
জাতীয় সংকটে, বিপর্যয়ে এবং সংগ্রামে দু’জন কবি যুগে যুগে আমাদের পথের দিশা দেখিয়ে এসেছেন তাঁদের একজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), দ্বিতীয়জন কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। রবীন্দ্রনাথে পরিশুদ্ধ বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধান পাওয়া যায়। তুলে ধরেছেন। ঈশ্বর অনুরাগী গভীর বোধসম্পন্ন সমর্পণের ছবিটিও। নজরুলেও সমর্পণ আছে কিন্তু আলাদা। নজরুলে আছে লড়াকু বীর্যবান বাঙালির পরিচয়। এঁরা এমন দুজন, যারা পৃথিবীতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে ধরাকে আলোকিত করতে আবির্ভূত হন। তাঁরা মহাত্মা, সাধক, মানব-প্রেমিক। রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল উভয়ের মধ্যে বয়সের ব্যবধান প্রায় চল্লিশ। সৃষ্টিতেও আছে ভিন্নতা, আছে স্বর সুরে। অনুজ এবং ভিন্নমাত্রার কবি নজরুল প্রসঙ্গ এলে রবীন্দ্রনাথও যেন আপনাতেই সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েন স্নিগ্ধ। আজন্ম নজরুল তাঁকে গুরুদেব বলে সম্বোধন করেছেন। স্নেহ পেয়েছেন। সারস্বত সমাজে ‘কবি’ স্বীকৃতি দিয়েছেন প্রথম তিনিই। রবীন্দ্র-সংগীতের গভীর অনুরাগী নজরুল সম্পর্কে চনাটি লিখতে গিয়ে তাই বুঝি তাঁর গুরুদেবেরই গানের দুটো লাইন কানে বেজে ওঠে, ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস- / সাধক ওগো প্রেমিক ওগো, পাগল ওগো ধরায় আস’। তাঁরা একাধারে সাধক এবং প্রেমিক শুধু নয়, পাগলও। যার কারণে এই দু’জনের কাছেই বাঙালির আশ্রয় হয়েছে প্রাণের, নিবেদনের, সমর্পণের। যাতে মিশে আছে হার না মানা হারের গল্পটাও।
নজরুল রূপ মুগ্ধতার কবি। রবীন্দ্রনাথের সাধনা ছিল অরূপের। উভয়ের পথ নিশ্চিত আলাদা। কিন্তু ধাঁচ এবং লক্ষ্য একই, সাধকের প্রাণ যাঁদের তাঁদের আত্মার খোরাক মানব কল্যাণ। মানুষের হিত সাধন তাঁদের সৃষ্টির ব্রত। এই পথে উল্লিখিত দুজনের একজন, বিনয়ে অবনত, অন্যজন দ্রোহে উন্নত। দু’জনেই তাঁদের সময়-অসময় জুড়ে জনমনপ্রাণ জয়ে জয়ী।
নজরুলের কবিতা যাঁরা পাঠ করেছেন শুধু নয়, অনুধাবন করেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই বিষয়টি লক্ষ্য করে থাকবেন, শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেই এই কবির কবিতা পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের বুকের গভীরে তারুণ্যের, যৌবনের অনাবিল শক্তি অনুভব করেন। এই রহস্য নজরুলের কবিতার হৃদয়াবেগ,শব্দচয়নে। যার প্রকাশ খুব সহজ সরল জোরালো এবং গতিময়। কবিতার ছন্দ বৈচিত্র্যে, বলার ভঙ্গিতে এমন প্রাণভেদী তরঙ্গ যাকিনা প্রাণের গভীরে গিয়ে পৌঁছে এবং কখনো স্থির থাকে না। নিরন্তর বীণার তারে সুরের ঝর্ণাধারার মত আলোড়িত করে। কবির কবিতায় যেমন, বিশেষ করে, প্রেমের কবিতায় এবং তাঁর গানেও তেমন। সুরের অনুরণন গীত শেষেও মনের গহীনে ভেসে বেড়ায়। সন্দেহ নেই, নজরুল সংগীতের বাণীও সুরারোপ করার আগে এক একটি উৎকৃষ্ট কবিতা।
যেবিষয় নজরুলে আছে, আর কারো নেই, তা হলো, শিশুতোষ হোক আর উদ্দীপনার কবিতা হোক কিংবা প্রণয়-সঙ্গীত সর্বত্রই তারুণ্যের প্রাণশক্তিই তাঁর সৃষ্টিশীল অনুভবের সৌন্দর্য-শক্তি। মূলত কবিতার ভিতর দিয়েই চিরকালের যৌবনের কাছে নজরুল আগামি কালের সংবাদ পৌঁছে দিয়েছেন। ‘বিদ্রোহী’ দিয়ে শুরু, যার আবেগ ছড়িয়ে দিয়েছেন শিশুতোষ কবিতায়ও। নজরুল নিজে জেগে ছিলেন বলেই জেগে ওঠার তাগিদ দিয়ে শুরু করেন। বলেন, ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে / তোমার ছেলে উঠলে মাগো রাত পোহাবে তবে।’
বলা-বাহুল্য, ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলার কাজটি আবির্ভবের পর থেকেই নজরুল করে গেছেন। গত শতবছরে বাঙালির জীবনে যত আন্দোলন হয়েছে, উপ-মহাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলন, ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনে, ১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধের মুক্তি-সংগ্রাম, স্বৈরাচারের পতনে, দুইহাজার চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আমরা দেখেছি, আমরা (যৌবন) জেগে না ওঠা পর্যন্ত জাতির জীবনে রাত পোহাল কই ? তোমার (মায়ের) ছেলেরা উঠলে বলেই সেদিন রাত পোহালো বাংলাদেশে। মাটি আলাদা হয়েছে কিন্তু মানুষের মুক্তি আসেনি। স্বাধীনতার আধা-শতক পার হয়ে যাওয়ার পরেও যখন আঁধারের অচলায়তন আমাদের বুকের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে থাকে, অনাহুত মৃত্যুর মিছিল যখন থামছেই না, যারা তখন এগিয়ে এলো ওরা আর কেউ নয়, তারা কবি নজরুলের উত্তরসুরি। সময়ের হাত ধরে জেগে ওঠা প্রত্যয়ী নতুন ভোরের আলো।
আমাদের জানা আছে, যে কবি চিরকালের, তিনি কখনও এক জায়গায় থেমে থাকেন না। তিনি অনায়াসে তাঁর সময়কে ডিঙিয়ে যান। তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে সকল কালের, যুগের সকল মানুষের। প্রত্যাশাকে জাগিয়ে রাখার জন্য তাই বুঝি অমানিশার আঁধার কেটে রাত পোহাবার সাধনাই ছিল নজরুলের কবিতার মৌলস্বর। এই আকাক্সক্ষা অপূর্ণ থাকে না যখন দেখা যায়, সময়ের প্রয়োজনে বারবার দ্রোহীর নবরক্ত, সমকালের তারুণ্য শাসকের অন্যায়ের অত্যাচারের প্রতিবাদে রাজপথে, মিছিলে নেমে আসে।
অগ্রজ কবি রবীন্দ্রনাথ যখন আহ্বান করেন, ‘ওরে নবীন ওরে আমার কাঁচা আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’- তখন তাঁর এই আশীর্বাণীও আমাদের মনে পড়ে, যেটা তিনি নতুন যুগের কবি নজরুলের জন্য করেছিলেন। ১১ আগস্ট ১৯২২ সালে নজরুলের একক সম্পাদনায় অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’ প্রকাশের আগে নজরুল গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের কাছে আশীর্বাণী চেয়েছিলেন। ২২ শ্রাবণ ১৩২৯ রবীন্দ্রনাথ যা লিখে পাঠিয়েছিলেন, সেটি পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকে প্রথম পাতার উপরের দিকে নিয়মিত ছাপা হয়েছে :
আয় চলে আয় রে ধূমকেতু,
আঁধারে বাঁধ অগ্নি সেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে যে তোর বিজয়-কেতন।
অলক্ষণের তিলক রেখা,
রাতের ভালে হোক না লেখা,
জাগিয়ে দেরে চমক মেরে
আছে যারা অর্ধচেতন।
সমকালে কথাশিল্পে যাঁর খ্যাতি বাঙালির অন্তরে গেঁথে আছে, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮) তিনি শিবপুর থেকে ২৪ শ্রাবণ ১৩২৯ শুভেচ্ছা-পত্র লিখে পাঠিয়েছেন, ‘আশীর্বাদ করি, যেন শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে নির্ভয়ে সত্য কথা বলিতে পার।’
ইতিহাস সাক্ষী, অনুজ কবি নজরুল তাঁর উপর অর্পিত এই দায় সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি সত্য কথন এবং প্রতিবাদী চরিত্র থেকে কখনো সরে আসেননি। যেকাজটি অগ্রজদের দ্বারা সম্ভব হয়নি সময়ের দাবী পূরণ করা, সেটি নজরুল অকুতোভয়ে করে গেছেন। অসত্য নয়, আধমরা আমরা যখন ঘরে বসে বসে দেশটা রসাতলে গেল বলে আহাজারি করে বারবার মরি, রাষ্ট্রে অরাজকতা, মৃত্যুর মিছিল আমাদের বিচলিত করে না, অন্যায়,অত্যাচার কারো সহ্যের সীমা অতিক্রম করে না। প্রতিদিন খুন, ধর্ষণ, অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে যখন আমাদের টনক নড়ে না তখন আমাদের পরের প্রজন্ম, আগামী সকালের সূর্য সন্তানেরা বয়োজ্যৈষ্ঠদের এই স্থবিরতাকে সহ্য করে ঘরে বসে থাকেনা। পেশিশক্তি, বন্দুকের নলের ডগায় বারবার রাস্তায় নেমে ওরা জানিয়ে দেয়, এই বিদ্রোহ প্রাণের। এই বিদ্রোহ অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরকালের। শান্তির, সত্যের।
জিজ্ঞেস করি, বারবার এই প্রাণশক্তি তারুণ্যেরা কোথায় পায় ? সহজ জবাব, আমাদের মতো আধমরাদের কাছ থেকে তো নয়ই! তাহলে ? শ্রেণিকক্ষ থেকে আগেই ওরা ‘বিদ্রোহী’ কবির কবিতার পাঠ থেকে প্রতিবাদের শিক্ষা নিয়ে আসে। জেনে যায়,
‘আমরা শক্তি আমরা বল
আমরা ছাত্রদল
মোদের পায়ের তলে মুর্ছে তুফান
উর্ধে বিমান ঝড়-বাদল...’- তখন সংগ্রামী জয়ের ইতিহাসে যৌবনের প্রতিবাদী শক্তিকে, সাহসকে কাকতলীয় বলে মনে হয় না। প্রত্যয় হয়, এরা তো সেইসব দামাল ছেলে, যারা বিদ্রোহী কবির চিরকালের অনমনীয় উত্তরাধিকার। আমাদের একজন কবি নজরুল আছেন যাঁকে হৃদয়ে ধারণ করলে বাঙালি জাতি কখনো পথহারা হবে না।
সবশেষে, স্মরণ করি, আবারও রবীন্দ্রনাথকে, যিনি নজরুলের আবির্ভাবকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তাঁর কবি-জীবন সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। হয়তো বিস্মিত হয়েছিলেন, নিজ বলয়ের বাইরে এই স্পর্ধিত কবি-প্রাণ সত্ত্বার পরিচয়ে। নজরুলকে তিনি যুগের প্রয়োজনে, শক্তি ও সাহসের জায়গা থেকে বিবেচনা করে এসেছেন। আমলে নিয়েছেন তাঁর বিপ্লবী চরিত্রকে। মনে করেছেন, যার প্রয়োজন হবে বিশ্বমানবতার শক্তি-সাম্যের মিছিলে। তাই উপযুক্ত সময়ে কবিগুরুর নজরুলকে ‘কবি’ স্বীকৃতি প্রদান তাৎপর্য বহন করে। স্মর্তব্য, রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজ বলয়ের বাইরে কাউকে গ্রন্থ উৎসর্গ করেছেন এমন দৃষ্টান্ত নেই। এছাড়া সমকালে পাশ্চাত্ত্য শিক্ষায় শিক্ষিত কবিদের নজরুল সম্পর্কে উন্নাসিক মনোভাবের বিষয়টি রবীন্দ্রনাথের গোচরে ছিল বুঝা যায় যখন তিনি একথা বলেন, ‘নজরুলকে আমি ‘বসন্ত’ গীতিনাটক উৎসর্গ করেছি এবং উৎসর্গপত্রে তাকে ‘কবি’ বলে অভিহিত করেছি। জানি তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এটা অনুমোদন করতে পারনি। আমার বিশ্বাস তোমরা নজরুলের কবিতা না পড়ে এই মনোভাব পোষণ করছ। আর পড়ে থাকলেও তার মধ্যে রূপরসের সন্ধান করনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছ মাত্র।...’ রবীন্দ্রনাথ নিজে আলোকিত ছিলেন। যার ফলে জেনে-বুঝে নজরুলকে স্বাগত জানাতে দ্বিধা করেননি। কেননা, তিনি ‘মাটির কাছাকাছি যার লাগি কান পেতে আছেন বলে জীবনের এক সময়ে উক্তি করেছেন, নজরুলের মধ্যে তিনি তাঁকেই দেখতে পেয়েছিলেন। স্তাবক উন্নাসিকদের ‘আবদার’কে রবীন্দ্রনাথ সেজন্যে এড়িয়ে গেছেন। বলেছেন, ‘আমি যদি আজ তরুণ হতাম. তাহলে আমার কলমেও ঐ সুর বাজত।...যুগের মনকে যা প্রতিফলিত করে, তা শুধু কাব্য নয়, মহাকাব্য।’ নজরুল যুগের মহাকাব্য রচয়িতা, সত্য। আবার এও সত্য যে, নজরুল কোন এক যুগে স্থির হয়ে নেই। কাল থেকে ‘কালান্তর’এ, বন্ধন-শৃঙ্খল ভেঙ্গে বেরিয়ে যাওয়া তাঁর সৃষ্টির প্রবাহমানতা। আর কে না জানে, যেনদী প্রবাহমান, সৃষ্টিতে তার কোন মৃত্যু নেই। মানুষের সাথে মানুষের দেখা হয়। কবির সাথে কবির। কবিদের মৃত্যু নেই।
লেখক: কবি, কথা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও নজরুল বিষয়ক প্রবন্ধের জন্য পুরস্কার প্রাপ্ত
