রোববার ২৮ জুন ২০২৬
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩
সৌর বিদ্যুৎ’ই বাংলাদেশে প্রযোজ্য
অধ্যাপক ডাঃ মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: রোববার, ২৮ জুন, ২০২৬, ১২:৫৩ এএম আপডেট: ২৮.০৬.২০২৬ ১:৪৯ এএম |

 সৌর বিদ্যুৎ’ই বাংলাদেশে প্রযোজ্য
বিদ্যুতের দাম, পরিবেশ রক্ষা এবং সবকিছুর জন্য নবায়নযোগ্য জ¦ালানি বাংলাদেশে দরকার। কিন্তু চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে জাতির উপর আবার কোন ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা না বাড়ে। ক্যাপাসিটি চার্জ এখন দেশের গলার কাঁটা। তাই ক্যাপাসিটি চার্জ না বাড়িয়ে একটি সুন্দর পরিকল্পনার মাধ্যমে যদি নবায়নযোগ্য জ¦ালানি ধীরে ধীরে বাড়ানো যায় তাহলে দেশের লাভ হবে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে তাঁরা নবায়যোগ্য জ¦ালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। নবায়নযোগ্য জ¦ালানি নীতিমালা ২০০৮, সমন্বিত বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি মহাপরিকল্পনা ২০২৩ এবং নবায়নযোগ্য নীতিমালা ২০২৫ প্রণয়ন করে নবায়নযোগ্য জ¦ালানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা আছে ১৮ হাজার মেগাওয়াট ২০৩০ সালে এ চাহিদা হবে ২৪ হাজার মেগাওয়াট। এর ২০ শতাংশ চাহিদা নবায়নযোগ্য জ¦ালানি দিয়ে পূরণ করতে চায় সরকার। প্রাথমিকভাবে নবায়নযোগ্য জ¦ালানির খরচ বেশি হলেও পরে এর সুফল পাওয়া যাবে। জানা গেছে আগষ্ট’২৬ দেশের একমাত্র পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসছে। তার খরচও সরকারকে বহন করতে হবে। 
বিদ্যুৎ খাতের বড় ফাঁদ হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১৩ টাকা দিয়ে কিনে বিতরণ কোম্পানির কাছে ৭ টাকায় বিক্রি করে আসছে। এখন দাম বাড়ানোর কারণে প্রতি ইউনিট প্রায় ১০ টাকায় বিক্রি করবে। এ ১০ টাকার মধ্যে প্রতি ইউনিটে ৫ টাকা ৪৬ পয়সাই হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। অথচ ২০১১ সালে প্রতি ইউনিট ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হত ২ টাকা ৩৫ পয়সা। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় ২০১১-১২ সালে এ চার্জ ছিল ৫ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ সালে ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা, ২০২৬-২৭ সালে তা বেড়ে দাড়াতে পারে ৫২ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। এখন বসিয়ে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে গিয়ে জনগণকে বড় মাশুল দিতে হচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পিডিবির ৫০ টি ছোটবড় কেন্দ্র থাকলেও সচল আছে ৯টি। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের লোকসান দিচ্ছে। যেমনÑ ঘোড়াশাল ২৬০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রয় বন্ধ। কিন্তু এটিকে রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। এজন্য এ কেন্দ্রের প্রতি ইউনিটে বিদ্যুতের মূল্য পড়ে ৩ হাজার ৭৫ টাকা। একইভাবে টঙ্গী ইউনিটের বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের মূল্য পড়ে ৫ হাজার ১৮৯ টাকা ও বাঘাবাড়ি কেন্দ্রে ইউনিট মূল্য ২ হাজার ৯৭২ টাকা। দেশের মোট উৎপাদিত ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে পিডিবি। অথচ তার জনবল ১০ হাজারের বেশি। পিডিবির বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ৩১ টাকা অথচ বিক্রিমূল্য ১০ টাকার মত। সরকারি রাউজান ২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য পড়ে ৩১ টাকা ৮১ পয়সা। পায়রা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৫৮ পয়সা। পিডিবির অভিজ্ঞ মহলের বর্ণনা, গত ১৬ বছরে পিডিবির দক্ষতাকে ভঙ্গুর করে বেসরকারি কোম্পানিকে উৎসাহ দেয়া হয়। এর খেসারত আরও কত বছর দিতে হবে কে জানে? দেশে দৈনিক ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে পিডিবি এবং সরকারি কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ৪০ শতাংশ। বাকি বিদ্যুৎ বেসরকারি খাত বা ভারত থেকে আমদানি করা হয়। এভাবে পুরো বিদ্যুৎ খাত বেসরকারি খাতের কাছে জিম্মি করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞগণের ধারণা। অনেকেরই ধারণা বন্ধ হওয়া কেন্দ্রের লোকবলকে নবায়নযোগ্য জ¦ালানির উৎপাদনে ট্রেইন আপ করা দরকার। 
নবায়নযোগ্য জ¦ালানি বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ গ্রহণ সরকারের জন্য এক্ষেত্রে সহজ উপায়। বিভিন্ন ভবনের ছাদে রুফটপ সোলার সিস্টেম ও ১৪ টি সোলার পার্ক নিয়ে এ পর্যন্ত দেশের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৪ গিগাওয়াট। প্রতিবেশি দেশ ভারত ২০০৬ সালে মিনিষ্ট্রি অব নিউ এন্ড রিনিউএবল এনার্জি গঠন করে জ¦ালানিকে আলাদা প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনে। পরবর্তী সময়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে মন্ত্রনালয়ের অধীন সোলার ইন্সটিটিউট ও সোলার এনার্জি কর্পোরেশন (২০১৪), বায়ু এনার্জি ইনস্টিটিউট গঠন করে। ২০১৪ সালে ভারতের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল মাত্র ২ দশমিক ৮২ গিগাওয়াট। এরপর থেকে তাদের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ইর্ষণীয় গতিতে প্রতিবছর পূর্ববছরের প্রায় দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২২ সালে ৫৫ গিগাওয়াট এবং ২০২৩ সালে ৬৬ গিগাওয়াট এসে দাঁড়ায়। রুফটপ সোলার সিস্টেম উৎসাহদানে ২০২৪ সালে ‘পিএম সূর্যঘর মুফত বিজলি যোজনা প্রকল্প’ বাস্তবায়ন শুরু করে ২০২৬ সালের মার্চে ভারতের মোট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১৫০ দশমিক ২৬ গিগাওয়াট এবং কেবল ২০২৫ সালে ভারতের জাতীয় গ্রীডে ৪৪ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। ২০১৮ সালে ভিয়েতনামের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ছিল মাত্র ৮৬ মেগাওয়াট, ২০২৫ সালের শেষে তা প্রায় ১৯ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে। 
ঢাকা সেন্ট্রাল এলাকার ভবনগুলোতে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করে ৬ হাজার ৯৫০ মেগাওয়াট এবং বৃহত্তম ঢাকা এলাকার ভবনগুলো থেকে ৩ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অর্থাৎ কেবল ঢাকা ও পাশর্^বর্তী এলাকা থেকে মোট ১০ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সব বানিজ্যিক, শিল্পকারখানা, আবাসিক ভবন ২০ বছর মেয়াদ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হবে না অনুমান করে ভবনের সম্ভাব্য আয়তন আনুমানিক অর্ধেক নামিয়ে আনলেও ৫ হাজার মেগাওয়ার্ট বেশি বিদ্যুৎ ঢাকা সেন্ট্রাল ও বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চল থেকে উৎপাদন সম্ভব। ঢাকায় ৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা গেলে, দেশের বিশেষ করে বড় শহরগুলোর সব ভবন ও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল থেকে অনেক বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়েকটি দেশের অভূতপূর্ব সাফল্যের পাশে মানুষকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে আকর্ষণীয় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে মানুষ স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে রুফপট সোলার সিস্টেম স্থাপনে এগিয়ে এসেছে। সরকারগুলো প্রনোদনা দেয়ার পাশাপাশি আবশ্যক সব প্রাতিষ্ঠানিক সেবা কঠোরভাবে নিশ্চিত করেছে। পিডিবি জীবাষ্ম জ¦ালানি বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং বৃহৎ বিনিয়োগে প্রকল্প বাস্তবায়নে অভিজ্ঞ। তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ও জনবল নতুন এবং বৃহৎ এ কর্মযজ্ঞের জন্য প্রস্তুত নয়। এছাড়া কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক দিক থেকে দুটির কার্য্যপ্রনালি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক সম্প্রসারণের জন্য শক্তিশালী কাঠামো দরকার। ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় নবায়নযোগ্য জ¦ালানিকে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনা কার্যকর হতে পারে। 
এ লক্ষ্যে যে পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা যেতে পারেÑ
১। নদীভিত্তিক ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, মহাসড়ক ও রেলপথের দু’ধারে প্রকল্প নেয়া সম্ভাবনাময়
২। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ের অধীনে পৃথক নবায়নযোগ্য জ¦ালানি বিভাগ গঠন
৩। নবায়নযোগ্য জ¦ালানি ইনিস্টিটিউট স্থাপন 
৪। উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও আনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতি আমদানি সহজ করা 
৫। সীমিত সংখ্যক সৎ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবশ্যিক যন্ত্রপাতি আমদানির ব্যবস্থা করা 
৬। মিটারিং ব্যবস্থাকে সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব করা 
৭। সরকারি ও বেসরকারি ভবনে বাধ্যতামূলক রুফটফ সোলার নীতিমালা প্রণয়ন
বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাড়তি চাহিদার জোগান এবং গ্যাস অনুসন্ধানে মনোযোগ সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। বায়ু ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব উৎসাহিত করতে হবে। অভিজ্ঞজন মনে করে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বায়ু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপারে বলা হয়, দেশের সব সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়নের আবর্জনা বা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে জমি রাখতে হবে। এ জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা যায়। জলমহাল এবং পুকুরে ভাসমান সোলার বসিয়েও বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া যায়। সরকার সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে আন্তরিক ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলে ২০৩০ সালের মধ্যেই ১০ গিগাওয়াট বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশ সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়। এক্ষেত্রে সফলতা অর্জনে প্রথম পদক্ষেপ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ের অধীনে একটি নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ বিভাগ স্থাপন। 
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
ইথানের শরীর থেকে গুলি বের করা যা নি এখনো
লালমাইয়ে যুবককে ডেকে নিয়েগলা কেটে হত্যার অভিযোগ
মহাসড়কের চৌদ্দগ্রামে পৃথক দুর্ঘটনায় নিহত ৩
মাদকবিরোধী জোটের উদ্যোগে মানববন্ধন
কুমিল্লায় নকলওষুধের বড় চালান জব্দ, উৎপাদন চক্রের সদস্য আটক
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কুমিল্লা সীমান্তের অর্ধশতাধিক এলাকা দিয়ে ঢুকছে মাদক
কুমিল্লার মুরাদনগরে হত্যা মামলার আসামির স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা
কাটাবিলে মাদক ব্যবসায়ীদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ চলাকালে ষষ্ঠ শ্রেণিরশিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ
কুমিল্লায় ফয়জুল করীমের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার
চীন থেকে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২