বৃহস্পতিবার ১৪ মে ২০২৬
৩১ বৈশাখ ১৪৩৩
সহিষ্ণু ও সৌহার্দ্য
জুলফিকার নিউটন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ১:২৫ এএম |

সহিষ্ণু ও সৌহার্দ্য
দর্শন বিষয়টার প্রতি অনেকের অরুচি আছে, বিশেষত কথাবার্তায় দার্শনিকতার প্রকাশ অনেকেই অপছন্দ করেন। কখনও কখনও সেই অরুচি সমর্থনযোগ্য বটে। যে ব্যক্তি গান গাইতে জানে না সে গান গাইলে সেটা যেমন বিরক্তিকর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তেমনই কারও কারও মুখে দার্শনিক বাক্য বেসুরো ঠেকে। একথা স্বীকার করে নেবার পরও একটা গোলমাল কিন্তু থেকে যায়। 
গোলমালটা সংক্ষেপে এই। জীবন থেকে দর্শনকে একেবারে বিদায় দেওয়া যায় না। অজান্তে হলেও আমাদের কাজকর্মের পিছনে একটা দর্শন কাজ করে, কখনও হয়তো বা সেটা ভ্রান্ত দর্শন। যদি সংসারে মন দিই তারও শাস্ত্রীয় সমর্থন আছে, যদি সংসার থেকে মন সরিয়ে নিই সেখানেও দর্শন উপস্থিত। যদি সত্য কথায় অভ্যস্ত হই। আমরা যুক্তির প্রয়োগে সাবধান হতে পারি, কিংবা অসতর্ক ভাবে বেছে নিতে পারি দুর্বল অথবা ভ্রান্ত দর্শন। সুস্থ মানুষের স্বাধীনতার সীমা এই পর্যন্ত। ভাল কিংবা মন্দ কোনও একটা দর্শন মেনে নেওয়া ছাড়া গতি নেই। তাত্ত্বিক আলোচনার প্রতি বিরাগ কমাবার একটি পথই ভেবে নেওয়া যায়, মাঝে মাঝে ঘরোয়া উদাহরণ অবতরুণ আর তত্ত্ব ও প্রয়োগের মাঝে আসাযাওয়া। 
প্রায় সবাই আমরা বড় হয়ে উঠেছি নির্দিষ্ট কোনও সমাজের সীমানার ভিতর। সেই সমাজ পরিচালিত হয় দীর্ঘকাল ধরে গঠিত ঐতিহ্যের আশ্রয়ে, বহুজনমান্য কিছু বিধানের নির্দেশে। এই সব মিলে রূপ লাভ করে লিখিত ও অলিখিত কোনও সমাজদর্শন, সমাজভেদে যার ভিন্নতা উপেক্ষা করা যায় না। অধিকাংশ মানুষ নিজ নিজ সমাজের ঐতিহ্য ও বিধান বিনাপ্রশ্নে মেনে নেয়। বুদ্ধির আলস্যে অনুকরণপ্রিয়তায় ও সামাজিক নিরাপত্তার সন্ধানে বহু মানুষ প্রচলিত বিধানের একান্ত অনুগামী হয়। এর বিপরীতে আছে ব্যক্তির নিজস্ব বিবেক ও যুক্তিশীলতার দাবি। এরই প্রেরণায় গড়ে ওঠে বিকল্প সমাজদর্শন। স্বাধীন বিচার ও নিজস্বতার দাবি সকলের ভিতর সমান প্রবল নয়, মানুষে মানুষে ধাতের পার্থক্য আছে। এইভাবে তৈরি হয় সামাজিক ইতিহাসের ধার ঘেঁষে ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার ও আত্মপ্রকাশের ইতিহাস, যার প্রতিফলন ঘটে সাহিত্যে ও দর্শনে। 
মানুষ বিশ্বপ্রকৃতির সন্তান। সুদীর্ঘকাল ধরে পরীক্ষানিরীক্ষার ভিতর দিয়ে উৎপত্তি হয়েছে মানবের। সেই পরীক্ষানিরীক্ষা আজও অসম্পূর্ণ। মানবপ্রকৃতিতে স্থান পেয়েছে নানা ধরনের প্রবৃত্তি ও আবেগ। প্রাথমিকভাবে এদের সাজানো যায় দুই বিরোধী সারিতে। কিছু প্রবৃত্তি বিরোধাত্মক, যেমন ভয় ক্রোধ লোভ; কিছু যোগাত্মক, প্রায় সবাই আমরা বড় হয়ে উঠেছি নির্দিষ্ট কোনও সমাজের সীমানার ভিতর। সেই সমাজ পরিচালিত হয় দীর্ঘকাল ধরে গঠিত ঐতিহ্যের আশ্রয়ে, বহুজনমান্য কিছু বিধানের নির্দেশে। এই সব মিলে রূপ লাভ করে লিখিত ও অলিখিত কোনও সমাজদর্শন, সমাজভেদে যার ভিন্নতা উপেক্ষা করা যায় না। অধিকাংশ মানুষ নিজ নিজ সমাজের ঐতিহ্য ও বিধান বিনাপ্রশ্নে মেনে নেয়। বুদ্ধির আলস্যে অনুকরণপ্রিয়তায় ও সামাজিক নিরাপত্তার সন্ধানে বহু মানুষ প্রচলিত বিধানের একান্ত অনুগামী হয়। এর বিপরীতে আছে ব্যক্তির নিজস্ব বিবেক ও যুক্তিশীলতার দাবি। এরই প্রেরণায় গড়ে ওঠে বিকল্প সমাজদর্শন। স্বাধীন বিচার ও নিজস্বতার দাবি সকলের ভিতর সমান প্রবল নয়, মানুষে মানুষে ধাতের পার্থক্য আছে। এইভাবে তৈরি হয় সামাজিক ইতিহাসের ধার ঘেঁষে ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার ও আত্মপ্রকাশের ইতিহাস, যার প্রতিফলন ঘটে সাহিত্যেও দর্শনে। 
যুগ যুগ ধরে অনেক মানুষ আদর্শ সমাজ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেছেন। আজকে থেকে নয়, অন্তত আড়াই হাজার বছর আগে থেকে সমাজ নিয়ে মানুষ চিন্তাভাবনা করছেন। সমাজবাদী চিন্তা আসলে যুগ যুগ ধরে প্রবাহিত আদর্শ সামজ নিয়ে যে চিন্তা তারই একটা অংশ। বারবার সেকথা নিজের মনে বুঝে নিতে হয়। বুঝে নিতে হয় কারণ আমরা সহজেই সেটাকে হারাই। বারবার হারাই বলে সেটাকে আবার উদ্ধার করার চেষ্টা করতে হয়। আমি প্রথমে আপনাদের একটু বলবার চেষ্টা করব যে এই আদর্শের কথাগুলি আমরা কীভাবে হারাই আর কীভাবে ফিরে পাই। আমি কোনও আন্দোলনের কথা বলি না, আমি চিন্তাভাবনার বিশ্বব্যাপী গতির কথা বলছি। যদি মানুষের চেতনার বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে ভাবা যায় তা হলে সমাজবাদী আদর্শের মূল্য কথা কী হতে পারে? মূল কথা হচ্ছে, কতগুলো মূল্যবোধ। সেই মূল্যবোধ বারবার কতগুলো শব্দমাত্র হয়ে যায় এবং বারবার তাদের অর্থের পুনরুদ্ধার প্রয়োজন হয়। কীভাবে এটা ঘটে দেখুন। যদি আমরা এই মূল্যবোধের কথা বলি তা হলে কোন মূল্যের কথা আমরা বলব? 
এই যে আড়াই হাজার বছর ধরে কিছু মানুষ আদর্শবাদী চিন্তা করছেন তাঁদের বাণীতে বারবার উচ্চারিত কিছু শব্দ স্মরণ করা যাক। আমরা সবাই জানি-শব্দগুলি কী। সত্য, সাম্য, সম্প্রীতি বা প্রেম, এইসব। কিন্তু আমরা কি এটাও জানি না যে এই শব্দগুলো উচ্চারণ করেও আমরা অনেকেই এগুলোর প্রতি আনুগত্য হারিয়ে ফেলি, আস্থা হারিয়ে ফেলি এবং এই অনাস্থার সপক্ষে যুক্তি পর্যন্ত দাঁড়ায়। কীরকম যুক্তি দাঁড়ায়? সেটাও আমরা জানি। সত্যই হোক, আর সাম্যই হোক, আর প্রেমই হোক, কীভাবে ভেতরে ভেতরে তা থেকে আমাদের আস্থা হারিয়ে যায় সেটা আমরা জানি। যেমন ধরুন সত্য। অধিকাংশ মানুষ সভায় বসে যতই সুন্দর কথা বলুন না কেন, সাধারণ জীবনে সত্য নিয়ে কথাবার্তা বলতে গেলে, অনেককে বন্ধুভাবে কথা বলতে গেলে, কী বলবেন তিনি, কী বলবার সম্ভাবনা বেশি? 
সম্ভবত তিনি বলবেন, আচ্ছা এই যে সত্য, আমাদের সত্যের অনুগামী হতে বলা হচ্ছে, সত্য কী তা কি আমরা জানি? সত্য কী তাই যদি না জানি তা হলে আবার সত্যের অনুগামী হওয়া কথাটার মানে কী? যদি না জানি তা হলে সত্যের অনুগামী হও এই সুন্দর কথাটা বলে লাভ কী? 
অথবা ধরুন সাম্য। আচ্ছা, সাম্যের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু সত্যিই কি সব মানুষ সমান? মানুষে মানুষে যে অনেক প্রভেদ আছে এটাই কি ঠিক কথা নয়? অষষ সবহ ধৎব নড়ৎহ বয়ঁধষ” শুনতে ভাল লাগে, কিন্তু কী করে জানা গেল কথাটা সত্য কিনা? শেষ পর্যন্ত তো দেখা যায় যে কেউ সাধু হন, আর কেউ হয়তো চোর। আর যখন মানুষে মানুষে এতই পার্থক্য তখন সাম্যের কথাটা, এই আদর্শের কথাটা কতটা বিশ্বাস রেখে বলা যায়?
তাহলে সত্য জানি না, সাম্য নেই। আর প্রেম? এই শব্দটা বড়ই একটা পিচ্ছিল শব্দ। কোন প্রেমে কতটা স্বার্থ লুকিয়ে থাকে সে কি আমরা সবসময় পরিচ্ছন্নভাবে জানি? কখনও ওটা স্বার্থসিদ্ধির জন্য অথবা শুধুই দেখানো প্রেম, তা কি আমরা জানি না? সত্য সাসাম্য প্রেম এই শব্দগুলো উচ্চারণ করলেই হল? মনে মনে যখন আমরা আস্থা হারিয়েই ফেলেছি, যখন ভাবছি সত্য জানি না, সাম্য নেই, প্রেম তো একটা বঞ্চনাও হতে পারে, এই যে মূল্যবোধের ব্যাপারে একটা সামগ্রিক অনাস্থা, এই অনাস্থা থেকে নিজের মনকে উদ্ধার করা এটা তো একটা কাজ। প্রথমে কিছুটা বিচারের নিরিখে অর্থ উদ্ধার করতে হয়, তারপর তাকে বিশ্বাস হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তারপর সেটাকে কাজের ভিতর দিয়ে প্রকাশ করতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটা কখনওই শেষ হয় না। যদি মনে করি শেষ হয়ে গেল তা হলে আমরা আবার পুরনো অনাস্থাতে গিয়ে পৌঁছবো। 
এরপর বিশ্বাস পুনরুদ্ধারের পথ খোঁজা যাক। যদি বলা যায় সত্য কী, সত্য বলে কি কিছু আছে? এই প্রশ্নের খুব সরল উত্তর আছে- আমরা শেষ সত্যের কথা কখনও বলতে পারি না। কিন্তু শেষ সত্যের কথা যখন বলছি না, তখনও সত্যবাদিতা কথাটা গুরুত্বপূর্ণ থেকেই যায়। যেমন আমরা বলি, সত্য রক্ষা করা। সত্য রক্ষা করা মানে কী? সরল মানে হল, কথা রাখা। যেকথা দিয়েছি যেকথা রাখা-সত্য রক্ষা করার এটাই সহজ অর্থ। যদি বলি যে আমি কী কথা দিয়েছি তা আমি জানি না, তা হলে মহা মুশকিল। তা হলে সমাজ চলে না। প্রত্যেকেরই একটা কথা দেবেন, তারপর সেকথা রাখবেন না, তাতে সমাজে পারস্পরিক আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। কোনও একটা সমাজকে যদি একসঙ্গে থাকতে হয়, চলতে হয়, তা হলে একটা পারস্পরিক আস্থার প্রয়োজন। আর ওই পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিটা নষ্ট হয়ে যায় যদি সত্য রক্ষাকে আমরা মূল্য না দিই। সত্য রক্ষা করাটা শুধু যে একটা আদর্শ তাই নয়, সত্য রক্ষা করাটা সামাজিক সংহতি রক্ষা করার অপরিহার্য শর্ত। যে সমাজে মানুষ অতিচালাকি করে নির্ভয়ে পার পেয়ে যায় সে সমাজে মানুষে মানুষে পারস্পরিক আস্থা ভেঙে পড়ে। সে সমাজ ভাল নয়। আর সেজন্যই সত্য রক্ষা করাটা একটা প্রয়োজনীয় কথা, এটা শুধু শব্দমাত্র নয়, তার বেশি কিছু। তার পরেও সত্য আবিষ্কার করার প্রশ্নটাও থাকে। কোনও বৈজ্ঞানিকই মনে করেন না যে তিনি শেষ কথা বলছেন। বৈজ্ঞানিক একথাই মনে করেন যে তিনি শুধু ওই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছোনোর চেষ্টা করছেন। আমরা সত্য বুঝবার জন্য, জানবার জন্য চেষ্টা করে যাব- এটা একটা আবশ্যক কাজ। 
সাম্যের ধারণাটা কি গ্রহণযোগ্য ধারণা? এই সন্দেহের পর আমরা কী করে সাম্যের ধারণায় ফিরে যেতে পারি সেটাই চিন্তা করতে হয়। এই যে সত্য, সাম্য, প্রেমের কথা বলছিলাম এই মূল্যবোধগুলোর ভেতর পারস্পরিক যোগ আছে। একভাবে এর হাত ধরাধরি করে চলে। এই যোগটাও বোঝা দরকার কারণ এই যোগটা যখন হারিয়ে যায় তখন কোনওটাই আলাদাভাবে দাঁড়ায় না। আর যোগটা যখন থাকে তখন বোঝাটাও অনেক সরল হয়ে যায়। সাম্য কিছু আছে নাকি- এই সন্দেহের পর সাম্যের প্রসঙ্গে ফিরে যেতে হলে কোনও গভীর তত্ত্বে যেতে হয় তা নয়। ধরুন একটি মায়ের চারটি সন্তান। চারটি সন্তানের মধ্যে তারতম্য তো আছেই; কিন্তু মা, মা হিসেবে চারটি সন্তানকে সমান ভালবাসেন। যে ছেলেটি পরীক্ষায় খারাপ করল মা তাকে কম ভালবাসবেন এটা মাতৃত্ব নয়, এটা মাতৃধর্ম নয়। কাজেই যে স্তরে অসাম্য একটা ঘটনা সেটা একটা স্তর বটে; অন্য একটা স্তর আছে যে স্তরে ভালবাসার ভিতর দিয়ে সব মানুষকে সমানভাবে গ্রহণ করা যায়। এটাও অন্য এক সত্য। এ দুটো ভিন্ন স্তরের কথা। তবে সাম্য যে শুধু ভালবাসার স্তরেই থাকে তাও নয়। অবশ্য ভালবাসার স্তরে যে সাম্যে কথা বলি সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা, কারণ সাম্য ও সম্প্রীতির ভাবনা যদি না থাকত তা হলে আর কোনও শক্তি নেই যেটা পরিবারকে একসঙ্গে ধরে রাখতে পারত। কাজেই সাম্য যে শুধুই একটা বড় দার্শনিক আদর্শের কথা তা নয়, মানুষের জীবনে, একসঙ্গে বাস করার একটা মূল আশ্রয়ও বটে। এরপর কথাটা আরও একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়া চলে। পরিবার, স্নেহ, ভালবাসা-ভালবাসার ক্ষেত্রে সাম্য। তার বাইরে কি সাম্য বলে কিছু নেই? তার বাইরেও আছে। 
আসলে জীবনে বাস্তবতার নানা স্তর আছে এবং এক এক স্তরে এক একটা ধারণা সত্য হয়ে ওঠে। ছেড়ে দিন ভালবাসার কথা। তারপর? দেখুন এক অর্থে আইনের চোখে সব নাগরিক সমান। আইনের চোখে বড়লোক দোষ করলে সেটা দোষ বলে ধরা হবে না, গরিব দোষ করলেই সেটা দোষ-এটা গ্রহণযোগ্য কথা নয়। আইনের চোখে সব মানুষ সমান। ভেবে দেখুন, একদিকে নির্বিষ্ট ভালবাসার চোখে সব মানুষ সমান, আবার অন্যদিকে নিরপেক্ষ আইনের চোখে। এ সবই অবশ্য আদর্শে কথা। এই আদর্শ ধারণাগুলো রক্ষা করা কিন্তু সমাজকে রক্ষা করার যে সাধনা তারই অপরিহার্য অংশ, শুধু কথার কথা নয়। 
আলোচনা বিষয় রইল এরপরও প্রেম অথবা সম্প্রীতি। কত ছোট স্বার্থ লুকিয়ে থাকে প্রেমের আড়ালে। আমরা স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাউকে ভালবাসা দেখাই, স্বার্থ পূর্ণ হওয়ার পর তার কাছ থেকে সরে যাই- এটাই কি ঘটনা নয়?এটা ঘটনা বটেই-এটা মানুষের অভিজ্ঞতার একটা স্তর। এই স্তরে ঐ অভিজ্ঞতাটা উপেক্ষা করা যায় না। তারপরও প্রশ্ন তাকে, সমস্ত সাময়িক স্বার্থের বাইরেও কি কোনও প্রেম আছে? যতক্ষণ স্বার্থে আবদ্ধ প্রেম দেখি, আমাদের মন বলে, এটাই একমাত্র সত্য। এর বাইরেও কিন্তু মানুষের মনে মানুষের সঙ্গে যোগের একটা তৃষ্ণা থাকে, প্রয়োজন থাকে, তার অপূর্ণতায় জীবন শুকিয়ে যায়। মনে হতে পারে যে এটা একটা সুন্দর কথ হল মাত্র। কিন্তু এটা সুন্দর কথা মাত্র তা নয়। আমরা শুধু জানি না, নিজেকেই জানি না। অন্য মানুষের সঙ্গে যোগের আনন্দ, সেই যোগের আনন্দের জন্যে মানুষের একটা তৃষ্ণা থাকে। এটা একটা সুন্দর কথামাত্র নয়, একটা বাস্তব সত্য- যোগের এই আনন্দ, সেই যোগের আনন্দ। শুধুই যোগ, তা থেকে অন্য কোনও স্বার্থ সিদ্ধ হচ্ছে না। অর্থের জন্যে, খাদ্যের জন্যে, সুখের জন্যে, বিলাসের জন্যে নয়, শুধুই যোগের জন্যে গভীর আকাক্সক্ষা। এমন আকাক্সক্ষা সত্যি যে মানুষের মনের গভীরে আছে তার কি কোনও সহজ প্রমাণ আছে? অতি সহজ প্রমাণ আছে। এই সব সহজ প্রমাণকে বারবার আবিষ্কার করতে হয়, এবং কিছু মূল আদর্শকে বারবার ফিরে পেতে হয়। প্রমাণটা এই-অতি সহজ একটা এক্সপেরিমেন্ট করে দেখুন। একটি মানুষকে আপনি অন্য সব মানুষের যোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটা ঘরে রাখুন-সেই ঘরে তার জন্য খুব নরম বিছানা থাকবে, সেই ঘরে প্রতিদিন তাকে অতি সুন্দর খাদ্য পৌঁছে দেওয়া হবে। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান সবই তার পাওয়া হয়ে গেল, শুধু সে অন্য কোনও মানুষের সঙ্গে যোগ রাখতে পারবে না। এর চেয়ে বড় শাস্তি কিছু নেই। যাঁরা শাস্তি বিধান করেছেন তাঁরা এটা জানেন। জানেন বলেই জেলখানায় ংড়ষরঃধৎু পবষষ-এ রাখাটাই সবচেয়ে বড় শাস্তি বলে মনে করা হয়। মানুষের মনে যোগের এই ক্ষুধাটা শুধু একটা গভীরতম আকাক্সক্ষা। 
গণতন্ত্রের দর্শন শান্তির সহায়ক। আমাদের গণতন্ত্র ত্রুটিতে ভরা, তবু এই ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রও স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে শ্রেয়। একটা তথ্যের প্রতি কোনও কোনও চিন্তক আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দুটি গণতান্ত্রিক দেশের ভিতর যুদ্ধ অতি বিরল ঘটনা। এ যুগের অধিকাংশ যুদ্ধে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এই মন্তব্যের সপক্ষে বড় উদাহরণ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরও বহু উদাহরণ। স্বৈরতন্ত্রের আছে ক্ষমতার এমন অসহিষ্ণু উদ্ধত কেন্দ্রীকৃত সংগঠন, যাতে প্রশ্রয় পায় ক্ষমতাবানের আগ্রাসী মনোবৃত্তি। অবশ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাঠামোর ভিতরও কখনও কখনও স্বৈরাচারী মনোভাবের নেতার উদ্ভব ঘটে। শান্তির জন্য চাই ভিন্ন কিছু গুণ, অন্য এক দৃষ্টিভঙ্গি। চাই বৈচিত্র্য ও বিভেদের প্রতি সহিষ্ণু ও গ্রহিষ্ণু মনোভাব, গণতন্ত্রের যেটা মূল কথা। সমগ্র বিশ্বে যদি কখনও এক রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় তবে সেই রাজ্যকে গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী দর্শনই মেনে চলতে হবে। তারই জন্য প্রস্তুতি মানুষের সমাজে পূর্বাহ্নে প্রয়োজন। বিশ্বে স্থায়ী শান্তির এটা অন্যতম পূর্বশর্ত। 
ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের প্রথম ও শেষ কথা সে মানুষ। শুদ্ধ যুক্তি ও বিবেকের বিচারে জাতি ও ধর্মসম্প্রদায়ের প্রতি ব্যক্তির আনুগত্য সেই অবধিই মান্য যেখানে সেটা মানবতার বিরোধী নয়। সব সাম্প্রদায়িক ধর্মের ওপর রক্ষার যোগ্য মানুষের ধর্ম। এই বোধ নিয়েই মানুষকে ইতিহাস রচনার পথে এগিয়ে যেতে হবে। এই দিশাতেই মনুষ্যত্ব রক্ষা পেতে পারে, অন্য পথে মনুষ্যত্বের ভবিষ্যৎ নেই। 
মানুষের মুক্তিই পরম লক্ষ্য। বলা হয়েছে, মুক্তির লক্ষ্যে চলা সম্ভব নানা পথে। সম্ভবই শুধু নয়, আবশ্যকও বটে। সেই সঙ্গে আবশ্যক এই নানা পথের পথিকদের ভিতর পারস্পরিক সৌহার্দ্য রক্ষা। সহিষ্ণু সৌহার্দ্য। আত্মসমালোচনা কাম্য, সেই সঙ্গে অপরের সমালোচনাও স্বাগত, তবে তাতে বিদ্বেষ যত কম থাকে ততই ভাল। এরই নাম গণতন্ত্র, যার বিশ্বস্ত সঙ্গী মানবতাবোধ। এরও স্তরভেদ আছে। উচ্চস্তরে মানবতার চেতনা গোষ্ঠীবদ্ধ স্বাজাত্যবোধকে ছাড়িয়ে যায়, প্রজাতির সীমা অতিক্রম করে হয়ে ওঠে মাহাবিশ্বের সঙ্গে মিলনপ্রত্যাশী। মনুষ্যত্বের যোগ্যতম দর্শন অতিক্রমী মানবতাবাদ। মানবচেতনার উদ্ভব ঘটেছে মহাবিশ্বের অভ্যন্তর থেকে। সেই বিশ্বের স্পন্দন আমাদের চেতনাকে আকৃষ্ট করে চলেছে দূরের বাঁশির মতো। কোনও সীমার ভিতরই মানুষের আত্মপরিচয় চিরকাল আবদ্ধ থাকতে প্রস্তুত নয়। সেই অতৃপ্তি নিয়ে মানুষ রচনা করে চলেছে তার ইতিহাস। তার চলার পথ তৈরি হয়েছে একই সঙ্গে বাস্তব সমস্যার ঠেলায় আর বৈশ্বিক আকর্ষণের টানে। 

















http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
কুমিল্লা ওয়াসা গঠনের সিদ্ধান্ত
কুমিল্লায় প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে কড়া নিরাপত্তা
কুমিল্লায় বিদেশি পিস্তলসহ যুবক গ্রেপ্তার
তিন বছর স্ট্যান্ডের ইজারা নেই, বছরে কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে মানসিক প্রতিবন্ধি রোগী নিখোঁজ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কুমিল্লায় প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি
ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেললাইন চালুর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে এমপি মনিরুল হক চৌধুরীর বৈঠক
জলাবদ্ধতা নিরসনে কুমিল্লা নগরীর খাল পরিদর্শনে প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু
কুমিল্লা ওয়াসা গঠনের সিদ্ধান্ত
কুমিল্লার তিতাসে হত্যা মামলার আসামিকে কুপিয়ে হত্যা
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২