রোববার ২৮ জুন ২০২৬
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবাসরীয়...
প্রকাশ: রোববার, ২৮ জুন, ২০২৬, ১২:৫৩ এএম আপডেট: ২৮.০৬.২০২৬ ১:৪৯ এএম |

রবিবাসরীয়...









এমন দিনকাল 

রবিবাসরীয়...আনোয়ারুল হক ।।

যমুনা ফিউচার পার্কের দক্ষিণ দিকের পকেট গেইট দিয়ে বের হয়েছে সে। পঁচিশ থেকে বয়স তিরিশের এক উদভ্রান্ত যুবক। যারা ওর পরিচিত, নিয়মিত একসঙ্গে উঠবস করে, তিন ডব্লিউর সার্কেলে সাঙ্গপাঙ্গ তারা কেউ তাকে ডিশ সেলিম, কেউ পাঙ্কু নামে ডাকে। যখন যে সরকার আসে তখন সেই দল করে। তার মানে সবসময় সরকারি দলের লোক সে। জুনিয়রদের কাছে বড় ভাই। আয়ের উৎস তার এলাকার যাবাহনের চাঁদাবাজী আর তেজগাঁও শিল্প এলাকার আবাসিক ভবনগুলিতে ডিশ, ওয়াইফাইয়ের ব্যবসা। শক্ত সামর্থ মাঝারি সাইজের শরীর। কুতকুতে চোখ। মুখে লাবণ্য কম, রুক্ষতা বেশি। প্রথম তাকালেই যে কারো চোখে পড়বে, মাথার মাঝখানে পোপ পলের চাঁদির টুপিটার মতো গোল বাটি বসিয়ে চারিদিকের চুল গলা ছোলা মোরগের মতো চাঁছা। তালুর গুচ্ছ চুল ধান গাছের পাতার মতো সরু সরু তোবড়ানো। আবু সাইদ গেইট থেকে এক সিঁড়ি নেমে ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে পাঙ্কু ফুটপাথে নামল। একই পথে যমুনায় ঢোকার মুখে ব্লণ্ডি চুলের টপস্ পরা একটি মেয়ে, সেলিব্রেটি টাইপ ওর সাথে মৃদু ধাক্কা খেল। দুজনের মুখ থেকে একই সাথে উচ্চারিত হল, সীট! 
দুজনেরই মনে হয়, তাড়া আছে। কেউই ভ্রুক্ষেপ করল না। ডিশ সেলিম ভীড়ের রাস্তাটায় গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে সামনে খালি যে রিক্সাটকে পেল, তাতেই সে লাফ দিয়ে উঠল। হাতের ইশারায় রিক্সাওয়ালাকে চলতে বলল। আবার মোবাইল থেকে মুখ সরিয়ে বাম হাতের তর্জনী দিয়ে সামনের দিক দেখিয়ে বলল, এই যা। এম ব্লকে। চালা জলদি। বলেই সে মোবইলে কথা বলায় মনোযোগী হল। 
 রিক্সাওয়ালা রুস্তমের কোন ইচ্ছাই ছিল না যাত্রী নেওয়ার। সে বাড্ডার মোড়ে যাত্রী নামিয়ে দিয়ে ফিরছিল কড়াইল বস্তিতে নিজের এক রুমের ঘরে। পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা রাতের ভাত বাসী আলুর ডালনা মরিচ পোড়া দিয়ে মেখে ধীরে সুস্থে খেয়ে তারপর আবার বের হবে। সকালে রিক্সা নিয়ে বের হওয়ার পর থেকে খাওয়ার সময় পায়নি। মাঝখানে একটা বনরুটি আর এককাপ চা খেয়েছে কেবল। এই সময় হুট করে তার খালি রিক্সায় লাফ দিয়ে উঠে পড়া যুবক যেন ভাদ্র মাসের তাল। আচমকা ওর মাথায় পড়েছে। রুস্তম বিরক্ত তো হলই, তার উপরে তুই করে বলাতে রিক্সার প্যাডেল থেকে পা উঠিয়ে সে থেমে গেল। নিজের সিটে বসে পিছন ফিরে ডিশ সেলিমকে এক নজর দেখল। যাবে না বলতে গিয়ে রুস্তম থেমে গেল। নিজের মনই যেন তাকে হশিয়ার করে দিল, সাবধান! সে পাঙ্কুর চেহারা সুরত পোশাক ভাবভঙ্গী মোবাইলে দ্রুত কথা বলার রাগী স্বর শুনে আর অস্থিরতা দেখে মুখের কথা গিলে ফেলল। সামনের দিকে ফিরে প্যাডেলে চাপ দিয়ে রিক্সাচালক রুস্তম ভাবছে, এই বয়সের একটা ছেলে ছিল ওর। সেজন্যে বাপের বয়সী ওকে এই ছেলে তুই করে কথা বলাতে রুস্তমের রাগ হলেও চুপ থাকাই ভাল। গরিবের আবার মান অপমান। এইসব কবুল করেই তাকে চলতে হবে। কোন ঝামেলা হলে কে তাকে বাঁচাবে! 
    দেশি লোকেরা আছে বটে! কিন্তু তাদেরই বা জোর কত! বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ভিতরে রিক্সা চালাবার জন্য মাত্র এক সপ্তাহ হল সে বউ আর কিশোরী মেয়েটিকে রেখে এখানে এসেছে। তার বাড়ি গাইবান্ধায়। ওর এলাকার সঙ্গীরা যারা কাজের খোঁজে এখানে এসে রিক্সা চালায়, তাদের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়েই সে এসেছে। দেশের বাড়িতে মাস ছ’য়েক ধরে সে অভাবে পড়ে ভ্যান চালাত। সারদিনের শেষে মহাজনের টাকা পরিশোধ করে চাল কিনলে হাতে তেল, মসলাপাতি, একটা তরকারি কেনার টাকা থাকত না। পিছনে বসা ঐ ছেলেটির বয়সী ওর বড় ছেলে, যার উপর রুস্তম আশা করেছিল সে তার দশ বছরের ছোট বোন আর বাপ-মাকে দেখবে সেই আশা টিকল না। এলাকার চেয়ারম্যানের দল করতে গিয়ে মারামারি করে পুলিশের খাতায় নাম উঠল। শুনেছে, আগের চেয়ারম্যানের দলের একজনকে খুন করে সে পালিয়েছে। কোথায় গেছে. কেই জানে না। সেই দলই এখন ক্ষমতায়। যাতে পোলার আর ঘরে ফিরার কোন পথ নাই। ধরা পড়লে হয় সারা জীবনের জেল নইলে সেই দলের কারো হাতে খুন হবে সে। আর রুস্তমের এমনই ভাগ্র, ওই সময় সে যার জমিতে হাল দিত, ফসল ফলাইত সেই জমির মালিক ছিল ঐ চেয়ারম্যানই। রুস্তমের ছেলে দিদার যখন তার জন্য মারামারি করতে গেয়ে খুনের আসামী হল তখন চেয়ারম্যানের সহানুভুতি দূরে থাক, বছর লাগাতি কামলার কাজ থেকে কোন কথা না বলে বাপেরে ছাটাই করে দিল। অগত্য মা মেয়েসহ জীবন বাঁচানোর তাগিদে রুস্তম আজ এখানে রিক্সাচালক। 
তিন চাকার রিক্সার প্যাডেল ঘুরছে তো রুস্তমের মনের চাকাও ঘুরছে। তিনবছর আগে দিদার নামে তার যে ছেলে পুলিশের ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে, সে আর পিছনের সিটে বসা ঐ ছেলেটি তো একই বয়সী। ভিটা ছাড়া আর কিছু নেই এমন পরিবার ওদের। মাত্র দুই গণ্ডা জমিই ওদের মাথা গোঁজার ঠাঁই। রুস্তমের বাপ-দাদা কারোরই কোনকালে বাড়তি জমি ছিল না। এলাকার সেই সময়ের চেয়াম্যান সগির আলী ছিল ওর দাদার মহাজন। তার ছেলে ইদ্রিস আলী চেয়ারম্যান ছিল রুস্তমের বাপের মহাজন। তার কুড়ি বছর বয়সে বাপ মারা যাওয়ার পর এই ইদ্রিস আলী হইল তারও মালিক। এতদিনের সম্পর্ক ইদ্রিস আলী শেষ করে দিল ছেলে খুনের মামলার আসামী হওয়ার পর। তার জন্যই তো সে খুন করছে! রুস্তম ভাবে, কথায় আছে না, যার জন্য চুরি করি সেই বলে চোর। ক্ষমতা বদল হইছে তো চেহারাও বদল হইয়া গেছে।
 ডানে বামে দেখে ডি ব্লক থেকে ই ব্লকে ঢোকার মুখে ডিশ সেলিম রুস্তমের পিঠে হাত রেখে বলল, ‘এই, এইখানে একটা খাড়া, আমি আইতেছি।’ বলে পাঙ্কু লাফ দিয়ে নেমে ছ’তলা বিল্ডিংয়ের গেইট পার হয়ে ভিতরে ঢুকে গেল।
রুস্তম বুঝতে পারছে না, বাকি দিনটা তার কেমন যাবে। একটা দীর্গশ্বাস ফেলে রিক্সাটাকে রাস্তার একপাশে রেখে নিজের সিটের উপর বসে সে একটা আকিজ বিড়ি ধরাল। আয়েশে দুই-তিন টান দিয়েছে মাত্র. দেখল. ডিশ সেলিম ডান হাত ধরা পনের যোল বছরের একটি মেয়েকে নিয়ে বাড়িটির ছোট গেইট ডিঙাল। রুস্তমের ভ্রু কুঁচকে দ্রুত নিজের সিট থেকে নেমে বিড়িটা ঝোপে ছুঁড়ে ফেলে দাঁড়াল। যুবক আগের মতই কানে মোবাইল, কথা বলছে দ্রুত। মেয়েটিকে ইশারা করল উঠে বসতে। রুস্তমকে ইশরা করল, যেতে।
রুস্তম দ্বিধায় পড়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কই যামু ?’ ডিশ সেলিম বিরক্ত হয়ে মুখ থেকে মোবাইল সরিয়ে খেঁকিয়ে উঠল, ‘কইছি না তোরে, কই যামু। যা।’
 কিশোরী মেয়েটি হিহি করে হাসল। এতে আরও বেশি মন খারাপ করে রুস্তম মেয়েটির দিকে তাকাল। দেখল, তাকে ওর নিজের মেয়েটির মতই মনে হল। রুস্তমের মেয়ে সুফিয়ার স্বাস্থ্য ভালো। তবে এই মেয়েটি শুকনো। গায়ে-বায়ে কোন মাংস নেই। মাথার চুল কালো না, লাল। মুখের রঙে আর হাতে-পায়ের রঙ এক না। মেয়েদের জামার বদলে মেয়েটির পরনে ছেলেদের শার্ট, গলার নিচে অনেকটা খোলা, যাতে উঠতি বুক দেখা যায। কোমরের নিচের প্যান্টটা হাঁটুর কাছে ইন্দুরে খাওয়া গর্ত, টুটা-ফাটা। ঠোঁটে এমন ভাবে রঙ মেখেছে তাতে ওরে মানাইছে না।
চলতে চলতে রুস্তম কে ব্লকে মোড় ঘুরতে গিয়ে ঘাড় ফেরালে পিছনে বসা ওদের দুজনের দিকে চোখ গেল। তাতে সে শরম পেল। যুবক ছেলেটি এখন আর মোবাইলে হরবড় করে কথা বলছে না। তার মনোযোগ মেয়েটির শরীরে। বৃষ্টি নেই, তেমন রোদও নেই। রিক্সার হুড তুলে দিয়েছে পাঙ্কু। ডান হাতে মেয়েটির কোমর জড়িয়ে ধরে ওর বাম হাত ঘুরছে শরীরের যেখানে সেখানে। অমত নেই বুঝা গেল মেয়েটি মুখে আরামের শব্দ করছে শুনে। বসুন্ধরার এদিকে লোকজনের চলাচল কম। নিরিবিলি পেলেই যুবক মেয়েটিকে চুমু খাচ্ছে।
রুস্তমের শরীর ঝিমঝিম করতে থাকে। এম ব্লকের দশ নম্বর রোডে মাথায় বেখেয়ালে একটা গর্তে পড়ে রিক্সাটা তীব্র ছাঁকুনী খেল। মেয়েটি আওয়াজ করল, ‘আউ!’ ডিশ সেলিম রিক্সার হুড নামিয়ে দিয়ে চেঁচাল, ‘কিরে দেইখা চালাস না।’
রুস্তম কিছু জবাব দিল না। বুঝল, মেয়েটি মাথার তালুতে রিক্সার হুডে ঠোকা খেয়েছে। জিজ্ঞেস করল, ‘এম ব্লকে কই নামবেন ? আইছি তো-’
ডিশ সেলিম চোখের কালো চশমাটা খুলে এদিক সেদিক কী যেন দেখল। তারপর বলল, ‘সোজা যা। স্টেডিয়াম পার হ।’ বলে রুস্তমের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে মেয়েটিকে বলল, ‘আজ খুব মজা হবে রুবিনা ‘
রুবিনার হাসির শব্দ ছাপিয়ে পাঙ্কুর মোবাইল বাজল। কানে ধরেই সে আগের মতই খেঁকিয়ে উঠল, ‘আইতাছি। এতো তাড়া ক্যান। অপেক্ষা কর। সঙ্গে মাল আছে।’
তো এরপর রুস্তম  ওদের নিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছে। বসুন্ধরার বিশাল সাম্রাজ্য পার হতে গিয়ে সে নিজেও অবাক। ভয়ও পাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে সে! এখন শীতকালের শেষ দিক। ফেবুয়ারির শেষ সপ্তাহ। না গরম না ঠাণ্ডা। ঝিরঝিরে বাতাসটা আরামের। ঘামের বা কষ্টের না। রুস্তমের পেটে খিদের টান ছাড়া আর কোন খারাপ লাগছে না। তবুও ভাবনা হচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে ওরা? এদিকটায় প্লট করা আছে কিন্তু বাড়ি নেই বললেই চলে। মাঝেমধ্যে দুই একটা বাড়ি উঠছে মাত্র। কাজ চলছে। রুস্তমের শরীর যেন আর চলে না! সে থেমে গিয়ে অনুনয় করে, ‘স্যার আমারে ছাইড়া দেন। এদিকে তো কোন বাড়ি ঘর নাই?’
ডিশ সেলিম অদূরে একটা খালি জমির নামাতে টিনের ছাপড়া আর তার পাশেই ছ’তলা একটা আণ্ডার কন্সট্রাকশন বিলিডং দেখিয়ে বলল, ‘ঐ খানে গিয়া থামা।’ 
রুস্তম ভীতু নয়। গাঁও গেরামের মানুষ। কিন্তু আশপাশ নিরিবিলি দেখে তার মনে ভয়ের শিহরণ জাগল। অবশেষে যেখানে সে থামল সেখানে কংকালের মতো উঠতি ওই বিল্ডিংটা ছাড়া আর কোন বাড়ি-ঘর নেই। রুস্তম না ভেবে পারল না, এই দুটি ছেলে মেয়ে ওখানে কেন যাচ্ছে? পাঙ্কু ছেলেটির ফোনের কথায় সে বুঝেছে, ওখানে আরও কেউ তাদের জন্য অপেক্ষায় আছে! 
রুস্তম রিক্সা থামতেই ওরা লাফিয়ে নেমে বিল্ডিংয়ের ভিতরের দিকে প্রায় দৌড়ে গেল। যাওয়ার সময় পাঙ্কু তাকে ভাড়া দিয়ে বিদায় করল না। বলল, ‘এইখানে থাক। তোরে আবার নিয়া যামু। তহন ভাড়া দিমু।’
ফিরিয়ে কিছু বলার সুযোগ পেল না রুস্তম। হাত ধরাধরি করে দুজন দ্রুত উধাও হলো বিল্ডংয়ের পেটে। 
 রিক্সায় বসে অপেক্ষা করতে করতে রুস্তমের ঝিমুনির ভাব এসেছিল। 
হঠাৎ গুলির শব্দে চমকে ধরফরিয়ে সে রিক্সা থেকে নেমে গুলির উৎস বুঝার চেষ্টা করল। এই সময় বিল্ডিংয়েরে ভিতরে আর একটা গুলির শব্দ হল। আশেপাশে থাকা কবুতর শালিক যাবতীয় পাখি আতংকে আকাশে উড়াল দিল। রুস্তম কী করবে ভেবে না পেয়ে বোকার মত বিল্ডিংয়ের মুখে দৌড়ে গেল। সিঁড়ির মুখে পৌঁছতে না পৌঁছতেই সে দেখল, একই বয়সের দুটি ছেলে পাঙ্কুকে পাঁজাকোলা করে এদিকে নিয়ে আসছে। ওর বুকের দিকে রক্তে সয়লাব। মনে হয়, বেঁচে নেই। একশ গজ দূরত্বে পাঙ্কুর সঙ্গে আসা কিশোরী মেয়েটি চিৎ হয়ে পড়ে আছে মাটিতে। ঐদিকে আরও দুটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে কাছাকাছি। ওদের একজনের হাতে পিস্তল। রুস্তমকে দেখে পিস্তল হাতে ছেলেটি ধীর পায়ে এগিয়ে এল। তার মাথায় চুল নেই। কামানো। চোখে কালো চশমা। থুতনিতে অল্প দাড়ি। পোশাকে অন্যদের তুলনায় সুবেশধারী। সে পাঙ্কুকে বহনকারী ছেলে দুটোকে হুকুম দিল, ‘জংলায় ফালাইয়া দে।’ 
রুস্তমের দিকে আঙুল তুলে পিস্তলধারীর পাশে থাকা ছেলেটি বলল, ‘দিদার ভাই, হে তো আমাগোরে দেইখা ফেলছে।’
বিস্ময়ে হা হয়ে গেছে রুস্তমের মুখ! নামটা সে শুনেছে! বুকের ভিতর শুকিয়ে থাকা কলজেটা দপ্ দপ্ করে লাফাতে শুরু করেছে। ও কি তার হারিয়ে যাওয়া ছেলে দিদার! বাপজান! 
চিৎকার দিয়ে ডাকতে যাওয়ার মুহূর্তে রুস্তম দেখল, কথিত দিদার নামের যুবকটি তার বুক বরাবর রিভলবার তাক করেছে। ওর বিস্ফারিত চোখে পলক পড়ে না। অপেক্ষায় থাকে একটি প্রাণঘাতী শব্দের।


কবি আল মুজাহিদী'র জীবন কাব্য

রবিবাসরীয়...আহাম্মেদ কবীর ।।


কবি আল মুজাহিদী (জন্ম ১লা জানুয়ারি ১৯৪৩ মৃত্যু ১৯ শে জুন ২০২৬) কবিতা নিয়ে, কবিতার কাব্যিক পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেলেন।
কিন্তু কঠির কি মৃত্যু হয়?
কিংবা কবিতার কি মৃত্যু হয়?
উত্তরটা আমাদের জানা নেই বলেই আমরা বিতর্ক করি, কাব্যের মহিমা মাখা অনন্য ভূবনে খুঁজি কবি ও কবিতাকে। এটা আমাদেরই স্বপ্ন-প্রয়াস, বাস্তবতার অভিজ্ঞান।
সেভাবেই আমরা স্মরণে আনতে পারি কবি আল মুজাহিদীকে, তাঁর প্রবহমান কবিতা- প্রেম যা কিনা নান্দনিক সৌকর্যে, বিলাসকে অতিক্রম করে প্রাজ্ঞ স্রোতধারায় জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে, 'হেমলকের পেয়ালা হাতে নিয়ে মাত্রা করেছিল। ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা' হয়ে যুদ্ধ নাস্তির’ মন্ত্রে ‘মৃত্তিকা অতি-মৃত্তিকাকে’ ‘প্রিজন ভ্যানে’ ভুলে দিয়েছেন। অন্যদিকে দিদেলাস ও ল্যাবিরিস্থ হিজিবিজির মধ্যে প্রাচ্য পৃথিবীর ধূলোকে সৌর জোনাকি দিয়ে এঁকেছেন জীবনের নানান অনুস্কায়। 
কবিতার রহস্য-আঁধারে বাবি আল মুজাহিদী যেনজীবনের যাপিত সত্যকে অ্যাকাডেমাসের বাগান ভেবে প্রেম ও পুনশ্চকে অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর অন্তরের গালিব-আতর দেখেছে সন্ধ্যার বৃষ্টি, কেঁপেছে কেঁদেছে কালের বন্দীতে। তবুও পাখির পথিবী আলবাট্রাস হয়ে ভঙুর গোলাপসহ কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি বলতে বলতে আবিষ্কার কারে চলেছে জীবনের আরেক বাস্তবতা Ñ পালকি চলে দুলকি তালে।
এগুলো হলো তাঁর কবিতার ভেতরের বাসা, ভেতর ঘরের প্রতিচ্ছবি, হয়তোবা বাইরে থাকা প্রকাশিত সত্যে কবিতার অভিজ্ঞান। কবি আল মুজাহিদীর সার্বিক কাব্য-প্রয়াসে সাধারণের মতো, অসাধারণ সত্যকে, দৃশ্য দৃষ্টিতে চিত্রময় করার প্রাজ্ঞ পূর্ণিমা-স্নাত আলোক সত্যের  দৃশ্যমান প্রভা, সর্বদাই বিচ্ছুরিতো।
কবিতার নিজস্বতা তৈরীর স্বপ্নে কাঠি সমাজ ও সাহিত্যে ডাবল মাস্টার্স করেছিলেন। কবিতাকে সহধর্মিণী বানিয়ে ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতার সাথে সংসার করেছেন। সেই স্বর্ণযুগে কবিতা তাঁকে এমনভাবে সম্পৃক্ত ও আবেশিত করেছিল সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। নিজে কাবিতা লিখেছেন অন্যের কবিতা ছাপিয়েছেন এবং প্রয়োজনে সম্পাদনাও করেছেন যার ফল স্বরূপ ‘কবিতা-পুরুষ’ হয়ে উঠতে সহজ হয়ে উঠেছিল। শুধুই বাংলা কবিতা নয় তাঁর দৃষ্টি ছিল বিদেশী কাব্য-ভূবনের দিকেও। ফলে কাইফি আজমির কবিতা, পৃথিবীর কবিতা, আহমদ ফরাজের কবিতাউর্দু কবিতা, হিন্দি কবিতা কিংবা হাইনরীশ হাইনে-র কবিতা, তাঁর অনুবাদ-শক্তি এবং কাব্য-ভুবনকে শক্তি ও স্বকীয়তায় প্রাজ্ঞতা দান করেছে। বিদেশী ভাষার কবিতাকে বাঙালি পাঠকের কাছে উপস্থাপনের প্রয়াস, কবি আল মুজাহিদীর আরেকটি কাব্য-শক্তির অভিজ্ঞান ভাবা খুব একটা ভুল হবে না।
কবিতার পাশাপাশি তিনি কবিতার শিশুতোষ সত্যকে ‘হালুম হুলম’ অনুষঙ্গেই বিকশিত করেননি একইসাথে নানাভাবে ‘তালপাতার সেপাই’ দিয়ে বলতে চেয়েছেন - ‘শেকল কাটে খাঁচার পাখি’।
ছড়াকাব্যে তাঁর দক্ষতা এবং প্রেমাঞ্জলি, পাঠককে মোহিত করেছিল বলেই তিনি লিখেছিলেন, সোনার মাটি রূপোর মাটি কিংবা ইস্টিশনের হুইসেল। এসব সৃষ্টিকর্ম শিশুতোষ হলেও এর মাধ্যমে তিনি জীবনের বাদ-প্রতিবাদ, মনস্তত্ত্ব, দর্শন, বুদ্ধিমানের সরলতাকে প্রকাশ করেছেন সাবলিল ও সহজ দৃষ্টি-দৃক্ষায়।
‘সমাজ ও সমাজতত্ত্ব’ প্রবন্ধ-প্রজ্ঞায় কবি হয়ে উঠেছিলেন সমাজ বিশেষজ্ঞ। ব্যাখ্যা করেছেন সমাজের অন্তর্গত বাস্তবতা আর দ্বান্দ্বিক বিকাশকে।  সমাজ নিয়ে তাঁর বিকশিত চিন্তা-মালা আরো বেশী প্রকটিতো উপন্যাস সমগ্রে। যৌবনের অভিজ্ঞতায় রচিত উপন্যাস ‘প্রথম প্রেম’। তারপর রহস্যভরা অনুষদে লিখলেন- ‘মিল এট ও স্যোন্যাটা’। উপন্যাসের ব্যতিক্রম বিভার বিচ্ছুরণ যেন, লাল বাতির হরিণ কিংবা রূপোলিরোদ্দুর ইত্যাদি। তাঁর লেখা উপন্যাসের মধ্যে আলোক পাখিটা, ছুটির ছুটি, খোকার আকাশ এবং খোকার যুদ্ধ... শুধু কথা সাহিত্যের প্রতিনিধিই নয় বরং বলা যায় তাঁর কবিতা-কল্পের কথ্য উপস্থাপন। পাশাপাশি ছোটগল্পেও তিনি তার বর্ণনাবাদী অভিজ্ঞানকে প্রকাশ করতে সচেষ্ট ছিলেন। কবি আল মুজাহিদীর লেখা গল্পগ্রন্থগুলো হলো- প্রপঞ্চের পাখি, বাতাবরণ এবং ভরা বাটাল মরা বাটালের চাঁদ। এখানেও তিনি প্রতীকী ব্যঞ্জনায় জীবন-বাস্ততাকে রূপক, প্রেমজ, দ্বন্দ্ব, দ্বিধা, দুঃখ-ক্ষোভের অন্তর্জালে আঁকার চেষ্টা করেছেন। কথাসাহিত্যে তিনি সরলতার রসালো-রহস্য নির্ভর নতুন প্রকারণের প্রয়াস খুঁজেছেন। যার ফলে তার সময়কালে অন্য কথা সাহিত্যিকদের চেয়ে তাঁর লেখনীর স্বাতন্ত্রতা অনেকটাই বিকাশিত হয়েছে। সবধরণের লেখাতেই কবির ব্যক্তিত্ববোধ এবং নিজস্বতা স্বকীয় প্রজ্ঞায় পরিস্ফুট হয়েছে। সুবক্তা আল মুজাহিদী তাঁর কথা সাহিত্যে সব সময়েই চেষ্টা করেছেন, কথাকে বক্তব্য-প্রধান না করে স্বচ্ছ, সাবলিল এবং বাঙময় করে তুলতে। এখানেই প্রকাশ হয়ে ওঠে তাঁর কবিত্বশক্তি এবং প্রকাশের নতুনত্ব।
কবির গবেষণা গ্রন্থ ‘কালান্তরের যাত্রী’ চিন্তাও প্রজ্ঞার সম্মিলন। কবির দুটি সত্তা। একটি তাঁর আবেগের। আর অন্যটি সমাজবাস্তর প্রেক্ষিতে কল্যাণধর্মী রাষ্ট্র ও মানবতার চিন্তা। তাঁর চিন্তন-বাস্তবতায় অত্যন্ত সুস্পষ্ট স্বকীয়তায় প্রকাশ হয়েছে প্রতিবাদী সত্য। সত্তার বিকাশএবং মানবতার মুক্তি। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাঁর ভেতরে সদা বিরাজমান ছিল যুদ্ধজয়ী মনোভাব লেখনীতেও সেই মহাসত্যকে বারংবার প্রকাশ করেছেন সাহসের সাথে আবেগ ও সৃজনশীলতার অনুপম রূপ-ময়তায়। তবে সর্ব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন ব্যক্তিত্ববান এবং স্পষ্টভাষী। একাত্তরকে যেমন শ্রদ্ধা করতেন একই সাথে পরবর্তীকালের অনাচার, অসাম্য, অবিচার, গণতন্ত্রকে হত্যা করার অপপ্রয়াসকে তিনি ঘৃণা করতেন। তিনি ছিলেন মুক্ত মনের মানুষ। মানুষের মুক্তির জন্য মানুষকে সংগ্রাম করতে হয়, যুদ্ধ-বিপ্লব করতে হয় সেই মহা সত্যকে নিয়েই তার কাব্য-যাত্রা।
কবিতা লেখার পাশাপাশি, কবিতার শিক্ষক ও নতুন কবিতার সব সারথির অন্বেষণ প্রয়াসে ছিলেন সদা সক্রিয়। দীর্ঘ কর্ম জীবনে ইত্তেফাকের কাব্যিক উচ্চ বারান্দায় তিনি শত শত কবিকে বিকশিত করেছেন, প্রকাশ করেছেন কিংবা কাব্যের উচ্চ মার্গীয় পথে সাধনার রথে চড়ে প্রাগ্রসর হতে উপদেশ দিয়েছেন। অনেক সময়ে লেখার চাইতেও অন্যকে লেখক হিসেবে তৈরী করতে বেশী আগ্রহী ছিলেন। হয়তোবা সেজন্যই তার কাব্য-ভুবন বিরাট-বিশাল হয়ে উঠেনি। তিনি বলতেন, আমি কী লিখিছি সেটা কালের বিচারে ছেড়ে দিলাম কিন্তু তোমরা কবিতার মাধ্যমে কালজয়ী হয়ে ওঠো এটাই আমার আশাবাদ।
 কবি আল মুজাহিদী কতটা কালজয়ী হয়েউঠছেন সেটা বলা মুশকিল। তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি বাংলা-কবিতায় নিজের অবস্থান তৈরী করবেন এমনটা ভাবা আনন্দেরই ব্যাপার হতে পারে। তবে তার জীবনকালে তিনি যাদেরকে নিয়ে চলেছিলেন তারা কিংবা তাদের উত্তরসূরিরা কবিকে ভুলবেন না। মর্যাদার আসনে সমাসীন করবেন, এমন প্রত্যাশা অবশ্যই যারা যেতে পারে।
কবিতাকে কবি আল মুজাহিদী, দীর্ঘ ৮৩ বছর ধরে কবিতার পথে হেঁটেছিলেন। কবিকে নিয়ে যাপিত জীবনে কখনোই দ্বিধায় ছিলেন না। কবি পরিচয় ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে গর্ব-গৌরবের। এছাড়াও পোশাকে লেবাসে তিনি ছিলেন একজন জাত-কবি। যে কেউ তার দিকে তাকালেই বুঝতে পারতেন, তিনি একজন কবি এবং কবিতার রঙে আঁকা সত্যিকারের মহান মানুষ ও কাব্য-পুরুষ।
পৃথিবী ছেড়ে তার চলে যাওয়াটা আমাদের জন্য বেদনার। তবুও বাস্তবতা হলো, সবাইকেই চলে যেতে হয়। সবাই চলে যায় এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে। তবে ‘হেমলকের পেয়ালা’ নিয়ে তাঁর চলে যাওয়া তাঁকে মহান করবে এমনি ভাবনায় তাঁর মতো করে আমরাও গেয়ে ওঠি-
‘আমি জানি, পৃথিবীতে
প্রতিদিন সূর্যমুখী ফোটে
তোমার সূর্যও আশায় আশায় 
জাগে। শুধু জেগে ওঠে।’














http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
ইথানের শরীর থেকে গুলি বের করা যা নি এখনো
লালমাইয়ে যুবককে ডেকে নিয়েগলা কেটে হত্যার অভিযোগ
মহাসড়কের চৌদ্দগ্রামে পৃথক দুর্ঘটনায় নিহত ৩
মাদকবিরোধী জোটের উদ্যোগে মানববন্ধন
কুমিল্লায় নকলওষুধের বড় চালান জব্দ, উৎপাদন চক্রের সদস্য আটক
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কুমিল্লা সীমান্তের অর্ধশতাধিক এলাকা দিয়ে ঢুকছে মাদক
কুমিল্লার মুরাদনগরে হত্যা মামলার আসামির স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা
কাটাবিলে মাদক ব্যবসায়ীদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ চলাকালে ষষ্ঠ শ্রেণিরশিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ
কুমিল্লায় ফয়জুল করীমের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার
চীন থেকে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২