে। তার ব্যক্তিগত আচরণ কিংবা তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখানে মুখ্য নয়। মুখ্য প্রশ্ন হলো, একজন মানুষকে তার চিন্তার শক্তি, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব আর সম্ভাবনার বদলে কেন এইচএসসি পাস না গ্র্যাজুয়েট–এই সরল রেখায় ফেলে বিচার করা হবে? এই বিচার আসলে ব্যক্তিকে নয়, আমাদের সামষ্টিক মানসিকতার মর্মান্তিক ক্ষতকেই উন্মোচিত করে।
আমরা মানুষকে বুঝতে চাই না, আমরা মানুষকে শ্রেণিবিন্যাস করতে চাই। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি সেই শ্রেণিবিন্যাসের সবচেয়ে সহজ হাতিয়ার। এতে রাজনীতি সহজ হয়, বিতর্ক সহজ হয়, কটাক্ষ সহজ হয়। কিন্তু সমাজ বুদ্ধিমান মানুষ সৃষ্টিতে সাহস পায় না। প্রজ্ঞাকে স্বীকৃতি দিতে সাহস পায় না। কারণ প্রজ্ঞা অস্বস্তিকর, প্রশ্ন তোলে, নিয়ম ভাঙে। ডিগ্রি নিরাপদ, পরিচিত ও নিয়ন্ত্রিত।
সমস্যাটা তাই ডিগ্রি থাকা বা না থাকার নয়। সমস্যাটা হলো, আমরা ডিগ্রিকে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে ফেলেছি। মানুষকে বোঝার ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়ার একটা শর্টকাট রাস্তা বানিয়েছি। এই শর্টকাট আমাদের রাজনৈতিক আলাপকে দরিদ্রতর করছে, সামাজিক কল্পনাকে সংকুচিত করছে। আর একটি সমাজ যখন কল্পনা হারায়, তখন সেই সমাজ ভবিষ্যৎ হারাতেও বেশি সময় নেয় না।
লেখক: গবেষক, লেখক ও অনুবাদক।












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
বিএনপির প্রার্থী কামরুল হুদার কাছে বাখরাবাদ পাওনা পৌনে ১২ কোটি
কুমিল্লায় আজ ‘ভোটের গাড়ি’ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার
খালেদা জিয়ার মাগফিরাত কামনায় ২নং উত্তর দুর্গাপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র দোয়া ও মিলাদ মাহফিল
কুমিল্লায় কমেছে শরীষার আবাদ; কম খরচে লাভজনক ফসলেও আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক
ব্রাহ্মণপাড়ায় ইয়াবাসহ ৩ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
বিএনপির প্রার্থী কামরুল হুদার কাছে বাখরাবাদ পাওনা পৌনে ১২ কোটি
১২ দলীয় জোট প্রধানকে দেখতে হাসপাতালে বিএনপি মহাসচিব
কুমিল্লায় ১১ আসনে ৭৬ বৈধ প্রার্থী
প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিলে মানতে হবে ৭ নির্দেশনা
কুমিল্লা জেলা পর্যায়ে শ্রীশ্রী গীতা পাঠ প্রতিযোগিতা
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২