
বাংলাদেশের
জন্ম হয়েছিল শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে।
স্বাধীনতার পর থেকেই দেশকে এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয়ে দেশের আপামর জনগণ কাজে
সম্পৃক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ বেশ কিছুটা আবেগতাড়িত এবং এ আবেগকে কাজে
লাগিয়ে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করলে যে এগুনো যায় বাংলাদেশের
অর্থনৈতিক যাত্রার গতি প্রকৃতি লক্ষ্য করলে তা সহজেই অনুধাবন করা যায়।
এদেশের
প্রতিটি মানুষ এক একজন উদ্যমী উন্নয়ন কর্মী। খুব অল্প প্রশিক্ষণ বা ধারণা
পেয়েই এ দেশের মানুষ নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। ‘আমরা পারবো
এবং পারি’-এ বিশ্বাস হৃদয়ে গেঁথে ধারাবাহিক শ্রমের ফসল হিসেবে গড়ে উঠেছে
আজকের বাংলাদেশ। তবে এখনও আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ, অনেক বাঁধা। তবে
আশার কথা এই যে, আমাদের সম্ভাবনার যে নীল আকাশ তার বিস্তৃতি চ্যালেঞ্জের
পরিধির চেয়ে বেশী। তাই চ্যালেঞ্জগুলো উতরিয়ে যাবার প্রচেষ্টায় সবাই সচেষ্ট
থাকলে সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়া সম্ভব হবে- সম্ভব হবে স্বপ্নময়
বাংলাদেশ গড়া।
বিশ্বের সব নামিদামি আর্থিক বিশ্লেষণ ধর্মী সংস্থা
প্রায়শই বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার পথ পরিক্রমার উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো
বিশ্লেষণ করে তুলে ধরেছে। একই সাথে পরামর্শ দিয়েছেন কোন কোন খাতকে গুরুত্ব
দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের ৮ম জনবহুল একটি দেশ, যেখানে
জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি কিলোমিটারে ১১৭১ জন। ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ
এখন বিশ্বের ২৫তম অর্থনীতির দেশ। তৈরী পোশাক রপ্তানীতে বাংলাদেশ বিশ্বে ২য়
স্থান দখল করে আছে। আমাদের আছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এনজিও। বিশ্ব শান্তি
রক্ষায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের
কাছে উদীয়মান বাজার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সব সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে
আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নকে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামীতে
বাংলাদেশের অর্থনৈতকি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক উন্নয়ন ঘটবে এ কথা নি:সন্দেহে
বলা যায়। সমসাময়িক উন্নত রাষ্ট্র সমূহ ভূমির ব্যবহারকে যেভাবে কার্যকরভাবে
করেছে সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে। মাটির উপরে আকাশ ছোঁয়া দালান যেমন তারা
গড়েছে তেমনি মাটির নীচে পাতাল রেল, সাব-ওয়ে, পার্কিংলট গড়ে সেখানেও একটি
(সমান্তরাল সেবামূলক) শহর গড়ে তুলেছে। এত করে সমতল ভূমিতে মানুষের/গাড়ির
চলাচলের ভার তথা যানজট যেমন কমানো গেছে, তেমনি অনেক খোলা জায়গার সংস্থান
করা গেছে-যা আবার পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, পানির আঁধার ইত্যাদি হিসাবে
ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। গণপরিবহন ব্যবস্থার সফল ব্যবস্থাপনা
অর্থনীতির চাকার গতিতে যেমন দ্রুততর করবে, তেমনি এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া
হিসাবে মানুষের জীবন মান তথা আয়ুস্কাল বৃদ্ধি, বিনোদন, নিরাপদ যাত্রা
ইত্যাদি নিশ্চিত হবে। ফলশ্রুতিতে স্বাস্থ্য সেবা খাতে মাথাপিছু খরচ কমে
আসবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রয়াস আমলে নিতে হবে।
উৎপাদন-ব্যবহার-ধ্বংস চিন্তার থেকে বেরিয়ে এসে উৎপাদন-ব্যবহার- পুন:
প্রক্রিয়াজাতকরণ তথা পুন:ব্যবহার ধারণাকে কাজে লাগাতে হবে। তাতে করে
পরিবেশের উপর যেমন কম প্রভাব পড়বে তেমনি সম্পদের অপচয় রোধ করা যাবে। অর্থাৎ
বৃত্তাকার বা চক্রাকার অর্থনীতির ধারণাকে কাজে লাগাতে হবে। এতে সম্পদের
দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায়
চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সম্ভাবনা গুলোকে কাজে লাগিয়ে উন্নতির দিকে এগিয়ে
যেতে ‘গবেষণা’র উপর গুরুত্ব দিতে হবে, দিতে হবে পর্যাপ্ত বাজেট সংস্থান।
আমাদের গর্বের যে কৃষি খাত এবং সেখাতে নিয়োজিত কৃষি কর্মীরা যারা আমাদের ১৬
কোটিরও বেশি মানুষকে তিন বেলা আহার যোগানের প্রানান্তকর চেষ্টা চালিয়ে
যাচ্ছে, তা সম্ভব হচ্ছে এ খাতে গবেষণার উপর জোর দেয়ার কারনেই। এখন সময়
এসেছে অন্যান্য মৌলিক খাতে গবেষণা বাড়ানোর। অন্য দেশের গবেষণায় প্রাপ্ত
ফলাফল অনেক সময় নিজ দেশের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হয় না। এর কারণ হচ্ছে
প্রতিটি দেশেরই ভূমি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত ধারণা ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক
ব্যবস্থাপনার ভিন্নতা রয়েছে। তাই প্রয়োজন প্রায়োগিক গবেষণা ও লাগসই
প্রযুক্তির উদ্ভাবন যা দেশের মাটি ও মানুষের ব্যবহার উপযোগী হবে। তাই
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিটি সেক্টর সংশ্লিষ্ট টার্গেট ভিত্তিক গবেষণা
চালানোর কার্যক্রম, প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ জরুরী ভাবে বিবেচনা
করা উচিত।
অর্থনীতির বহি:খাত যেমন বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে
সংশ্লিষ্ট সকল খাত/প্রতিষ্ঠানে গবেষণা খুবই জরুরী। স্বল্প আয়ের দেশ হতে
উন্নয়নশীল আয়ের দেশে উত্তরণের ক্ষেত্রে এবং উত্তরণের পর সেস্থানে নিজের
জায়গা পাকাপোক্ত করে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে পৌঁছানোর জন্য উৎপাদনশীলতা ও
দক্ষতা বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। তাই এ ক্ষেত্রে যান্ত্রিকতার/প্রযুক্তির
সংযোজন যেমন জরুরী তার চেয়ে বেশী জরুরী সেই প্রযুক্তি যাতে বাংলাদেশের
বিবেচনায় লাগসই ও ব্যবহারপযোগী হয় তা নিশ্চিত করা। বর্তমানে যে দক্ষতা নিয়ে
শ্রমিকরা কাজ করছে সামনের দিনগুলোতে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী করে গড়ে
তুলতে এ শ্রমিকদের উন্নতর দক্ষতার প্রশিক্ষণ দিয়ে বিশ্বমানের শ্রম বাজারের
উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। এতে বিশ্ব বাজারে আমাদের শ্রমিকদের
কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ফলশ্রুতিতে দক্ষ শ্রমিকদের আয়ের অর্থ দেশে
রেমিট্যান্সের যোগান বাড়াবে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানোর লক্ষ্যে
‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি’ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন হচ্ছে ‘প্রত্যাশিত
পরিবর্তন’। ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি’ ও ‘প্রত্যাশিত পরিবর্তন’ এ দুয়ের
সম্মিলনে অর্জিত অর্থনৈতিক উন্নয়নই শুধুমাত্র টেকসই হতে পারে। যেন তেন ভাবে
মুনাফা অর্জনই শুধুমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিৎ নয়। খেয়াল রাখতে হবে যাতে করে
অধিক মুনাফার আশা যেন ভোক্তা/সেবাগ্রহীতার জন্য ক্ষতির কারণ না হয়ে দাড়ায়।
পণ্য বা সেবা প্রদানে বিক্রির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের প্রতি জোর
দিতে হবে। আমি দ্রব্য/পণ্য/সেবা উৎপাদন করবো, বাজার জাত করবো’ কিন্তু সেটা
অবশ্যই করবো পণ্যের/সেবার গুণগত মান বজায় রেখে। যাতে করে ভোক্তা শ্রেণি
পণ্য/সেবা গ্রহণ করার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্থ না হন।
মানব সম্পদ
উন্নয়ন আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে
গবেষণা ও বৈশ্বিক ধারণার আলোকে প্রযুক্তি উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করলে
সমৃদ্ধ আগামীর বাংলাদেশ গড়ার মতো মানব সম্পদ তৈরি করা সম্ভব হবে। এ সুস্থ,
সবল, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত, প্রযুক্তিগত জ্ঞান সম্পন্ন মানুষ সঠিক
নেতৃত্ব পেলে আমাদের দেশকে আমূল বদলে দিতে পারে। আমাদের বাংলাদেশ এই সময়ে
যে জনমিতিক লভ্যাংশ ভোগ করছে তাকে কাজে লাগাতে হবে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য
শুধু নিজের ব্যক্তিগত প্রাপ্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা ঠিক হবে না। বিশ্বকে
সবার জন্য বাসোপযোগী করে গড়ে তুলতে কাজ করার লক্ষ্যে মানসিকভাবে উপযোগী করে
তুলতে হবে। একইভাবে অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে তোলাই স্বাস্থ্য সেবার
লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং মানুষ যেন অসুস্থ না হয় সে পরিবেশ বা প্রতিবেশ
তৈরীর লক্ষ্যে কাজ বা গবেষণা চালাতে হবে।
পরিশেষে বলবো, গতিশীল ও
অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাই, সেই সাথে চাই মানবিক, সামাজিক
উৎকর্ষতা বা উচ্চতর বোধের উদ্ভব বা সে মুখি পরিবর্তন। তবেই কাঙ্খিত
অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে-যা দীর্ঘমেয়াদ হবে টেকসই। সুশাসন প্রতিষ্ঠার
মাধ্যমে মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিশ্বে অনেক
দেশ থাকলেও আমাদের মাতৃভূমি কিন্তু এই বাংলাদেশ। এর ভালো মন্দের সাথে
জাড়িয়ে আছে আমাদের ভাল থাকা বা মন্দ থাকা। প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের এখন
এগিয়ে যাওয়ার সময়, আর এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত এবং
কার্যকর অংশগ্রহণ।
লেখকঃ পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত।
