
ঈদুল
আজহা সমাগত, যার অপর নাম কোরবানির ঈদ। ঈদ হলো আনন্দের দিন। এই আনন্দের
অন্যতম অনুষঙ্গ হলো খাবার। আর কোরবানির ঈদের অন্যান্য খাবারের সঙ্গে মূল
আয়োজন বিভিন্ন রকমের গোশত খাওয়া-যেমন গরু, খাসি, মহিষ, এমনকি উটের গোশত। ঈদ
উৎসবে সবারই মনের প্রবল ইচ্ছা বেশি বেশি করে মাংস খাওয়া। দু-একদিন বেশি
খেতে যদিও খুব বাধা নেই, তবুও খাওয়া উচিত রয়ে-সয়ে। স্বাস্থ্যবিধি ও নিয়ম
মেনে খাওয়াদাওয়া করলে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটার আশঙ্কা কমবে এবং ঈদ আনন্দময়
করে তোলা যাবে।
আমাদের একটু নজর দেওয়া দরকার—আমরা কী খাচ্ছি, কতটুকু
খাচ্ছি, বিভিন্ন খাবারের প্রতিক্রিয়া কী, তার ওপর। মূল সমস্যাটা নিঃসন্দেহে
খাবারের পরিমাণে। অনেকেই একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণ তৈলাক্ত বা চর্বিযুক্ত
খাবার খেয়ে হজম করতে পারেন না। এছাড়া কোরবানির জন্য মাংসের পরিমাণটাও একটু
বেশিই খাওয়া হয়। ঈদ উৎসবে অনেকেরই মনের প্রবল ইচ্ছা বেশি করে মাংস খাওয়া।
অনেকেই আছেন, যারা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে অনেক বেশি মাংস খেতে পছন্দ করেন। আবার
এমনও কেউ আছেন, যারা মাংসের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা ভেবে একেবারেই খেতে চান
না।
মনে রাখতে হবে, মাংসের যেমন কিছু ক্ষতিকর দিক আছে, তেমনি এর যথেষ্ট
উপকারও আছে। কারণ মাংস প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম উৎস। তবে খাদ্যসচেতনতাও
সবচেয়ে বেশি জরুরি। বিশেষ করে যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগেন, তাদের খাবার
নিয়ে থাকে অনেক সংশয়। এক্ষেত্রে বলা যায়, দু-একদিন বেশি খেতে যদিও খুব বাধা
নেই, তবু খাওয়া উচিত রয়ে-সয়ে। সমস্যা হতে পারে যাদের পেটের পীড়া, উচ্চ
রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ আছে কিংবা যাদের এসব রোগের প্রাথমিক লক্ষণ
আছে। ঈদের সময় সবার বাসায়ই কমবেশি নানা মুখরোচক খাবারের আয়োজন করা হয়।
নিজের বাসায় তো বটেই, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের বাসায় এবং বিনোদনকেন্দ্রে
ঘুরে ঘুরে সারাদিনই টুকিটাকি এটা-সেটা খাওয়া হয়, যেগুলো আমাদের সংস্কৃতিরই
অংশ।
মাংস পরিমাণমতো খাবেন : মাংস তো খেতেই হবে, তাতে বাধা নেই। মূল
সমস্যাটা নিঃসন্দেহে খাবারের পরিমাণে। অনেকেই একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণ
তৈলাক্ত বা চর্বিযুক্ত খাবার খেয়ে হজম করতে পারেন না। তাছাড়া কোরবানির মাংস
পরিমাণে একটু বেশিই খাওয়া হয়। ফলে পেট ফাঁপা, জ্বালাপোড়া, ব্যথা, এমনকি
বারবার পায়খানা হতে পারে।
অতিভোজনে পেটে ভরা ভাব, অস্বস্তিকর অনুভূতি,
বারবার ঢেকুর ওঠা, গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটি, এমনকি বুকে ব্যথা পর্যন্ত হতে
পারে। বেশি মাংস খেলে তা পরিপূর্ণভাবে হজম হতে সময় লাগে। পর্যাপ্ত পানি পান
না করার কারণে অনেকে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন। যদিও কোনো নির্দিষ্ট খাবার খেতে
মানা নেই, কিন্তু পরিমাণ বজায় রাখা খুবই জরুরি। এক্ষেত্রে শুরু থেকেই
পরিকল্পনা থাকা উচিত। যেহেতু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই সবাই মাংস খাওয়ার জন্য
ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাই সকাল আর দুপুরের খাওয়াটা কম খেলেই ভালো। আত্মীয়স্বজন
বা বন্ধুবান্ধবের বাসায়ও যথাসম্ভব কম খাওয়া উচিত।
এড়িয়ে চলুন চর্বি:
অতিরিক্ত চর্বি খাওয়া এমনিতেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কোরবানির সময় এ
বিষয়টি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা উচিত। অনেক সময় দেখা যায়, রান্না সুস্বাদু হবে
মনে করে মাংসে বেশকিছু চর্বি আলাদাভাবে যোগ করা হয়। এসব পরিহার করা উচিত।
মাংসের সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণে সবজি খাওয়া যেতে পারে। টাটকা সবজি পাকস্থলী
সাবলীল রাখে। পরিমিতিবোধ যেখানে রসনা সংবরণ করতে পারে, সেখানে ভয়ের কিছু
নেই। মাংসে তেল বা ঘিয়ের পরিমাণ কমিয়ে দিলে, ভুনা মাংসের বদলে শুকনো কাবাব
করে খেলে, কোমল পানীয় ও মিষ্টি কমিয়ে খেলে কোরবানির ঈদের সময়ও ভালো থাকা
যাবে।
বয়সভেদে খাবার : যাদের বয়স কম এবং শারীরিক কোনো সমস্যা নেই, তারা
নিজের পছন্দমতো সবই খেতে পারেন এবং তাদের হজমেরও কোনো সমস্যা হয় না—শুধু
অতিরিক্ত না খেলেই হলো, বিশেষ করে চর্বিজাতীয় খাদ্য। মধ্যবয়সী এবং বয়স্ক
ব্যক্তিদের খাবার সম্পর্কে সচেতন থাকা খুব জরুরি। এমনকি উচ্চ রক্তচাপ,
ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি ইত্যাদি না থাকা সত্ত্বেও এই বয়সের
মানুষের ঈদের খাবারের ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার।
কোষ্ঠকাঠিন্য
বা পাইলসের সমস্যা : বেশি মাংস খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বেড়ে যায়।
যাদের এনাল ফিশার ও পাইলস রোগ আছে, তাদের পায়ুপথে জ্বালাপোড়া, ব্যথা
ইত্যাদি বাড়তে পারে; এমনকি পায়ুপথে রক্তক্ষরণও হতে পারে। তাই প্রচুর
পরিমাণে পানি, শরবত, ফলের রস, ইসবগুলের ভুসি ও অন্যান্য তরল খাবার বেশি
খাবেন।
পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা: কারও পেটে গ্যাস হলে
ডমপেরিডন, অ্যান্টাসিড, ওমেপ্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল জাতীয় ওষুধ খেতে পারেন।
যাদের আইবিএস আছে, তারা দুগ্ধজাত খাবার পরিহার করুন।
ডায়াবেটিস:
ডায়াবেটিস রোগীকে অবশ্যই মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। গরু বা খাসির
মাংস পরিমাণমতো খেতে পারেন, তবে চর্বি না খেলেই ভালো।
অ্যালার্জিজনিত
সমস্যা: অনেকেরই গরুর মাংস খেলে অ্যালার্জির ঝুঁকি থাকে। তাদের জন্য গরুর
মাংস এড়িয়ে চলাই যুক্তিযুক্ত। যদি কেউ খেতে চান, তবে আগে থেকে চিকিৎসকের
পরামর্শ অনুযায়ী খেতে পারেন।
রক্তে উচ্চমাত্রায় কোলেস্টেরল, উচ্চ
রক্তচাপ, স্ট্রোক এবং হৃদরোগী: অতিরিক্ত গরুর মাংস খেলে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি
বেড়ে যায়। শুধু গরু নয়, মহিষ, ছাগল ও খাসির মাংসে থাকে উচ্চমাত্রার প্রোটিন
ও ফ্যাট। তাই অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস খেলে স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও
কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়। বিশেষ করে যারা আগে থেকেই এসব রোগে ভুগছেন,
তাদের ঝুঁকি আরও বেশি। তাই মাংস খাওয়ার সময় অবশ্যই খেয়াল রেখে পরিমিত
পরিমাণে এবং চর্বি ছাড়িয়ে খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সারা বছর তারা যে ধরনের
নিয়মকানুন পালন করেন খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে, কোরবানির সময়ও সেভাবে চলাই
ভালো।
কিডনির রোগী: যারা কিডনির সমস্যায় ভোগেন, যেমন ক্রনিক রেনাল
ফেইলিওর, তাদের প্রোটিনজাতীয় খাদ্য কম খেতে বলা হয়। তাই মাংস খাওয়ার
ব্যাপারে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনো ক্রমেই অতিরিক্ত খাওয়া ঠিক
হবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সারা বছরের মতো ঈদের সময়ও কম মাংস খাওয়া
ভালো।
মাংস বাদে আর যা যা কম খাবেন বা এড়িয়ে চলবেন: মনে রাখতে হবে,
মাংস তো খাওয়া হয়, এর সঙ্গে আরও কিছু মুখরোচক খাবার খেতে অনেকেই ভালোবাসেন;
যেমন কলিজা, মগজ, ভুঁড়ি, পায়া বা নেহারি ইত্যাদি। এগুলোও পরিমাণমতো খেতে
পারেন। দাওয়াতে গেলে অতিভোজন পরিহার করার চেষ্টা করবেন। হয়তো অনেক
খাওয়াদাওয়া টেবিলে সাজানোই থাকবে, কিন্তু খেতে বসলেই যে সব খেতে হবে, তা
নয়। রাতের খাবার খেয়েই ঘুমিয়ে পড়বেন না। খাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা পর বিছানায়
যাবেন। খাবারের ফাঁকে ফাঁকে পানি খাবেন না। এতে হজমরস পাতলা হয়ে যায়। ফলে
হজমে অসুবিধা হয়। তাই খাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা পর পানি পান করুন। খাবারের
মাঝে বোরহানি খেতে পারেন।
ব্যায়াম করতে হবে নিয়মিত: বয়স অনুযায়ী ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করতে ভুলবেন না। শরীর থেকে অতিরিক্ত ক্যালরি কমাতে এটি সহায়ক হবে।
গোশত
সংরক্ষণ: কোরবানির পরে গোশত বিলিয়ে দেওয়ার পরও দেখা যায় যে ঘরে অনেক গোশত
জমা থাকে। এই গোশতগুলো ভালোভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। ফ্রিজে সংরক্ষণ
সম্ভব হলে ভালো। তবে গ্রামগঞ্জে, এমনকি শহরে অনেকের বাসায় ফ্রিজ না থাকলে
সঠিকভাবে মাংস জ্বাল দিয়ে রাখতে হবে। এমনকি মাংস সিদ্ধ করে শুকিয়ে শুটকির
মতো করে অনেক দিন খাওয়া যেতে পারে। খাবার আগে খেয়াল রাখতে হবে যেন মাংসের
গুণগত মান ঠিক থাকে।
ঈদ আনন্দের। আর খাবারের তৃপ্তি না থাকলে এ আনন্দ
যেন পূর্ণতা পায় না। কিন্তু তা হতে হবে পরিমিত। ঈদের উৎসবের আনন্দ আগেও
ছিল, চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলতেই থাকবে। খাওয়াদাওয়ারও উৎসব-আনন্দ,
অতিভোজন-একইভাবে চলবে। অন্তত একটা দিন হলেও সবার এমন ইচ্ছা থাকে। না খেলেও
অনেক সময় আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব জোর করেই খাওয়াবে। তারপরও সবাইকে
রয়ে-সয়ে খেতে হবে। ঈদ এবং ঈদ-পরবর্তীসময়ে ভালো থাকতে হলে খাবারের বিষয়ে
পরিমিতিজ্ঞান ও সংযম পালন করতে হবে। এভাবেই উৎসবও চলতে থাকবে, স্বাস্থ্যটাও
ভালো থাকবে।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
