
সময়
প্রবাহমান। দেখতে দেখতে বছর চলে গেল। ২০২৫ সাল ছিল খুবই ঐতিহাসিক।
বাংলাদেশের তরুণ সমাজ যে ভূমিকা রাখল, তরুণদের কাছ থেকে আমরা নতুন কিছু
পেলাম। তারা এক অস্থির অবস্থা মোকাবিলা করে জনগণকে একত্রিত করে নতুন একটা
অবস্থানের সৃষ্টি করল। তরুণদের আন্দোলনে দেশের জনগণ সাড়া দিয়েছে- এটাও বড়
অর্জন। দেশের জনগণ সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং ন্যায়ের পথে চলে। ২০২৪
সালের জুলাই-আগস্টে যে বিপ্লব হলো, তা দেশকে অনেক কিছুই পরিবর্তন করে
দিয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এখান থেকে অনেক কিছুই শিখতে পারবে, জানতে পারবে।
দেশের জনগণ তরুণদের যে অবদান তা মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করেছে। আজকের তরুণরা
সবসময় নতুন চিন্তা করে। যুগে যুগে তরুণরা অনেক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। ২০২৫
সালে বাংলাদেশে সুন্দর স্বপ্ন দেখাল তরুণ সমাজ। তাদের সেই স্বপ্নকে আমাদের
ধারণ করতে হবে।
২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের পর আমাদের
প্রত্যাশার জায়গাটা অনেক বেড়েছে। ভবিষ্যতে আমরা সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণ
প্রত্যাশা করছি, যেখানে গণতন্ত্র ও সত্যবাদিতা বজায় থাকবে। মানুষ
সুন্দরভাবে বসবাস করবে। দুর্নীতিমুক্ত একটি সমাজ আমরা দেখতে পাব। অতীতে
হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে; নতুন বাংলাদেশে তা আর হতে দেওয়া
যাবে না। রাজনীতি, প্রশাসন, বিচার ও শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে
হবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে আরও বেশি সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ঠিক সেই পথেই হাঁটবে।
বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এক ধরনের
মুক্তিকামী ভাব আছে। তারা মুক্তি চায়। কিন্তু মুক্তি সহজে ধরা দেয় না।
আজকের তরুণরা তা উপলব্ধি করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণরা এক
বিপ্লবের মাধ্যমে তা অর্জন করে দেখিয়ে দিয়েছে। সেই বিপ্লবের মাধ্যমে
অনেকদিনের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে জনগণ মুক্তি পেয়েছে। ২০২৫ সালে তরুণরাই
নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশের চেতনাকে ধারণ করে আমরা
সবাই যদি একসঙ্গে কাজ করি, তাহলে দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব
হবে।
তরুণ সমাজ নতুনভাবে দেশকে বড় কিছু উপহার দেবে। তরুণরা বাংলাদেশকে
এমন একটি দেশে পরিণত করবে যার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হবে।
শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে আর্থিক ব্যবস্থাপনাসহ সব জায়গাতেই ভালো
অবস্থানে পৌঁছবে আগামীর বাংলাদেশ।
দেশকে এগিয়ে নিতে হলে
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও পরিবর্তন আনা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বহুদিন ধরেই
অচল অবস্থায় আছে। অর্থাৎ এ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ
করতে পারেনি। ছাত্ররা আবাসিক হলে ক্রীতদাসের মতো থাকত। বিগত সময়গুলোতে
ছাত্রদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধ্যতামূলকভাবে অংশগ্রহণ করতে হতো। আমাদের
ছাত্ররা অনেক মেধাবী। কিন্তু পড়াশোনার কোনো সুস্থ পরিবেশই তারা পেত না।
ডাইনিং হলে খাবারের মান খুবই খারাপ ছিল। রাজনৈতিক দলের নেতাদের কারণেই এমন
হতো। এখন হয়তো সে অবস্থা আর থাকবে না। পট-পরিবর্তন হচ্ছে। এখন
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুক্তভাবে কাজ করতে পারবে। ২০২৪ সালের ছাত্রদের বড়
বিপ্লবের পর রাজনৈতিক ছাত্রনেতাদের আধিপত্য বিলোপ হয়েছে। এখন ছাত্ররা
স্বাধীনভাবে আবাসিক হলে বসবাস করতে পারছে। বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনভাবে কাজ
করতে পারছে। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশে শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ ফিরে আসবে।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত হলে জাতি উন্নত হবে। জাতি উন্নত হলে দেশ উন্নত
হবে। তরুণরাই দেশকে নতুন সম্ভাবনার দ্বারে পৌঁছে দিয়েছে।
২০২৪ সালে যে
বড় অর্জন হয়েছে, তাতে দেশ গড়ার বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা অচিরেই
আবার পড়াশোনায় মনোনিবেশ করবে। এজন্য তাদের নতুন পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার যে নতুন পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া আমাদের সবার
দায়িত্ব ও কর্তব্য। আগামীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা নিজেদের
মধ্যে আত্মসম্পর্ক গড়ে অনেক দূর এগিয়ে যাবে। শিক্ষার্থীরা আগামীতে
শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করবে। ছাত্রদের মধ্যে সেই অনুভূতি শিক্ষকদেরই জাগাতে হবে
এবং তা সম্মানের সঙ্গে ধারণ করবেন শিক্ষকরা।
শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে
সম্পর্কের যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে তা অচিরেই কেটে যাবে আশা করা যায়। ভবিষ্যতে
এগুলো থাকবে না। ছাত্রদের সন্তানের মতো করে দেখেই আমাদের কাজ করতে হবে।
জ্ঞান সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে বসে কাজ করতে হবে।
তাহলেই দেশ এগিয়ে যাবে। তরুণদের শিক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্র গঠনে এগিয়ে আসতে
হবে। তাদের সমাজের সমস্যাগুলো দূর করার চেষ্টা করতে হবে।
২০২৫ সালে অনেক
ঘটনাই ঘটে গেছে। সচিবালয়ে আগুন দেওয়াসহ দেশে অনাকাক্সিক্ষত কিছু ঘটনা ঘটেই
চলেছে, যা খুবই দুঃখজনক। বিভিন্ন স্থানে মবসন্ত্রাস হচ্ছে। ২০২৪-এর
অভ্যুত্থানে অনেকে শহিদ হয়েছেন। তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। ২০২৪ সাল
অনেকটা বেদনার এবং ২০২৫ সাল অনেকটা বেদনার পাশাপাশি অর্জনের। যে স্বপ্ন
নিয়ে তরুণরা বিজয় এনেছে, আমরা যেন সে স্বপ্নকে ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নিতে
পারি। দেশকে এগিয়ে নিতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে সোনার
বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। নতুন বছরে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে হোক। দেশে
ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। বাংলাদেশ আমাদের সবার। রাজনৈতিক দলগুলো একে
অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তাদের কাজ করে যাক। সর্বোপরি, আমাদের সবার
সহযোগিতা নিয়েই দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান
