বৃহস্পতিবার ১৪ মে ২০২৬
৩১ বৈশাখ ১৪৩৩
সাঁঝবেলায় কষ্ট ও স্মৃতি
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ১২:৩৯ এএম আপডেট: ১২.০৫.২০২৬ ১:১৩ এএম |

 সাঁঝবেলায় কষ্ট ও স্মৃতি

দু:খ ভারাক্রান্ত মনে এ লেখা শুরু করছি। আমার কর্মজীবনের শেষ কর্মস্থান ছিল চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ। সে কলেজের তখন অধ্যক্ষ ছিলেন প্রফেসর ড. ফাতেমা নার্গিস চৌধুরী। তিনি ২৬ এপ্রিল ২০২৬ চট্টগ্রামে বেলা ২.৩০মি এ মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে আমি শোকাভিভূত। মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট তাঁর আত্মার সদগতি কামনা করছি। আমার কর্মজীবনে অনেক অধ্যক্ষের অধীনে চাকরি করেছি তিনি ছিলেন আমার কাছে ব্যতিক্রমধর্মী শ্রদ্ধান্বিত গুণিজন-জ্ঞানে-রুচিবোধে-প্রশাসনিক দক্ষতায় মহিমান্বিত ব্যক্তিত্বে এবং মানবিক আচরণ ও ব্যবহারে। তাঁর কথাই বলব। উজ্জ্বল ছাত্রীজীবন। ১৯৬৩ সালে কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড থেকে মেধা তালিকার শীর্ষে মেয়েদের মধ্যে প্রথম, ১৯৬৫ সালে একই বোর্ড থেকে উচ্চমাধ্যমিক (বিজ্ঞান) শাখায় মেধা তালিকায় শীর্ষ স্থান অধিকারী ফাতেমা নার্গিস চৌধুরী ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও সম্মান ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। কমনওয়েলথ স্কলারশীপ পেয়ে কানাডা ম্যাকগিল বিশ^বিদ্যালয় থেকে এমএস ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হওয়ার কথা। কিন্তু পারিবারিক কারণে পিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা বিভাগে চট্টগ্রাম কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। চাকরি জীবনের অধিকাংশ সময় এ কলেজেই অতিবাহিত করেছেন। পরে প্রফেসর হওয়ার পর ছয়মাস কুমিল্লা দাউদকান্দি উপজেলার গৌরিপুর মুন্সী ফজলুর রহমান সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ হলেন, সেখান থেকে চট্টগ্রাম সিটি কলেজে উপাধ্যক্ষ, সেখান থেকে চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ এবং সর্বশেষ হাজী মহসিন সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
প্রফেসর ড. ফাতেমা নার্গিস চৌধুরী যখন চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ, আমি তাঁর নিকট থেকে অবসর গ্রহণ করি। এ নিয়ে পরে কিছু কথা বলব।
আমার কর্মজীবন কলেজের শিক্ষকতা দিয়ে শুরু এবং একটানা এক মাস কম ৩৫ বছর শিক্ষক হিসেবেই কর্মজীবন সমাপ্ত করেছি। আমি সরকারি বিধি অনুযায়ী ৫৭ বৎসর বয়সে অবসর গ্রহণ করি। প্রথমে বেসরকারি কলেজের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। আমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র ও শিক্ষক। তার একটি ইতিহাস আছে। এখানে তা বলার বিষয় নয়। তবে এতটুকু বলতে হচ্ছে- আমি ব্যক্তিগতভাবে যা হতে চেয়েছিলাম, তা হতে পারিনি। জীবনে চাকরি হিসেবে শিক্ষকতা করব, এটা আমার আদর্শিক দৃঢ় অবস্থান ছিল। কারণ আমার পিতৃদেব আজীবন শিক্ষক ছিলেন, আমি এই মানসিকতায় নিজেকে তৈরি করে রেখেছিলাম। তবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হবো এটা আমার ধারণাতীত ছিল। অন্য ইতিহাস, অবশ্যই ব্যতিক্রমধর্মী।
১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম,এ পাশ করি। স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে পড়াশুনা করি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। ১৯৬৮ সালের ১৭ এপ্রিল এম, এ পরীক্ষার ফল বের হয়, ১ম ১৯৬৮ সাল থেকে চট্টগ্রাম রাঙ্গুনীয়া ডিগ্রি কলেজে বাংলার শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করি। ঐ কলেজে চাকরি করার জন্য আমি আবেদন করিনি, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর্যবেক্ষক হিসেবে আমার চাকরি শুরু, তিনমাস পর ক্লাসে পড়াতে শুরু করি। তখন কলেজের অধ্যক্ষ সন্তোষভূষণ দাশ- এম,এ,বি,টি,এম,এড (প্রথম শ্রেণি)। শিক্ষক সংখ্যা ৩২জন। অফিস সহকারী-পিয়ন মিলে ১৫জন। অধ্যক্ষ মহোদয় কলেজে কম আসতেন, কলেজের কাজেই বাইরে ব্যস্ত থাকতেন। মাসের পর আমরা যথারীতি বেতন পেয়ে যেতাম। রাঙ্গুনীয়া কলেজের ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা তখন প্রায় দু’হাজারের বেশি। এটি একটি পরীক্ষায় নকলের আখড়া। এজন্যই গ্রামাঞ্চলে এত ছাত্রের ভিড়। ৫০০ ছাত্রের থাকবার হোস্টেল, ৭০জন ছাত্রীর জন্য পৃথক নিবাস। অধ্যক্ষসহ ৭জন শিক্ষকের আবাসন, ১৩জন শিক্ষক থাকার মেসসহ আবাসন। বিরাট এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ কলা-বাণিজ্য বিজ্ঞান সমেত ডিগ্রি কলেজ।
অধ্যক্ষ মহোদয়ের সঙ্গে কম দেখাসাক্ষাৎ। কাজেই মেলামেশার সুযোগ কম থাকায় দূরত্বটা থেকে গেছে। তবে আমি তাঁর স্নেহের পাত্র ছিলাম। তিনি চেয়েছিলেন-আমি তাঁর শালিকা আমারই ছাত্রী শিখা চৌধুরীকে বিয়ে করি। তা কিছুতেই সম্ভব নয়। আমি তো রাঙ্গুনীয়ায় চাকরি করব না। কিন্তু ৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন, ৭১-র মহান মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি নানা কারণে অন্যকোনো কলেজে চাকরির ব্যবস্থা করতে পারিনি। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে কুমিল্লা মহিলা কলেজে যথারীতি সাক্ষাৎকার দিয়ে রাঙ্গুনীয়া থেকে ১৪ ডিসেম্বর চলে আসি, ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭২-এ কুমিল্লা মহিলা কলেজে যোগদান করি।
শ্রদ্ধেয় সন্তোষভূষণ দাশ আমার শিক্ষকতার চাকরির প্রথম অধ্যক্ষ। তিনি স্বইচ্ছায় আমাকে মনোনীত করেছিলেন, আমি তাঁর স্নেহ পেয়েছি, প্রিয়ভাজন ছিলাম। আমি যখন রাঙ্গুনীয়া কলেজ থেকে চলে আসি, তখন তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দ্বিতীয় পিএসসি কমিশনের সদস্য, ঢাকায় থাকেন। আমার আজীবন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি তিনি।
কুমিল্লা মহিলা কলেজে যখন যোগদান করি, তখন অধ্যক্ষ শ্রদ্ধাভাজন মোসলেহ উদ্দীন আহমদ। তিনি আমার জীবনে অনেকটুকু অংশে আজীবন মিশে আছে। তাঁর গুণের শেষ নেই। তাঁকে কখনো অধ্যক্ষ, কখনো পিতৃতুল্য অভিভাবক, কখনো সুহৃদ, কখনো পথপ্রদর্শক, কখনো আলোকবর্তিকা হিসেবে পেয়েছি-দেখেছি-ধারণ করেছি। তাঁর সম্পর্কে বহুকথা লিখেছি-অফুরান শ্রদ্ধান্বিত চাঁদোয়াটা এখনও মাথার উপর থেকে ছায়া দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বিনম্র শ্রদ্ধা ও সালাম আমার অধ্যক্ষ মোসলেহ উদ্দীন আহমদ স্যারকে।
কুমিল্লা মহিলা কলেজ ১৯৭৮ সালে ১লা ফেব্রুয়ারি সরকারি হওয়ার পর তিনজন অধ্যক্ষের অধীনে চাকরি করেছি। ১৯৮১ সালে এপ্রিলে বদলি হয়ে যখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে আসি, তখন কুমিল্লা মহিলা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন প্রফেসর যোবায়দা মির্জা। তিনি ড. কাজী মোতাহার হোসেন-এর জ্যেষ্ঠ কন্যা। আমাকে ছাড়বেন না অর্থ্যাৎ রিলিজ করবেন না। এ সংবাদ ভিক্টোরিয়া কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান আমার শিক্ষক অধ্যাপক কাজী নুরুল ইসলাম জানতে পেরে সোজাসুজি মহিলা কলেজে এসে আমাকে রিলিজ করে দিতে অনুরোধ করেন এবং স্বীকৃতি আদায় করেন। আমি ক্লাশ থেকে ফিরে স্টাফরুমের বারান্দায় কাজীস্যারকে দেখে কাছে গিয়ে প্রণাম করলাম। তিনি বললেন- ‘বড় আপাকে অনুরোধ করে এসেছি, তিনি তোমাকে ৬ তারিখ ছেড়ে দিবেন।’ ৫ তারিখ কলেজে ছাত্রী সংসদের নির্বাচন ছিল। স্যারের ভাষায়- ‘আমার পোলাডা ছেড়ে দিয়েন, আমার দরকার।’ পরবর্তীতে যথারীতি আমি ৬ তারিখ অবমুক্তির অনুমতিপত্র নিয়ে ভিক্টোরিয়া কলেজে যোগদান করি। ভিক্টোরিয়া কলেজে আমি ৯জন অধ্যক্ষের অধীনে চাকরি করেছি। সকলের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলছি একমাত্র অধ্যক্ষ আবদার রশীদের সান্নিধ্য-স্নেহ-সহযোগিতা এবং বিকশিত হওয়ার যে-সাহচর্য পেয়েছি, তা আমার জীবনের অনেকটুকু মূলধনের মতো সম্পদ হয়ে আজও বহমান। তিনি আমাকে অকৃত্রিম স্নেহ করতেন। আমার প্রতি তাঁর অগাধ বিশ^াস রেখেছিলেন। আমি তখন বিকেলে একটি কাগজের দোকানে ম্যানেজারি করতাম, তিনি সেখানে চলে যেতেন, অনেক সিনিয়র শিক্ষকগণ জড় হতেন, সমৃদ্ধ আড্ডা হতো। তিনি অধ্যক্ষের বাসায় একা থাকতেন, আমার ও আমাদের আহবান ছিল অনেকটা আদেশজারির মতো। সে অনেক কাহিনি।
একসময় আমি মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের ৬ বছর শিক্ষকতা করেছি, পাঁচজন অধ্যক্ষের অধীনে চাকরি করেছি। সর্বশেষ অধ্যক্ষ ভিক্টোরিয়া কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যক্ষ জনাব ছিদ্দিকুর রহমান ভূঁইয়া যখন যোগদান করেন, তখন কুমিল্লাবাসী ও প্রাক্তন সহকর্মী হিসেবে আমাদের মেলামেশা, একত্রে ভাড়াবাসায় থাকা ও খাওয়া দাওয়া করা ইত্যাদি তখন বন্ধু পর্যায়ে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। সে এক অভূতপূর্ব বন্ধু-স্বজন সম্পর্ক। একসময় ১৯৯৮ সালে সম্ভবত এপ্রিলের দিকে বদলি হয়ে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে চলে আসি। ২০০১ সালে পদোন্নতি তথা সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে আমার শেষ কর্মস্থল চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে যোগদান করি। অধ্যক্ষ ছিলেন প্রফেসর আতিয়া আহমদ। বড় ভালো মানুষ ছিলেন।
আমি তাঁকে অল্পদিন অধ্যক্ষ হিসেবে পেয়েছি। এক পর্যায় চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে উপাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. ফাতেমা নার্গিস চৌধুরী অধ্যক্ষ হিসেবে চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে যোগদান করেন। তাঁর কথাই বলব।
চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ খুলসী এলাকায় ছোট্ট টিলার উপর ২১ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত। এক কোণায় একটি দরগা আছে। উঁচু টিলায় অধ্যক্ষের নিবাস। পেছনে ছাত্রীনিবাস ও মাঠ। আছে ক্যান্টিন। কলেজে ঢুকলেই মূল বিল্ডিং এর সামনে সুন্দর ফুলের বাগান। বাগানের মধ্যে বড় গাছ, তার নীচে পাকা বসার জায়গা। বাগান নিয়মিত পরিচর্যা করা হয়। কলেজ শুরুর আগে অধ্যক্ষের টেবিলে ও শিক্ষক পরিষদে ফুলের টবসাজানো। ছাত্রীরা ফুল কিনে নেয়, ফুলের চারাও অর্থের বিনিময়ে বাসায় নিয়ে যায়। নান্দনিক ব্যাপার। একটি রোমান্টিক আবহাওয়া। পাঁচটি কলেজে চাকরি করেছি। কুমিল্লা মহিলা কলেজে ১০ বছর, ভিক্টোরিয়া কলেজে ১৬ বছর, মৌলভী বাজার কলেজে ৬ বছর, রাঙ্গুনীয়া কলেজে প্রায় ৫ বছর, আর চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে ২ বছর থেকেও কম। শেষোক্ত কলেজে চাকরি করতে গিয়ে বেশ আনন্দ-সহযোগিতা-আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছি। বাংলা বিভাগের ছাত্রীরা আমার প্রতি এতটাই শ্রদ্ধান্বিত ছিল, এখনও অনেকে যোগাযোগ করে থাকে। বিভাগে সর্বক্ষণ সাথি ছিল হরিশংকর জলদাস। একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে হয়, বিভাগের সহকর্মী-সহকারী অধ্যাপিকা বদরুন্নাহার বেগম, চার সন্তানের মাতা, স্বামী চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক, ঘোরতর তাবলীগ করেন। আমার শেষকর্ম দিবসের চারদিন আগে গোপনে বাসা থেকে রান্না করে লাইব্রেরিতে বসিয়ে খাওয়ালেন। তা ভিন্ন প্রসঙ্গ।
আমি প্রতি সপ্তাহে কুমিল্লায় চলে আসতাম। পারিবারিক প্রয়োজন ছাড়াও রামকৃষ্ণ আশ্রমের সম্পাদক ছিলাম বলে সাপ্তাহিক কিছু কাজ উপস্থিত থেকে করতে হতো। সেজন্য বৃহস্পতিবার ক্লাশ করে কুমিল্লা চলে আসতাম। রবিবার বিকেলের ট্রেনে চলে যেতাম। সোম-মঙ্গল-বুধ-বৃহস্পতিবার ক্লাশ নিতাম। শনিবার-রবিবার অনুপস্থিত থাকতাম। বিভাগীয় প্রধান তা কিছুতেই মেনে নিবেন না। অথচ আমার চাকরির একেবারে শেষ দিক। বাধ্য হয়ে অধ্যক্ষ ড. ফাতেমা নার্গিস চৌধুরীর কাছে সব খুলে বললাম। তিনি বিষয়টি বিবেচনায় সহজভাবে নিলেন। কারণ, বিভাগে কোনো শিক্ষকের ঘাটতি ছিল না। আমাকে অনুমতি দিলেন এবং অতি গোপনে বললেন যে তারিখবিহীন একটি সি,এল-এর দরখাস্ত যেন তাঁর কাছে জমা রাখি। তা-ই হলো।
২০০২ সালে ২০ আগস্ট আমার পিতৃদেব মৃত্যুবরণ করেন। একমাস আমাকে মৃত অশৌচের বিধি বা নিয়ম পালন করতে হবে, তা চট্টগ্রামে থেকে বা কুমিল্লা থেকে যাওয়া-আসা করে পালন করা সম্ভব নয়। তাঁকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলায় তিনি আমাকে সে সুযোগ দিয়েছিলেন। আমাকে একটি পরীক্ষা কমিটির আহবায়ক মনোনীত করলেন। অনেক অনুরোধের পরও বললেন- ‘যাওয়ার সময় একটি কাজ করে যান, এটা আমার ইচ্ছ।’ আমি মাথা পেতে দায়িত্বটি পালন করেছি।
যে কথাটি গর্বের সাথে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে। তিনি আমাদের অর্থাৎ শিক্ষকদের পাঠদান বিষয়ে খোঁজখবর নিতেন অনেকটা গোপনে। আমি একদিন দ্বিতীয় বর্ষ (উচ্চমাধ্যমিক) বিজ্ঞানের ক্লাশ নিচ্ছি, তিনি বারান্দায় দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, মেয়েরা দেখতে পেয়ে একটু চঞ্চল হয়েছিল। আমি বুঝিনি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়- একদিন আমি বাংলা সম্মান শ্রেণির (৩য় বর্ষ) ক্লাশ নিতে দোতলায় বারান্দায় দিয়ে যাচ্ছি, তিনি আমার পেছনে পেছনে আসছেন, আমি তা দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম। তিনি আমার কাছে এসে বললেন-‘ আমি আজ আপনার ক্লাশের ছাত্রী হবো।’ তিনি আমাকে নিয়ে ক্লাশে ঢুকলেন, ছাত্রীদের সঙ্গে বসলেন, আমি সেদিন হাজিরা না নিয়ে সোজা সেদিনের পড়ার বিষয়ের উপর বক্তৃতা শুরু করি। পুরোটা সময় তিনি উপস্থিত থেকে ঘন্টা শেষে আমাকে নিয়ে অধ্যক্ষের রুমে গেলেন, চা-বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। আমি অভিভূত হলাম, তিনি তাঁর মুগ্ধতার কথা শুনালেন। এমনটি যে আমার শেষ কর্মজীবনে প্রাপ্তি, তা শ্রদ্ধা ও আবেগ দিয়ে আজও আমি স্বাপ্নিক জগতের শিক্ষক। 
আমার চাকরির শেষ সাতদিন কলেজে উপস্থিত ছিলাম ক্লাশ নিয়েছি। সহকর্মীদের সাথে কথা বলেছি। ছাত্রীদের থেকে বিদায় নিয়েছি। শেষদিন ৪টার সময় হরিশংকর বাবুকে নিয়ে অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করেছি। আগেই উপাধ্যক্ষসহ অন্যান্য বিভাগের প্রধানগণ কক্ষে ছিলেন। অধ্যক্ষ ড. ফাতেমা নার্গিস চৌধুরী আমি কক্ষে ঢোকার সাথে সাথে ফুলের তোড়া নিয়ে এগিয়ে এসে আমাকে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানালেন। আমি ভেঙ্গে পড়িনি, মানসিক প্রস্তুতি ছিল, সহজভাবে বিদায় মুহূর্তটি উপভোগ করেছি। কারণ, অধ্যক্ষ ড. ফাতেমা নার্গিস চৌধুরীর মহিমময় ব্যক্তিত্ব আমাকে আপ্লুত করে রেখেছিল। পরে শিক্ষক পরিষদ অপর দু’শিক্ষকসহ যথামর্যাদায় আমাদের আনুষ্ঠানিক বিদায় সংবর্ধনা দিয়েছিল।
২৬ এপ্রিল ২০২৬ রবিবার তিনি মৃত্যুবরণ করলেন, ফেইসবুকে প্রথম খবরটি দেখি, পরে খোঁজ নিই। একজন শ্রদ্ধেয় পরমাত্মীয়ের বিদায়-বেদনায় আমি শোকাভিভূত হয়ে কিছুটা সময় আপন জগতে বিচরণ করে তাঁকে খুঁজেছি। মননে তাঁকে পেয়েছি, আত্মচেতনায় শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছি। একজন দুর্লভ ব্যক্তিত্বময়ী শিক্ষক ও প্রশাসকের অধীনে স্বল্প সময় চাকরিকাল অতিবাহিত করে নিজেকে গৌরবান্বিত করতে পেরেছি। শেষকথা- ম্যাডাম, ভালো থাকবেন। আপনাকে অনন্তকাল শ্রদ্ধা জানাই, জানাব।














http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
কুমিল্লা ওয়াসা গঠনের সিদ্ধান্ত
কুমিল্লায় প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে কড়া নিরাপত্তা
কুমিল্লায় বিদেশি পিস্তলসহ যুবক গ্রেপ্তার
তিন বছর স্ট্যান্ডের ইজারা নেই, বছরে কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে মানসিক প্রতিবন্ধি রোগী নিখোঁজ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কুমিল্লায় প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি
ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেললাইন চালুর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে এমপি মনিরুল হক চৌধুরীর বৈঠক
জলাবদ্ধতা নিরসনে কুমিল্লা নগরীর খাল পরিদর্শনে প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু
কুমিল্লা ওয়াসা গঠনের সিদ্ধান্ত
কুমিল্লার তিতাসে হত্যা মামলার আসামিকে কুপিয়ে হত্যা
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২