
পৃথিবীতে
চিরন্তন সত্য বা চিরন্তন মিথ্যা বলে কিছু নেই। সবকিছুই আসলে আপেক্ষিক।
আমির হামজার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী রাশমিকা মান্দানা। আবার কারো
কাছে হয়তো আলিয়া ভাট বা দিপীকা পাডুকোন বা ববিতা বা পরিমণী। আবার কারো কাছে
হয়তো তার প্রেমিকাই সবচেয়ে সুন্দর। তেমনি ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পুকুরটি
কুমিল্লার টমছমব্রিজ এলাকায় নিউ হোস্টেলে অবস্থিত’ এই বাক্যটি একই সঙ্গে
সত্য এবং মিথ্যা। পৃথিবীর বাকি সবার কাছে বাক্যটি মিথ্যা হলেও আমার কাছে
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ছিল নিউ হোস্টেলের পুকুরটিই। ছিল বলছি কেন, সে
ব্যাখ্যায় পরে আসছি। সৌন্দর্য্যের মাপকাঠি একেকজনের কাছে একেকরকম। এই যে
আমরা গাই ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে
আমার জন্মভূমি’, এই গানটি তো ডাহা মিথ্যা। বিশ্বে বাংলাদেশের চেয়ে সুন্দর
অনেক দেশই হয়তো আছে। কিন্তু আমার কাছে আমার জন্মভূমিই সকল দেশের রাণী।
সৌন্দর্য্যের ধারণার সাথে আসলে মিশে থাকে আবেগ, ভালোবাসা, স্মৃতি। নিউ
হোস্টেলের সেই পুকুরটি আমার কাছে তেমনই এক আবেগের নাম, স্মৃতিমেদুর
ভালোবাসা যেন।
সাধারণে নিউ হোস্টেল নামে পরিচিত হলেও এখানে আসলে দুটি
ছাত্রাবাসের সম্মিলন ঘটেছে। ভিক্টোরিয়া কলেজের ইন্টারমিডিয়েট শাখার মুসলমান
শিক্ষার্থীদের জন্য শেরেবাংলা ছাত্রবাস আর অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য
রবীন্দ্রনাথ ছাত্রাবাস। দুয়ে মিলে ‘নিউ হোস্টেল’। তবে কানা ছেলের নাম
পদ্মলোচন যেমন, নিউ হোস্টেলের নামটাও ততটাই বেমানান। আশির দশকে আমরা যখন
ছিলাম, তখনই নিউ হোস্টেলের ভগ্নদশা। এখন তো পুকুরের পূর্ব, পশ্চিম আর উত্তর
পাশের আদি নিউ হোস্টেলের ভবনগুলো পরিত্যক্ত। নামকরণ স্বার্থক করতেই হয়তো
পুকুরের দক্ষিণ পাশে নিউ হোস্টেলের নতুন ভবন হয়েছে। এই ভবনের জায়গায় আমরা
খেলতাম তখন। যত নতুন ভবনই হোক, আমার স্মৃতিতে নিউ হোস্টেল মানেই এখনও সেই
পুরোনো ভাঙ্গা চোরা ভবনগুলোই।
রুম যতই ভাঙ্গা হোক, টয়লেট যতই নোংরা হোক,
ডালের পানি যতই তরল হোক; নিউ হোস্টেল আমার কাছে এক ভালোবাসার নাম।
অজপাড়াগা থেকে এসএসসি পাশ করে কুমিল্লা শহরে আসা একটি আনস্মার্ট, গাঁইয়া
ছেলেকে আশ্রয় দিয়েছিল নিউ হোস্টেল। এ যেন কুয়োর ব্যাঙের সাগরে পরার দশা।
শুধু আশ্রয় দেয়নি, এই হোস্টেল গড়ে তুলেছে আজকের আমাকে। মাগরিবের নামাজের
আগেই বাসায় ফেরার কঠোর শাসন থেকে একেবারে অবাধ স্বাধীনতা। এ যেন এক নতুন
দুনিয়া, যেখানে অপেক্ষা করছে বিস্ময় আর বিস্ময়। নিউ হোস্টেল আমার জন্য এক
নতুন বিস্ময়কর পৃথিবী দেখার জানালা। পেছন ফিরে তাকালে দেখি, অবাধ
স্বাধীনতার অপচয় করলেও অপব্যবহার করিনি। নিউ হোস্টেল আমার অনেক প্রথমের
সাক্ষী। প্রথম সিগারেট খাওয়া, প্রথম প্রেমে পরার অপার্থিব অনুভূতি, বিরহের
দহনে নিউ হোস্টেলই আমাকে পরম মমতায় আশ্রয় দিয়েছে। পুকুরের দক্ষিণ পারের
ঘাটে বসে মধ্যরাতে কোরাসে ‘কটা রাত কাটিয়েছো জেগে, স্বপ্নের মিথ্যে
আবেগে...’ গাওয়ার স্মৃতি এখনও কাঁদায়। পুকুরের পশ্চিম-উত্তর কোনার
কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাড়িয়ে 'এই সেই কৃষ্ণচূড়া..' গাওয়ার স্মৃতিও আনন্দ
দেয়।
আমরা যখন হোস্টেলে তখন স্বৈরাচার এরশাদ ক্ষমতায়। তখন আমাদের ‘এখন
যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’। দিনভর মিছিল, মিটিং, হরতাল,
পিকেটিং আর রাত জেগে পড়াশোনা- এই ছিল নিত্য রুটিন। রাতে ক্লান্ত লাগলে দল
বেধে চলে যেতাম পরিত্যক্ত পুরোনো বিমানবন্দরে।
রাজনীতিতে দারুণ সক্রিয়
থাকলেও কখনো হানাহানিতে জড়াইনি। রাজনৈতিক মত-পথ যাই হোক, তা বন্ধুত্বে বাধা
হয়নি। দিন শেষে সবাই এক সাথে আড্ডা মারতাম।
এখন যে টুকটাক লেখালেখি করে
জীবিকা নির্বাহ করি, তার ভিতটাও গড়ে দিয়েছিল নিউ হোস্টেলই। যত যাই করি,
শিয়রে জীবনানন্দ বা শামসুর রাহমান বা আল মাহমুদের বই থাকতো। রাতে ঘুম না
এলে বা গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে প্রিয় কবিতা আর সিগারেট সঙ্গ দিতো। এখন
দেশের বিখ্যাত কবি খলিল মজিদ আমাদের পরের ব্যাচের ছাত্র। নিউ হোস্টেলে তার
লেখা অধিকাংশ কবিতার প্রথম পাঠক আমি। গভীর রাতে আমাকে ঘুম থেকে তুলে সে
কবিতা পড়াতো। সংবাদ সাময়িকী পড়তাম কাড়াকাড়ি করে। একবার একটা দেয়াল পত্রিকাও
করেছিলাম। টানিয়ে দিয়েছিলাম সেই কৃষ্ণচূড়ার গায়ে।
ক্রিকেট নিয়ে এখন যত
আবেগ, তার শুরুটাও সেই নিউ হোস্টেলেই। রবীন্দ্র ছাত্রবাসের সুপার কুন্ডু
গোপী স্যারের বাসায় আমরা ক্রিকেট দেখতাম। স্যার ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের
সমর্থক, আমিও তাই হয়ে গেলাম। এখনও আমার প্রিয় ক্রিকেটার ভিভ রিচার্ডস।
ম্যারোডানা যে ৮৬ সালে একাই আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে দিলেন, আমার
কাছে তার সাক্ষীও এই নিউ হোস্টেল।
নিউ হোস্টেল আমাকে বিশ্ব দেখিয়েছে,
স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। নিউ হোস্টেলের চোখে যে বিশ্ব দেখার শুরু, গত চার
দশকে দেশে-বিদেশে তা আরো নিবিড়ভাবে দেখেছি। কিন্তু নিউ হোস্টেলের চোখে
দেখার যে আনন্দ, সবকিছু তখন যে বিস্ময় নিয়ে আসতো; পরে আর তা পাইনি।
পুকুর
দিয়ে শুরু করেছিলাম, পুকুর পারেই শেষ করি। যেদিন সময় বেশি থাকতো, সেদিন
ঘণ্টাখানেকের আগে গোসল শেষ হতো না। অবাধ সাঁতারে এপার ওপার না করলে গোসলের
তৃপ্তি হতো না। সময় কম খাকলেও আধঘণ্টার আগে গোসল শেষ হতো না। এখন অনেক
দামী, আধুনিক সুইমিং পুলের সাঁতারে শরীর ভিজলেও মন ভেজে না। ছেড়ে আসার বছর
ত্রিশেক পর একবার নিউ হোস্টেলে গিয়েছিলাম। পুরোনো তিনটি ভবনকে ধ্বংসস্তুপে
পরিণত হতে দেখে বুকের ভেতরে একটা ধাক্কা লেগেছিল। খুঁজে খুঁজে নিজের রুমটি
বের করে নস্টালজিয়ায় কাতর হয়েছি। কিন্তু সেই ‘সবচেয়ে সুন্দর’ পুকুরটির দশা
দেখে বুকটা একেবারে ভেঙ্গে গেছে, পরিত্যক্ত ভবনগুলোর মতই। সময়ের কারণে
ভবনগুলো না হয় ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু পুকুরটির ধ্বংস হওয়ার জন্য নিশ্চয়ই কোনো
না কোনো মানুষই দায়ী, আমাদের লোভই নিশ্চয়ই গ্রাস করেছে আমার সবচেয়ে সুন্দর
পুকুরটিকে। কেউ যদি নিউ হোস্টেলের পুকুরটিকে তার আগের রূপ ফিরিয়ে দেন, আমি
আজীবন তার গোলাম হয়ে থাকবো। কাজটা হয়তো কঠিন, কিন্তু সবাই মিলে চেষ্টা
করলে অসম্ভব নয়। এই উদ্যোগটি কি আমরা নিতে পারি? আবার কি নিউ হোস্টেলের
পুকুরের ঘাটে বসে জ্যোস্না রাতে গাইতে পারবো ‘আজ জ্যোস্না রাতে সবাই গেছে
বনে, বসন্তের এই মাতাল সমীরণে...’। নিউ হোস্টেলকে কি আমরা তার বসন্ত ফিরিয়ে
দিতে পারি না?
* আগামী ৩১ মে কুমিল্লার কোর্টবাড়ির বার্ডে হতে যাওয়া নিউ হোস্টেল অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের ১ম গ্র্যান্ড রিইউনিয়নকে সামনে রেখে লেখা।
