মঙ্গলবার ৯ জুন ২০২৬
২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নগরভবন বর্তমান স্থানেই চায় কুমিল্লার মানুষ
মাসুদ আলম।।
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬, ১:১১ এএম আপডেট: ০৯.০৬.২০২৬ ২:০১ এএম |


নগরভবন বর্তমান স্থানেই চায় কুমিল্লার মানুষকুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নতুন নগরভবন বর্তমান স্থানেই নির্মাণের দাবিতে একাট্টা হয়েছেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, নগরীর বিশিষ্টজন, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ জনগণ। তাদের দাবি, ১১০ কোটি টাকার অনুমোদিত প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব না করে বিদ্যমান নগরভবনের স্থানেই অত্যাধুনিক ভবন নির্মাণ করতে হবে। অন্যথায় সরকারি অর্থ ও সময়ের অপচয়ের পাশাপাশি নাগরিক সেবা ব্যাহত হবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছেন, নগরবাসীর মতামত উপেক্ষা করে নগরভবন স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে। সরকার দলীয় নেতৃবৃন্দও বলছেন,নগর ভবন নগর ভবনের স্থানেই হবে। এখন যেখানে আছে সেখানেই হতে হবে। এ নিয়ে কেউ ষড়যন্ত্র করতে চাইলে মেনে নেওয়া হবে না, যড়যন্ত্র করতে দেওয়া হবে না।
নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে নগরীর প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত বর্তমান নগরভবন থেকে নগরবাসী সহজেই নাগরিক সেবা গ্রহণ করছেন। এ অবস্থায় একটি অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্পকে স্থগিত রেখে নতুন করে স্থান নির্ধারণ বা পরিবর্তনের বিতর্ক সৃষ্টি করা নগর উন্নয়নের গতি ব্যাহত করার পাশাপাশি গণমানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার শামিল। এতে সরকারি অর্থ, সময় ও প্রশাসনিক সক্ষমতার অপচয়ের আশঙ্কাও রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে মানুষকে নতুন করে দুর্ভোগে ফেলার বিষয়ও। নগরীর নানা শ্রেণির বিশিষ্টজনদের অভিমত, কুমিল্লার মানুষের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায় বর্তমান স্থানেই নতুন ও অত্যাধুনিক নগরভবন নির্মাণ করা উচিত। অন্যথায় গণমানুষ আন্দোলনে নামতে পারে।
জানা গেছে, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের জন্য ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক নগরভবন নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছে। তবে নতুন নগরভবন কোথায় নির্মিত হবে, তা নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হওয়ায় বর্তমানে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। এক পক্ষ বর্তমান নগরভবনের স্থানেই নতুন ভবন নির্মাণের পক্ষে অবস্থান নিলেও অন্য একটি পক্ষ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক-সংলগ্ন ছোট ধর্মপুর এলাকায় সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব পতিত জমিতে ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছে।
নগরীর বিশিষ্টজনদের দাবি, নগরভবনের অবস্থান নির্ধারণে রাজনৈতিক বা ব্যক্তি স্বার্থের পরিবর্তে জনগণের মতামত এবং নগর পরিকল্পনার বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তারা মনে করেন, যেখানে অবকাঠামো, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও নাগরিক সেবা ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, সেখানে নতুন ভবন নির্মাণই হবে সবচেয়ে যৌক্তিক, অর্থনৈতিক ও জনবান্ধব সিদ্ধান্ত।
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম বলেন, নগর ভবন নগর ভবনের স্থানেই হবে। এখন যেখানে আছে সেখানেই হতে হবে। এ নিয়ে কেউ ষড়যন্ত্র করতে চাইলে মেনে নেওয়া হবে না, যড়যন্ত্র করতে দেওয়া হবে না।  প্রয়োজনে সাব অফিস হতে পারে। কিন্তু মূল নগর ভবন যেখানে সেখানেই নতুন ভবন হবে। নাগরিক সুবিধার স্বার্থে নতুন ভবন সেখানেই হতে হবে। এ নিয়ে কুমিল্লাবাসী ও গণমানুষ একমত। আমাদেরও একটাই দাবি। নগর ভবন নগর ভবনেই থাকুক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাবেক সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান বলেন, শতবর্ষী নগরভবন বর্তমান স্থান থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর কুমিল্লা নগরবাসী কোনোভাবেই মেনে নেবে না। কারণ বর্তমানে যেখানে নগরভবন রয়েছে, সেখান থেকে নগরের চারদিকে সমানভাবে সেবা বণ্টন সহজভাবেই পরিচালিত হয়ে আসছে। পুরাতন ভবন ভেঙে নতুন অত্যাধুনিক নগরভবন হতে পারে, কিন্তু সেটির স্থান পরিবর্তন হতে পারে না। যারাই এ ধরনের চক্রান্তে লিপ্ত, তাদের মোকাবিলায় কুমিল্লার নাগরিক সমাজ সজাগ দৃষ্টি রেখেছে।
তিনি বলেন, কুমিল্লা সদর ও সদর দক্ষিণ উপজেলা নিয়ে এই সিটি কর্পোরেশন গঠিত। দক্ষিণে একটি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। বর্তমান নগরভবন ভেঙে স্থানান্তর করা শুধুই অর্থের অপচয়। যারা এ ষড়যন্ত্র করছেন, তারা নাগরিক সেবা চান না। আমাদের জোরালো আবেদন, এ ধরনের উদ্ভট চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য চক্রান্তকারীদের অনুরোধ করব।
কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মাসুক আলতাফ চৌধুরী বলেন, সিটি কর্পোরেশনের নগরভবন স্থানান্তরের যে বিষয়টি উঠে এসেছে, সেটি কোনো যৌক্তিক দাবির ভিত্তিতে নয়; এটি একটি রাজনৈতিক চিন্তা এবং আধিপত্যের বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে কেউ কেউ এটি করতে চাচ্ছেন। বর্তমান নগরভবন যে স্থানে রয়েছে, সেই স্থানেই নগরভবন রেখে অত্যাধুনিক ভবন নির্মাণের দাবি এই নগরীর সব শ্রেণি-পেশার মানুষের। কারণ নগরীর ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টি ওয়ার্ডে মানুষের ঘনত্ব ও বসবাস সবচেয়ে বেশি। আর বাকি নয়টি ওয়ার্ডে এখনো কৃষিজমি ছাড়া তেমন কিছুই নেই। ১৮টি ওয়ার্ডের ২০ শতাংশ জায়গায় নগরীর ৮০ শতাংশ মানুষের বসবাস, আর দক্ষিণের ৯টি ওয়ার্ডের ৮০ শতাংশ জায়গায় ২০ শতাংশ মানুষের বসবাস। মানুষের ঘনত্ব বিবেচনায় বর্তমান স্থানে সিটি কর্পোরেশনের নগরভবন থাকাই সেবার দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিক। শুধু তাই নয়, দক্ষিণের মানুষের সেবার জন্য সিটি কর্পোরেশনের একটি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে, সেটিও দোতলা থেকে চারতলায় উন্নীত হচ্ছে। সমানভাবে সেবা বণ্টনের স্বার্থে বর্তমান সিটি কর্পোরেশনের মূল ভবন যেখানে আছে, সেখানেই তা রাখতে চান সকল বাসিন্দা। আগামীতে সিটি কর্পোরেশনের সীমানা সম্প্রসারণ হলেও এই নগরভবনই মধ্যবর্তী স্থানে থাকবে, যেখান থেকে চারদিকে সেবা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে আরও আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করা হবে।
কুমিল্লার প্রবীণ আইনজীবী ও গবেষক অ্যাডভোকেট গোলাম ফারুক বলেন, সিটি কর্পোরেশনের সীমানা সম্প্রসারণ এখনও অনেক দূরের বিষয়। এর আগে নগরভবন স্থানান্তরের আলোচনা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনের আয়তন ৫৩ বর্গকিলোমিটার। ভবিষ্যতে এটি সম্প্রসারিত হয়ে ২৫৬ বর্গকিলোমিটারে উন্নীত হলে তখন নতুন একটি প্রেক্ষাপট তৈরি হবে। সম্প্রসারণের পর জনসংখ্যার ঘনত্ব, নাগরিক চাহিদা ও সেবার পরিধি বিবেচনা করে নগরভবন স্থানান্তরের বিষয়টি সামনে আসতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে নগরভবন রয়েছে, সেটিই যথার্থ ও উপযুক্ত স্থান।
এ নিয়ে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, নগরীর ৮০ শতাংশ বাসিন্দার দাবি উপেক্ষা করে নগরভবন স্থানান্তর করা হলে সেটি হবে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডের অধিকাংশ মানুষ বর্তমানে নগরীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত নগরভবন থেকেই সহজে সেবা গ্রহণ করছেন। বর্তমান অবস্থানটি যোগাযোগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। ভবিষ্যতে সিটি কর্পোরেশনের সীমানা সম্প্রসারণ করে কুমিল্লা সদর উপজেলার তেলকুপি বাজার থেকে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর পর্যন্ত এলাকা অন্তর্ভুক্ত হলেও বর্তমান নগরভবনের অবস্থান ভৌগোলিকভাবে মধ্যবর্তী স্থানেই থাকবে। ফলে নগরীর চারদিকের বাসিন্দারা সমানভাবে নাগরিক সেবা গ্রহণ করতে পারবেন এবং কোনো এলাকাকে অতিরিক্ত সুবিধা বা বঞ্চনার মুখোমুখি হতে হবে না।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান নগরভবনের স্থানেই ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক নগরভবন নির্মাণের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং ঠিকাদার নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পের প্রয়োজনীয় কার্যক্রমও শেষ পর্যায়ে। এখন যদি স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। প্রকল্পের মেয়াদ সীমিত হওয়ায় নতুন করে স্থান নির্ধারণ, নকশা ও অনুমোদনের জটিলতায় পড়লে পুরো প্রকল্পই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। এতে কুমিল্লাবাসী একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে।
এ বিষয়ে আপত্তি জানানো স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, স্থানীয় এমপিকে কিছু না জানিয়ে নগর ভবন নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়, যা বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। আগের কাউন্সিলররাও বর্তমান স্থানে নগর ভবন নির্মাণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে আমি মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেই। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণ ও নির্বাচিত মেয়র না আসা পর্যন্ত নতুন নগর ভবন নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য আমি বলেছি।
















http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
নগরভবন বর্তমান স্থানেই চায় কুমিল্লার মানুষ
ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ
সংসদে কুমিল্লা বিমানবন্দর চালুর দাবি এমপি মনির চৌধুরীর
সাবেক এমপি বাহারের বক্তব্যের প্রতিবাদে কুমিল্লায় আইনজীবী ঐক্য পরিষদের সংবাদ সম্মেলন
দাউদকান্দিতে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কুমিল্লায় মহাসড়কে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল থেকে ৪৫ জন গ্ৰেফতার
প্রধান সন্দেহভাজন অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান ও সাবেক সেনাসদস্য শাহিন আলমের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ
নগরভবন বর্তমান স্থানেই চায় কুমিল্লার মানুষ
বুড়িচংয়ে কিশোর গ্যাংয়ের অস্ত্রের মহড়া, তিন দিনেও আটক নেই
কমেনি ভোগান্তি, থামছে না সিএনজির ভাড়া নৈরাজ্য
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২