বিশ্বের প্রত্যেক প্রান্তের লাখো মুসলিম এখন মক্কার পথে। ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ পবিত্র হজ পালনের জন্য তারা সমবেত হয়েছেন পবিত্র ভূমিতে। সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জীবনে অন্তত একবার হজ পালন করা ফরজ। আদি পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজিরা তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করতে মক্কায় অবস্থান করছেন।
হজের এই আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রতিটি ধাপ কীভাবে সম্পন্ন হয়? পাঠকদের জন্য হজের নিয়মাবলি ও ধাপগুলো এখানে তুলে ধরা হলো:
যাত্রা শুরু ও ইহরাম
হজের প্রথম ধাপ হলো ইহরাম। ইহরাম শুধু নির্দিষ্ট পোশাক নয়, বরং হজের নিয়ত বা সংকল্প। পুরুষরা সেলাইবিহীন দুটি সাদা কাপড় পরিধান করেন এবং নারীরা শালীন পোশাক পরেন। এই শুভ্র পোশাক ধনী-দরিদ্র ও বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল ভেদাভেদ মুছে দিয়ে আল্লাহর দরবারে সবাইকে সমান করে দেয়। আকাশপথে যারা আসেন তারা বিমানেই মিকাত অতিক্রমের আগে ইহরাম সম্পন্ন করেন।
তাওয়াফ ও সাঈ
মক্কায় প্রবেশের পর হাজিরা কাবা শরিফ সাতবার প্রদক্ষিণ করেন, একে তাওয়াফ বলা হয়। এরপর তারা সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌঁড়ান বা হাঁটেন, যা সাঈ নামে পরিচিত। হজরত হাজেরা (আ.) তার শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-এর পানির তৃষ্ণা মেটাতে যেভাবে দুই পাহাড়ের মাঝে ছুটেছিলেন, সেই স্মৃতিকে স্মরণ করেই এই সাঈ সম্পন্ন করা হয়।
তাঁবুর শহর মিনাতে অবস্থান
তাওয়াফ ও সাঈ শেষে হাজিরা মক্কার প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত মিনায় গিয়ে সমবেত হন। মিনা বিশ্বের বৃহত্তম তাঁবুর শহর হিসেবে পরিচিত। ১ লাখেরও বেশি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবুতে হাজিরা অবস্থান করেন। এখানে তারা জিকির ও ইবাদতের মাধ্যমে হজের প্রধান রোকন বা ধাপ ‘আরাফার ময়দানে’ অবস্থানের জন্য প্রস্তুতি নেন।
আরাফায় অবস্থান: হজের মূল রোকন
৯ জিলহজ হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন হাজিরা মিনা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আরাফার ময়দানে গিয়ে অবস্থান করেন। সূর্য ঢলে পড়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করা ও দোয়া করা হজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নবী করিম (সা.) বলেছেন, আরাফাতে অবস্থানই হলো হজ। হাজিরা এখানে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ ও রহমত কামনা করেন।
মুজদালিফায় রাত্রিযাপন
আরাফার ময়দানে অবস্থান শেষে সূর্যাস্তের পর হাজিরা ধীরস্থিরভাবে মুজদালিফায় রওনা হন। সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান। এখান থেকেই হাজিরা শয়তানকে মারার জন্য প্রয়োজনীয় কঙ্কর বা পাথর সংগ্রহ করেন।
কোরবানি ও শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ
১০ জিলহজ ঈদুল আজহার দিন হাজিরা মিনায় ফিরে বড় শয়তানকে সাতটি পাথর নিক্ষেপ করেন। এরপর আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি দেওয়া হয়। কোরবানির পর পুরুষরা মাথা মুণ্ডন করেন এবং মহিলারা চুলের সামান্য অংশ কাটেন। এর মাধ্যমে হাজিরা ইহরামের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হন।
তাওয়াফে ইফাজাহ ও বিদায়ী তাওয়াফ
হজের শেষ পর্যায়ে হাজিরা আবারও মক্কায় ফিরে কাবা শরিফ তাওয়াফ করেন, যাকে তাওয়াফে ইফাজাহ বলা হয়। এরপর সবশেষে দেশ ছাড়ার আগে তারা আরও একবার কাবা প্রদক্ষিণ করেন, যা বিদায়ী তাওয়াফ নামে পরিচিত। এর মাধ্যমেই সম্পন্ন হয় এক আধ্যাত্মিক ও পরম তৃপ্তির সফর।
প্রতিটি ধাপ হাজিদের মনে আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও আনুগত্যের এক নতুন অধ্যায় তৈরি করে। এই সফরের স্মৃতি দহাজিরা সারাজীবন বয়ে বেড়ান এবং এক নতুন মানুষ হিসেবে নিজের দেশ ও পরিবারে ফিরে আসেন।
