মঙ্গলবার ৯ জুন ২০২৬
২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
স্নায়ুবিক জটিলতায় অকুপেশনাল থেরাপি: শিশুর স্বাভাবিক জীবনের পথে নতুন দিগন্ত
ইসতিয়াক আহম্মেদ অনন্ত
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬, ১:১১ এএম আপডেট: ০৯.০৬.২০২৬ ১:৫৯ এএম |

  স্নায়ুবিক জটিলতায় অকুপেশনাল থেরাপি: শিশুর স্বাভাবিক জীবনের পথে নতুন দিগন্ত
আধুনিককালে শিশুদের মধ্যে নানা ধরনের স্নায়ুবিক (নিউরোলজিক্যাল) সমস্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জন্মগত জটিলতা, অক্সিজেনের অভাব, মস্তিষ্কের বিকাশজনিত ত্রুটি, দুর্ঘটনা এবং বংশগত কারণে অনেক শিশু স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ থেকে পিছিয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অত্যন্ত কার্যকর ও আধুনিক পদ্ধতি হলো অকুপেশনাল থেরাপি (ঙপপঁঢ়ধঃরড়হধঞযবৎধঢ়ু)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু চিকিৎসা নয়-বরং এক ধরনের পুনর্বাসনকৌশল, যা শিশুকে দৈনন্দিন কাজের প্রশিক্ষণ, শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আচরণ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক যোগাযোগ ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে সাহায্য করে। অকুপেশনাল থেরাপি শিশুর কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে, নিজের কাজ নিজে করতে এবং জীবনের মূলস্রোতে ফিরে আসতে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার নাম।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি জরুরি পরিসংখ্যান
এডিএইচডি (৮%), ডাউন সিন্ড্রোম (০.১০%), অটিজম (০.১৭%), সেরিব্রাল পালসি (০.৩৫%)।
শিশুদের নিউরোডেভেলপমেন্টাল সমস্যার বিস্তার এখন আর কোনো উপেক্ষিত বিষয় নয়। সাম্প্রতিক জরিপ ও উপাত্ত থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু নানা ধরনের স্নায়ুবিক জটিলতায় ভুগছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শৈশবকালীন এডিএইচডি (মনোযোগের ঘাটতি ও অতিচঞ্চলতা) প্রায় ৪ শতাংশ শিশুকে প্রভাবিত করে; সেরিব্রাল পালসির হার ০.৩৫ শতাংশ, অটিজম ০.১৭ শতাংশ এবং ডাউন সিনড্রোম ০.১০ শতাংশ। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জন্মকালীনজটিলতা, গর্ভাবস্থায় অপুষ্টি, অক্সিজেনের ঘাটতি, মস্তিষ্কে আঘাত, জেনেটিক কারণ এবং পরিবেশগত বিভিন্ন ঝুঁকির কারণে শিশুদের মধ্যে স্নায়ুবিক সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে অনেক শিশু স্বাভাবিক বিকাশের ধাপগুলো যথাসময়ে অর্জন করতে পারে না। এই পরিসংখ্যান যত ছোট আকারে মনে হোক না কেন, প্রতিটি শতাংশের পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো শিশুর জীবন ও ভবিষ্যৎ। আর এই শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে অকুপেশনাল থেরাপির ভূমিকা যত গুরুত্বপূর্ণ, ততই অপরিহার্য।
কোন কোন সমস্যায় এই থেরাপি জরুরি
বর্তমানে সেরিব্রাল পালসি, অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, এডিএইচডি, ডাউন সিনড্রোম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, ডেভেলপমেন্টাল ডিলে, সেন্সরি প্রসেসিং ডিসঅর্ডার, লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটি, ব্রেন ইনজুরি, স্ট্রোক পরবর্তী জটিলতা, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি, পেশিদৌর্বল্য ও ভারসাম্যহীনতা-এমন অসংখ্য স্নায়ুবিক সমস্যায় অকুপেশনাল থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যত দ্রুত সমস্যা শনাক্ত করে থেরাপি শুরু করা যায়, শিশুর সুস্থতার সম্ভাবনা ততই বেড়ে যায়।
শেখে দৈনন্দিন কাজ, বাড়ে আত্মবিশ্বাস
অনেক শিশু নিজে খেতে পারে না, জামা পরতে পারে না, খেলাধুলা বা স্কুলের কাজে পিছিয়ে পড়ে। অকুপেশনাল থেরাপিস্ট ধাপে ধাপে তাদের চামচ ব্যবহার, বোতাম লাগানো, জুতা পরা, দাঁত ব্রাশ করা, টয়লেট ব্যবহার ও স্কুলব্যাগ গোছানো শেখান। এসব দক্ষতা শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা কমায়।
মোটর দক্ষতা ও ভারসাম্যের উন্নয়ন
সেরিব্রাল পালসি বা অন্যান্য স্নায়ুবিক সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের অনেকের হাত-পায়ের নড়াচড়া, শরীরের ভারসাম্য এবং সমন্বয় ক্ষমতা দুর্বল থাকে। বিশেষ ধরনের ব্যায়াম, খেলা এবং থেরাপিউটিক কার্যক্রমের মাধ্যমে অকুপেশনাল থেরাপি এসব দক্ষতা উন্নত করতে সহায়তা করে। থেরাপির ফলে শিশুদের পেশির নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়, হাত-চোখের সমন্বয় উন্নত হয় এবং দৈনন্দিন কাজ সম্পাদনের সক্ষমতা বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত থেরাপি অনেক শিশুকে স্বাভাবিক চলাফেরা ও কার্যক্রমে অংশ নিতে সহায়তা করে।
সেন্সরি জটিলতা কমায়, আচরণ স্বাভাবিক করে
অটিজমসহ বিভিন্ন নিউরোডেভেলপমেন্টাল সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে সেন্সরি বা সংবেদনগত জটিলতা প্রায়ই দেখা যায়। অনেক শিশু অতিরিক্ত শব্দ, আলো, স্পর্শ কিংবা ভিড় সহ্য করতে পারে না। আবার কেউ কেউ ব্যথা বা স্পর্শের অনুভূতি সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে না।অকুপেশনাল থেরাপির সেন্সরি ইন্টিগ্রেশন পদ্ধতি শিশুকে বিভিন্ন সংবেদন গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করে। এর ফলে অস্থিরতা কমে, মনোযোগ বৃদ্ধি পায় এবং আচরণ আরও স্বাভাবিক হয়।
মনোযোগ ও শেখার সক্ষমতা বৃদ্ধি

এডিএইচডি আক্রান্ত শিশুদের পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। অকুপেশনাল থেরাপি মনোযোগ বৃদ্ধি, নির্দেশনা অনুসরণ, লেখালেখির দক্ষতা, স্মৃতিশক্তি উন্নয়ন ও ক্লাসরুমের আচরণ নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষণ দেয়। এতে শিক্ষাজীবনে আসে ইতিবাচক পরিবর্তন।
সামাজিক ও মনত্ত্বাতিক বিকাশে ভূমিকা
নিউরোলজিক্যাল জটিলতায় আক্রান্ত অনেক শিশু অন্যদের সঙ্গে মেশে না, সর্বদারাগান্বিতভাবপ্রকাশ, ভয় বা হতাশা। থেরাপিস্টরা খেলা, দলগত কার্যক্রম ও আচরণভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিশুকে বন্ধু তৈরি করতে, আবেগ প্রকাশ করতে ও আত্মবিশ্বাস অর্জনে সাহায্য করেন। ফলে শিশু সমাজের পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে।
পরিবারকেও করানো হয় প্রশিক্ষণ
শুধু থেরাপি সেন্টারে কাজ করলেই হয় না-পরিবারের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু থেরাপি সেন্টারে কয়েক ঘণ্টা কাজ করলেই কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না। শিশুর উন্নয়নের জন্য পরিবারের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ থেরাপিস্টরা অভিভাবকদের শেখান কীভাবে বাড়িতে শিশুর সঙ্গে কাজ করতে হবে, কোন ধরনের খেলনা বা কার্যক্রম ব্যবহার করতে হবে এবং কীভাবে শিশুর আচরণ ও শেখার প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে হবে। এতে থেরাপির ফলাফল আরও কার্যকর হয়।
আসুন, সবাই সচেতন হই, সচেতনতা বাড়ানোর এখনই সময়
বাংলাদেশে এখনো অনেকে অকুপেশনাল থেরাপি সম্পর্কে যথেষ্ট জানা নেই। ফলে অনেক শিশু সঠিক সময়ে চিকিৎসা পায় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্নায়ুবিক সমস্যাকে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সঠিক চিকিৎসা, পরিবারের সহযোগিতা ও নিয়মিত থেরাপির মাধ্যমে অসংখ্য শিশু স্বাভাবিক ও স্বনির্ভর জীবনে ফিরতে সক্ষম। নিউরোলজিক্যাল সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে অকুপেশনাল থেরাপির ভূমিকা অনস্বীকার্য। এটি শুধু শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায় না-বরং গড়ে তোলে মানসিক বিকাশ, সামাজিক আচরণ, আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের দক্ষতা। সঠিক সময়ে সঠিক থেরাপি, পরিবারের সহযোগিতা এবং সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি একটি শিশুকে সীমাবদ্ধতার গণ্ডি পেরিয়ে তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারে। আর সেই কারণেই শিশু পুনর্বাসন ব্যবস্থায় অকুপেশনাল থেরাপির গুরুত্ব দিন দিন আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে তাই শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সময়মতো অকুপেশনাল থেরাপি গ্রহণের গুরুত্ব অপরিসীম এবংএর বিকল্প কোনো বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা নেই।
লেখক: ২য় বর্ষ, ব্যচেলর অব সায়েন্স ইন অকুপেশনাল থেরাপি
বিএইচপিআই, সিআরপি, সাভার, ঢাকা














http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
নগরভবন বর্তমান স্থানেই চায় কুমিল্লার মানুষ
ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ
সংসদে কুমিল্লা বিমানবন্দর চালুর দাবি এমপি মনির চৌধুরীর
সাবেক এমপি বাহারের বক্তব্যের প্রতিবাদে কুমিল্লায় আইনজীবী ঐক্য পরিষদের সংবাদ সম্মেলন
দাউদকান্দিতে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কুমিল্লায় মহাসড়কে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল থেকে ৪৫ জন গ্ৰেফতার
প্রধান সন্দেহভাজন অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান ও সাবেক সেনাসদস্য শাহিন আলমের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ
নগরভবন বর্তমান স্থানেই চায় কুমিল্লার মানুষ
বুড়িচংয়ে কিশোর গ্যাংয়ের অস্ত্রের মহড়া, তিন দিনেও আটক নেই
কমেনি ভোগান্তি, থামছে না সিএনজির ভাড়া নৈরাজ্য
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২