
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ায় যান এবং সেখান থেকে চীনে যান। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তার বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা হয়। এ পর্যন্ত যা জানতে পেরেছি, টেকনিক্যাল করপোরেশন, আইটি এবং আমাদের ছাত্রদের পড়ালেখার সুযোগ তৈরি করা, সেই সঙ্গে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা, যাতে সে দেশে আমাদের লোকজনের কাজের সুযোগ অবারিত হয়। আমাদের প্রবাসীদের বড় একটি অংশ মালয়েশিয়ায় কাজ করে। হিসাব মতে, তা প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখের মতো। আবার অনেকে আছেন যারা অবৈধভাবে অবস্থান করছেন, অর্থাৎ তাদের অবস্থানটা বেআইনি হয়ে গেছে। তাদের বৈধতার বিষয়ে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
অন্যদিকে চীন আমাদের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার। অর্থাৎ বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ উৎস। সবকিছু চিন্তা করলে চীনের বিনিয়োগ অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। এজন্য চীনের গুরুত্ব অনেক। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চীনের যে অবস্থান, সে ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলে বহির্বিশ্বে বিভিন্ন ফোরামে আমাদের যে উচ্চারণ, সেগুলো গুরুত্ব পাবে। কাজেই কূটনৈতিক মহলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
চীনে ব্যবসা-বাণিজ্য কীভাবে বাড়ানো যায়, বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে চীনে আরও বেশি পণ্য কীভাবে রপ্তানি করা যায়, সে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আলোচনায় আনতে হবে। চীনের প্রয়োজন এমন জিনিস বাংলাদেশে তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, চীনের সঙ্গে আমাদের সহযোগিতার একটা বড় অংশ হচ্ছে প্রযুক্তিগত এবং প্রকল্প সহায়তা।
প্রযুক্তি এবং প্রকল্প সহযোগিতা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চীনের কাছ থেকে আমরা যে প্রকল্প সাহায্যগুলো পেয়ে থাকি, সেগুলো আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের জিনিস যদি আমরা অন্য কোনো দেশ থেকে আনতে চাই, সেটা অনেক ব্যয়বহুল হয়ে যায়। সেজন্য আমরা স্বাভাবিকভাবেই চীনের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকল্প সহায়তা নিয়ে থাকি। তা ছাড়া চীন কোনো প্রকল্পে সহযোগিতা করলে সেটার সঙ্গে প্রযুক্তির যে বিষয় সেগুলো তারা সহজে আমাদের সঙ্গে শেয়ার করে। আমাদের যে প্রকৌশলী এবং টেকনিশিয়ানরা আছেন তাদের সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করে, যাতে তারা নিজেরাই পরে চালিয়ে নিতে পারে। এ জিনিসগুলো কিন্তু সবসময় অন্য দেশ থেকে পাওয়া যায় না। এসব বিচার করলে চীনের সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া এর বাইরে আছে শিক্ষা-সংস্কৃতি। নানা ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে আমাদের সহযোগিতা আছে। চীনে আমাদের অনেক ছাত্রছাত্রী পড়ালেখা করছে। চীন সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের ছাত্রছাত্রীদের স্কলারশিপ দিচ্ছে। আবার অনেক সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা বিভিন্ন বিষয়ে ট্রেনিংয়ের জন্য চীনে যাচ্ছেন। সবকিছু খেয়াল করলে চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না। সেজন্য আমি মনে করছি, এই সফরটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর যেহেতু এটাই প্রথম বিদেশ সফর, সেটাও নিঃসন্দেহে একটা আলাদা বার্তা বহন করে।
অনেকে বলতে চান, সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীনের চেয়ে আমাদের বেশি আগ্রহ ভারতের প্রতি। না, এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই। আমি মনে করি, এটা একটা সুযোগ, এ সুযোগটা গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমরা খেয়াল করেছি, চীনে যাওয়ার আগে একটা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যে, প্রধানমন্ত্রী প্রথমে ভুটানে যাবেন, ভুটান থেকে ভারতে যাবেন। কিন্তু ভারত সেটা খুব ভালোভাবে নেয়নি। তারা চাচ্ছে যে, তারেক রহমান সরাসরি ভারতে যান। ভুটানে গিয়ে সেখান থেকে ভারতে যাওয়া ভারত সরকার পছন্দ করেনি। তারা চায় যে, আলাদা করে ভারতে সফর করা হোক। ভুটানে গিয়ে তার পর সেখান থেকে যাবেন, এটা তারা পছন্দ করে না। সেজন্য আমাদের ধারণা, প্রধানমন্ত্রী চিন্তা করেছেন, ভারত বা চীন সরাসরি কোনোখানে আগে যাবেন না। অন্য কোনো দেশ হয়ে যাবেন। সেজন্য মালয়েশিয়ায় আগে গেলেন, সেখান থেকে গেলেন চীনে।
এখন শুনতে পাচ্ছি যে, প্রধানমন্ত্রী জুলাইয়ে ভারতেও যাবেন। আমি মনে করি, আমাদের জন্য চীন-ভারত দুটোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। ভারতের যে গুরুত্ব সেটা অন্য কারও সঙ্গে মেলে না। কারণ ভারত আমাদের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী। আমাদের চারপাশ ঘিরে তারা আছে। বে-অব বেঙ্গল, অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরেও তাদের প্রভাববলয় রয়েছে। সেখানেও তারা ইচ্ছা করলে আমাদের জন্য যেকোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। অনেকে বলেন তিন দিকে, কিন্তু আমি বলি চারদিকেই ভারত আর আমরা ভারতের পেটের মধ্যে অবস্থান করছি। পরস্পরিক যে অবস্থান, এটার জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে। চীনের ব্যাপারে সে সেরকম কিছু নেই। কিন্তু চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা হচ্ছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা। এই যে ব্যবসা-বাণিজ্য, সেটা তো চীনের সঙ্গে আমাদের সবচেয়ে বেশি। চীন আমাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। চীন আমাদের বিভিন্ন ধরনের আর্থিক ঋণ দিয়ে থাকে। কখনো কখনো অনুদানও দিয়ে থাকে। তাদের কাছ থেকে আমরা প্রচুর সামরিক সরঞ্জামা ক্রয় করি। ঐতিহাসিকভাবে বহুদিন ধরে এভাবে চলে আসছে। আমাদের ছাত্রছাত্রী, সরকারি কর্মকর্তা সবাই এখানে প্রশিক্ষণের জন্য যান। শিক্ষা গ্রহণের জন্য যান। সবদিক থেকেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময় দুই দেশের সাংস্কৃতিক দলের সফর বিনিময় হয়। আমি মনে করি, এখানে একটু কমতি আছে, এটা বাড়ানো দরকার। যাই হোক, এখন প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছেন, সেখানে আমরা শুনেছি যে, ১৭টার মতো বিভিন্ন রকমের চুক্তি, স্মারক ইত্যাদি প্রটোকল সই করা হবে। সংখ্যা শুনেই মনে হয় একটা বিশাল বিস্তৃত ক্যানভাস নিয়ে কাজ চলছে। সেজন্য আমরা অপেক্ষা করে আছি যে, দেখি কী হয়। তবে একটা জিনিস বুঝতে হবে যে, যখন উচ্চতর পর্যায়ে সফর বিনিময় হয় তখন অনেক কিছুই হয়তো বলা হয়, করা হয়, সই করা হয়। কিন্তু সেগুলো সবসময় সঠিকভাবে ফলোআপ হয় না। এগুলো বাস্তবায়নে খুব একটা সদিচ্ছা দেখা যায় না সবসময়। এবারে যে চুক্তি হবে প্রধানমন্ত্রী ফিরে আসার পর সেগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তা না হলে এই যে সফর বা যা কিছু বলা হচ্ছে, যা কিছু অঙ্গীকার করা হচ্ছে, এগুলো তখন ফাঁকা বুলি হিসেবে সামনে চলে আসবে।
২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এসেছিলেন, তখন বলা হয়েছিল-২৮ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন রকম সহযোগিতা দেবে। আমরা তার মধ্যে ৮-৯ বিলিয়নের বেশি এখন পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারিনি। এই জিনিসটা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। বিভিন্ন রকম সাহায্য-সহযোগিতার কথা আসবেই। কিন্তু আমরা হয়তো শেষ পর্যন্ত সব বাস্তবায়ন করতে পারব না। সেটা খুব দুঃখজনক হবে। এ ব্যাপারে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। দুই দেশের মধ্যে উচ্চতর পর্যায়ে যখন সফর বিনিময় হয়, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা, সেখানে এক ধরনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। চীন প্রতিবারই নতুন নতুন একেকটা কথা বলে। এবার যেমন তারা বলছে-কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ অব করপোরেশন, সে ক্ষেত্রে আমাদের বুঝতে হবে যে, এটার মানে হচ্ছে সর্বব্যাপী কৌশলগত সম্পর্ক। স্ট্র্যাটেজিক বললে অনেকে মনে করতে চান যে, তার মানে হচ্ছে এটা সব সামরিক ব্যাপার বা প্রতিরক্ষা বিষয়ের ব্যাপার। আসলে তা নয়। স্ট্র্যাটেজিক বলতে সর্বব্যাপী, দীর্ঘস্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু বোঝায়। সেদিক থেকে চিন্তা করলে এই সফর খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়।
চীনের সঙ্গে আমাদের সহযোগিতা মূলত অর্থনৈতিক। বিশ্বপরিমণ্ডলে এটা আমাদের একটা নতুন মর্যাদাও দান করে। চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক যেরকম, অন্যান্য দেশের সঙ্গেও আমাদের তেমন সুসম্পর্ক রাখা প্রয়োজন। আমরা আশা করব যে, প্রধানমন্ত্রী চীন থেকে ফিরে এসে উপযুক্ত সময়ে ভারত সফরে যাবেন। রাশিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। সুতরাং, কাউকেই ছোট করে দেখা যায় না। বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। সবার সঙ্গেই আলাদা করে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। একজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক, আরেকজনের সঙ্গে মন্দভাব বিশ্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বর্তমান সরকার সে ব্যাপারে সচেতন থাকবে।
আমাদের প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সফল হোক, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার নতুন নতুন ক্ষেত্র বিস্তৃতি লাভ করুক এবং যেসব সহযোগিতা চালু আছে সেগুলো যাতে আরও গতি লাভ করে, এ আশাবাদ পোষণ করছি।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত
